অন্যরকম ভালোবাসা ২ -পর্ব ১০

0
74

#অন্যরকম_ভালোবাসা 💓 [২]
#ইফা_আমহৃদ
পর্ব:: ১০

— “ইশরা সামান্য কিছুদিনের ব্যবধানে ভুলে গেলে তোমার ভালোবাসার মানুষটিকে। তবে কি জানো, বিয়ে আল্লাহ দেওয়া একটা পবিত্র সম্পর্ক। আমি চাই না, সেই সম্পর্কটা নষ্ট হোক। সেদিনের বলা হাজারো মিথ্যা কথা বলার মাঝে, এটাই সত্যি। আর সেটা হচ্ছে, আমি তোমাকে আজও ভালোবাসি। রাতগুলো নষ্ট করে তোমার ছবির দিকে তাকিয়ে থাকি! মেঘালয় ডাকটার শোনার জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনতে থাকি। কিন্তু আমার সেই অপেক্ষার প্রহর জীবনেও শেষ হবে না।”

কথন গুলো থামিয়ে ইশরার দিকে সরু চোখে অবলোকন করলো মেঘ। ইশরা ক্রমাগত কেঁপে চলেছে। কাঁপা কাঁপা হাত জোড়া ইশরার কাঁধে ঠেকালো। তড়িৎ গতিতে ধাক্কা দিয়ে অন্যপ্রান্তে গিয়ে দাঁড়ালো ইশরা। পূর্বের চেয়ে কম্পন আরো বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। সেপ্টে গেল লিফ্টের সাথে। যেন লিফ্টের অন্যপ্রান্তে কোনো অদৃশ্য দরজা লুকিয়ে আছে। যেটা সকলের অগোচরে ইশরা খুঁজে পেয়েছে। পরমুহূর্তেই বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পাঁয়তারা শুরু করে দিলো সে। দুহাতে ক্রমাগত লিফ্টের বাটন চেপে চলেছে। প্রতিটা বাটনে ক্লিক করছে সে। ধীরে ধীরে কাঁপতে কাঁপতে আলো নিভে গেল ভেতরের। ইতিমধ্যে লিফ্ট কাঁপতে কাঁপতে মাঝ পথে থেমে গেছে। তীব্র অন্ধকারে নেতিয়ে পড়লো ইশরা। দুহাতে মুখ মন্ডল ঢেকে ফুঁপিয়ে উঠলো সে। মনে হচ্ছে তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি তার চরম সর্বনাশ করে ফেলবে। ভেতর থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা চালালো কিছুক্ষণ। সফল হলো না তার চেষ্টা। পিঠ ঘেঁষে বসে পড়লো নিচে। ক্ষীর্ণ আলো এসে ধরা দিলো লোচনে। মেঘ টর্চ জ্বালিয়ে ইশরা বলে ডাকছে। কিন্তু সেসব শোনার মতো মস্তিষ্কে নেই ইশরা।

ইশরা কষ্ট এবার হয়তো উপলব্ধি করতে পারল। দরজা খুলে গেল থার্ড ফ্লোরে। তপ্ত শ্বাস ত্যাগ করলো ইশরা। সময় অবিলম্ব না করে এক ছুটে বেরিয়ে গেল সে। লিফ্ট থেকে বের হতেই মুখ থুবড়ে পড়লো। সাথে সাথে হাতের কনুই পায়ের হাঁটু জ্বরে উঠলো ইশরার। পড়নের জিন্স অতিক্রম করে ভেতরটা ছিলে গেছে খানিকটা। হাত ফোসকে ইতিমধ্যে শার্টসহ মুঠোফোন টা মাটিতে পড়ে গেছে। ব্যাথায় ভেতরের শক্তিগুলোর ক্ষয় হয়ে গেছে। ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে ফিরে তাকালো ইশরা। মেঘ তার দিকে এগিয়ে আসছে। দ্রুত হাত ফসকে পড়ে যাওয়া জিনিস পত্রগুলো তুলে নিলো সে। ব্যাথার্থ পায়ে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা চালালো বেশ কিছুক্ষণ। কোনো রকম এলোমেলো পা ফেলে দৌড় এগিয়ে গেল ওজানার উদ্দেশ্য। তদানীং পেছনে ছুটে আসছে মেঘ।

আসতে আসতে এসে পৌঁছেছে থার্ড ফ্লোরের একদম অন্তিম প্রান্তে। সামনে যাওয়া মতো রাস্তা নেই। পেছনে ঘুরে অবলোকন করলো ইশরা। একপা একপা করে পিছুতে লাগলো সে। ভেসে এলো মেঘের কর্কট কন্ঠস্বর..

— “ইশু আর এগিও না, পড়ে যাবে।”

ইশরা মেঘের কথন কর্ণপথে নিলো না। মেঘের পায়ের গতির সাথে তার মিলিয়ে পিছুতে লাগলো। রেলিং এ ধাক্কা লেগে উল্টো হয়ে পড়ে গেল সে। তট জলদি হাত ধরে সামলে নিল মেঘ। ভেতরে চিপকে রাখা ভয়টা দ্বিগুণ হয়ে এলো ইশরার। ধমকের স্বরে বলল..

— ইশরা পাগল হয়ে গেছ তুমি? হাত কেন ছাড়াচ্ছো?

হুস ফিরলো ইশরার। নিচের দিকে তাকালো সে। তবে জীবনের সমাপ্তি ঘটবে না তার। জ্ঞানশূন্য হয়ে কি করতে চলেছে সে। এখান থেকে পড়লে কি হতে পারে ধারণা নেই তার। মেঘের স্পর্শে গাঁ গুলিয়ে উঠলো ইশরার। কোনো এক সময় এই স্পর্শটা গভীরভাবে মিস্ করত সে। আর আজ সেই সংস্পর্শ-টা ঘৃণায় গাঁ গুলিয়ে উঠছে। মনের কোণে আয়ান ছাড়া দ্বিতীয় কারো প্রতি ফিলিং নেই। উপরের দিকে তাকিয়ে নিভু নিভু গলায় বলল..

— “হাত ছাড়ো আমার। মেঘালয় হাত ছাড়ো বলছি..

নয়ন যুগল গ্ৰথণ হয়ে গেল মেঘের। শরীরের শিরায় শিরায় প্রবাহিত হলো হিম শীতল ধারা। হাতের বাঁধন আলগা হয়ে গেল ধীরে ধীরে। ঘটে গেল সেই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি। বিকট শব্দে নিচে পড়ে গেল ইশরা। কালো কুচকুচে দুটো কাক, ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে উড়ে গেছে অজানার উদ্দেশে। শরীর কাঁপানো শব্দে ধ্যান ভাঙলো মেঘের। দুকদম পিছিয়ে বসে পড়লো নিচে। ফিরে তাকানোর মতো সাহস খুঁজে পেল না সে। হার্ট দ্রুত গতিতে বিট করতে শুরু করেছে। হঠাৎ -ই ভেতরে ম্যাজিকের মতো সাহস ভড় করলো মেঘের ভেতরে। উঠে দাঁড়িয়ে এগিয়ে গেল সেদিকে। উঁকি দিল নিচের দিকে। নজরে এলো পরিচয় মানুষটার কিছু অংশ। হাতে থাকা প্যাকেটা-টা বক্ষের সাথে জড়িয়ে চাপা আর্তনাদ করছে সে। পুনরায় সেদিকে নজর দেওয়ার মতো সাহস খুঁজে পেল না। ঝড়ের গতিতে সিঁড়ি বেয়ে নিচে যাওয়ার উদ্ধেগ হলো সে। সম্ভব হলে লাফ দিয়ে ইশরার কাছে চলে যেত।

_________________
সূর্যের রশ্মি বিদায় নিয়েছে আকাশের কোণ থেকে। অন্ধকারের অতল গহ্বরে তলিয়ে গেছে শহর। সূর্যহীন আকাশ হলেও লাল রঙের আভা গুলো রয়ে গেছে। খানিকক্ষণ পর তারাও বিদেয় হবে। ফিরবে আবার সূর্যের সাথে। আভা-গুলো যখন আকাশের বুক থেকে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার উপক্রম তখন অপারেশন থিয়েটারের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো অভিজ্ঞ ডাক্তার। তমোনা আর রৌদ্র এগিয়ে গেলেন সেদিকে। সাথে শেফাও যোগ হয়েছে। ডা. সাহেব মুখে পরিধিত গাঢ় সবুজ রঙের মাক্স খুলে বলল.

— “আপনাদের ডাক হয়তো তিনি কবুল করেছেন! সিরিয়াস কোনো ইনজুরি ছিলো না। সারা দেহে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে। তবে মাথার আঘাতটা মারাত্মক ছিল। এখন পেসেন্ট ভালো আছে। একটু পর কেবিনে সিফ্ট করা হবে। তখন দেখা করবেন কিন্তু জাগাবেন না। প্রচুর ব্লিডিং হওয়ার কারণে শরীরটা প্রচুর দূর্বল। ঘুমের ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে। ঘুমাতে দিন।”

হেঁটে চলে গেলেন তিনি। ভেতরে আঁটকে রাখা অসহায় শ্বাস ফেললেন ইশরার বাবা মা। অতিশয় চিন্তায় ব্যাপার-টা আয়ানের বাড়ির কাউকে জানানো হয়নি। ফোন হাতে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন রৌদ্র জুবায়ের। বেঞ্চিতে বসে পড়লেন তমোনা। শেফাও যেন প্রাণ খুঁজে পেল। তার ভুল সিদ্ধান্তে কি হতে চলেছিল ধারণা করা যায় নি।

ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করতে করতে রাত দশটার কাঁটার ছাড়িয়েছে। আয়ানের বাবা মা-সহ সকলে এসেছে। কেবিনে সিফ্ট করা হয়েছে ইশরাকে। জ্ঞান ফিরেছে তার। হাতে স্যালাইনের ক্যানেল লাগানো। নার্স খবর দিয়েছে প্রিয়জনদের। দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলো সকলে। নিজের প্রিয় জনদের দেখে দূর্বল হাসি দিলো ইশরা। উঠে বসার চেষ্টা করতে ধমক দিলো তিথি। পুনরায় গাঁ হেলিয়ে দিলো। শেফা পাশে বসে কৌতূহলী কন্ঠে বলল.

— “কি এমন হয়েছিল। কি এমন ঘটেছিল যে, তুই ঝাঁপ দিতে গেলি। মেঘ যখন ফোন করে আমাকে সবটা জানিয়েছে, আমি স্তব্ধ হয়ে গেছিলাম। সেই তোকে এখানে নিয়ে এসেছে। একদম সুপার-ম্যান স্টাইলে।”

কিছু বললো না ইশরা। তখন শরীরের ভেতরে অদৃশ্য যন্ত্রনা করছিল, যে করেই হোক তাকে মেঘের থেকে দূরে যেতে হবে। কিন্তু মেঘকে এতো ভয় পাওয়ার কি আছে বুঝতে পারল না।

বেশ টুকিটাকি কথা হলো সকালের সাথে। এবার সবার ফেরার পালা। সকলে যেতে চাইলেও তমোনা যাবে না। তার এক কথা, সে মেয়ের সাথে থাকবে। তার সাথে যোগ হয়েছে তিথি। সেও যাবে না। মায়ের এমন কথা শুনে, কষ্ট হলো খুব। এতো দিন এই মাকে তার প্রয়োজন ছিলো। মুখের ভঙ্গিমা সুচালো করে বলল..

— “বাবা তুমি মাকে নিয়ে যাও তো? আমার এখানে কাউকে থাকতে হবে না।”

— “তুই বললেই আমি চলে যাবো। যেদিন তুই হসপিটাল থেকে বাড়িতে যাবি, সেদিন আমিও একসাথে বাড়িতে ফিরবো। তার আগে নয়।”

উঠে বসার চেষ্টা করতে করতে বলল.

— “ঠিক আছে! তাহলে বাড়িতে চলো। বাড়িতে গেলে যদি আমি অসুস্থ হয়ে যাই, তাহলে যাবো। তোমাকে তবুও থাকতে দিবো না।”

তমোনা, তিথি দ্বিমত পোষণ করলেন না। মুখ গোমড়া করে বাড়িতে যেতে রাজি হলেন। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো ইশরা। ইতিমধ্যে বেরিয়ে পড়েছেন তারা। এক্সিডেন্টের কথা আয়ানকে জানাতে বারণ করে দেওয়া হয়েছে। সে আয়ানকে ব্যাপারটা জানাতে চাইছে না। আদোও আয়ান জানলে, আসবে কি-না, জানা নেই তার। নয়ন গ্ৰথণ করে নিদ্রাচ্ছান্ন হওয়ার চেষ্টা চালালো। তার ঘুম আসবে না, সেটা‌ জানা কিন্তু চেষ্টা করতে ক্ষতি কি।

ড্রয়ারের দ্বিতীয় তাকে ক্রমাগত ফোন বেজে চলেছে। সেই আওয়াজে বেষ্টিত নয়নজোড়া খুলে তাকালো ইশরা। ক্যানেল বিহীন হাত দিয়ে ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরলো। ওপাশ থেকে ভেসে এলো চির পরিচিত কষ্ঠস্বর! কান থেকে ফোন সরিয়ে স্ক্রিনে তাকাতেই দুফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো নয়ন বেয়ে। এই মানুষটার জন্য এতোক্ষণ তার সবকিছু অস্তিত্ব হীন লাগছিলো। শিতলতি মেশানো কন্ঠে বলছে..

(চলবে.. ইনশাআল্লাহ)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here