অন্যরকম ভালোবাসা ২ -পর্ব ১৮

0
60

#অন্যরকম_ভালোবাসা 💓 [২]
#ইফা_আমহৃদ
পর্ব:: ১৮

বেলকেনির গ্ৰিলে মাথা ঠেকিয়ে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে ইশরা। হাজার বার চাইলেও সহ্য করতে পারছে না। যতোবারই মুছার চেষ্টা করছে ততবারই পূর্ণ হচ্ছে অশ্রুতে। তাই না মুছেই রেখে দিল। আয়ানের বারবার অবহেলা তার সহ্য হচ্ছে না। নিজের কষ্টগুলো দূর করার বৃথা চেষ্টায় মগ্ন ছিল যখন ইশরা। তদানীং ডাক পড়ল তমোনার। বেলকেনিতে প্রবেশ না করে, বাইরে দাঁড়িয়ে বললেন..

— “ইশু তোর বাবা দরজা খুলেছেন। তোকে ডাকছে। তুই গেলেই জানতে পারব কি হয়েছে তার। তাড়াতাড়ি আয়..

ফিরে তাকালো না ইশরা। দৃষ্টিকে বাইরেই বন্দী করে বলল..– “মা তুমি যাও, আমি আসছি।”

তমোনা চলে গেলেন। মায়ের অনুপস্থিত অনুভব করে উঠে দাড়ালো ইশরা। তাকে এভাবে দেখলে কষ্ট পেতেন তমোনা। তাই মায়ের যাওয়ার অপেক্ষা করলো সে। মুখে পানি ছিটিয়ে মুছে নিল। সাধারণ ব্যবহৃত ক্রিমটা মুখে মেখে নিলো। চুলগুলো ঠিক করে বাবার রুমে পা বাড়ালো ইশরা। সকালে বাড়িতে ফিরে রৌদ্র জুবায়ের দরজা বন্ধ করে রেখেছিলেন। মাত্র খুলেছে, সারাদিন কিছু খায়নি। কারো সাথে কথা বলেনি। একটা কথাই উচ্চারণ করেছেন,– “আমি এখন একা থাকতে চাই।”

খাবার টেবিলের উপর রেখে বাবার দিকে এগিয়ে গেল ইশরা। মাটিতে বসে বাবার কোলে মাথা রেখে নয়ন গ্ৰথণ করে নিল। মৃদু শব্দ বলল..

— “বাবা কি হয়েছে তোমার? কি বলবে তাড়াতাড়ি বলে খাবারটা খেয়ে নাও, নাহলে খাবার খেয়ে বল। না খেয়ে থাকতে অসুস্থ হয়ে যাবে তুমি!”

রৌদ্র জুবায়ের মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন। মেয়ের কষ্টটা তিনি উপলব্ধি করতে পারছেন। নয়ন থেকে চশমা খুলে বললেন..– “ইশু মা আমার, তোমার জীবনটা আমি নষ্ট করে দিয়েছি। তাই না।”

চমকালো ইশরা। তট জলদি বাবার মুখশ্রীর দিকে তাকালো। ইশরা ঠোঁট নাড়িয়ে কিছু উচ্চারণ করার আগেই মুখ খুললেন রৌদ্র জুবায়ের..

— “কিছু লুকাতে হবে না তোর। আমি সব জেনে গেছি, আজাদ আমাকে সবটা খুলে বলেছে! আমাদের একটা ভুল সিদ্ধান্তের জন্য আজ তোর জীবনটা নষ্ট হতে বসেছে। চিন্তা করিস না মা, আমি তোর ভালো জায়গায় বিয়ে দিবো। খুব ভালো থাকবি তুই।”

— বাবা এখানে তোমাদের কোনো দোষ নেই। সব দোষ আমার ভাগ্যের। তাছাড়া আমি আর আয়ান পালিয়ে বিয়ে করেছি।

রৌদ্র জুবায়ের মেয়েকে থামিয়ে দিলেন। তিনি যদি আয়ানের সাথে ইশরার বিয়ে ঠিক না করতেন তাহলে এমন কিছু আদোও হতো না। হঠাৎ মাথার ভেতরে বজ্র বিদ্যুৎ খেয়ে গেল। হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরলেন তিনি। সামলে নেওয়ার চেষ্টা করলেন। মৃদু স্বরে বললেন.. — “দো-ষ তোর ন..
বাক্য শেষ করতে পারলেন না। দুহাতে মাথা চেপে নুইয়ে পড়তেন। দ্বি-মুহুর্ত অতিক্রম হওয়ার আগেই বসা থেকে চেয়ার নিয়ে উল্টে পড়লেন তিনি। চোখ উল্টে গেল তার। শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করলেন। দ্রুত এগিয়ে গেলেন তমোনা। আংশিক শব্দে গালে আঘাত করে বলতে লাগলেন..

— “এই শুনছো? কি হয়েছে তোমাকে? এমন করছো কেন? কথা বলো!”
রৌদ্র জুবায়ের যেন আরো শক্তহীন হয়ে পড়লেন। বাবার এমন অবস্থায় ইশরা যেন বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে তার বাবাকে ধরা উচিত না-কি ডাক্তারকে ফোন করা উচিত, হসপিটালে নেওয়া উচিত না-কি আশে পাশের কাউকে ডাকা উচিত। কিছুক্ষণ নিজের সাথে যুদ্ধ করে সামান্য শক্তি সঞ্চয় করলো সে। দ্রুত পানি ভর্তি গ্লাস টা হাতের মুঠোয় নিয়ে নিলো। বাবার মাথার নিচে হাত রেখে দুই ওষ্ঠের মাঝ দিয়ে এলিয়ে দিলো পানি। খেলেন না রৌদ্র জুবায়ের। মুখের ফাঁক দিয়ে অধর গড়িয়ে গড়িয়ে পানিটুকু নিয়ে পড়ে গেল।

এই মুহূর্তে নিজেকে সবচেয়ে বেশী অসহায় লাগছে তার। তমোনার দিকে তাকালে ভেতরটা ভেঙ্গে যাচ্ছে তার। বাম হাত সামান্য উঁচুতে উঠিয়ে পাল্স রেট চেক করে নিলো ইশরা। পাল্স দ্রুত গতিতে বিট করছে।

________________

হসপিটালের করিডোরে বসে আছে ইশরা। হাত নিজের মাথায় বন্দী। নয়নজোড়া বন্দী গভীর অন্ধকারে। চোখ মেললেই গড়িয়ে পড়বে না চাওয়া অম্বুধারা। নিজেকে যথাসাধ্য শক্ত রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে ঠিকই ভেঙ্গে পড়ছে। তারপাশে কিছুটা দূরে বসে তমোনা কাঁদছে। তাকে সামলানোর শক্তিটুকু নেই। আইসিইউর অবাধে সাধারণ কেবিনের ভেতরে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির সাহায্যে রৌদ্র জুবায়ের এর চিকিৎসা হচ্ছে।

উঠে দাঁড়ালো ইশরা। এগিয়ে গেল কিছুটা দূরে। হাতের মুঠোয় রাখা ফোনটা বের করে তিথির নাম্বারে ডায়াল করলো। তমোনাকে সামলানোর জন্য হলেও তিথিকে প্রয়োজন। গভীর রাত্রি হওয়াতে তিনি হয়তো নিদ্রাচ্ছন্ন। দ্বিতীয়বার রিংটোন বাজতেই রিসিভ হলো। কথা বলার শক্তিটুকু খুঁজে পেল না ইশরা। ভেতরের কান্নাগুলো‌ দলা পাকিয়ে গলায় আটকে আছে‌। বিরবির করে দুবার উচ্চারণ করলো..– “বা-বা, বা-বা।”

বুঝতে সক্ষম হলো সে পারবে না। ফোনটা নিয়ে এগিয়ে এলো। ড্রাইভার চাচার কাছে দিয়ে ইশরায় বাবার কথা জানাতে বললো ইশরা। তিনি সবটা তমোনাকে জানিয়ে দিলেন।
মিনিট ত্রিশেক পরে হসপিটালে হাজির হলেন তিথিসহ সবাই। তিথিকে দেখে তমোনা আর হালকা হয়ে পড়লেন। তবে ইশরার নয়ন এদিক সেদিক আয়ানকে খুঁজতে লাগল। এই দুঃখ প্রাচীর সময় তার আয়ানকে প্রয়োজন। তার শান্ত্রনা প্রয়োজন। কিন্তু চোখের সেই তৃষ্ণা মিটলো না। আয়ান আসেনি। অভিমানে পাহাড় জমে গেল ইশরার। ইতিমধ্যে দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন সবুজ রঙের জামা পরিহিতা নার্স। মুখের মাক্স খুলে বললেন..

— “৩ নং আইসিইউর ভেতরে রেহানা নামের একজন নার্স আছে। তাকে আসতে বলবেন।”

বলেই আবার ভেতরে চলে গেল সে। ইশরা বেরিয়ে এলো নার্সকে খুঁজতে। রিসেপশন থেকে কক্ষের অবস্থান জেনে এগিয়েছে গেল সেদিকে।

প্রবেশদ্বারের বাইরে কাউকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এগিয়ে এলো একজন নার্স। এসে জিজ্ঞাসা করলেন..
— “কি চাই এখানে!”

— “রেহানা নামের একজন নার্সকে ওখানে খুঁজছি।”

নার্সকে সঙ্গে নিয়ে পুনরায় এগিয়ে গেল বাবার কেবিনের সামনে‌। মাঝপথে থেমে গেল তার চরণ। একটু আগের দেখা দৃশ্যগুলো মস্তিষ্কে সচল হয়ে উঠলো। আইসিইউর ভেতরে কাকে দেখেছে সে। এক মুহুর্ত সময় অবিলম্ব না করে একপ্রকার দৌড় ছুটে গেল সেদিকে। কাঁচের সামনে দাঁড়াতেই সেই অনাকাঙ্ক্ষিত মানুষটিকে নজরে এলো তার। এবার অম্বুধারা আঁটকে রাখতে ব্যর্থ হলো সে। গড়িয়ে পড়লো গাল বেড়ে নিচে। বিরবির করে অধর নাড়িয়ে শব্দহীন উচ্চারণ করলো সে.. — “আ-য়া-ন।”
পর মুহুর্তেই চোখ মুছে একই জায়গায় বন্দী করে নিল সে। না তার দেখা ভুল ছিল না। ওরনার শেষপ্রান্ত দিয়ে মুছতে লাগলো কাঁচটা। বিনিময়ে গ্লাসটা আরো পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন হয়ে উঠলো। কিন্তু দৃষ্টিভোম হলো না। প্রবেশদ্বারের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে ধীরে ধীরে বসে পড়লো সে। আর সহ্য করতে পারছে না। সবকিছু অগোছালো, এলোমেলো লাগছে তার কাছে।

নার্স এগিয়ে এলো ইশরার দিকে। একহাটুতে ভড় দিয়ে ইশরার দিকে ঝুঁকে বললেন..

— “ম্যাম কি হয়েছে আপনার? শরীর খারাপ লাগছে?”

মাথা তুলে অবলোকন করলো ইশরাত। আঙুল তুলে আইসিইউর ভেতরে উদ্দেশ্য করে বলল..

— “আয়ান, এখানে কি করছে? কি হয়েছে ওর?”

— “উনি তো ইরেকটাইল ডিসফাংশন রোগে আক্রান্ত! তার চিকিৎসা চলছে! ছেলেটার আর তার ওয়াইফের জন্য কষ্ট হচ্ছে। বিয়ের পরেরদিন ছেলেটা জানতে পারে সে ইরেকটাইল ডিসফাংশন রোগে আক্রান্ত। ভাবতে পারছেন? ছেলেটা মেয়েটাকে না জানিয়ে ট্রিটমেন্ট নিতে থাকে। লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হচ্ছিলো। সাইড ইফেক্ট এর জন্য দুজনের মাঝে দুরত্ব ক্রমশ বাড়ছিলো। অবশেষে ছেলেটা সিদ্ধান্ত নেয়,পেনাইল ইনজেকশন নিবে। সেই প্রসেসটাই ভেতরে চলছে।”

বাকরুদ্ধ হয়ে গেল ইশরা। আয়ান এতো বড় একটা সমস্যায় জর্জরিত আর সেখানে ইশরা কিছুই জানে। তার জন্য ছেলেটা নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে। অশ্রুসিক্ত নয়নে বলল..– “এটা কিভাবে করা হয়?”

— “পেনাইল ইনজেকশন যেমন আলপ্রোস্টাডিল স্ব-ইনজেকশন:
এই পদ্ধতিতে, আলপ্রোস্টাডিল একটি সূক্ষ্ম সূঁচ দ্বারা পুরুষাঙ্গের গোড়ায় বা পাশে ইনজেক্ট করা হয় এবং এটি প্রায় এক ঘন্টার জন্য ইমারত বজায় রাখতে সাহায্য করে। স্ব-ইনজেকশন পাঠ প্রথমে অভিজ্ঞ স্বাস্থ্যসেবা পেশাদারদের দ্বারা দেওয়া উচিত। চিকিৎসার এই পদ্ধতির সাফল্যের হার 85%হিসাবে উচ্চ। আলপ্রোস্টাডিল দুই বা ততোধিক ওষুধের সাথে মিশে যেতে পারে যা “বিমিক্স” বা “ট্রিমিক্স” সংমিশ্রণ হিসাবে পরিচিত যা একা অ্যালপ্রোস্টাডিলের চেয়ে শক্তিশালী এবং ইরেকটাইল ডিসফাংশনের জন্য আদর্শ চিকিৎসা হয়ে উঠেছে। এই পদ্ধতির সাধারণ পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াগুলির মধ্যে রয়েছে হালকা রক্তপাত এবং দীর্ঘায়িত ইরেক্শন (প্রিয়াপিজম)।”

আর শোনার ক্ষমতা রইলো না ইশরার মাঝে। ক্রমশ নয়নজোড়া ঝাপসা হয়ে আসছে তার। শরীরের ভারসাম্য হারিয়েছে জ্ঞান হারালো সেখানে। ধীরে ধীরে মস্তিষ্ক তলিয়ে গেল অতল গভীর অন্ধকারে।

(চলবে.. ইনশাআল্লাহ)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here