অন্যরকম ভালোবাসা ২ -পর্ব ১১

0
68

#অন্যরকম_ভালোবাসা 💓 [২]
#ইফা_আমহৃদ
পর্ব:: ১১

— “ইশরা কি হয়েছে তোর, সারাদিন ফোন করেছি। কিন্তু তোকে পাইনি। ফেরার পথে তোর বাড়িতে গিয়েছিলাম। কিন্তু কাউকে দেখতে পাইনি। বাড়িতে ফিরে দেখছি, এখানেও কেউ নেই। সবাই কোথায়?”

দাঁত কামড়ে ভেতরের কান্নাগুলো গলায় পেঁচিয়ে নিল ইশরা। এতোক্ষণ এই ভয়টাই সে পাচ্ছিলো। স্বাভাবিক কন্ঠে বলল.

— “এতো চিন্তা করার কি আছে আয়ান। আজ সবাই মিলে একটু ঘুরতে গিয়েছিলাম। এতোক্ষণে হয়তো আঙ্কেল আন্টি বাড়িতে চলে গেছে।”

একটু মনযোগ স্থাপন করলো বাইরের দিকে। বাইরে থেকে চেঁচামেচির আওয়াজ ভেসে আসছে। কর্ণের কাছ থেকে ফোন সরিয়ে বেরিয়ে গেল আয়ান। করিডোরে থাকা রেলিং এ হাত রেখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। পা জোড়া গতিশীল করে রুমে প্রবেশ করলো। বেডের উপর সমস্ত শরীর হেলিয়ে দিল। ক্লান্তিমাখা কন্ঠে বলল..

— “হ্যাঁ তারা পৌঁছেছে। আমাকেও বলতি, তোদের সাথে একটু ঘুরতে যেতাম।”

— “তুই তো কাজের মাঝে ব্যস্ত থাকিস তাই বলা হয়নি।”

দরজা খোলার শব্দে সেদিকে দৃষ্টিপাত করলো ইশরা। নীল ড্রেস পরিধিতা নার্স এগিয়ে আসছে তার দিকে। ইশরার পাশে বসলেন তিনি। তুলো দিয়ে কাঙ্খিত জায়গাটা পরিস্কার করে নিল। সিরিজে পর্যাপ্ত মেডিসিন নিয়ে নিলেন। ইশরার দিকে তাকিয়ে বললেন..

— “আপনার মাথায় আঘাত ম্যাম। কথা বলার ফলে মাথার টিস্যুতে পেসার পড়ে। বেশী কথা বলবেন না।”

ইনজেকশন টা ধীরে ধীরে ইশরার হাতের ঢুকিয়ে দিলেন। সিরিজটা ডাসবিনে রেখে পাতলা চাদরটা ইশরার বুক পর্যন্ত তুলে দিলেন। বললেন.

— “ম্যাম, মিনিট বিশেক পরে এসে দ্বিতীয় ডোস দিলেই আজকের মতো শেষ আবার কালকে। তারপর বাড়িতে চলে যাবো। ছেলে মেয়েরা অপেক্ষা করে কখন হসপিটাল থেকে বাড়িতে যাবো।”

জবারে শুধু হাসলো ইশরা। তদানীং অপর পাশ থেকে ভেসে এলো সূচালো কন্ঠস্বর..

— “ইশরা তুই হসপিটালে কি করছিস? দ্বিতীয় ডোস দিবে মানে কি? কোথায় তুই।”

নয়নজোড়া বেষ্টিত করে তপ্ত নিঃশ্বাস ছাড়ল ইশরা। নার্সের কথার ছলে সে যে আয়ানের সাথে কথা বলছিলো, বেমালুম ভুলে গিয়েছিলো। কাঁপা কাঁপা স্বরে বলল..

— “কই না-তো? আমি হসপিটালে থাকতে যাবো কেন? আমি বাড়িতে।”

শ্বাস ছাড়ার আগে লাইন কেটে গেল। বুকে হাত রেখে হাঁফ ছাড়ল ইশরা। পরক্ষণেই ভয়টা তীব্র হয়ে এসেছে। আয়ান ফোন করেছে। তবে ভিডিও। চেয়ে রইল স্ক্রিনের মাঝে। বাজতে বাজতে কেটে গেলো ফোনটা। নিভে গেল স্ক্রিনের আলো। পুনরায় বেজে উঠলো ফোনটা। অডিও কল করেছে আয়ান। সংকোচ কাটিয়ে ফোনটা রিসিভ করলো ইশরা। কর্ণের কাছে নিয়ে ফিরিয়ে নিয়ে এলো । আয়ানের কর্কট কন্ঠস্বরে কানের পর্দা ফেটে যাওয়ার উপক্রম। আমতা আমতা করে বলল..

— “আমি এখন অপ্রস্তুত হয়ে আছি! এখন কথা বলতে পারব না।”

দাঁত কিরমির করে জবাব দিলো..– “তুই কোনো রুপসী সুন্দরী নয় যে, তোকে দেখতে কল করবো। রিসিভ করে রুমটা দেখা। নাহলে আন্টিকে ডেকে ফোনটা দে.। আমি তার সাথে কথা বলবো।”

অগোছালো কথাগুলো হারিয়ে গেল অজানায়। শূন্য হয়ে গেল মিথ্যা শব্দগুলো। ফট করে ফোন কেটে বন্ধ করে রাখল। বন্ধ ফোনের দিকে তাকিয়ে ড্রয়ারের উপর রেখে দিলো।

মিনিট বিশেক পর সয়ং আয়ান এসে হাজির হলো কেবিনের ভেতরে। আয়ানকে দেখে চমকে উঠলো ইশরা। বুকের ভেতরে অদৃশ্য ভয় ছড়িয়ে গেল। এই বুঝি কিছু একটা করে ফেললো। পড়নের ঘামার্থ শার্টটা এলোমেলো হয়ে আছে‌। টাই টা ঝুলে আছে কাঁধের পেছনে। উস্কোখুস্কো চুলে নজরকাড়া লাখছে তাকে। কিন্তু সেই অপলক দৃশ্য দেখার মতো সাহস হলো না ইশরার। মুখশ্রী ঘুড়িয়ে নিল অন্যদিকে। কিন্তু কোনো লাভ হলো বলে মনে হলো না। শব্দহীন পায়ে এগিয়ে এলো সে। একদম নেশাগ্ৰস্থ মানুষের মতো। বেডের একপাশে সামান্য পরিমাণে জায়গা করে অনায়াসে দখল করে নিল। গালে হাত রেখে ইশরাকে নিজের দিকে ফিরিয়ে নিল। ফিরল ইশরা। তদানীং নয়ন যুগল বেষ্টিত অতিশয় অন্ধকারে। ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে। ধীরে ধীরে আরো প্রকট হলো সেই শব্দ। ঠান্ডা হাত ছোঁয়ালো ইশরার কুঁচকে যাওয়া ললাটে। অতঃপর সেই স্পর্শ এলো হাতের কাছে। নেমে গেল পায়ের পাতায়। এবার পূর্বের ন্যায় নয়ন গ্ৰথণ করে রাখার মতো ক্ষমতা পেল না। মেলে তাকালো সে। তার থেকে স্বল্প দূরে আয়ান। ঝুঁকে কাছে তার মুখশ্রীর উপর। হাহাকার ছড়ানো আঁখি যুগল তার দিকে গভীর ভাবে তাকিয়ে আছে। চোখাচোখি হলো দুজনার। চোখের মাধ্যমে ভেতরের না বলা ভাষার আদান প্রদান হলো দুজনের।
ভরে এলো আয়ানের চোখ। অম্বধারা আয়ানের চোখ থেকে গড়িয়ে ইশরার চোখে পড়লো। ঘনঘন পলক ফেললো সে। চোখের কোণ থেকে গড়িয়ে পড়লো বালিশে। আয়ান মুছিয়ে দিল সেই চোখ।

একহাত ইশরার কোমড়ে চেপে নিজের বাহুডোরে আবদ্ধ করে নিল প্রিয়শ্রীকে। অসংখ্য বার অধর ছুয়ে দিল সেই মোটা ব্যান্ডেজ গুলোর উপর। হুহু করে কেঁদে উঠলো ইশরা। শব্দময় সেই কান্না। আয়ানের এলোমেলো শার্ট টা আঁকড়ে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলল..

— “কেন? কেন এলি না তুই। আমি কতোবার তোকে ডেকেছি তার হিসেব নেই, তখন কেন আসলি না। চোখে অন্ধকার ধরা দেওয়ার আগ পর্যন্ত তৃষ্ণার্ত পাখির মতো হাপিত্যেশ করছি।”

হাতের বাঁধন দৃঢ় হলো অনেকটাই। উপরের শার্ট পেরিয়ে সেই বাঁধনের দাগ স্পষ্ট হলো পিটে। ইশরার নখের দাগ পিঠের সর্বোত্ত ছড়িয়ে পড়েছে। শার্টের কারণে দেখা যাচ্ছে না।
ইশরার পিঠে হাত রাখলো আয়ান। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল.

— “ইশু; এই ইশুপাখি। কাঁদছ কেন? বলো আমাকে কি হয়েছিলো। কিভাবে এতো আঘাত পেয়েছ তুমি?”

আয়ানের শিতল কন্ঠস্বর পৌঁছালো না ইশরার কর্ণেপথে। সে নিজের মতো বলে চলেছে। হাতের দৃঢ় বন্ধন ছাড়িয়ে ইশরাকে সামনে নিয়ে এলো। অশ্রু ধারা মুছিয়ে দিয়ে বলল..– “কেঁদো না, আমি আছি তোমার সাথে। আজকের পর থেকে এক মুহুর্তের জন্যও তোমাকে চোখের আড়াল করবো না।
শান্ত হও। বলো কি হয়েছে তোমার।”

ইতিমধ্যে কান্নার বেগ কমে এসেছে ইশরার। আয়ানের প্রশ্নের জবাব দেওয়ার মতো ক্ষমতা তৈরি হলো না তার ভেতরে। বালিশে মাথা হেলিয়ে দিলো। মুখশ্রী অন্যদিকে ঘুরিয়ে বিরবির করে বলল..

— “আমার ক্ষুধা লেগেছে আয়ান। প্রচন্ড ক্ষুদা। পেটের সবকিছু বেরিয়ে আসার উপক্রম।”

জ্ঞানশূন্য হয়ে জামা ভেতর দিয়ে ইশরার উন্মুক্ত পেটে হাত ঠেকালো আয়ান। পেটে অবস্থান করা হাতের উপর হাত রাখলো ইশরা। বাচ্চাদের মতো করে বলল..

–” হ্যাঁ! এই জায়গাটায় খাবার চাইছে!”

সাথে সাথে নেমে গেল হাত। অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো আয়ান। সংকোচ নিয়ে বলল..
— “মা আন্টি খাবার দিয়ে যাননি?”

আমতা আমতা করে বলল.. — “আসলে তখন ক্ষুধা লাগেনি, তাই খাইনি। এখন পেয়েছে। তুই এনে দিতে পারবি কি-না সেটা।”

ইশরা চায়না আয়ান তার পাশে থাকুক। আয়ানকে অগোছালো রুপে মেনে নিতে পারছে না সে। সাথে আয়ানের প্রশ্ন। তাই বাড়িতে পাঠানোর চেষ্টা করছে।

আয়ান পকেট থেকে ফোন বের করলো। কিছুক্ষণ ফোন টিপে কানের কাছে ধরে বলল..

— “মা কিছু হালকা খাবার বানিয়ে ড্রাইবার-কে দিয়ে পাঠিয়ে..

ফোন কেড়ে নিল ইশরা। আঁখি দিলো স্ক্রিনে, তিথির কাছে ফোন। লাইন কেটে আয়ানের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,.

— “এতোরাতে আন্টি কেন খাবার বানাতে যাবে? তাছাড়া ড্রাইভার কেন আসবে। তুই এখন বাড়িতে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে খাবার খেয়ে ঘুম দিবি। সকালে রিলেক্স মুডে আসবি।”

মুগ্ধ নয়নে ইশরাকে মন ভরে দেখে নিল আয়ান। অসুস্থতার মাঝেও তার জন্য মেয়েটা চিন্তা করছে। কিছুক্ষণ আগে ইশরার জন্য যখন উতলা হয়ে উঠেছিল, তখন তিথির কাছে জানতে চেয়েছিলো সে। ব্যর্থ হলো সেখানে। এদিকে তমোনাও আয়ানের ফোন রিসিভ করছে না। বাধ্য হয়ে লোকেশন চেক করে ছুটে এসেছে। এতো রাতে হসপিটালের দরজা বন্ধ ছিল। পাঁচিল টপকে ভেতরে ঢুকেছে সে।

শার্টের কলার ঠিক করে হাতা ফোল্ড করতে করতে বলল..

— “এতো রাতে হসপিটালে কেউ এলাউড নয়। একবার বেরুলে ঢুকতে দিবে না। (একটু থেমে আবার)
আমি জানি, তোর ক্ষুধা লাগেনি। শুধু শুধু অভিনয় করে লাভ নেই। আমি যাচ্ছি না।”

এলে মেলো পায়ে হেঁটে বেরিয়ে গেল আয়ান। কদাচিৎ হাঁসির রেখা দেখা গেল ইশরার অধর জুড়ে। মিনিট দশেক পর ফিরে এলো আয়ান। পড়নে হসপিটালের ঢিলেঢালা জামা কাপড়। এসে বসলো ইশরা পাশে। ইশরা চুল থেকে গড়িয়ে পড়া পানিগুলো মুছিয়ে দিলো একহাতে। বেডের একপাশে সেঁটে গেল। জায়গা করে দিল আয়ানকে শোয়ার। আয়ান শুলো না, তাকিয়ে রইল ইশরার দিকে। রহস্যময় হেঁসে বলল..

— “ইশু আমার শোয়া ভালো নয়, সেটা তোর অজানা নয়। পড়ে যাবি নিচে!”

— “আমার কাঁধে মাথা রেখে শুয়ে পড়। পড়বো না।”

দ্বি-মুহুর্ত অতিক্রম হওয়ার আগেই কোনোরকম ইশরার বাহুতে মাথা রেখে শুয়ে পড়লো আয়ান। ইশরা মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল অতিশয় তুলতুলে হাতে। না চাইতেও ধীরে ধীরে নেতিয়ে গেল আয়ান। পাড়ি জমালো গভীর নিদ্রার অতলে।

(চলবে.. ইনশাআল্লাহ)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here