অন্যরকম ভালোবাসা ২ -পর্ব ২৪

0
62

#অন্যরকম_ভালোবাসা 💓 [২]
#ইফা_আমহৃদ
পর্ব:: ২৪

পড়ন্ত বিকেল। চারদিকে সূর্যের শেষ বিকেলের উত্তাপ। ইশরা জানালার পাশে বসে শান্ত মনে বাইরে তাকিয়ে আছে। দুপুরের দিকে তার এসে পৌঁছেছে তাদের কাঙ্খিত জায়গায়। ফ্রেস হয়ে লাঞ্চ করে বসে আছে। নদী দেখতে বরাবারই ভালো লাগে তার
আজকেও তার ব্যাতিক্রম নয়। নদীর অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্য ইশরার মনকে ক্লান্তহীন করে তুলেছে। শাওয়ার শেষে বেরিয়ে এলো আয়ান। পড়নে তার ছাই রাঙা ট্রাউজার ছাড়া কিছু নেই। গলায় একটা হালকা সবুজ কিংবা টিয়া রঙের টাওয়াল। চুলগুলো কপালে কাছে লেপ্টে রয়েছে। বিন্দু বিন্দু জল কণা জমে আছে উন্নুক্ত বুকে। দেখতে সমুদ্রের তলদেশের মুক্তার মতো লাগছে। আয়ান এগিয়ে গেল ইশরার দিকে। একদম পিছনে বসে পড়ল তার। ইশরার পিঠের সাথে নিজের বুক মেশালো। নড়েচড়ে উঠলো ইশরা। জলকণা গুলো সুতি কাপড় ভেদ করে পিঠের কিছুটা অংশ ভিজিয়ে তুলেছে ইশরার। মৃদু লজ্জার্থ হাসলো সে। পরক্ষণেই আয়ান তার কাঁধে মুখ গুঁজে দিলো। তার ভেজা খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি গেঁথে গেল ইশরার গলায়। ইশরা হাত রাখল আয়ানের গালে। ভেজা দাড়িগুলোতে হাত ছুঁইয়ে দিয়ে বলল..

— “প্রচন্ড ডিস্টার্ব করছে এই দাঁড়িগুলো।”
আয়ান ইশরার হাতের উপর নিজের হাত রাখল। অধর ছুয়ে দিলো গভীরভাবে। বলল..

–” তাই বুঝি? আজকেই লাগছে? আগে যখন আরো কাছে এসেছিলাম তখন লাগে নি। ”

ইশরা আয়ানের এমন ভাবল্যাস বিহীন উত্তর অভিলাস করে নি। ফট করে তাকালো নিজের অতি প্রিয় মানুষটির দিকে। সে নেশাগ্রস্ত দের মতো তার দিকে তাকিয়ে আছে। যেই লোচনে ভাষা ভিন্ন। সাথে সাথে সরিয়ে নিল সে‌। এই ভাষা পড়তে গেলে নিজেকে হারিয়ে যেতে হবে ভালোবাসার গহীনে। নিজেকে ছাড়িয়ে উঠে দাঁড়ালো সে। — “ধ্যাত।”

যাওয়ার জন্য উদ্দেগ হতেই হাত টেনে থামিয়ে দিলো আয়ান। ইশরার কাঁধে দুহাত স্থাপন করে নিল বিনা বাধায়। স্বল্প ঝুঁকে গেল ইশরার দিকে। অধরে অধরে ছুঁই ছুঁই করে বলল..

— “ইশু, এই ইশুপাখি। আমার কাছে এতো লজ্জা পাও কেন? তোমার প্রতিটি লজ্জা পাওয়া কথাগুলো আমার বুকে তীরের মতো বিঁধে। ক্ষতবিক্ষত করে তুলে। মনে হয় হারিয়ে যাই তোমার গহীনে।”

বলেই নিজের অধর কামড়ে ধরলো ইশরার। ইশরা ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো আয়ানকে। ওষ্ঠ জ্বলছে। ঘসতে ঘসতে বলল..– “ইস্। হয়তো কেটেই গেছে।”
আরেকটু এগিয়ে এলো আয়ান। ঝুঁকলো তার দিকে। ফলস্রুতিস্বরুপ ইশরার নিচের দিকে ঝুঁকে গেল। ফিসফিসিয়ে বলল..

— “তৈরি হও, ঘুরতে যাবো। আজ তোমাকে নিয়ে সারারাত আমি নামক স্থানে থাকবো। যেটা বর্তমানে শুধু আমার।”

আয়ান বেলকেনিতে গিয়ে দাঁড়ালো। ইশরা এখনো নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মুখটা পানসে হয়ে আসছে। তিতগুটে ঢেকুর আসছে ভেতর থেকে। সাথে সাথে দুহাত ঠেকালো মুখে। দৌড়ে ছুটল ওয়াশরুমের দিকে। বমি হলো না। বিরাগী হয়ে উঠলো ইশরা। ইদানীং কিছুদিন যাবৎ তার সাথে ক্রমাগত এমন কিছু হয়ে চলেছে। এই ভেতর থেকে ঠেলে আসছে কিন্তু বমি হচ্ছে না। মাথাটা ঝিম দিয়ে থাকে। শরীরটাও অস্তির হয়ে থাকে।
.
.
সূর্য ডুবে গেছে বেশ কিছুক্ষণ পূর্বে। তার রক্তিম আভা গুলো আকাশের বুকে বিদ্যমান রয়েছে। সমুদ্রের পানির মাঝে তার প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠেছে। হাতের ভাঁজে জুতো গুলো বন্দী। একটা মস্ত ঢেউ এসে ইশরার পায়ের পাতা স্পর্শ করে চলেছে আর সে অজানা কারণে খিলখিলিয়ে হেসে উঠছে। মন মুগ্ধকর সেই হাসির শব্দ। আয়ান বক্ষে হাত রেখে ইশরার ভঙ্গিমা দেখে চলেছে। চারদিকে পর্যটক কারীটা আড়চোখে ইশরার দিকে তাকাচ্ছে। যেটা মোটেও ভালো লাগছে না তার। নিজের পড়নের উপরের শার্ট খুলে ইশরার গায়ে জড়িয়ে দিলো। ঢেউএর মাঝে লাফ ঝাঁপ করার কারণে আংশিক ভিজা সে। সমুদ্রের তীরে ইশরার হাত ধরে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল..

— “ইশু, রিসোর্টে ফিরে চলো।”

— “প্লীজ আয়ান আরেকটু থাকি!”

— “এখানে দাঁড়িয়ে পানিতে ভিজে ভিজে ছেলেদের মজা দিতে খুব লাগছে বুঝি। যদি এতো ভালো লাগে তাহলে এখানে মজা না দিয়ে ওদের সাথে রুমে চলে যাও।”

হাসৌজ্জ্বল মুখটা নিমিষেই ফেকাসে হয়ে উঠলো। অশ্রুতে পূর্ণ হলো আঁখি জোড়া। কিভাবে আয়ান পারলো নিজের বউকে অন্য ছেলের সাথে মিশিয়ে এভাবে কথা বলতে। ইশরার মন খারাপ পাত্তা দিলো না আয়ান নিস্তেজ হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে সাইকেলের দিকে এগিয়ে গেল। আসার সময় সাইকেল ভাড়া করে নিয়ে এসেছে সে।

ইশরাকে আয়ানের সামনে বসাতে চাইলে জেদ করে পেছনে গিয়ে বসলো সে। সাইকেল ধরে নিজেকে ব্যালেজ করে নিল। সে আয়ানের সাথে একটুও কথা বলবে না।
_________________
জনশূন্য হীন নির্জন দ্বীপের এক প্রান্তে বসে আছে দুজন মানব। কারো মুখে কোনো কথা নেই। একজন অন্যজনের উপর অভিমানের ডালা পূর্ণ করে বসে আছে আরেকজন অভিমান ভাঙাতে ব্যস্ত। সামনেই ধাউ ধাউ করে অগ্নিশিখা জ্বলছে। তার পাশের ছোট একটা কুড়েঘড়। মৃদু মৃদু কুয়াশা জমে আছে শূন্যতায়। অদৃশ্যতায় দেখা যাচ্ছে না দুরের আবহাওয়া। আয়ান ইশরার পাশে বসে পড়লো। ইশরা তেতে উঠল এবার..

— “কেন? কেন এসেছেন আমার কাছে? আমাকে তো অন্য ছেলের কাছে ছিঃ। আপনার ভাবনা এতোটা নিচ। কবে জানি টাকা লোভে, অন্য কারো কাছে বিক্রি করতেও দ্বিধা বোধ করবেন না।”

ইশরার মনে অন্য আশঙ্কা দানা বেঁধে রয়েছে। তখন সমুদ্র পাড়ে দিবার মতো দেখতে একটা মেয়েকে দেখেছে। একদম সেই মুখ, সেই কথা বলার ধরণ, সেই স্টাইল, পড়নে সেই আধুনিক জামা। আয়ান সেই মেয়েটাকে দিবা মনে করেনি তো? ফিরে যাবে না তো তার কাছে। যদি তেমন কিছু হয়, তাহলে এই সামান্য কিছুদিনের জীবনটা বিসর্জন দিবে সে। এই জীবনে আর কখনো আয়ানকে সে অন্যকারো পাশে সহ্য করতে পারবে না।
পুনরায় বিরাজমান রইলো দুজনের পিনপিনে নিরবতা। আয়ান এগিয়ে গিয়ে আগুনের শিখা নিভিয়ে দিলো। অন্ধকারে আবৃত হয়ে গেল জায়গাটা। ভয়ে জড়সড় হয়ে গেল ইশরা। তার পড়নে এখনো আয়ানের শার্টটা। সেটাকে পেঁচিয়ে ধরে রইলো। অন্যহাতে হাতরাতে লাগল আয়ানকে। হাতটা আয়ানকে স্পর্শ করতে দুহাতে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো তাকে। মিশে গেল আয়ানের সাথে। আয়ান সরিয়ে নিল নিজেকে। বলতে শুরু করল..

— “দেখেছো ইশরা, তুমি যতোই আমাকে লোভী বলো। তোমার সাথে খারাপ ভাষায় কথা বলি। কিন্তু দিন শেষে এই হৃদয়হীন, লোভী মানুষটিকে তুমি সবচেয়ে বেলী ভালোবাসো, বিশ্বাস করো। তোমার কাছে স্বাভাবিক মনে হলেও এটাই সত্য, আমি কখনো তোমাকে ঠকাবো না। তাহলে..

— “স্যরি, আসলে আমি নিজেকে তুমি ছাড়া অন্যকারো সাথে মেলাতে পারি না তাই..

আর বলার প্রয়োজন হলো। কারণ পরের বাক্যগুলো মুখে প্রকাশ না করলেও মনের কোণে উঁকি দিয়েছে। আর সেটা বিশ্বাস আর ভালোবাসা।

কেটে গেল বেশ কিছুক্ষণ। মিটে গেল দুজনকার মাঝের ভুল বোঝাবুঝি। কৃত্রিম আলোর নেই। অর্ধ চাঁদের আলোয় মনের ভাব আদান প্রদান করে চলেছে তারা। নিরবতা ভেঙ্গে মুখ খুললো ইশরা..

— “আয়ান তুমি তো বলেছিলে, আমাকে স্পেশাল জায়গায় নিয়ে আসবে। সেটা একান্ত তোমার! কোথায় সেই জায়গা।”

— “কেন ইশুপাখি? এই জায়গাটা তোমার পছন্দ হচ্ছে না বুঝি। এটা তো তোমার স্বপ্নে জায়গা ছিল।”

চরম অবাক হলো ইশরা। আমতা আমতা করে বলল..
আমার স্বপ্নের জায়গা!

— “তোমাকে তো পুরোটা বলা হয়নি ইশুপাখি! আমি যখন মায়ের গর্ভে ছিলাম তখন এই জমিটা লিচে নেওয়া হয়েছে। একদম ৯৯ বছরের জন্য। মায়ের মন খারাপ হলেই সে এখানে আসে কিছুদিনের জন্য। আর এইযে কুঁড়েঘর দেখছো, এটা মায়ের ইচ্ছেতে হয়েছে। শহরের ইট, পাথরের আবরন থেকে বেরিয়ে এই কুঁড়েঘরে তিনি শান্তি পায়।
এইবার ভেবে দেখো, যে মা আমাকে এই অসাধারণ জায়গা উপহার দিয়েছে। আমাকে শুভ্রের সাথে তুলনা করছে। আমি কেন মায়ের কাল্পনিক শুভ্রের মতো হতে পারব না। মায়ের কথা শুনে চলতে পারব না। মা, নিজে তোমাকে পছন্দ করে এনেছে। আর আমি জোর করে বিয়ে করেছি। তাকে কি পছন্দটা কিন্তু মায়ের ছিল। তাই তোমাকে ছাড়া আমার পক্ষে কখনো সম্ভব নয়।”

— “যদি আন্টি না চাইতেন, তাহলে আমাকে ছেড়ে দিতি! তাই না।”

অজান্তেই বলে ফেললো সে। ইশরা উত্তরের আশায় চাতক পাখির নিমিত্তে তাকিয়ে রইলো। আয়ানও ভাষা খুঁজে পেল না। বলল..

— “মা কখনো এমন চাইবে না।”
— যদি চাই কখনো?
— “জানি না।”

(চলবে.. ইনশাআল্লাহ)

সামনে পরীক্ষা। কিছুদিন ধরে অনিয়মিত হচ্ছে গল্পটা এবং সামনেও কিছুদিন হতে পারে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here