অন্যরকম ভালোবাসা ২ -পর্ব ১৬

0
61

#অন্যরকম_ভালোবাসা 💓 [২]
#ইফা_আমহৃদ
পর্ব:: ১৬

আচম্বিতে দরজা নক করাতে ভরকে গেল ইশরা। ফাঁকা অন্ধকার রুমে দু’জনকে একসাথে দেখলে কি হতে পারে, তা ভাবলেই গাঁ শিউরে উঠছে তার। পিছিয়ে গেল ইশরা। আয়ানের দিকে এগিয়ে গেল। আয়ান পাত্তা দিলো না। ইশরার পাশ কাটিয়ে দরজা খুলে নিল। দরজা খুলে স্বল্প ফাঁক করে মাথা হেলিয়ে দিল। অপর পাশের ছেলেটি একটা প্যাকেট এগিয়ে দিল আয়ানের দিকে। মাথা চুলকে ইতোহস্ত বোধ নিয়ে বলল..

— “ভাই, সবজি বার্গার পাই নাই। চিকেন বার্গার আর কোক নিয়ে এসেছি। ”

আয়ান হাত বাড়িয়ে প্যাকেট-টা নিজের হাতে নিয়ে স্মিত হাঁসলো। স্বল্প বয়সী ছেলেটা খুচরো টাকা এগিয়ে দিলো, নিল না আয়ান। বলল.. — “রেখে দে তোর কাছে!”

— “না ভাই লাগবে না!”
আর কিছু বলার আগে ক্রুব্ধ লোচনে তাকালো ছেলেটার দিকে আয়ান। ফিসফিসিয়ে বলল..– “তোকে যেতে বলেছি, সো গো..

মুহুর্তের মাঝেই ছেলেটি শূন্যতায় হারিয়ে গেল। বিকট শব্দে দরজা বন্ধ করে ভেতরে ঢুকলো আয়ান। খাবারগুলো বেঞ্চির উপরে রেখে বন্ধ জানালা গুলো খুলে দিল। সাথে সাথে পশ্চিমা হাওয়া প্রবেশ করলো ক্লাসে। অন্ধকারে আবৃত শুনশান নিরিবিলি রুমটি ভরে উঠলো আলোর খেলায়। পূর্বের জায়গায় বসে পড়লো আয়ান। পকেট থেকে মুঠোফোন বের করে গেমস খেলতে মনোযোগ দিলো। বিরক্তিতে ছেড়ে গেল ইশরার মুখশ্রী। নাক ফুলিয়ে চলেছে। নাক ফুলালে দাঁতের সাথে দাঁতের অদ্ভুত ঘর্ষণ হয়। গাল তুলনামূলক একটু ফুলে যায়। কপাল কুঁচকে যায়, সাথে ভ্রু সরু হয়ে উঠে। বেঞ্চির দিকে অসহায় হয়ে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। রাগে ফোঁস ফোঁস করতে করতে বলল..

— “ইউ হেভ অ্যানি আইডিয়া, হাউ মাস হ্যাজ এনার্জি ইজ লস।”

আড়-চোখে ইশরার দিকে তাকিয়ে ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বলল..– “কথায় কথায় এতো নাক ফুলাও কেন তুমি? বোঁচা নাকটা ফোলালে তোমাকে বেলুনের মতো লাগে। যতো ইচ্ছা ফুলিয়ে ঢোল করে ফেলো, খাবার শেষ করার আগে তুমি এখান থেকে বের হতে পারবে না। ইজ ফাইনাল।”

আবার সেই তুমি সম্বোধন ভেতরে স্নিগ্ধ হাওয়া ছড়িয়ে দিলো ইশরার। জ্বালিয়ে দিলো সেদিনের ক্ষতগুলো।তবুও ইশরার হারার পাত্রী নয়। আয়ানের থেকে কিছুটা দূরত্ব নিয়ে বসে রইল সে। জেদ ধরে আছে, খাবে না মানে খাবে না। খাবার এনে জোর করে মুখে পুড়ে দিবে। সেও ফেলে দিবো। কিন্তু তেমন কিছু করল না আয়ান। প্যাকেট খুলে খাবার বের করে রাখল। খাবার দেখে পেটের ভেতরে মোচর দিয়ে উঠলো ইশরা। যতোই জেদ ধরুক। কাল রাত থেকে খায়নি। দৃষ্টি সরিয়ে পায়ের দিকে বন্দী করে নিল। তাকাবে না সেদিকে।

আয়ান বার্গার বের করে স্বনান্দে খেতে লাগল। মাঝে মাঝে খাবারের প্রশংসা করছে। যাতে ইশরা আরো কাবু হয়ে আসছে। অর্ধেকটা বার্গার খেয়ে কোক হার্ফ বোতল খেয়ে তিপ্তিকর ঢেকুর তুললো। ইশরার দিকে তাকিয়ে হাই তুলে বলল..

— “এখনো অর্ধেক আছে, চাইলে খেতে পারে! না-হলে পরে তাও পাবে না।”

পরক্ষণেই হামলে পড়লো খাবারের উপর। ইশরা নিজেকে সংযত করতে ব্যর্থ হলো এবার। আয়ানের হাত থেকে খাবার ছিনিয়ে নিজের মুখে মুড়ে নিল। বিদ্রুপ হাসি ফুটে উঠলো আয়ানের মুখে। শার্টের কলার টেনে ঠিক করে, শার্টের হাতা ফোল্ড করতে করতে বলল.. — “ডং! আগে এলেই পারতি।” বড় বড় পা ফেলে দরজা খুলে বেরিয়ে গেল আয়ান। আয়ানের কথা কর্ণপাত করলো না ইশরা। নিজের মতো খাওয়া চালিয়ে যেতে লাগলো।

_________________
অজানা কারণে মন খারাপ ইশরার। ভার্সিটি থেকে ফিরেই কিছুক্ষণ নিস্প্রাণ হয়ে বসে ছিল সে। মন ভালো করতে বেলকেনিতে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। এতেও মন ভালো হলো না তার। দিশেহারা হয়ে ওয়াশরুমে ঢুকলো শাওয়ার নিতে। এলোমেলো পায়ে বেরিয়ে এলো ঘন্টা খানেক পর। মাথা ধরে আছে তার। পড়নের বাথরোব-টা না পাল্টেই শুয়ে পড়লো বেডের মাঝ বরাবর। অতি দ্রুত নিদ্রার অতলে তলিয়ে গেল ইশরা।
.
.
রাত তখন গভীর। কুকুরের অস্পষ্ট ডাক শোনা যাচ্ছে।সময় তখন রাতের প্রথম প্রহর। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ইশরা। অপ্রস্তুত স্পর্শে ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে কেঁপে উঠছে সে। সেই ছোঁয়া অতি মাদকতা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। কখনো কখনো অপর পাশের মানুষটির শ্বাস প্রশ্বাস নিজের শরীরে আঁচড়ে পড়ছে, সেটা অনুভব করতে পারছে। নিভু নিভু চোখ খুলে তাকালো সে। আচম্বিতে নিজের চোখের সামনে অনাকাঙ্ক্ষিত মানুষটিকে দেখে নিদ্রা উবে গেল ইশরার। ফাল মেরে উঠে পড়লো সে। লোচন দুহাতে পরিষ্কার করে তাকালো। কিন্তু না, সেটা তার দৃষ্টিভোম নয়। আয়ান তার দিকে খানিকটা ঝুকে আছে। হাত দুটো তার দুপাশে বন্দী। জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে চেয়ে রইল সেই মানবটির দিকে। আয়ানের ভেতরের উষ্ণ গরম ফুঁ দিতেই নয়ন বেষ্টিত হয়ে গেল অনুভুতিতে। দু’হাতে শরীর ঢেকে নিলো অতিদ্রুত।

কদাচিৎ হাসলো আয়ান। ঈষৎ ঝুঁকে গেল ইশরার নিমিত্তে। চুলের মাঝে বন্দী টাওয়াল খুলে নিল। কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিসিয়ে বলল..

— “এতো প্যাকেট হওয়ার দরকার নেই। যা দেখার দেখে নিয়েছি একটু আগে। যখন তোর জামা কাপড় পাল্টে দিয়েছিলাম।”

ফট করে দৃষ্টি ঘুড়িয়ে নিজের দিকে তাকালো ইশরা। তাজ্জব বনে গেল সে। সত্যি তার শরীরে গ্ৰে রঙের টি শার্ট আর ব্ল্যাক প্ল্যাজু। উঠে বসার চেষ্টা করতেই আয়ান শুয়ে পড়লো তার চুলের ভাঁজে। উঠে বসার আগেই চুলে টান পড়লো তার। পুনরায় শুয়ে পড়লো। নাক ফুলিয়ে আয়ানের দিকে তাকালো। আয়ান মুখশ্রী গহীনে নিয়ে গেল কেশের ভাঁজের। চেপে ধরলো ইশরার নাক। ভ্রু কুঁচকে বলল..

— “এতো ইভার রিয়েক্ট করার কি আছে? আমিই তো- তোর হাজবেন্ড। সো তোর সবকিছু দেখার রাইট আমার আছে।”

তৃক্ষ্ম দৃষ্টিতে আয়ানের দিকে দৃষ্টিপাত করলো ইশরা। আঙুল তুলে ইউ বলার আগেই অধর ছুয়ে দিলো সেই আঙুলে আয়ান। ঘামার্ত শার্টটা খুলে ফেললো। শুঁকে বলল..

— “এইসব বাদ দে! উঠেই যখন গেছিস, দেখ আঙ্কেলের অব্যবহৃত কিছু পাস কি-না।”

বিন্দু পরিমাণ নড়তে দেখা গেল না ইশরাকে। আয়েশ করে হাই তুলে চোখ বন্ধ করে নিল। আয়ান ফোন বের করলো। ফোনের কোণ দিয়ে কপালের কিনারায় স্লাইড করতে করতে বলল..

— “একটু আগে যেই স্বরণীয় মুহূর্তটা আমি দেখেছি, সেটা ফোনেও ভিডিও করে রেখেছি। যাতে সবাই দেখতে পারে। তাছাড়া তুই জামা কাপড় না আনলেও সমস্যা নেই। বস্ত্রবিহীন না-হয় বউয়ের সামনে ঘোড়াঘুড়ি করব।”

লজ্জায় কর্ণ উষ্ণ হয়ে এলো ইশরার। আয়ান দেখলো না। সে নিজের মতো ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। নাক ছিচকালো ইশরার। ফোঁস ফোঁস করতে করতে নামলো নিচে। চোখ আটকে গেল ডাক্তারি রিপোর্টের মাঝে। কার আবার কি হলো। ইশরা চমকালো বটে তবে পাত্তা দিলো না। বেরিয়ে গেল রুম থেকে।

ডাইনিং এ আলোর রেখা দেখা যাচ্ছে। এগিয়ে গেল সেদিকে। তমোনা খাবার বারছে। সংকোচে পড়লো ইশরা। কৌতূহলী কন্ঠে বলল..

— “মা; এতো রাতে ঘুম রেখে কি করছো এইসব?”

তমোনা ইশরার দিকে না তাকিয়ে নিজের কাজ করতে করতে বলল..

— “বিয়ের পর প্রথম জামাই এসেছে! ভালো মন্দ না খাওয়ালে চলে। তেমন কিছু করতে পারলাম কই? গরুর মাংস, মুরগির মাংস আর ডিমের কোরমা। কালকে আরো ব্যবস্থা করবো। তুইও একটু সাহায্য কর..

ঠোঁট উল্টে গেল ইশরার। গরু, মুরগি, ডিম তাও নাকি কম। ইশরার জন্য কখনো এতোসব খাবার রাঁধে নি অথচ বাইরের একটা ছেলের জন্য রাঁধছে। বিরক্তিকর কন্ঠে বলল..

— “মা আয়ান এর আগেও অনেকবার এসেছে।”

— “জামাই হিসেবে তো আসেনি!”

দমে গেল ইশরা। ভেংচি কাটলো সে। সূচালো কন্ঠে বলল..

— “এখন এই কাজ রেখে তোমার জামাইয়ের জন্য একটা ছেঁড়া জামা থাকলে দাও, পড়ে রাস্তার মোড়ে বাটি নিয়ে বসবে।”

— “ছিঃ, এইসব কোন ধরনের কথা ইশু। প্রোপার সম্মান করতে শেখ!”
তমোনা রুমের দিকে এগিয়ে গেল। গ্ৰে রঙের ফতুয়া আর লুঙ্গি এনে ইশরার হাতে ধরিয়ে দিলো। ইশরাও বিনা বাক্যেয় লুঙ্গি আর ফতুয়া নিয়ে রুমে চলে এলো। ততক্ষণে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়েছে আয়ান। আয়ানের লোমকূপে জমে আছে বিন্দু বিন্দু জলকণা। আজ ইশরার কাছে আয়ানকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরতম পুরুষ লাগছে। আঁখিযুগল আটকে গেল আয়ানের আঁখিতে। সাথে সাথে নিম্নোক্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করল সে।

ইশরার সোজাসুজি দাঁড়ালো আয়ান নামক যুবকটি। ইশরার শুষ্ক হাতটা নিজের জল জমা বুকের বাম পাঁজরে রাখল। কেঁপে উঠলো ইশরা। তট জলদি হাত সরিয়ে নিল। আয়ান বাধা মানল না। ইশরার দুহাত নিয়ে কাঁপল ডান্স শুরু করে দিল। ভেজা ভেজা ঠোঁট নাড়িয়ে গান গাইলো মৃদু স্বরে। নাচ শেষ করে কোলে তুলে নিলো ইশরাকে। ঢিলে হয়ে এলো পড়নের টাওয়াল। শব্দহীন খসে পড়লো সেটা। সামনে রক্ষিত আয়নাতে দৃষ্টিগোচর হলো অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু। মস্তিষ্ক অচল হয়ে উঠলো ইশরার। হাত থেকে খসে পড়লো জামা কাপড় গুলো।

ইশরাকে ফেলে দিল আয়ান। দ্রুত টাওয়াল তুলে ঠিক করে নিল। ভ্রু কুঁচকালো ইশরা। বাঁকা হেসে বলল..

— “ঢেকে লাভ নেই! যা দেখার দেখে নিয়েছি। পুরো জাদুঘরে সংরক্ষিত করা যাবে।”

(চলবে.. ইনশাআল্লাহ)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here