অন্যরকম ভালোবাসা ২ -পর্ব ২৩

0
57

#অন্যরকম_ভালোবাসা 💓[২]
#ইফা_আমহৃদ
পর্ব:: ২৩

রবির প্রথম আলো গাছগাছালি বেধ করে দিগন্তর থেকে দিগন্তে ছড়িয়ে পড়েছে। আলোতে আলোতে আরো একবার সেজে উঠেছে দিনের পৃথিবী। পাখিরা কিচিরমিচির ডেকে চলেছে। সেই প্রথম কিরণ আর কিচিরমিচির শব্দ চলন্ত ট্রেনের ভেতর থেকেও শোনা যাচ্ছে। অতিশয় মিষ্টি সেই ধ্বনি। এখনো এক ধ্যানে বসে আছে আয়ান। তার কাঁধে মাথা রেখে গভীর নিদ্রাচ্চন্ন হয়ে আছে ইশরা। ইশরাত নিদ্রায় ব্যাঘাত ঘটাতে চায় না সে। সারারাত এমন ভাবে বসে থাকার কারণে বাম পাশ টা ব্যাথায় টনটন করছে। আয়ান সেই ব্যাথাকে আনন্দে পরিণত করে নিয়েছে। সেই রাতটা ঘুমন্ত মুখশ্রী দিকে তাকিয়ে মায়াতে কাটিয়ে দিয়েছে। আয়ান একহাত উঁচু করে হাই তুললো। ট্রেন হন দিচ্ছি। বেশিদূর পথ বাকি নেই। ধীরে ধীরে মানুষ জন জেগে উঠছে। এখন এখানে এভাবে বসে থাকা একদম নিরাপদ নয়। ইশরার গালে হাতে রেখে মৃদু আওয়াজে ডাক দিলো তাকে।– ইশু, এই ইশু।

— প্লীজ ডেকো না, ঘুমাতে দাও।
ইশরা হাই তুলে আয়ানের গলা পেঁচিয়ে আবার নিদ্রায় তলিয়ে গেল। আয়ান আবার ডাক দিলো। ইশরা এবার বেশ নড়েচড়ে উঠলো। পাশ ফেরার চেষ্টা করতেই পড়ে যেতে নিলো। আয়ান চট জলদি ইশরার কোমর জড়িয়ে সামলে নিলো তাকে। ইশরা ভয় পেয়ে গেল। নিদ্রা ভঙ্গ হলেও নয়ন এখনো অতিশয় ভীতিতে আয়ানের শার্ট খামচে ধরে আছে। আয়ান ইশরাকে নিয়ে ট্রেনের ভেতরে প্রবেশ করলো। সারারাত ঠান্ডা বাসাতে বসে থাকার কারণে শরীর হিম হয়ে আছে। সেই হিম শীতল হাতটা গালে রেখে বলল..

— “ভয় পেয়ো না ইশু, আমি যতক্ষণ তোমার পাশে আছি। তোমার কিচ্ছু হতে দিবো না। আই প্রমিস।”

এবার ভেতরকার সাহসে মেলে তাকালো আঁখি যুগল। এক চিলতে হাসলো সে। ততক্ষণে সূর্য আলো একটু উপরে উঠে গেছে। দুজনে দুজনার হাত ধরে এগিয়ে গেল কেবিনের দিকে।
.
.
ট্রেন চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনে এসে থেমেছেন মিনিট বিশেক আগে। ট্রেন থেকে নামার জন্য সবাই তাড়াহুড়ো শুরু করে দিয়েছে। প্রায় যাত্রীরা নেমেও পড়ছে। শুধু আয়ানরাই নামে নি। তার কথা, ট্রেন এখন ছেড়ে দিচ্ছে না। তাই জনশূন্য হওয়ার পড়েই নামবে। কেটে গেল আরো কিছুক্ষণ। জনশূন্য হয়ে পড়লো স্টেশন। নামতে শুরু করলো তারা। একে একে মালপত্র সব নামানো হলো। স্টেশন থেকে নেমে কিছুদূর গিয়ে মাইক্রো বাসে উঠলো তারা। আয়ান আগে থেকেই বুক করে রেখেছিল। স্বনন্দের এগিয়ে গেল তারা। মাইক্রো বাস এসে থামলো মাঝারী সাইজের রেস্তোরাঁর সামনে। বেরিয়ে গেল তারা। স্বল্প পরিমাণে নাস্তা করে আবার যাত্রা শুরু করলো।

আয়ানের পাশে জানালার কাছে ইশরা বসে আছে। কাঁচ খোলা থাকায় বাইরের আবহাওয়া অনুভব করা যাচ্ছে। কাঁচের ফাঁক দিয়ে হাত গলিয়ে দিল বাইরে। একটু পর মাথা বের করে দিল। বাঁধ সাধল আয়ান। ফোনে টাইম দেখতে দেখতে বলল..

— “ইশু, বাইরে মাথা দিও না। এক্সিডেন্ট হয়ে যাবে।” মাথা ভেতরে এনে মুখ ফুলিয়ে রইলো। কাঁচ বন্ধ করে দিল। একে একে শরীর থেকে শাল, জ্যাকেট খুলে আয়ানের হাত ধরিয়ে দিল। ভ্রু কুঁচকালো আয়ান। ওরনাটাকে ভালো ভাবে পর্যবেক্ষণ করে বলল..

— “এটা রেখেছ কেন? এটাও দাও..

বিরাগী হলো ইশরা। তীক্ষ্ম নয়নে আয়ানের দিকে দৃষ্টিপাত করলো। আয়ান উপরে তাকালো। বলল..

— “প্রয়োজনে দাঁড়িয়ে এখান থেকে উপভোগ করো। তবুও মাথা বের করো না। তুমি যতবার এমন করো, আমার হার্ট বিট ততবার বেড়ে যায়।”

মুচকি হাসলো ইশরা। আয়ান দৃষ্টি সরিয়ে পাশে দিলো। তনয়া ইশরার মতো একই কাজ করে চলেছে। ঠাস করে চপল মারল মাথায়। ফলস্বরূপ মাথাটা আরেকটু বাইরে চলে গেল। পরক্ষণে আয়ান কান টেনে ভেতরে নিয়ে এলো। তবু কান ছাড়ল না। তনয়া কান ছাড়াতে ব্যস্ত হয়ে গেল। আয়ান না ছেড়ে বলল..

— “এদিকে একজনকে বারণ করছি শুনতে পারছিস না।
আয়ানের কথা শেষ হওয়ার আগে তনয়া মুখ খুললো.. — কই তাকে তো আমার মতো মাথায় চড় মেরে, শেয়ালের মতো কান টেনে ভেতরে নিয়ে আসিস নি। যখন আমি শ্বশুর বাড়িতে চলে যাবো তখন কার সাথে এমন করবি?”

আয়ান কান ছেড়ে দিলো। হাতটা তনয়ার পেছন থেকে এনে বোনকে জড়িয়ে নিল। তনয়া ভাইয়ের বুকে মাথা রাখল। চুলের ভাঁজে হাত রেখে বুলিয়ে দিল। আয়ানের ভাবতেই অবাক লাগছে, তার ছোট পুঁচকি বোনটার বিয়ে হচ্ছে। যে সারাদিন ভাইয়া ভাইয়া বলে তাকে মাতিয়ে রাখত। বোনের ক্রুটির জন্য সে মার খেতে মায়ের হাতে। ভাই বোনের মাঝে খুনসুটি হলেও কখনো কোনো চাওয়া অপূর্ন রাখে নি। সেদিনের কথা মনে পড়লে এখনো হেঁসে উঠে। তনয়ার তখন পনেরো তম জন্মদিন ছিলো। আয়ান তার জন্য গিফ্ট কিনে এনেছিলো। একটা দামী সেল-ফোন। লুকিয়ে দিয়েছিলো। তার সেই ফোনটা তনয়ার ব্যাগ থেকে টাকা চুড়ি করে কিনেছিল। বাবা মায়ের কাছে ভয়ে বলতে পারেনি। আর আয়ানকেও কিছু বলতে পারেনি।

কথাগুলো ভাবতেই ছলছলিয়ে উঠলো আয়ানের লোচন যুগল। মাথা নিচু হয়ে এলো। তনয়া তা লক্ষ্য করলো। মুছিয়ে দিলো আয়ানের অশ্রু। সেও ভাইয়ের সাথে কেঁদে উঠলো। শব্দ করে কেঁদে উঠল দুজনে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলল..

— “আমি তোকে ছেড়ে কোথাও যাবো না ভাইয়া!”
ইশরা তখন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে প্রকৃতির সুন্দর উপভোগ করছে। কান্নার শব্দ কানে আসতেই নেমে গেল সে। দুই ভাই বোনকে কাঁদতে দেখে হতবাক হয়ে গেল সে। সামনের সিটে বসা দুয়ানও দুজনের দিকে তাকিয়ে আছে। কৌতূহলী কন্ঠে বলল..– “কি হয়েছে?”

— “দুই ভাই বোনের সম্পর্কটা ভাঙতেই বসছে যে,”

দুয়ানের কথা শেষ হতেই আয়ানের কাঁধে হাত রাখল। ইশারায় শান্ত হতে বলল।‌ কান্নার গতি কমে এসেছে অনেকটা। তবে এখনো তনয়া আয়ানের বুকে মুখ লুকিয়ে রয়েছে। আয়ান আঙুলে চুল পেঁচিয়ে টান দিলো। তনয়া কপাট লোচনে তাকালো। আয়ান আবার টান দিলো তনয়ার চুলে। তনয়া এবার চুলগুলো একহাতে ধরে আয়ানের শার্টের বোতাম ধরে টান দিলো। ছিড়লো না, তবে কিছুটা ঝুলে পড়লো।‌ আবার আরেকটা বোতাম ধরে টান দিলো। এটারও একই অবস্থা। শুধু হয়ে গেল দুই ভাই বোনের মারামারি। চুল ধরে টান দিচ্ছে এই আবার বোতাম ধরে টান দিচ্ছে। ফাঁকে আবার চিমটিও দিচ্ছে। তবে ঝগড়া শেষে আবার কাঁধে মাথা দিয়ে বসে আছে‌। দুজনের কান্ডে মুখ চেপে হাসলো তারা। আয়ানের অপর বাহুতে ইশরা মাথা রাখল। তবে একটা আফসোস হয়েই গেল। বড় ভাইয়ের অভাব। যদি তার একটা ভাই থাকতো, তাহলে এতো খুনসুটি করতে পারত।
থাকুন না একটা ভাই, যে বাবার পরের স্থানটা দখল করে নিবে। যার কাছে সকল আবদার, হাজির হয়ে যায়।

__________________ভাই ছোট হোক কিংবা বড়, আগলে রাখার দায়িত্ব তারই…
প্রতিটি ভাই তার বোনের জন্য ছায়া।
— ইফা 🌿

______________________

আটলান্টিক প্রজারের ঘাট অতিক্রম ছেড়ে আগে আরো আগে। উদ্দেশ্য সেন্টমার্টিন দ্বীপে। সীপের তিন তলায় জায়গা হয়েছে তাদের। যে যার মতো নদী দেখায় ব্যস্ত। কেউ ছবি তুলছে। গাঙচিল ভেসে বেড়াচ্ছে নদীর বুকে। কেউ আবার তাদের খাবার‌ ছুঁয়ে দিতে ব্যস্ত। নাফ নদীর উপর দিয়ে চলাচল করছে সীল। মিয়ানমারের গাছগাছারী দেখা যাচ্ছে এখান থেকে। এতো সুন্দর প্রকৃতির মাঝেও মনটা বিষাদময় তমোনার কাছে। তার প্রিয় মানুষটি যে তার কথা সাথে বলছে না। তিনি স্বজ্ঞনে থাকলে এতো কিছুর প্রয়োজন পড়তো না। তপ্ত নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন তিনি। এদিকে আসার ইচ্ছে ছিলো না তার। কিন্তু ইশরার জন্য তা সম্ভব হয়নি। সে চাইছে না, তার বাবা মাকে ছাড়ে কোথায় যেতে। রৌদ্র জুবায়ের মাথা নড়তে দেখা গেল। জিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজাতে লাগলেন। তমোনা বুঝতে সক্ষম হলো রৌদ্র জুবায়ের এর পানির তৃষ্ণার লেগেছে। তিনি পানির বোতল খুলে সামান্য পানি পান করালেন তাকে। আবার পূর্বের স্থানে রেখে দিলেন। রৌদ্র জুবায়ের এর এমন অবস্থা হওয়ার পর আর হাসতে দেখা যায় নি তাকে। একটু ঝুঁকে বললেন..

— “ক্ষুধা লেখেছে কিছু খাবে?”

মাথা নাড়ালেন তিনি। তার অর্থ তিনি যাবে না। হঠাৎ করেই রংময় হয়ে উঠলেন তমোনা। ফোন বের করে কয়েকটা ছবি তুলে নিল দু’জনের। মানুষটা বাকশক্তি হীন। তাতে কি প্রাণহীন তো নয়। তাকে দিয়েই না-হয় বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিবে। আচ্ছা, তার ভালোবাসার মানুষটি কি আর কখনো আগের মতো স্বাভাবিক হতে পারবে না।

(চলবে.. ইনশাআল্লাহ)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here