অন্যরকম ভালোবাসা ২ -পর্ব ০১

0
119

নিজের রাগ সংযত করতে ব্যর্থ হওয়াতে ঠাস ঠাস চড় বসিয়ে দিল আয়ানের গালে। গালে হাত দিয়ে ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে ইশরার দিকে তাকিয়ে আছে আয়ান। এই দৃষ্টির মানে বড্ড অজানা তার কাছে। কাঁটা গায়ে লবনের মতো কাজ করছে। দৃষ্টিকে তুচ্ছ করে আয়ানের শার্টের কলার চেপে নিজের কাছে নিয়ে এলো ইশরা। তীব্র রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে দাঁতে দাঁত চেপে বলল.

— “লজ্জা করে না তোর। সাহস কি করে হয় আমাকে বিয়ের প্রোপজাল দেওয়ার। ইচ্ছে করছে তোকে.

বাক্য উচ্চারণ করার আগেই ইশরার হাত মুচড়ে ধরলো আয়ান। ব্যাথায় কুঁকড়ে উঠলো সে। শ্রবণপথের কাছে ওষ্ঠ এনে হিংস্র কন্ঠে বলল.

— “এখানে সাহসের কি আছে? বেস্ট ফ্রেন্ড হই আমি তোর। কেন? বেস্ট ফ্রেন্ডকে বিয়ে করা যায় না, না-কি সংসার করা যায় না।”

আয়ানের কথায় পাত্তা না দিয়ে আঘাতপ্রাপ্ত হাত ছাড়াতে ব্যস্ত হয়ে গেল ইশরা। বেশ কিছুক্ষণ পর নিজের হাত ছাড়িয়ে নিতে সক্ষম হলো সে। তিক্ত কন্ঠে বলল.

— “আর ইউ ক্র্যাজি ম্যান, ডু হেভ অ্যানি আইডিয়া, ওয়াট আর ইউ সেইড এবাইট। আমি ইশরা, দিবা নই!”

মার্জিত ব্যবহার এলো না আয়ানের থেকে। তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়লো সে। ইশরার বাহু চেপে ঝাকাতে ঝাকাতে বলল.

— “আমি জানি তুই ইশরা। আমি দিবাকে ভুলতে চাই। সেটা যেভাবেই হোক! প্লীজ ইশরা রাজি হয়ে যা..

নিষ্পত্তি কথাটা উৎকন্ঠায় আপ্লুত হয়ে বললো আয়ান। তবুও গললো না ইশরার মন। যেটা কখনো ভাবা যায় না, সেটা বাস্তবে কিভাবে সম্ভব। নিজেকে সামলে আয়ানের দিকে দৃষ্টিপাত করতেই থমকে গেল ইশরা। নয়ন যুগল রক্তিম হয়ে আছে, চুলগুলো এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে আছে। আয়ানকে বিধ্বস্ত অবস্থায় দেখে কিছুটা বিচলিত হয়ে উঠলো ইশরা। বাহু টেনে বেঞ্চিতে বসিয়ে দিল তাকে। দ্বি-মুহু্র্ত অবিলম্ব না করে নিজেও আয়ানের পাশের জায়গাটা বিনা বাঁধায় দখল করে নিল। ল্যাডিস ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে ছিপি খুলে এগিয়ে গিয়ে সে।

দুর্বল চোখে ইশরার দিকে তাকিয়ে ক্ষীনবিহীন হাতে বোতলটা নিয়ে এক ঢোক পানি খেল। ঠোঁটের কোণে আলতো হাসির রেখা ফুটিয়ে বলল.

— “তাহলে তুই রাজি তো ইশরা.

আয়ানের কথায় বিরাগী হয়ে উঠতে দেখা গেল ইশরাকে। বার কয়েক ঘনঘন শ্বাস নিয়ে বলল.

— “আয়ান দিবা তোকে প্রচন্ড পরিমানে ভালোবাসে, আর তুইও তাকে ভালোবাসিস! তোরা একে অপরকে ছাড়া অস্তিত্বহীন। আমার কথা শুন, দিবা হয়তো কোনো সমস্যায় পড়েছে। তাই আসতে পারছে না।আমরা কালকে ব্যাপার-টা দেখছি, তুই এবার বাড়িতে যা.

আয়ানের মাঝে কোনো রুপ ভাবাবেগ লক্ষ্য করা গেল না। সে পূর্বের ন্যায় অশ্রুসিক্ত নয়নে ইশরার দিকে তাকিয়ে আছে। সেই গহীন দৃষ্টিকে তুচ্ছ করে আয়ানকে ঠেলে বাড়ির দিকে পাঠিয়ে দিলো ইশরা। তবে মনের ভেতরে উথাল পাতাল ঝড় এখনো বহমান তার।
.
.
কাজী অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে আছে ইশরা। নয়ন যুগল রাস্তার এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করছে। অম্বুতে ছলছল করছে আঁখি জোড়া। শেষবারের মতো অন্ধকারে আবৃত শুনশান নিরিবিলি রাস্তার দিকে তাকিয়ে ধপ করে বেঞ্চিতে বসে পড়লো সে। দিবার চিন্তায় মাথা ব্যাথা করছে। দুহাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো সে।

আচম্বিতে ফোনের রিংটোনের আওয়াজে ধ্যাত ভাঙল তার। বেঞ্চিতে আয়ানের ফোন দেখে বিরক্তিতে ললাটে কুঁচকে এলো তার। ফোনের স্ক্রিনে বাবা নামটা জলজল করছে। আজাদ আহম্মেদ ফোন করেছে। রিসিভ করতে নিয়েও সেই সাহস খুঁজে গেল না সে। কি বলবে তাকে। একহাতে ফোন নিয়ে নিরিবিলি রাস্তায় মাঝ দিয়ে দৌড়াতে শুরু করলো। উদ্দেশ্য যে করেই হোক ফোনটা আয়ানকে পৌঁছে দিতে হবে।

আয়ানের পিছু পিছু ছুটে চলেছে ইশরা। বেশ কিছুক্ষণ ক্রমাগত ছুটে চলাতে হাঁপিয়ে উঠেছে সে। আর যাই হোক একটা ছেলের সাথে হেঁটে পারা যায় না। পেছনে থেকে ক্রমাগত ডেকে চলেছে আয়ানকে। কিন্তু তার শোনার নামই নেই। সে তার মতো এগিয়ে চলেছে। বুকে হাত রেখে ঘনঘন শ্বাস নিতে লাগল সে।

হঠাৎ তীব্র আলোর ঝলকানিতে চোখ কুঁচকে এলো তার। হাত দিয়ে আঁখি আড়াল করে নিভু নিভু চোখে তাকালো সে। চলন্ত ট্রাক দেখে হুস উভে গেল ইশরার। পেছন থেকে চিৎকার করে বেশ কয়েকবার ডেকে উঠলো সে। আয়ানের পায়ে গতি যেন আগের তুলনায় অনেকটাই বেড়ে গেছে। ডানে বামে না তাকিয়ে সর্বশক্তি দিয়ে ছুটে চললো সামনের দিকে। ধাক্কা দিয়ে দ্রুতগামী ট্রাকের সম্মুখ থেকে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হলেও বিপত্তি ঘটল অন্য জায়গায়। অর্ধ ভাঙ্গা ইটের সাথে হোঁচট খেয়ে উবুত হয়ে রাস্তার পাশে পড়লো ইশরা। প্রচন্ড ব্যাথায় আর্তনাদ করতে গিয়েও করলো না। অধর চেপে সহ্য করে নিল। ইশরার ঠিক হাত দুই দূরে পড়েছে আয়ান। উঠে বসতেই দুহাতের দৃঢ় বাঁধনে বেষ্টিত করে নিল তাকে। ভাঙ্গা গলায় বলল.

— “ঠকিয়েছে, ঠকিয়েছে। ওর আমাকে ঠকিয়েছে। আসার কথা বলেও আসেনি। দিবা তার বাবার কথাই শুনেছে, আমি ওর যোগ্য নই। তুই প্লীজ আমাকে বিয়ে করতে রাজি হয়ে যা.

একদিকে পায়ের ব্যাথা অন্যদিকে আয়ানের অসহ্যকর ব্যবহারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে ইশরা। ধাক্কা দিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে বলল.

— “তুই পাগল হয়ে গেছিস! তোর এই পাগলামিতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল, তাই আসে নি। তুই আমাকে বিয়ে করতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল! আ’ম স্যরি! আমি মেঘকে প্রচন্ড ভালোবাসি, তোর কথা রাখতে পারছি না!”

কথাগুলো বলে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেই আর্তনাদ করে উঠলো। ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে আয়ানের দিকে তাকিয়ে রইল ইশরা। আয়ান পা দুটো নিজের কোলে নিয়ে হতাশাগ্ৰস্থ কন্ঠে বলল.

— “ও, মাই গড! তোর পায়ের উপর দিয়ে ট্রাক গেছে তাইনা। নার্স, ডাক্তার, এম্ভুলেন্স, হসপিটাল.

— “চুপ করবি তুই! গাধার মত ডেকেই চলেছিস, ইডিয়েট। আমার পায়ের উপর দিয়ে ট্রাক না গিয়ে ট্রেন গেলে তো তুই খুশি হতিস। কিন্তু কান খুলে শুনে রাখ, ট্রাক ফ্রাক তো দূরে থাক হেলিকপ্টার গেলেও কিছু হবে না।”

ভেংচি কেটে এগিয়ে এলো আয়ান। মৃদু ঝুঁকে কোলে তুলে নিলো ইশরাকে। অতঃপর আবার ছুটল কাজি অফিসের দিকে..

ইশরা জুবায়ের ইশু। বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান। আয়ান আর ইশরা দুজন দুজনার বেস্ট ফ্রেন্ড। জন্মলগ্ন থেকেই পরিচিত তারা। শুধু আয়ানই নয়, দুয়ান আর শেফাও আছে। গত বছর তিনেক ধরে আয়ানের সাথে দিবা নামক একটা মেয়ের সাথে সম্পর্কে রয়েছে। ব্যাপারটা জানাজানি হওয়ার পর আয়ানের সাথে বিয়ে ঠিক করে ইশরার। সেদিন ভেঙ্গে পড়েছিলো দুজনে। কারণ মেঘ নামক কাউকে ভালোবাসতো ইশরা। অবশেষে ঠিক করা হয়, আজকে বিকালে পালিয়ে বিয়ে করবে দুজনে। দুয়ান শেফার অনুপস্থিতিতে ইশরাই ছিলো আয়ানের পাশে। বিকেল তিনটার আগে আয়ান ইশরা এসে পৌঁছালেও দিবার এসে পৌঁছাতে পারে নি। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা, সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত। তবুও দেখা গেল না দিবার। এদিকে আয়ানের অবস্থার অবনতি হচ্ছে। উপায় না পেয়ে কন্টাক্ট করা হয়। কিন্তু ফোনটা বারবার বন্ধ আসছিলো। নিজের জ্ঞান বুদ্ধি হারিয়ে দিবার প্রতি ক্ষোভে ইশরাকে বিয়ের প্রোপজাল দিয়েছিল।

____________________
লাল শাড়ি পড়ে আয়ানের কোলে চড়ে আহম্মেদ বাড়িতে মাথা নিচু করে আছে ইশরা। সবাই কৌতূহলী চোখে দুজনার দিকে তাকিয়ে আছে। আজাদ আহম্মেদ ফোন করে রৌদ্র জুবায়ের কে ডেকে এনেছেন। ভয়ে ভয়ে আয়ানের শার্টের পেছনের অংশ চেপে ধরলো ইশরা। চোখের ইশারায় কপাট রাগ দেখিয়ে সামনে তাকিয়ে বলল.

— “এখানে, এভাবে দাড় করিয়ে রেখেছ কেন? যদি কিছু বলার থাকে তাহলে বলো, নয়-তো ভেতরে যেতে দাও।”

— “তুই এখনো বুঝতে পারছিস না, কেন তোকে এখানে দাড় করিয়ে রাখা হয়েছে। না-কি বুঝেও না বোঝার ভান করছিস।”

আজাদ আহম্মেদ কথায় আয়ান বেশ রেগে গেল। ইশরাকে সোফায় বসিয়ে আজাদ আহম্মেদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলল.

— “তোমরাই তো চেয়েছিলে আমরা বিয়ে করি। হঠাৎ আমার পালিয়ে বিয়ে করতে ইচ্ছে হলো, তাই করলাম। আপাতত কিছু শুনতে চাইছি না, তনু তেল গরম করে রুমে নিয়ে আয়।”

পূর্ণরায় সোফার কাছে এসে কোলে তুলে নিল ইশরাকে। তক্ষণাৎ নিজেকে সামলাতে হাত রাখল আয়ানের কাঁধে। অতঃপর পা বাড়ালো রুমের উদ্দেশ্য। পেছনে না তাকিয়ে বুঝতে পারছে, সবাই মুখ চেপে হাসছে। হয়তো আয়ানের কানেও হাঁসির শব্দ পৌঁছেছে। তাই পেছনে ফিরে গম্ভীর কন্ঠে বলল.

— “ওখানে দাঁড়িয়ে কোল-গেটের এড না দেখিয়ে তেল গরম করে নিয়ে আয়। যা..

(চলবে.. ইনশাআল্লাহ)

#অন্যরকম_ভালোবাসা 💓[২]
#ইফা_আমহৃদ
পর্ব:: ০১

(পূর্বের সিজনের সাথে মিল নেই। যা আগের সিজন পড়েন-নি তারাও পড়তে পারবেন। কোথায় কোথায় আংশিক মিল থাকতে পারে। বিব্রত হবেন না।
সূচনা পর্ব কেমন হয়েছে, জানাতে ভুলবেন না কিন্তু)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here