অনুভূতির_অন্বেষণ পর্বঃ২

0
362

অনুভূতির_অন্বেষণ পর্বঃ২
#চন্দ্রিকা_চক্রবর্তী

(৫)

—-আরে আপু, বুঝিস না কেন, আমি তো আর এমনি এমনি এতোকিছু মনে রাখি না।

—-তো কেমনে কেমনে মনে রাখিস?

—-আরে ওইদিন তো আমি ওয়াশরুমে পা পিছলে পড়ে গিয়েছিলাম। পা মচকে গিয়েছিলো। কপাল ফেটে গিয়েছিলো। হাত ভেঙ্গে গিয়েছিলো। এমনকি মারাও গিয়েছিলাম।

শেষের কথাটা বলে আরেক বার জিহবায় কামড় দিলো ইশরাত। এই যা! এতো বেশি বকবক করার দরকার টা কী ছিলো? শেষের কথাটা বলে তো একেবারে দিলো সব শেষ করে।

—-ওহ তাই? তুই মরেও গিয়েছিলি? তা আমার সাথে কী এখন তোর ভূত শুয়ে আছে?

—-ইয়ে মানে স্লিপ অফ টাং। মানে একটু ভুল বলে ফেলেছি আর কী। আসলে বলতে নিচ্ছিলাম যে এতো এতো জায়গায় আঘাত পেয়েছিলাম যে মারা যাওয়ার মতো অবস্থা হয়েছিলো।

—-কপাল ফেটেছে? হাত ভেঙ্গেছে? পা মচকেছে?

—-হ্যাঁ তো। এই জন্যই তো সেদিনটা ভুলিনি আমি।

—-গত মাসের পাঁচ তারিখ এমনটা হয়েছে তাই না?

—-তবে আর বলছি কী!

—-তাহলে গত মাসের দুই তারিখ যে শুনলাম ক্লাস পার্টি করার জন্য তুই আম্মুর কাছে টাকা চেয়েছিলি? ছয় তারিখ নাকি ক্লাস পার্টি শেষ করে বাসায় ফিরতে ফিরতে তোর সন্ধ্যা হয়েছিলো? তো পার্টিতে কী পায়ে, কপালে, হাতে ব্যান্ডেজ করে গিয়েছিলি?

ইশরাতের এখন ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা। কাঁদো কাঁদো কন্ঠে বললো

—-আপু, আমার পেট ভীষণ ব্যথা করছে। মনে হচ্ছে এখন বাথরুমে না গেলে একটা বিশ্রী ব্যাপার ঘটে যেতে পারে এখানে। আমি যাই?

মিশরাতের উত্তরের অপেক্ষা না করে দৌড়ে ওয়াশরুম চলে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দিলো ইশরাত। ইশরাত যাওয়া মাত্রই মিশরাত হাসতে হাসতে বিছানায় শুয়ে গড়াগড়ি খেতে লাগলো। হাসির রেশ কাটলো ফোনে কল আসার শব্দে। আননোন নাম্বার থেকে ফোন এসেছে। এতো রাতে! ঘড়িতে তাকিয়ে দেখলো প্রায় বারোটা বেজে সাতাশ মিনিট। না, এতো রাতে ফোন ধরা ঠিক হবে না। নিশ্চয়ই কোনো বখাটে ছেলে বিরক্ত করার জন্য ফোন দিচ্ছে। ফোন ভাইব্রেশন মোডে করে টেবিলে রেখে শুয়ে পড়লো মিশরাত। কিন্তু ফোনে কল আসা বন্ধ হচ্ছে না। আর ফোন ভাইব্রেট হতেই থাকলো। এতবার করে যখন ফোন দিচ্ছে তখন কী গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজ পড়লো নাকি আবার? মিশরাত ঠিক করলো ফোন রিসিভ করে কথা বলবে না। আগে অপরপ্রান্তের ব্যক্তির কথা শুনবে, কন্ঠ শুনবে। যেই ভাবা সেই কাজ। ফোন রিসিভ করে কানে লাগিয়ে চুপচাপ রইলো মিশরাত।

অপর প্রান্ত থেকে শুধু কিছু দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শোনা গেল। কথা বলছে না মানুষটি। মিনিট দুয়েক কেটে যাওয়ার পর মিশরাত নিজে থেকে বললো

—-রাত-বিরেতে মেয়েদের না জ্বালাতন করলে বুঝি পেটের ভাত হজম হয় না? ভালো ঘুম হয় না? ফোন দিয়ে চুপ করে বসে থাকিস। কেন? মেয়ের কন্ঠটা একবার শুনবি বলে? শুনে নিয়েছিস? মনস্কামনা পূর্ণ হয়েছে? এবার রাখ ফোন!

একগাদা কথা শুনিয়ে সবেমাত্র ফোন কান থেকে নামাতে নিয়েছিলো মিশরাত। এরমধ্যেই শুনতে পেল একটি ভরাট পুরুষ কন্ঠ।

—-একটু ফোনটা ধরে রাখবে মিশরাত? কথা বলতে হবে না। তোমাকে একটুও বিরক্ত করবো না। শুধু তোমার শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ শুনতে চাই। এতোটুকু দয়া করবে আমার উপর? আমার ঘুম আসছে না। একটুও ঘুম আসছে না।

—-ওহ, তাই তো বলি। এরকম তো কখনো আমার সাথে হয়নি। আজকে হঠাৎ করে এতো রাতে ফোন। বোঝা উচিত ছিলো যে আপনার মতো একটা নির্লজ্জ মানুষ আমার পিছু নিয়েছে। এই সমস্যা কী আপনার একটু খুলে বলবেন?

—-তুমি আমার কথা শুনবে মিশরাত? সত্যি শুনবে?

—-ঢং কম করবেন। আমি আপনার সাথে প্রেমালাপ করবো বলিনি। শুধু বলেছি আপনি আমাকে এভাবে বিরক্ত করছেন কেন তার কারণটা বলে যেতে।

—-বলেছিলাম তো তোমাকে গাড়িতে বসে তখন। আমি একটু প্রাণ খুলে বাঁচতে চাই।

—-আমি কী আপনার প্রাণনাশ করেছি?

—-না, এর জন্য আমি নিজেই দায়ী। কিন্তু আমার এই ভুলটা আমি শুধরাতে চাইছি।

—-আপনি কোনো ভুল করেননি। সব ভুল আমার ছিলো। অতিরিক্ত আবেগ নিয়ে চলতাম তখন। আর তার জন্য আমার যথেষ্ট শিক্ষাও হয়েছে। আপনাকে আমি পাঁচ বছর আগে যে কয়েকটা দিন, যে কয়েকটা মুহূর্ত বিরক্ত করেছিলাম, তার সবকিছুর জন্য দুঃখিত।

—-আরেকটু বিরক্ত করো না আমায়? আমি যে বিরক্ত হতে চাই। নয়তো সেই সময়টুকুতে আমাকে নিয়ে যাও?

—-আপনার কী চাকরি চলে গিয়েছে? নাকি বউ ছেড়ে চলে গিয়েছে? মানে এতোটা আজাইরা সময় মানুষ পায় কীভাবে?

—-আমি সবকিছু ফেলে চলে এসেছি মিশু। চাকরি আমার যায়নি। আমি কারোর অধীনে কাজ করিনা যে আমার চাকরি যাবে। বরং অনেক অনেক কর্মচারী আমার অধীনে কাজ করে। তাই চাকরি যাওয়ার প্রশ্নই আসে না। আর বউ এর কথা বলছো? আমি তো এখনো বিয়ে করিনি মিশু। বউ ছেড়ে যাবে কীভাবে?

—-এই জন্যই আজকে আপনার এই অবস্থা। আপনার মতো যোগ্যতা সম্পন্ন একজন মেয়ে দেখে বিয়ে করে ফেলুন। আর আপনার তো এতো দেরী করার কথাও না। আপনার প্রেমিকা কোথায়? ওই যে বলতেন আপনার মিস পারফেক্ট? তো কোথায় উনি? আপনি নিজেকে পারফেক্ট হিসেবে দাবী করেন। আপনার বউ তো অবশ্যই পারফেক্ট হতে হবে। সমানে সমানে হবে তবেই না যায়! তাই বিয়ে না করে থাকলে জলদি করে ফেলুন। অবশ্যই বিয়েতে দাওয়াত দিবেন। ঠিক আছে?

—-নিজের বিয়ের দাওয়াত নিজে চাইছো?

দাঁত কিড়মিড় করতে করতে ফোন রেখে দিতে নিলো মিশরাত।

—-দাঁড়াও মিশু, ফোন কেটো না। একটা কথা কান খুলে শুনে রাখো। তুমি আমাকে শাসন করো, বকাঝকা করো, এমনকি মারো— যা ইচ্ছে তাই করো। কিন্তু আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করার কথা ভেবো না। ভাবতে যেও না। কারণ বিয়ে তোমার আমাকেই করতে হবে। ইতোমধ্যেই বুঝে গিয়েছো, তোমার ফোন নাম্বার যেহেতু আমি জোগাড় করে ফেলেছি, তাহলে তোমার বাসা খুঁজতে বা ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে জানতে আমার খুব বেশি একটা বেগ পেতে হবে না। তুমি না চাইলেও আমি জানবো। তুমি জানালেও আমি খবর পাবো। তুমি না বললেও আমি শুনতে পারবো। তাই আমার থেকে পালিয়ে তুমি অন্য কোথাও যেতে পারবে বা অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারবে সে কথা ভুলেও ভেবো না।

—-আপনার থ্রেট শুনে আমি ভয় পাই না। একবার বলেছি, আবারও বলছি। আপনাকে ভয় পেত যে মিশু, আপনাকে ভালোবাসতো যে মিশু, সে অনেক আগেই মরে গেছে। এখন যে আপনার সাথে কথা বলছে সে মিশরাত বিনতে শোয়েব। আপনার মতো আরিয়ান হক কে সে এখন আর ভয় পায় না, পরোয়া করে না। শুনতে পেয়েছেন? রাখুন এবার ফোন।

মিশরাত রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে নিজেই ফোন কেটে দিলো।

—-আপু?

চট করে পাশে ফিরে মিশরাত দেখলো ইশরাত তার দিকে তাকিয়ে আছে।

—-কিছু বলবি?

—-আরিয়ান হক আবার তোর জীবনে ফিরে এসেছে? কবে এলো? কাউকে কিছু বললি না কেন?

—-ইশু, এখন কাউকে কিছু বলার দরকার নেই।

—-অবশ্যই আছে আপু। ওই লোকটা তোকে কী পরিমান অপমান করেছিলো তা আমি ভুলিনি। মনে তো চায় তাকে পেলে সকাল-বিকাল থাপড়াতে!

—-ইশু, ভদ্রতা বজায় রেখে কথা বল। সে বয়সে তোর থেকে অনেক বড়।

—-হোক বড়। শুধু বড় না, বুড়ো হোক। তবুও যা সত্যি তা আমি বলবোই। তোর চোখের পানি আমি দেখেছি আপু। আব্বুকে অপমানিত হতে দেখেছি। কার জন্য? শুধু ওই আরিয়ান হক এর জন্য। ওই লোকটাকে আমি কোনোদিনও ক্ষমা করতে পারবো না। আর তোর জীবন থেকে তো নিজেই চলে গিয়েছিলো। না, কথাটা হলো না। আসলে কথাটা হলো, তোকে অপমান করে তাড়িয়ে দিয়েছিলো নিজের জীবন থেকে। তাহলে এখন আবার তোর কাছে কেন এসেছে? তোর জীবনে কেন এসেছে? তাকে ছাড়া তুই দিব্যি ভালো আছিস, সেটা বুঝি সহ্য হচ্ছে না তার?

—-আমি জানি না রে। আজকে রাতে প্রথম তার সাথে আমার এতো বছর পর দেখা হয়। জানিস, আজকে ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে যখন আমি তাকে দেখলাম, তখন মনে হলো আমি বুঝি বৃষ্টির কারণে চোখে ভুল দেখছি। অনেকবার চোখ কচলে তার দিকে তাকিয়েছিলাম।

—-ওহ, তার মানে আজকের ঘটনা থেকে এর সূত্রপাত?

—-হ্যাঁ, আমাকে বারেবারে রীতিমতো হুমকি ধমকি দিচ্ছে যাতে অন্য কাউকে আমার জীবনে না রাখি। বুঝতেই পারছিস অন্য কেউ বলতে কাকে বোঝাচ্ছি।

—-সাদমান ভাইকে বলেছিলি?

—-না, তখন রাস্তায় জিজ্ঞেস করেছিলো। কিন্তু বৃষ্টির কারণে আর বলা হয়নি। এখন তো অনেক রাত। আর বলা হবেও না আজকে। কালকে সকালে না হয় বলবো।

—-সেটাই কর। আব্বুকে জানাতে চাচ্ছিস না ঠিক আছে। কিন্তু সাদমান ভাইয়াকে জানিয়ে রাখাটা বোধহয় ভালো হবে।

—-আচ্ছা, বলে রাখবো। এখন ঘুমাতে আয়।

বিছানায় শুয়ে থাকা অবস্থায় ইশরাতের দিকে হাত বাড়িয়ে দিলো মিশরাত। হাসিমুখে বোনের কাছে চলে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে ফেললো ইশরাত।

—-আপু, সবাই বলে মায়ের শরীরে নাকি একটা মা মা গন্ধ পায় বাচ্চারা। আমিও পাই আম্মুর শরীরে। কিন্তু আমি আরও একটা ঘ্রাণ পাই জানিস? আপু আপু ঘ্রাণ। তোকে জড়িয়ে ধরলে।

—-পাগলি! ঘুমা।

—-ও আপু, তোর বিয়ে হয়ে গেলে আমার কী হবে রে?

—-ঠিক আছে, আমার আগে তোর বিয়ে দিতে বলবো আব্বুকে।

—-ধ্যাত! আমি ইমোশনাল কথা বললাম একটা। আর তুই মজা নিচ্ছিস। ওহ, বিয়ের কথা বলায় মনে পড়লো। তা ওই আরিয়ান হক এর জন্য না মেয়ে ঠিক ছিলো? সেই মেয়েকে বিয়ে করেনি? নাকি বিয়ের পর বউ মুখে লাথি মেরে চলে গেছে?

—-ইশু, কারোর উপর রাগ করে থাকলেই যে এভাবে কথা বলতে হবে তার কিন্তু কোনো মানে নেই। মুখের উপর লাথি মারা এগুলো কোন ধরনের কথার নমুনা বল তো?

—-আপু, তুই কী দিয়ে তৈরি বল তো? যে মানুষটা তোর সাথে এরকম করলো, তুই এখনো তাকে কিছু বললে এভাবে রেগে উঠিস?

—-ধুর! রাগ কখন করলাম? তাও তোর সাথে? আমার ইশুর সাথে আমি রাগ করতে পারি? আসলে এভাবে উল্টোপাল্টা কথা আমি কাউকে বলতে পারি না। তাই আর কী। আর ওই লোক বিয়ে করেনি বলেছে৷ কেন করেনি কে জানে! সেটা জেনে আমার কাজ নেই। এখন ঘুমা তো। আমি চুলে বিলি কেটে দিচ্ছি।

(৬)

—-তুমি আমাকে গতকাল বলোনি কেন?

—-আরে কালকে তো সুযোগ ছিলো না। আর আমি তো দেরী করিনি। এখনই বলে দিলাম। তাছাড়া এটা তো এতো জরুরি কিছু না।

—-থানায় মামলা করবে?

—-কীসের?

—-পার্সোনাল হ্যারেসমেন্ট এর?

—-আরে না। এখনই এতদূর যাওয়ার দরকার নেই। একটু অপেক্ষা করে দেখি। এমনও তো হতে পারে যে হুজুগের বশে চলে এসেছে আমার কাছে। দু-তিন দিন পিছন পিছন ঘুরবে। এরপর পাত্তা না পেয়ে আবার চলে যাবে।

—-রিস্ক নেওয়াটা কী ঠিক হবে?

—-আরে রিস্ক কোথায়! তুমি তো আমার সাথে অফিসে যাতায়াত করার সময় থাকোই। আর বাসার ঠিকানা জানলেও কখনো হুটহাট করে ঢুকে পড়ার সাহস সে করবে বলে আমার মনে হয় না।

—-হুম, বুঝলাম। আচ্ছা, আন্টি কোথায়?

—-আম্মু একটু দোকানে গিয়েছে। ওই নুডলস, বিস্কিট, চানাচুর টুকটাক খাবার কিনতে। এই সুযোগেই তো তোমাকে ডাকলাম। নয়তো আম্মুর সামনে আরিয়ানকে নিয়ে কথা তুলতে পারবো নাকি কখনো? দেখা যাবে ওই মানুষের কথা শুনেই আম্মু গলা ফাটিয়ে এমন এক চিৎকার দেবে যে পুরো বিল্ডিংয়ের লোক জড়ো হয়ে যাবে!

—-তা যা বলেছো! আন্টির এমনিতেও তোমাকে নিয়ে বেশ চিন্তা। শুধু তোমাকে নিয়ে নয় অবশ্য, তোমার ছোটবোন কে নিয়েও। তা কোথায় সে?

—-সাজুগুজু করছে।

—-ছেলে দেখতে আসবে নাকি?

—-ছেলে তো প্রতিদিনই দেখতে আসে।

অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো সাদমান।

—-সাবাশ! এটাকেই বলে সেন্স অফ হিউমার। ইদানীং বেশ ভালোই রপ্ত করে ফেলেছো দেখছি।

—-দেখতে হবে না কার সাথে থাকি?

—-পরোক্ষভাবে প্রশংসা করার জন্য ধন্যবাদ।

—-আপু?

মিশরাত আর সাদমান তাকিয়ে দেখলো হাতে নাস্তার ট্রে নিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে ইশরাত। চুলগুলো ছেড়ে রেখেছে। ইশরাত আর মিশরাত দু’বোনেরই কোমড় সমান চুল। মিশরাতের চুল সোজা আর ইশরাতের কোঁকড়ানো। এখন এলোকেশী হয়ে অবনত মস্তকে দাঁড়িয়ে আছে। চোখে গাঢ় কাজল আর ঠোঁট গোলাপি রঙে রাঙানো। স্মিত হাসি ঠোঁটে বজায় রেখে সাদমানের সামনে এসে দাঁড়ালো ইশরাত। নাস্তা রাখলো টেবিলে।

—-খেয়ে নিন।

—-আমার জন্য আনিসনি ইশু? আমিও তো খাইনি।

—-আমি তো তোর সাথে খাবো বলে আনিনি।

—-কেন, তুমি আর মিশরাত আমার সাথে খেয়ে নিতে পারো তো। আমার একা খাবার খাওয়া থেকে তোমাদের সাথে খেলে ভালো লাগবে।

—-ইশু, তুই বস। আমি নিয়ে আসছি আমাদের খাবার বেড়ে।

মিশরাত উঠে চলে গেলে ইশরাত গিয়ে বসলো সাদমানের পাশে। সাদমান হাতে পত্রিকা নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখেছে। সেদিকে বেশ কয়েকবার তাকিয়ে আবার চোখ নামিয়ে নিলো ইশরাত। কানের পাশে বাম হাতে দিয়ে ছোট ছোট চুলগুলো গুঁজলো। এরপর গুনগুন করে গাইতে লাগলো

—-পড়ে না চোখের পলক, কী তোমার রূপের ঝলক!

—-নিজেকে নাগিন ভাবতে তোমার খুব ভালো লাগে মনে হয় ইশরাত? নাগিন সিরিয়ালের পরবর্তী সিজনের নায়িকা হতে চাও নাকি?

কথাটা শোনার সাথে সাথে ইশরাতের হাসিখুশি মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। চমকে প্রশ্ন করলো

—-মানে?

—-শুনেছি সাপ নাকি চোখের পলক ফেলতে পারে না। তো সাপ এর আপডেট ভার্সন কী? নাগ বা নাগিন? তোমাকে দেখতে তো আমার কাছে মেয়ে-ই মনে হয়। আমার ধারণা ভুল হলে বলতেই পারো! ভুল নাকি?

—-সাদমান ভাই, আপনি একটা উজবুক। শুধু উজবুক নয়, একটা নির্দয় এবং পাষাণ প্রাণী। আপনি কোনোদিনও আমাকে বুঝলেন না।

ইশরাত একরাজ্য সমান অভিমান মনে চাপিয়ে মুখ ফুলিয়ে সেখান থেকে উঠে চলে গেল। মিশরাত এরমধ্যেই খাবার হাতে নিয়ে আসছিলো। সে আসতে না আসতেই দেখলো ইশরাত দৌড়ে তার রুমে চলে যাচ্ছে। বোকাসোকা মুখে কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে থেকে সাদমানের কাছে এসে বসলো আবার।

—-ইশুর কী হলো আবার?

—-রাগ করেছেন উনি।

—-এই তো ভালো ছিলো। হুট করে রাগ উঠলো কেন আবার?

—-রাগ বোধহয় আমার উপরেই করেছে।

—-আবার তাকে খোঁচা দিয়ে কথা বলেছো তাই না?

বাঁকা হাসলো সাদমান।

—-কী মজা পাও এসব করে বলো তো? বেচারির আমার মতো অবস্থা। ইশুকে দেখলেই নিজের অতীতটা ভেসে উঠে। আমিও তো একজনের জন্য ঠিক এমনটাই পাগল ছিলাম। দিন রাতের হিসেব থাকতো না। তার ভাবনায় মত্ত থাকতাম। সকল সুখ, সকল অনুভূতির একচ্ছত্র অধিপতি তাকে করেছিলাম। অথচ আজ!

—-আরিয়ানকে নিয়ে তুমি কী এখনো ভাবো? আসলেই কী অতীত থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছো নাকি শুধু মুখেই বলো?

—-অতীত এমন একটা জিনিস, যা চাইলেও মোছা যায় না মন থেকে। আরিয়ান আমার মনে আর নেই। কিন্তু তাকে নিয়ে যেসব স্মৃতি ছিলো, তারা তো নিজেরা এসে মনে উঁকিঝুঁকি মারে ক্ষণে ক্ষণে। স্মৃতি ভোলা কী এতো সহজ সাদমান? তুমি যদি ইশুকে পছন্দ না করো তাহলে সরাসরি বলে দিও। মেয়েটাকে এভাবে অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখো না। নয়তো আমার মতোই অবস্থা হবে হয়তো। তবে ইশু কিন্তু আমার থেকে একটু ব্যতিক্রম। জানো কীভাবে?

—-কীভাবে?

—-সে সহজে কোনো অপমান ভুলতে পারে না। কাউকে যদি তার ভালো লাগে, তাহলে সেই মানুষটার আশেপাশে থাকার খুব চেষ্টা করে। কিন্তু যদি তার চেষ্টার সীমা অতিক্রম করে যায়, তবে কিন্তু সেই মানুষটার দিকে আর ফিরেও তাকায় না!

—-তুমি ঠিক কী বলতে চাইছো?

—-তুমি কী বোঝো না ইশু তোমাকে কীভাবে দেখে?

—-আমার বোঝা না বোঝার সাথে তোমার কথার সম্পর্ক কী?

—-সম্পর্ক আছে। ইশু তোমাকে পছন্দ করে তুমি জানো না?

—-সে আমাকে পছন্দ করলেই আমারও তাকে পছন্দ করতে হবে কোনো কথা আছে?

—-অবশ্যই না। এজন্যই বলছি, ইশুকে বুঝিয়ে বলে দাও। আশা করি এভাবে তাকে বুঝিয়ে বললে সে কিছুটা কষ্ট পেলেও নিজেকে সামলে নেবে। আর আমি তো আছি-ই। কিন্তু তুমি যদি তাকে কিছু না বলো, তাহলে তো তার অনুভূতি আরও গাঢ় হতে থাকবে তোমার জন্য। আর যতো প্রগাঢ় অনুভূতি হবে, ততো বেশি কষ্ট হবে। নিজেকে দিয়ে তো বুঝি। আর তুমি যদি তাকে পছন্দ করো, তাহলেও বলে দিও। নয়তো ওই যে বললাম, তার চেষ্টার সীমা অতিক্রম করে গেলে সে ওই মানুষটার দিকে আর ফিরেও তাকায় না!

মিশরাত কথা বলা শেষ করে সাদমানের দিকে তাকিয়ে লক্ষ্য করলো এক টুকরো আপেল মুখে দিতে দিতে একটা রহস্যময় হাসি দিলো সাদমান। যেই হাসির কারণ কিছুই বুঝতে পারলো না মিশরাত।

—-আজকে একটু বাইরে বের হবে?

—-কোথায়?

—-এমনি। আশেপাশে ঘুরে আসবো। কতোদিন পরে একটা ছুটি পেলাম। উইকএন্ড পেলেই তো শুধু ঘুম আর ঘুম। এবার ভাবছি একটু ঘুরে আসি। অনেকদিন যাওয়া হয় না কোথাও।

—-কখন যাবে?

—-বিকেলে চলো? সন্ধ্যার পরেই ফিরে আসবো। খুব বেশি দূর যাবো না।

—-শুধু আমরা দু’জন?

—-তোমার বোন কেও নিয়ে এসো না হয়। পরীক্ষা শেষ হয়ে গিয়েছে। এখন একটু রিফ্রেশমেন্ট দরকার।

—-তুমি জানো কীভাবে ইশুর পরীক্ষা শেষ? ইশু বলেছে তোমাকে?

—-তোমার বোন তো আর শহরের বাইরে কোথাও পড়াশোনা করে না। তার কলেজ সম্পর্কে আমার ধারণা আছে। যাই হোক, চলি। আন্টির আসতে বোধহয় সময় লাগবে। আসলে বলে দিও আমি এসেছিলাম।

সাদমান উঠে চলে গেলে মিশরাত টেবিল থেকে অবশিষ্ট খাবারগুলো নিয়ে চলে গেল ভেতরের রুমে। কিন্তু কেউ খেয়াল করলো না পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে একটা অভিমানী মুখ এতোক্ষণ যাবত তাদের সব কথাবার্তা শুনছিলো।

চলবে…
(ভুলত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। কার্টেসী ছাড়া দয়া করে কেউ কপি করবেন না।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here