অন্যরকম ভালোবাসা ২ -পর্ব ১৩

0
73

#অন্যরকম_ভালোবাসা 💓 [২]
#ইফা_আমহৃদ
পর্ব:: ১৩

বৃষ্টির জলধারায় ইতিমধ্যে ভিজে একাকার হয়ে গেছে দুটো মানব। মোটা হাত-পা, মাথার ব্যান্ডেজ ভিজে গেছে বহুক্ষন পূর্বে। ধীরে ধীরে কপির কাপ ঠান্ডা হয়ে আসছে। আয়ান মৃদু উষ্ণময় কাপে চুমুক দিতেই ভেসে এলো, মনোমুগ্ধকর গানের সুর..

🎶 আগে কতো বৃষ্টি যে, দেখেছি শ্রাবণে!
জাগে নি-তো এতো আশা, ভালোবাসা এ-মনে।
আগে কতো বৃষ্টি যে, দেখেছি শ্রাবণে!
জাগে নি-তো এতো আশা, ভালোবাসা এ-মনে।

এই বৃষ্টি ভেজা পায়ে, সামনে এলে হায় ফোঁটে কামিনী.
আজ ভিজতে ভালো লাগে,শুণ্য মনে জাগে
প্রেমের কাহিনী।🎶🎶

রিমঝিম ধারাতে, চায় মন হারাতে…
রিমঝিম ধারাতে, চায় মন হারাতে…

ইশরার মনোমুগ্ধকর সুরে নিজেকে উতলার সর্বস্তর মনে হলো আয়ানের। নিজেকে গুটিয়ে রাখতে ব্যর্থ হলো কপির কাপের মাঝে। উঠে দাঁড়ালো সে। এক কদম ফেলতেই ঝাপসা হয়ে এলো আঁখি জোড়া। বৃষ্টির ফোঁটায় ঝাঁপসা হয়ে এসেছে চশমার কাঁচ। অন্ধকারে কিছু দেখার মতো ক্ষমতা অবকাশ রইলো না তার মাঝে। চশমা খুলে নিল হাতের ভাঁজে। টি শার্টের নিম্নাংশ দিয়ে মুছে নিল চশমার কাঁচ। চোখে পরিধান করার আগেই হাত ফসকে নিচে পড়ে গেল প্রয়োজনীয় জিনিসটা। বসে পড়লো আয়ান। হাতরাতে লাগল ছাদের মেঝে। সংস্পর্শে এলো না সেই কাঙ্খিত জিনিসটা। এলো ছাদের জমে থাকা পানিগুলো। ততক্ষণে ইশরার গলার সুর ভারী হয়ে এসেছে। সেই সুর অনুসরণ করে এগিয়ে গেল সেদিকে। ইশরার কাছে পৌঁছানোর পূর্ব মুহুর্তে পিচ্ছিল যায়গায় পা লেগে উল্টে পড়ে গেল আয়ান। হাত দিয়ে কিছু ধরে ব্যালেজ করার চেষ্টা করলে ইশরার শরীর স্পর্শ করলো। দুজনে ছিটকে পড়লো নিচে। জমে থাকা পানিগুলো ছিটকে পড়লো আয়ানের মুখে। থেমে গেল হৃদয় কাঁপানো সুর ধ্বনিগুলো। বৃষ্টির ঠান্ডা ঠান্ডা বিন্দু কণা আয়ানের চুলের মাঝে পড়লো। মাথার অগ্ৰভাগ থেকে গড়িয়ে গড়িয়ে মুখশ্রী অতিবাহিত করে চিবুক বেয়ে ফোঁটা ফোঁটা পড়লো ইশরার মুখে। টানা টানা নেত্র যুগল কুঁচকে নিভু নিভু হয়ে আয়ানের চোখে বন্দী করলো।

কিছুক্ষণ সময় চললো সেই অন্যরকম লগ্ন। ধাক্কা দিয়ে আয়ানকে সরিয়ে বসলো ইশরা। হাত পা চেক করলো, পুরাতন ব্যাথার সাথে নতুন কোনো ব্যাথা সংযুক্ত হলো কি-না। পেল না। ঝাঁঝালো কন্ঠে বলল..

— “তুই কোনো কাজ ভালো ভাবে করতে পারিস না, ইডিয়েট।”

— “আমি কিছু দেখতে পারছি নি। চশমাটা হারিয়ে গেছে, খুঁজে পাচ্ছি না।”

অসন্তুষ্ট হয়ে গেল ইশরা। উঠে দাঁড়ালো নিজে নিজে। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ছাদের অপর প্রান্ত থেকে চশমা খানা খুঁজে নিয়ে এলো। আয়ানের হাত না দিয়ে নিজেই পরিয়ে দিল প্রয়োজনীয় জায়গায়। কপাট রাগ দেখিয়ে বলল..

— “নিজেকে শুভ্র বলে দাবী করিস। কই শুভ্র-তো কারো সাহায্য নেয় না। তার দৃষ্টি শক্তি কম থাকলেও স্মৃতি শক্তি, চলন শক্তি, শ্রবণশক্তি অঢেল।”

নয়ন গ্ৰথণ করলো আয়ান। এগুলো তার শারীরিক ত্রুটি ইরেকটাইল ডিসফাংশন রোগের ওষুধের পার্স প্রতিক্রিয়া। কিছুদিন ধরে সে মেডিসিন নেওয়া শুরু করেছে। যার ফলশ্রুতিতে চোখে দেখতে পারছে না। কথা ঘুরানোর চেষ্টা করে বলল..

— “শুভ্রের সাথে আমার যথেষ্ট মিল রয়েছে। ইভেন্ট চোখে সমস্যা টাও। প্রায় বেশ কয়েক বছর ধরে এই সমস্যা। তবে বেশ জড়ালো নয়। মাঝে মাঝে দেখতে পাই না। তখন চশমা ব্যবহার করি। মা আমাকে চশমা ব্যবহার করতে দেয় না।”

আয়ানের বাক্যগুলো মিথ্যা নয়। এর আগে কখনো তাকে চশমা পরিধান করতে দেখিনি সে। মাথা কাত করে মোহনীয় চোখে তাকালো আয়ানের দিকে। হাত মেলে দিলো শূন্যতায়। ঝিরিঝিরি পানিতে পূর্ণ হলো হাতের মুঠো। আয়ান হাত রাখলো ইশরার মেলে দেওয়া হাতের উপর। হাতের পরশে সেই পানিগুলো আংশিক শব্দে নিচে পড়ে গেল। ঠোঁট চেপে একগাল হাসলো ইশরা। দৃষ্টি গোচর হলো না সেই মাতাল করা হাঁসি। চপল পা ফেলে দোলনার দিকে এগিয়ে গেল ইশরা। বসিয়ে দিল আয়ানকে। নিজেও বসলো তার পাশে। কাপ হাতে নিলো। বৃষ্টির শিতল পানিতে ডুবে গেছে কপির অবশিষ্ট অংশ। সেই হাড় কাঁপানো শিতল পানি ঢেলে দিলো আয়ানের মাথায়।
.
.
ইশরাকে কোলে তুলে ধীরে ধীরে নিচে নেমে এলো আয়ান। বসিয়ে দিল বেডের কিনারে। ভেজা জামা থেকে ছুপছুপ পানিতে ভিজে গেল বেডে সহ মেঝের অনেকটা। শার্টের কলার চেপে কাছে নিয়ে এলো আয়ানকে। হাত সরিয়ে গলায় বন্দী করে নিল। নেশাগ্ৰস্থ দের মতো টেনে টেনে বলল..

— “ছেলেরা না-কি মেয়েদের এই অবস্থায় দেখলে নিজেদের কন্ট্রোল হারিয়ে ফেলে। আমি তো তোর বউ। তাহলে এভেয়েট করছিস কেন?”

পিছিয়ে গেল আয়ান। ছড়িয়ে নিল নিজের। অপ্রস্তুত স্বরে বলল..

— “ইশু জেদ ধরে ছিলি, তাই বৃষ্টিতে ভিজতে রাজি হয়েছি। এখন যা জামা কাপড় পাল্টে নে, ঠান্ডা লেগে যাবে!”

শুনলো না ইশরা। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে এগিয়ে গেল আয়ানের দিকে। নিজের উচ্চতা বৃদ্ধি করতে নিজের পায়ের ভাড় ছেড়ে দিলো আয়ানের উপর। আয়ানের পায়ের পাতায় পা রেখে উঁচু করে চুলের ভাঁজে হাত ঠেকানো ইশরা। দ্বি-মুহূর্ত অপেক্ষা না করে নিজের অধরের ছোঁয়ায় আয়ানের অধর নিজের আয়ত্তে করে নিল। পিছিয়ে গেল আয়ান। নিজের ভারসাম্য বজায় রাখলো জড়িয়ে নিল ইশরাকে। বেশ কিছুক্ষণের জন্য হারিয়ে গেল অনুভূতিময় স্পর্শে।

শরীরের প্রতিটি কোষ যেন সচল হয়ে উঠেছে। অস্বস্তিতে ছেড়ে গেল সবটা। নিজের অক্ষমতা জানিয়ে দিয়েছে সে ব্যর্থ। স্বযত্নে নিজের থেকে বিছিন্ন করে নিল ইশরাকে। এতোটা আশা করে নি ইশরা। ঘনঘন পলক ফেলে বলল..
— “কি হয়েছে আয়ান তোর।”

উষ্ণ শ্বাস ছেড়ে জামা কাপড় বের করলো আয়ান। চপল পা ফেলে প্রস্থান করলো রুম। যেন কোনো বিড়াল মাছ চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছে।
____________________

আজকের দিনটা আর পাঁচটা দিনের চেয়ে ভিন্নতর। কাক ডাকা ভোরে ঘুম ভেঙ্গেছে তমোনার। সকাল সকাল একটা কালো রঙের কাক এসে রুমের ভেতর প্রবেশ করেছে। তমোনার পায়ের কাছে তিনবার কা কা করে জানালা বেধ করে বেরিয়ে গেল অজানায়। সেই থেকে অস্তিরতায় ভুগছে তমোনা। তার মনের অনন্ত কোনো ধারণা জন্মেছে, অজানা বিপদ অত-পেতে রয়েছে। ইশরার চিন্তা করতে করতে খাবারের প্লেটে আঁকি ঝুঁকি করছে। রৌদ্র জুবায়ের তাকালেন তমোনার দিকে। তমোনার এমন উদ্ভর কর্মকাণ্ডে বিরক্ত হলেন তিনি। খাবার সময় কথা বলা, খাবার না খেয়ে নাড়াচাড়া করাটা সুবিধার চোখে দেখেন না তিনি। খাবারের দিকে তাকিয়ে বললেন..

— তমু, কি হয়েছে তোমার? এতো কি ভাবছ?

রৌদ্র জুবায়ের এর ধ্বনিগুলো হয়তো কর্ণপথে গেলো না তমোনার। তিনি নিম্ন দৃষ্টিতে নিজের কাজ করে যাচ্ছেন। আশাহত হয়ে কাঁধে হাত রেখে বেশ কয়েকবার ঝাকুনি দিলেন রৌদ্র জুবায়ের। তটস্থ কন্ঠে বলল..

— “খেয়ে ইচ্ছে না করলে রেখে দাও। শুধু শুধু বৃথা চেষ্টা করো না। এতে শরীর খারাপ হবে।”

ভাবনার ছেদ ঘটল তমোনার। পানি ঢেলে ঝুটো হাত ধুয়ে নিলেন। ইতিমধ্যে রৌদ্র জুবায়ের এর খাবার শেষ হয়ে গেছে। প্লেট দু’টো হাতে নিয়ে বেসিনে রেখে এলেন। বসে পড়লো পূর্বের আসনে। অন্য মনস্ক হয়ে গেলেন পুনরায়।

তমোনার এমন হুটহাট অন্য মনস্ক হয়ে যাওয়া ভালো নজরে দেখলেন না তিনি। কিছু বিচলিত কন্ঠে বললেন..

— “কি নিয়ে এতো গভীর চিন্তা কর তুমি? আমাকে বলো, আমিও একটু চিন্তা করি।”

মন খারাপ হয়ে গেল তমোনার। আঁচলে মুখ ঢেকে হুহু করে কেঁদে উঠলেন তিনি। এবার যেন রৌদ্রের ধৈর্য বাঁধ ভেঙে গেল। রাগ দেখিয়ে বললেন..

— “কি হয়েছে বলবে তো? এবারে কাঁদলে সমস্যা সমাধান হবে?”

— “আমার মনটা সেই সকাল থেকে ভালো নেই। কাক-টা এসে অশুভ সংকেত দিয়ে গেছে। মন ইশরার জন্য আকুল হয়ে আছে। কতো গুলো দিন হয়েছে মেয়েটাকে দেখি না।”

এতোক্ষণে বুঝতে সক্ষম হলেন তিনি। তবে কাকের ব্যাপার-টা যুক্তিসংগত মনে হলো না তার কাছে। কাক যখন খুশি উড়তে পারে, ঘুরতে পারে, তার কন্ঠে কাকা করে ডাকতে পারে। সেটা অশুভ হবে কেন? ইচ্ছে করছে তমোনাকে দুটো ধমক দিয়ে থামিয়ে দিতে। কিন্তু তা করলেন না তিনি। উঠে দাঁড়ালেন নিজের চেয়ার ছেড়ে। বসে পড়লেন তমোনার পাশে। মাথায় হাত বুলিয়ে আশ্বাসের কন্ঠে বলল..

— “এতো চিন্তা করছ কেন? কাল সকালে একবার মেয়ের বাড়িতে গিয়ে না-হয় স্ব-চোখে দেখে এসো।”

মায়ের অবুঝ মন তাই হয়তো ভরসা পেলেন না তমোনা। ল্যান্ডফোন দিয়ে কল লাগালেন ইশরার ফোনে। মেয়ের ভালো আছে, কথাটা শুনেই তিনি শান্ত হবেন। তার আগে নয়।

(চলবে.. ইনশাআল্লাহ)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here