অন্যরকম ভালোবাসা ২ -পর্ব ২৯

0
61

#অন্যরকম_ভালোবাসা 💓 [২]
#ইফা_আমহৃদ
পর্ব::২৯

ঘন কালো অন্ধকারে আবৃত হলো বিকেলের মেঘমুক্ত আকাশ। বৃষ্টির ফোঁটা পড়তে লাগলো ধীরে ধীরে। ইশরার কষ্টে সঙ্গি হতে এসেছে তারা। ইশরাও তাদের সাথে তাল মিলিয়ে শব্দহীন কাঁদছে।
আয়ান মাথা নত করে রইলো। ইশরা অভিযোগ গুলো তাকে পিড়া দিচ্ছে। নিজের কাজকে গুরুত্ব দিতে দিতে প্রিয় মানুষটির প্রতি অবহেলা করেছে। বৃষ্টির ফোঁটা কিছুটা বাড়তেই হুস ফিরলো তার। কাতর কন্ঠস্বর নিয়ে বলল..

— “ইশু বৃষ্টি হচ্ছে, বাড়িতে চল। ভিজে যাচ্ছিস।”

— “একটু ভিজতে চাই আয়ান। জলকণার সাথে নিজের কষ্টগুলো বিসর্জন দিতে চাই। জ্বর আসুক, কাতর করে দিক আমাকে। দিক..

বিনিময়ে হাত জোড়া শূন্যতায় মেলে দিল ইশরা। আয়ান কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। অতঃপর ইশরার বাহু চেপে ধরলো! হালকা কন্ঠে বলল..

— “ইশু জেদ ধরিস না। চল এখান!”

ধীরে ধীরে আয়ানের হাতটা বাহু থেকে ছাড়িয়ে নিল। আয়ানের নয়নে নয়ন যুগল বন্ধ করে কাতর কন্ঠে বলল..

— “শেষবারের মতো জড়িয়ে ধরবে আমায়? শেষবারের আবদার..
আয়ান দৃঢ় বাঁধনে জড়িয়ে নিল ইশরাকে। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলতে লাগলো..– “আম স্যরি, ইশুপাখি।”
ধীরে ধীরে হাতের বাঁধন আলগা করে সরে এলো তার। আয়ানের হাতটা মুঠোয় পুড়ে নিল ইশরা। কিছুক্ষণ অতিবাহিত হওয়ার পরে ছেড়ে দিলো হাতখানা। এগিয়ে গেল ব্রিজের রেলিং এর কাছে। দম বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলল..

— “ক্ষমা করে দিস আয়ান। নিজের সাথে প্রিন্সেসকে সাথে নিয়ে গেলাম। ভালো থাকিস, যত্ন নিস।”

আয়ানের সবটা বোধগম্য হতে বেশ সময় পেতে হলো। কিন্তু তাল আগেই ঘটে গেল অঘটন। রেলিং এর উপরে উঠে ঝাঁপ দিলো। শেষ মুহূর্তে আয়ান ইশরার হাত ধরে ফেলল। একহাত রেলিং এ ঠেকিয়ে অন্যহাত দিয়ে পেঁচিয়ে নিল ইশরাকে। কিন্তু আভিমানী ইশরা, সে তোয়াক্কা করলো না। আয়ানের হাত ছাড়াতে ব্যস্ত হয়ে গেল। আয়ান যেন দূর্বল হয়ে পড়ছে ক্রমশ। বলল..

— “ইশু কি করছিস তুই? আমার হাতটা ছাড়িস না। আমাকে এই পৃথিবীতে একা করে হারিয়ে যাস না। এতো শাস্তি আমার প্রাপ্ত নয়। আমি সবটা তোকে খুলে বলল। প্লীজ ইশু..

ইশরার কর্ণপথে আয়ানের আর্তনাদ পৌঁছালো না। সে নিজের কাজে ব্যস্ত। আয়ান অসহায় হয়ে পড়লো। শেষ চেষ্টা হিসেবে বলল..

— “ইশু এমন করিস না। আয়রা আমাদের সন্তান, ভালোবাসার অস্তিত্ব। তুই কিভাবে পারবি আমাদের অস্তিত্ব শেষ করে দিতে। মা হয়ে এমন সার্থপর হস না, ইশুপাখি।”

ইশরার হুস ফিরল। অনুসূচনায় পূর্ণ হলো সে। মা হয়ে কিভাবে নিজের সন্তানকে শেষ করে দিতে চেয়েছিলো। আয়ানের অপর পাশে জড়িয়ে ধরলো। নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা একটা মেয়ের ওজন আর পাঁচটা স্বাভাবিক মেয়ের মতো নয়। তিন গুন ওজন বেড়ে যায়। আয়ানের কষ্ট হয়ে গেল। হাতজোড়া বারবার ছুটে যাচ্ছে। ইশরা রেলিং এ হাত ঠেকালো। পা ঠেকালো ব্রিজের উপর। আয়ান ইশরার হাত পেঁচিয়ে ধরে হোসফোস করতে করতে বলল..

— “আয়ান, প্লীজ আমাকে তোল। আমি আমার প্রিন্সসকে পৃথিবী দেখাতে চাই। তার কাছে অপরাধী মা হতে পারবো না।”

ইশরা আয়ানের কাঁধে হাত রাখলো। আয়ান ইশরার কোমর জড়িয়ে উঠিয়ে নিয়ে আসলো ঠিকই কিন্তু বিপত্তি ঘটল অন্য জায়গায়। নিভে যেতে বসেছিলো আয়ানের অস্তিত্ব।
আয়ান নিজের ব্যালেন্জ হারিয়ে ফেললো। আচম্বিতে বিকট শব্দে ইশরার মাথা গিয়ে বাড়ি খেল রেলিং এর সাথে। রেলিং এ বাড়ি খেয়ে আবার পেছনের রেলিং এ আঘাত খেল। অতঃপর মাটিতে পড়ে পেটে আঘাত পেল। দুহাতে পেট চেপে আর্তনাদ করে উঠলো সে। মাথা ফেটে রক্ত গড়িয়ে পড়তে লাগল। পেটের ভেতর থেকে ক্রমাগত ছোট আয়রা আঘাত করে চলেছে। চুল চেপে ধরলো সে। বিরবির করে মৃদু শব্দে আয়ান আয়ান বলে চেঁচিয়ে উঠলো।
আয়ান ছুটে এলো ইশরার দিকে। ইশরার এমন অবস্থায় বাকরুদ্ধ হয়ে গেল সে। ভেতরকার শক্তি সঞ্চয় করে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো। কাঁপা কাঁপা হাতজোড়া মাথায় রাখল। চাঁপা কন্ঠে বলল..

— “ইশু, এই ইশুপাখি। কষ্ট হচ্ছে তোর।”

পরক্ষণেই হাত ধরে টেনে বুকে জড়িয়ে নিল। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো আয়ান। ইশরার নয়নজোড়া গ্ৰথণ তখন যন্ত্রনাদায়ক কাতরে। বিরবির করে বলল..

— “আ-য়া-ন। প্রিন্সসকে প্লীজ বাঁচা। প্লীজ বাঁচা। আমি পৃথিবীর সবচেয়ে অপরাধী মা হতে চাই না। ”

আয়ান বুক থেকে সরিয়ে নিল ইশরাকে। পেটে আঘাতের ফলে অনাকাঙ্ক্ষিত রক্ত ধারা বইতে শুরু করেছে। আয়ান সময় নিলো না। দ্বি মুহূর্ত অতিবাহিত হওয়ার আগেই আয়ান উঠে দাঁড়ালো। হালকা ঝুঁকে ইশরাকে পাঁজাকোলে তোলে দৌড়াতে শুরু করলো। নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে নিয়ে দৌড়াতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে আয়ানকে। তবুও থামলো না সে।

হসপিটালের করিডোরে প্রানপণে দৌড়াচ্ছে আয়ান। তার কোলে জ্ঞানহীন অবস্থায় রয়েছে ইশরা। আয়ানের চিৎকারে লোকজন জড়োসড়ো হয়ে গেছে এক জায়গা। ইশরাকে নেওয়ার সাথে সাথেই অপারেশন থিয়েটারের ভেতরে নেওয়া হলো তাকে। আয়ানের শার্টের বেশ খানিকটা অংশ রক্তে রঞ্জিত হয়ে আছে। বাকি অংশ বৃষ্টিতে ভিজে চুপচুপে হয়ে আছে। হাঁটু ভেঙ্গে বসে পড়লো আয়ান। বাড়িতে জানানো দরকার সবাইকে। পকেট থেকে মুঠোফোন বের করে ডায়াল করলো তিথির কন্টাক্ট নাম্বারে। রিসিভ হলো না। ব্যর্থ হয়ে তনয়ার ফোনে ডায়াল করল। রিসিভ হয়ে ওপাশ থেকে কিছু বলার আগেই বলতে শুরু করল..

— “ত-নু, ইশু। আমার ই-শু”
_______________
রাত তখন গভীর। বাইরের বৃষ্টির দেখা নেই। শান্ত পরিবেশ। বৃষ্টি পরে যেমন আবহাওয়া বিরাজ করে, ঠিক তেমন। করিডোরে বসে আছে সকলে। আয়ানের পড়নে সেই রক্তমাখা শার্টটা রয়েছে। ভেঙ্গে পড়েছে সে। গুড়িয়ে গেছে। শক্ত শূন্যতায় ভুগছিলো ইশরা। অন্যদিকে মাথায় বুকে রক্ত জমাট বেঁধে রয়েছে। ইশরাকে বাঁচানো দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে ডাক্তারের কাছে। ইশরাকে বাঁচাতে চাইলে ছোট আয়রাকে বাঁচাতে পারবে না। ইশরা বাঁচলেও ভবিষ্যতে এ কি হবে জানা নেই তাদের। ইশরার শেষ কথাটা ছিলো,
— “আ-য়া-ন। প্রিন্সসকে প্লীজ বাঁচা। প্লীজ বাঁচা। আমি পৃথিবীর সবচেয়ে অপরাধী মা হতে চাই না।”
তাই ইশরার ইচ্ছে পূরণ করতে বেবী কে বাঁচানোর চেষ্টা করছে ডাক্তার। অপারেশন থিয়েটারের উপরের লাল রঙের বাতিটা বন্ধ হয়ে গেল। আয়ান গতিহীন, অবশ পা-জোড়া টানতে টানতে এগিয়ে গেল দরজার দিকে। বেরিয়ে এলো সবুজ ড্রেস পরিহিত এক জন ডাক্তার। কিছু জানার নেই তার। আয়ানের কাঁধে চপল মেরে ভেতরে যেতে বলল!
আয়ান দূর্বল পায়ে ভেতরে এগিয়ে গেল। ছোট একটা মেয়ে ইশরার পাশে শুয়ে আছে। শুভ্র রঙের কাপড়ে মুড়িয়ে রাখা হয়েছে তাকে। আয়ান হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো সেখানে। একজন নার্স এসে ছোট প্রিন্সেসকে আয়ানের কোলে তুলে দিল। আয়ান এক ধ্যানে তাকিয়ে রইল ছোট সোনার দিকে। অবিকল ইশরার মতো দেখতে সে। বড় বড় ডাগর ডাগর পাপড়ি যুক্ত আঁখি জোড়া দিয়ে আয়ানের দিকে তাকিয়ে আছে। আয়ান নিজের তর্জনী আঙুল এগিয়ে দিতেই আদো আদো হাতে পেঁচিয়ে ধরলো প্রিন্সেস। খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো সে। বাকি সবাই তাকিয়ে রইল দুজনের দিকে। একদম সেই হাঁসি। আয়ান অধর ছুয়ে দিল আয়রার ললাটে। দূর্বল কন্ঠে বলল..

— “ইশু এই ইশুপাখি। দেখ তোর আগে আমি প্রিন্সেসকে ছুঁয়ে ফেলেছি। তুই বকবি না।
আমি তো তোকে অপরাধ মুক্ত করে দিলাম। তাহলে কেন ফিরে আসবি না। ভালো থাকিস পাখিটা।
সত্যি টা একবার শুনে নাহয় আমাকে এতোবড় শাস্তি দিতি। মেনে নিতাম। কিন্তু নিঃস্ব করে কেন দিলি।”

আয়ান কেঁদে উঠলো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে। অম্বু ধারা গড়িয়ে পড়লো আয়রার হাতের উপর।

তারপরে কেটে গেছে কয়েকটা সেকেন্ড, কয়েকটা মিনিট, কয়েকটা মুহুর্তে, কয়েকটা দিন, সপ্তাহ, মাস, বছর। আয়ান এখন আর কাঁদে না। খুব সুখে আছে তারা। প্রিন্সেসকে নিয়ে খুশি আছে সে। তবে মুখের সেই মায়াবী হাসিটা নেই। গম্ভীর থাকে সবসময়। সবার থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখে।
আয়রার পাঁচ বছর। স্কুলে পড়ে সে। তার স্কুলে যেমন খুশি তেমন সাজো, প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছে সে। তার পড়নে লাল রঙের ইশরার শাড়িটা। হাত ভর্তি কাঁচের চুড়ি। নয়নে মোটা করে কাজল রেখা। মায়ের সমস্ত অলঙ্কার তার দখলে। আয়নায় খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বেশ কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করলো নিজেকে। তাকে দেখতে অবিকল ইশরার ছবির মতো। কিন্তু ইশরার মতো এতো উঁচু পেট নেই। ফোঁস করে দম ছাড়লো সে। সে মায়ের মতো সাজবে, মানে সাজবেই। কিছুক্ষণ ফোঁস ফোঁস করে একটা ওরনা মুড়িয়ে নিলো। সেটা পেটের ভেতরে দিয়ে এক লাফ দিল। পরক্ষণেই খুলে পড়ে গেল নিচে। ঠোঁট উল্টে বলল..
— “মাম্মা তুমি যদি থাকতে। তাহলে আমি তোমার কাছে জিজ্ঞেস করতাম যে তোমার এতোবড় পেটে কি কি আছে?”

(চলবে.. ইনশাআল্লাহ)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here