অন্যরকম ভালোবাসা ২ -পর্ব ০৬+৭

0
69

###অন্যরকম_ভালোবাসা 💓 [২]
#ইফা_আমহৃদ
পর্ব:: ০৬

— “তুই নিজের বউকে অন্যের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিস আয়ান। এটা আমার লাইফ, তাই আমি কি করবো, না করব সম্পূর্ণ টা আমার ইচ্ছায়। ছেড়ে দিবি, দে..

হাতে অবস্থায় করা ফোনটা এখনও বেজে চলেছে। অতিশয় ক্ষোভে ফোনটা ছুঁড়ে ফেললো অদূরে। দেয়ালের সাথে বাড়ি খেয়ে ছিটকে এসে পায়ের কাছে পড়লো ইশরার। দুহাতে মাথার চুল টেনে বেডের উপর বসে পড়লো সে। আয়ান এগিয়ে এলো ইশরার দিকে। সংশয় দিয়ে স্পর্শ করলো ইশরার হাত। এক ঝটকায় নিজের হাত ছাড়িয়ে উঠে দাঁড়ালো ইশরা। জানালার গ্ৰিল মুষ্টিবদ্ধ করে বলল.

— “ইডিয়েট; আমার চোখের সামনে থেকে যা! তুই ভালো ভাবেই জানিস, আমি রেগে গেলে কি করতে পারি।”

বাইরের থেকে আসা হিম শীতল হাওয়ায় ইশরার চুলগুলো উড়ছে। পেছনে ঘন কালো কেশ ছাড়া কিছুই নজরে এলো না। বরাবরের মতো এখনও রুমের ভেতরটা আলোকহীন। আলোকহীনতায় এই অপরুপ সুন্দরী রমনীকে দেখে দু নয়ন পূর্ণ করার ইচ্ছে থাকলেও, অপূর্ণই রয়ে গেল।
আয়ান ইশরার রাগ সম্পর্কে অবগত। অন্যের উপর কখনো রাগ দেখায় না। সব নিজের উপর দেখায়। অতিশয় ক্ষোভের সময় কেউ তার পাশে থাকলে হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে দেয়ালে আঘাত করে। তিন বার ইশরার হাতের আঙ্গুল ভেঙেছিলো।

এগিয়ে গেল আয়ান। ইশরা আর নিজের মাঝের দূরত্ব ঘুচিয়ে নিল। আয়ানের বক্ষের সাথে ইশরার পিঠ সেপ্টে আছে। পেছনে ফিরলো না ইশরা। দৃঢ় বাঁধনে বেষ্টিত করে নিল জানারার গ্ৰিল। সে চাইছে না, এতো রাতে তুচ্ছ একটা কারণে কারো নিদ্রা ভঙ্গ হোক। দাঁতে দাঁত চেপে বলল.

— “আয়ান; এখান থেকে যা.!

কদাচিৎ সরে এলো আয়ান। নমনীয় সুরে বলল.

— “ইশরা আমি তোর ভালোর..

কথা শেষ করতে পারলো না আয়ান। ইশরার রক্তিম বর্ণ ধারণ করা লোচণের দিকে তাকিয়ে থমকের গেল। অন্ধকারের মাঝেও লাল নয়নজোড়া জ্বলজ্বল করছে। ভয়ংকর দৃষ্টি থেকে নিজেকে সরিয়ে নিল সে। তখনই মুখ খুলল ইশরা.

— “আমি তোকে একবারও বলেছি আমার ভালো করতে? তাহলে?”

বচন হারিয়ে ফেললো আয়ান। পায়ের গতি বাড়িয়ে বেলকেনিতে চলে গেল ইশরা। বিকট শব্দে দরজা বন্ধ করে দিল। সেই আওয়াজে ভাবনার ছেদ ঘটল আয়ানের। রুম প্রস্থান করে ড্রয়িং রুমের উদ্দেশ্য পা বাড়ালো সে।

ডেক্সিতে দুকাপ সমপরিমাণ পানি দিয়ে টিভি দেখতে বসেছে আয়ান। পরিমাণ মতো চিনি আর চা পাতা দিয়েছে। রং টা তীব্র হলে নিয়ে আসবে। একের পর এক চ্যানেল পাল্টাছে সে‌। গভীর রাত হওয়াতে তেমন কিছু নেই। মৃদু সুবাস এসে ধরা দিলো আয়ানের কানের ডগায়। তড়িৎ গতিতে কিচেনের দিকে এগিয়ে গেল সে। ডেক্সি থেকে কাপে চা ঢেলে নিল। নত হয়ে ডেক্সিটা বেসিনে রেখে পানিতে পূর্ণ করে ভিজিয়ে রাখল।
বাইরে থেকে ক্রমাগত কুকুর ডেকে চলেছে। জানালার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিল বাইরে। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় নিচে কয়েকটা কুকুর দেখা যাচ্ছে। রিহু বলতো, কুকুরেরা নাকি রাতে জ্বীন, পরী, ভূত দেখলে ডাকে। কিন্তু কিছুই দৃষ্টি গোচরে এলো না তাঁর। নিজের কান্ডে হাসলো আয়ান। সাধারণ মানুষ কিভাবে এইসব দেখবে।
দৃষ্টি সরিয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিতে যাবে তখনই কেউ কাপ নিয়ে গেল হাত থেকে। সেদিকে অবলোকন করলো আয়ান। তার বাবা আজাদ আহম্মেদ এসেছে। আয়ানের পাশে বসে আরাম করে চায়ের কাপে চুমুক দিলেন। দ্বিতীয় চুমুক দিয়ে আয়ানের পানে তাকিয়ে বললেন.

— “বাহহ, খুব ভালো চা বানাস তো তুই। আরেক কাপ বানা।”

বাবার এহেন কাজে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে ছিল আয়ান। ধ্যান ভাঙতেই আজাদ আহম্মেদের থেকে চায়ের কাপ নিতে উদ্ধেগ হয়ে উঠলো। রিনরিনে কন্ঠে বলল.

— “বাবা তোমার সুগার আছে। এতে চিনি দেওয়া। আমি তোমাকে চা বানিয়ে দিচ্ছি।”

আয়ানের কথা কর্ণপাত করলেন না আজাদ আহম্মেদ। পুনরায় চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন.

— “তোর মায়ের জন্য গভীর রাতে ঘুম ভেঙ্গে মিষ্টি খেতে আসি প্রতিদিন। আজ তোর মা ফ্রিজ লক করে রেখেছে।”

নয়ন যুগল ললাটে উঠে গেল আয়ানের। অবিরাম ঘনঘন পলক ফেলে বলল.– “তারমানে প্রতিদিনের মিষ্টি চোর তুমি বাবা!”

— “মুখ সামলে কথা বল! এখানে চোরের কি আছে? আমার টাকা দিয়ে মিষ্টি কেনা হয়, আর আমি খাবো না। ইডিয়েট! একবার বুড়ো হ, তখন বুঝবি নোনতা জীবন কতোটা কষ্টের!”

অসন্তুষ্ট হলো আয়ান। করুন চোখে বাবার দিকে তাকালো। ইশরা কথায় কথায় ইডিয়েট বলে, বাড়িতে আসার পরে এখন তার বাবাও ইডিয়েট বলে। অধর চেপে ডেক্সিতে থাকা বাকি চা-টুকু কাপে ঢেলে নিল।

________________
আজকের সকালটা একদম অন্যরকম। চারদিকে রোদের রশ্মি ঝলমল করছে। যদিও বর্ষাকালের মাঝামাঝি সময়। তবুও আকাশ পরিষ্কার। সকালের সূচনা হয়েছে অনেকক্ষন আগে। পেরিয়ে গেছে তিন থেকে চার ঘন্টার বেশি। রোদের সোনালী আভা এখন প্রকট আকার ধারণ করেছে। নিস্তব্ধ বাড়িটা এখন সমাচরে প্রান ফিরে পেয়েছে। হাই তুলতে তুলতে রুমের দিকে এগিয়ে গেল আয়ান। হালকা ভেড়ানো প্রবেশদ্বার খুলে সংকোচ নিয়ে প্রবেশ করলো আয়ান। বেডের মাঝ বরাবার ঘুমিয়ে আছে ইশরা। বেডের পুরোটা অংশ ইশরার দখলে। হাত পা ছড়িয়ে ছিটিয়ে অতল নিদ্রায় তলিয়ে আছে। কোলবালিশ টা পিঠের নিচে। পড়নে আয়ানের পোষাক।

অনুসূচনায় পূর্ণ হলো আয়ান। বিয়ে হয়েছে আজ কয়েকটা দিন পেরিয়ে গেছে। অথচ একটা জামা কিনে দেওয়া কথা মনে নেই। যদি ইশরার জায়গায় দিবা থাকতো। তাহলে এমন করতে পারত সে। আজ ফেরার পথে ইশরার জন্য প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে নিয়ে আসবে।

মাথার কোণে দুষ্টু বুদ্ধি এঁটে চারদিকে কিছু একটা খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে গেল আয়ান। কাবার্ড থেকে একটা একটা মোটা দড়ি বের করে ইশরাকে বেডের প্রতিটি কোণের সাথে বেঁধে নিলো। কালকে রাতে দেরী করে নিদ্রা আর গভীর নিদ্রাচ্ছন্ন থাকার কারণে উপলব্ধি করতে সক্ষম হলো না সে।

ইশরাকে শান্তিতে ঘুমাতে দেখে বিরাগী হলো সে। আয়ান সারারাত নির্ঘুম কাটিয়েছি আর ইশরা ঘুমিয়েছে। মানতে পারলো না আয়ান। পা টিপে টিপে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল আয়ান। এক বালতি পানি এনে ইশরার উপর ছুঁড়ে ফেলল। হন্তদন্ত হয়ে উঠে পড়লো ইশরা। হাত পা বাঁধা থাকায় কোনোরুপ লাভ হলো না। ভেজা চুপচুপ হয়ে আয়ানের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলো। বিষয়টা বোধগম্য হতে বেশ বেগ পেতে হলো ইশরাকে। রক্তচক্ষু করে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে তাকালো আয়ানের দিকে। আয়ান ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বুকে হাত গুজে বলল.

— “সারাদিন নিজেকে আমার বউ বলে দাবী করিস! বউয়ের কোন দায়িত্ব-টা পালন করেছিস তুই। রান্না করতে জানিস না, ঘুম থেকে দেরী করে উঠিস, পড়াশোনা চালে উঠিয়েছিস। পাঁচ মিনিট সময় দিলাম। রেডি হয়ে নিচে আয়। ভার্সিটিতে যেতে হবে।”

হেলেদুলে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল আয়ান। ইশরা ভ্রু কুঁচকে নিজের দিকে তাকালো। আঁতকে উঠলো সে। ওড়না বিহীন ভেজা জামা কাপড় চিপকে আছে শরীরের সাথে। ওয়াশরুম থেকে আয়ান বের হলে আবার তাকে এই রুপে দেখবে। ভাবতেই লজ্জায় কুঁকড়ে উঠলো সে। কি বেক্কল। সময় দিয়ে গেছে কিন্তু বাঁধন খুলে দিয়ে যায়নি।

— “ভাবী; আজকে কি ঘুম থেকে উঠবে ন..

ইশরা অবস্থা দেখে শব্দগুলো হারিয়ে গেল তনয়ার। মুখটা স্বল্প ফাঁক হয়ে আছে তার। ভেজা বেড শিট আর দড়ি গুলোর দিকে তাকিয়ে রইল সে। ইশরার কথা বাস্তবে ফিরলো সে!

— “তনু দড়িটা খুলে দাও তো। তোমার ভাইয়ের মাথায় পোকা ঢুকেছে।”

হেঁসে উঠলো তনয়া। তার ভাই দিনকে দিন সত্যি পাগল হয়ে উঠেছে। আবার মনে কোণে অন্য প্রশ্ন উঁকি। দিচ্ছে, প্রশ্ন টা নিজের ভেতরে রেখে দিলো।
সময় অবিলম্ব না করে ইশরার বাঁধন খুলে দিল তনয়া। শান্তির শ্বাস নিলো ইশরা। বিয়ের দিনের ব্যবহৃত জামা নিয়ে তনয়ার ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গেল। এই আয়ানকে একটা শাস্তি না দেওয়া পর্যন্ত শান্তি নেই তার।

(চলবে.. ইনশাআল্লাহ)অন্যরকম_ভালোবাসা 💓 [২]
#ইফা_আমহৃদ
পর্ব:: ০৭

— “ম্যাম; আমি ড্রেনের সাথে ধাক্কা খেয়ে কুকুরের উপর পড়েছিলাম। না মানে, কুকুরের সাথে ধাক্কা খেয়ে ড্রেনের উপর পড়েছিলাম। তাই আসতে দেরী হয়েছে। “(হাত কচলাতে কচলাতে ইশরা)

ইশরা ভিত্তিহীন কথা শুনে বুকে হাত গুঁজে দু’পা এগিয়ে এলেন শর্মিলা শিকদার। ইশরার পা থেকে মাথা পরখ করে নীড়দ্ধিধায় প্রশ্ন করলেন ক্লাসে উপস্থিত বাকি ছাত্র- ছাত্রীদের.

— “তোমরা কেউ আজকের নিউজ দেখেছিলে, আমি জানতাম সিলেট আর চট্টগ্ৰামের ড্রেনগুলোর অবস্থা শোচনীয়। কিন্তু ঢাকার ড্রেনগুলো যে জীবন্ত হয়ে উঠেছে, সেটা জানতাম না। তোমরা যদি কেউ জানো, আমাকে একটু জানাও.

ক্লাসের প্রতিটি কোণ সাক্ষী হলো আরো একটি হাসৌকর মুহুর্তের। অট্টহাসিতে শব্দের তালে মৃদু হাসলেন শর্মিলা শিকদার। মুখশ্রী ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতম হলে এলো ইশরার। জনশূন্য থাকলে নিজের দু গালে দুটো নয়, বরং চারটা চড় মারত। সামান্য অনৃত কথাটাও বলতে পারছে না। মাথার অগ্রভাগ চুলকাতে চুলকাতে বলল.

— “আসলে ম্যাম। ড্রেনের সাথে না, কুকুরের সাথে ধাক্কা খেয়ে ড্রেনের উপর পড়েছিলাম। হাতে একটু ব্যাথা পেয়েছি তাই।”

কনুর দেখিয়ে শেষের কথাটা উচ্চারণ করলো ইশরা। সূক্ষ চোখে কনুইয়ের দিকে তাকালেন শর্মিলা শিকদার। গাঢ় সবুজ রং ছাড়া কিছুই নজরে এলো না তার। ফুল হাতা দিয়ে হাতের ঘোড়ালি পর্যন্ত ঢাকা। টেবিলের উপর থেকে ইস্টিলের স্কেল নিয়ে স্বজোড়ে আঘাত করলেন তিনি। রিনরিনে কন্ঠে বললেন.

— “এখন থেকে কুকুরে যে খাবার খায়, সেগুলো তুমি খাবে। যদি একটু শক্তি হয়। সামান্য একটা কুকুরের সাথে ধাক্কা খেয়ে ড্রেনের উপর পড়ে। তোমাকে না দেখে আমি বিলিভ করতাম না। ভাগ্যিস তোমার মতো স্টুডেন্ট পেয়েছিলাম। তাই জানতে পারছি।”

তিনি ভালোভাবেই জানেন, এইসব ইশরার অমৃত কথা। গত কয়েক বছর ধরে দেখছেন। প্রতিদিন দেরী করে এসে একটা অজুহাত দিবেই। ইশরাকে ক্লাসে ঢোকার অনুমতি দিয়ে, ক্লাস করাতে মন দিলেন শর্মিলা শিকদার। তিনি বই হাতে তুলে কিছু বলা আগে আয়ান উপস্থিত হলো সেখানে। তিনি ভ্রু কুঁচকে আয়ানের দিকে তাকিয়ে বললেন.

— “তোমার কেন লেট হলো আয়ান। আমি তোমার কাছ থেকে আনডিসিপ্লিন আশা করি নি।”

— “ম্যাম ইশরাকে কুকুরের থেকে বাঁচিয়ে হসপিটালে নিয়ে গিয়েছিলাম।”

পুনরায় হেঁসে উঠলো সকলে। বিরাগী হলো ইশরা। অতিশয় ক্ষোভে ফোঁস ফোঁস করছে। আয়ান যে তাকে ইনসাল্ট করছে, বেশ বুঝতে পেরেছে সে।

___________________
মৃদু মৃদু হাওয়া বইছে। সমান তালে রাস্তার ধুলাবালি উড়ছি। কখনো ময়লা আবর্জনা গুলো আঁচড়ে পড়ছে গ্লাসের ফাঁকে। আবার দমকা হাওয়া সরিয়ে দিচ্ছে সেই আবর্জনা গুলো। ঘুটঘুটে অন্ধকারে তলিয়ে গেছে দিনের আকাশ। যেকোনো সময় বর্ষনের ধারা বেরিয়ে আসবে আকাশ চিরে। কারো বাড়িতে যাওয়া হবে।কেউ প্রবল আগ্ৰহে অপেক্ষা করবে বৃষ্টি থামার জন্য। চেয়ারে মুখোমুখি বসে আছে দুজন মানব। পিনপিনে নিরবতা বিরাজমান দুজনের মাঝে। মুখের অফুরন্ত বুলিগুলো মনের কোণে জড়ো হয়ে আছে। বলার শতচেষ্টা করেও বলতে সক্ষম হচ্ছে না। দুজনের কথার সূচনা করতে চাইলে ঘটল তৃতীয় ব্যক্তির আগমন। ওয়েটার দুকাপ কফি টেবিলে রেখে চলে গেলেন। মেঘ কপির কাপ হাত নিয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে চুমুক বসালেন। ইশরা কাপ তুললো না। এক ধ্যানে চেয়ে রইল ধোঁয়া ওঠা কাপের দিকে।

অর্ধকাপ ফাঁকা করে মেঘ বলল.

— “ইশরা আমি সব শুনেছি। আয়ান সকালে ফোন করে তোমাদের ব্যাপার-টা আমাকে জানিয়েছে।”

আশে পাশের টেবিলগুলো ফাঁকা। তবুও কিছুটা চাপা স্বরে বলল. — “সব জানিয়েছে।”
মাথা নাড়িয়ে সংক্ষেপে প্রতিউত্তর দিলো মেঘ.– “হম।”

কেটে বেশ কিছুক্ষণের নিরবতা। অধীর আগ্রহে মেঘের কথাগুলো শোনার জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনছে ইশরা। এই বুঝি বলে উঠলো,– “ইশরা আমি তোমাকে ভালবাসি। এই থেকে বড় সত্যি আর কিছু নেই। তুমি আমার কাছে ফিরে এসো। এতেই সন্তুষ্ট আমি।”
কিন্তু ইশরাকে হতবাক করে দিয়ে বিপরীত বাক্য উচ্চারণ করলো মেঘ.

— “ইশরা! তোমাদের বিয়েটা যেহুতু হয়ে গেছে, এখন সেটাতেই ফোকাস করো। আমি একজন সাধারণ মানুষ আর সাধারণ একজনের সাথেই বাকি জীবনটা কাটাতে চাই।”

ভাবনার মাঝে ডুবে কফির কাপে চুমুক দিয়েছিলো ইশরা। মেঘের কথা হালকা হয়ে এলো হাতে বাঁধন। কফির কাপ পড়লো না তবে অধরের বেশ কিছুটা অংশ সাক্ষী হলো সেই কষ্টদায়ক ব্যাপারে। দু ঠোঁট চেপে সেই কষ্টটা দমিয়ে রাখল। তবে মেঘের দেওয়া আঘাতটার সহ্য ক্ষমতা হলো না। বিরবির করে উচ্চারণ করলো, “দ্বিতীয় আঘাত।”
সেদিন আয়ানের দেওয়া সিগারেটের ছ্যাকার সাথে ছিল প্রথম বেদনা আর কফির সাথে দ্বিতীয় আঘাত। অস্ফুট স্বরে বলল.

— “মেঘ আমি অতি সাধারণ একটা মেয়ে।”

— “ছিলে, এখন নেই। এখন তোমার দেহের প্রতিটি স্পর্শ আয়ানকে ঘিরে। ব্যবহৃত কিছু আমি ব্যবহার করি না।”

দৃঢ় মনোবল সঞ্চয় করে ইশরা। অশ্রুসিক্ত নয়নে মেঘের দিকে তাকি পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ল.– “আমি ব্যবহৃত জিনিস মেঘ।”

— “তা নয়তো কি! তোমাদের বিয়ে হয়েছে। কয়েকটা দিন পেরিয়ে গেছে। এখনো আমাকে বিশ্বাস করতে হবে, তুমি ভার্জিন। তোমাদের মাঝে কিছু হয় নি।”

পরের কথাগুলো অস্পষ্ট হয়ে উঠলো ইশরার কাছে। নয়ন জোড়া বেষ্টিত করে নিল ঘন কালো অন্ধকারে। নিজেকে সংযত করে উঠে দাড়ালো সে! ব্যাগ থেকে পাঁচশত টাকার নোট বের করে রেখে দিলো কাপের নিচে। ব্যাগটা কাঁধে তুলে বলল.

— “তুমি সোজাসুজি বললেই পারতে। তুমি ভার্জিন চাও আমাকে নয়। তাহলে অন্তত এতো সময় নষ্ট হতো না।”

মনে কোণে জমে থাকা অভিযোগগুলো নিজের সাথে নিয়ে দরজা ঠেলে বেরিয়ে এলো ইশরা। ক্লান্ত শরীরটা এই অভিযোগ গুলোর ভাড় বইতে পারছে না।

__________
বাইরে বৃষ্টির ধারা বহমান। সময় অতিবাহিত হওয়ার সাথে সাথে বৃষ্টির বেগ বেড়ে চলেছে। ভিজে বাড়িতে ফিরেছে আয়ান। আলোকহীনতায় নিস্তেজ হয়ে আছে তার প্রিয় ঘরটা। ইশরার জন্য কিনে আনা জামা কাপড়ের শপিং ব্যাগগুলো বেডের উপর রেখে দিল। সুইচ অফ করে অন্ধকারের আবরন সরিয়ে দিলো। কিন্তু কোনো রুপ লাভ হলো না। প্রচন্ড শব্দে ভাঁজ পড়লো অদূরে। বিদ্যুৎ চলে গেল মুহূর্তেই। ফ্রেশ হতে জামা কাপড় নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল আয়ান।

মিনিট পাঁচেক পর বেরিয়ে এলো সে। বেডের উপর পড়ে থাকা ফোনের টর্চ জ্বালিয়ে পুরো রুমে নজর বন্দী করে নিল। ক্লান্ত নজরে দৃষ্টি গোচর হলো না ইশরাকে। সময় অবিলম্ব না করে টর্চের আলোয় রুম প্রস্থান করলো সে।

তিথি খাবারের টেবিল স্বযত্নে গুছিয়ে নিচ্ছে। অনেকক্ষন যাবৎ তনয়াকে ডাক দিচ্ছে, কিন্তু তার দেখাই নেই। হয়তো বজ্রপাতে তার ডাক দোতলায় অবস্থান করা তনয়ার ঘর পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে না। সেদিকে এগিয়ে গেলেন তিনি। মাঝপথে দেখা হলো আয়ানের সাথে। সেও তড়িগড়ি করে নিচে ছুটছে। তিথি কে দেখে সামনে এসে দাড়ালো আয়ান। সংকোচ নিয়ে কিছুক্ষণ আমতা আমতা করলো সে। অসন্তুষ্ট হয়ে উঠলেন তিথি। বিরক্তিকর কন্ঠে বললেন.

— “আয়ান ফাজলামো না করে, সামনে থেকে সর

সরলো না আয়ান। ইতোহস্ত বোধ করে বলল..

— “মা, ইশরাকে দেখেছো?”

— “জানি না মেয়েটার কি হয়েছে। ভার্সিটি থেকে ফিরে দরজা বন্ধ করে বসে ছিল। এখন হয়তো দরজা খুলেছে। হয়তো তোদের মাঝে সমস্যা ছিল। যা মিটিয়ে নে.

চলে গেলেন তিথি। আয়ানও সময় অবিলম্ব না করে রুমে প্রবেশ করলো। অন্ধকার রুমে পুনরায় নজর দিলেন। নজরে এলো না কাউকে। তদানিং বজ্রপাতের আলোয় পরিষ্কার হয়ে গেল সবকিছু। বেলকেনিতে ছায়ামূর্তি নজরে এলো তার। এগিয়ে গেল সেদিকে। বেলকেনির প্রবেশদ্বার খুলতেই দমকা হাওয়ায় পিছিয়ে গেল সে। ফোঁকট দিয়ে মাথা হেলিয়ে আবার উঁকি দিলো সেদিকে। বেলকেনির প্রতিটি কোণা ভিজে চুপচুপ হয়ে আছে। সেখানে মানুষের থাকার কোনো অবকাশ নেই। প্রবেশদ্বার বন্ধ করে ভেতরে যেতেই কাশির শব্দ শ্রবণপথে এলো আয়ানের। থেমে গেল চরণ। কাশির শব্দ অনুসরণ করে সেদিকে গেল সে। তদানিং বজ্রপাতের আলোয় ইশরার দেখতে পেল আয়ান। মাথা হাঁটুতে মুড়িয়ে বসে আছে দেয়াল ঘেঁষে। ঘন কালো কেশের জন্য মুখশ্রী দেখা যাচ্ছে না। ইশরার মুখোমুখি বসে, স্বল্প ধাক্কা দিলো। কেঁপে উঠলো সে। কম্পনের মাত্রা আগের তুলনায় অনেকটাই বেড়ে গেল। মাথা তুলে আয়ানকে গভীর ভাবে অবলোকন করলো। একদম বিধস্ত লাগছে তাকে। অগোছালো চুলগুলো পুরো শরীরে ছড়িয়ে আছে। চোখগুলো টকটকে রক্তিম। এই ইশরাকে কখনো দেখে নি সে। কিছু বলার আগেই হিংস্র বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়লো আয়ানের উপর।

__________ যদি শব্দ-বিহীন এক যুগল নয়নই অজস্র কথার উৎস হয়,
তাহলে বর্ণ-গুলোর ব্যবহার ভিত্তিহীন।
— ইফা 🌿

(চলবে..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here