অন্যরকম ভালোবাসা ২ -পর্ব ২৫

0
55

#অন্যরকম_ভালোবাসা 💓 [২]
#ইফা_আমহৃদ
পর্ব:: ২৫

রঙিন আলোয় সেজেছে সেন্টমার্টিন দ্বীপের একটাই বড় অংশ। বিয়ের অনুষ্ঠানে মেতে উঠেছে সকলে। তনয়া দুয়ানের বিয়ের সাথে ইশরা আয়ানের বিয়েও পাকাপোক্ত করা হয়েছে। রৌদ্র জুবায়ের আর তমোনার সম্মতিতে বিয়ের তোরজোর চলেছে তাদের। কিছুক্ষণ পর প্রায় রাত আটটার দিকে শুরু হবে হলুদ সন্ধ্যায় উৎসব। প্রায় কিছুদিন ধরে একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন ইশরা আয়ান। ইশরার বর্তমান স্থান তনয়ার সাথে একই ঘরে।
সাধারণ সাজে প্রস্তুত দুজনে। তনয়া বসে বসে ফোন স্ক্রুল করছে আর ইশরা ওয়াশরুমে আছে। তট জলদি কেউ ঘরে ডুকে দরজা বন্ধ করে দিল। তনয়া প্রচুর চমকালো। আয়ানকে দেখে ভ্রু কুঁচকালো সে। ফোনটা পাশে রেখে ভ্রু নাচিয়ে বলল..– “তুই এখানে ভাইয়া! ব্যাপার কি?”

— “ব্যাপার-টা তোর বুদ্ধিহীন মাথায় ঢুকবে না। তাড়াতাড়ি বেরু ঘর থেকে, আমার অতীব গুরুত্বপূর্ণ কাজ কাছে?”

তনয়া বাঁকা হাসলো। আয়ানের হাতের ভাঁজে অনেকটা হলুদ অবস্থান করছে। যার থেকে হলুদের পানি মেঝেতে চুইসে চুইসে পড়ছে। ফোন নিয়ে পুনরায় বেডের উপর বসে পড়লো সে। স্ক্রিনে দৃষ্টি বন্ধ করে বলল..– “তোর গুরুত্বপূর্ণ কাজ কী ভাবীকে হলুদ ছুঁয়ানো?”

— “দিনদিন বেশি পেকে যাচ্ছিস। যা বের হ রুম থেকে। ”

তনয়া একহাত বক্ষে গুঁজে অন্যহাত মেলে দিল আয়ানের দিকে। সরু চোখে তাকিয়ে বলল..– “দুই হাজার লাগবে?”
আয়ান বিরাগী হলো। সময় ক্রমাগত ফুরিয়ে আসছে। কোনো ঝামেলায় সে ঝড়াতে চাইছে না। পকেট থেকে পাঁচশত টাকার নোট বের করে তনয়ার দিকে এগিয়ে দিলো। ভাব দেখিয়ে টাকাটা নিতে গিয়েও নিলো না তনয়া। চুল ঠিক করতে করতে বলল..
— “পাঁচ হাজার লাগবে?”

— “মানে!”

অবাকের সুরে বলল আয়ান। ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বলল..– “দুই হাজার টাকার এক টাকা কম দিলে, আস্তে আস্তে টাকার পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে।”

— “আমার বউয়ের সাথে দেখা করতে আসছি, আর তুই আমার থেকে টাকা নিচ্ছিস।”

— “তাতে কি? এখন তোর বউ নেই। এখন তোর হবু বউ। হতেও পারে না হতে পারে।”

আয়ান ভালোভাবে বুঝতে সক্ষম হয়েছে, তনয়ার সাথে টাকা নিয়ে কথা বাড়ালে সময় নষ্ট ছাড়া কিছু হবে না। পকেট থেকে মানিব্যাগ টা বের করে তনয়ার হাতে দিয়ে দিল। কপাট রাগ দেখিয়ে বলল..– “এবার তো যেতে পারিস?”

তনয়া গেল না। টাকা গুনতে বসলো। ততক্ষণ সহ্য হলো না আয়ানের। এক প্রকার হাত ধরে টেনে বের করে দিল তনয়াকে। আয়ানের উপস্থিতি যাতে ইশরাত অনুভব করতে না পারে তাই ওয়াশরুমের পাশের দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়ালো আয়ান। বেশ কিছুক্ষণ পর ছিটকিনি খুলে বেরিয়ে এলো ইশরা। সবার প্রথমে নজর বুলিয়ে নিল পুরো রুমে। তনয়া নেই। তট জলদি এগিয়ে গেল দরজায় দিকে। লক করে বেডের উপর গা হেলিয়ে দিল। চুলের সামনের অংশ ভেজা। অর্থাৎ মাথায় পানি দিয়েছে সে। মিনিট পাঁচেক পেরুবার পরেই উঠে বসলো। মেডিসিন বক্স বের করে কয়েকটা মেডিসিন পানি সমেত খেয়ে নিল। মাথাটা পৃথিবী নিয়ে ঘুড়তে। হাঁটার চেষ্টা করতেই পড়ে যেতে নিল সে। তৎক্ষণাৎ আয়ান এসে ধরলো তাকে। কয়েকটা মৃদু শব্দে চপল মারল ইশরার গালে। হতাশাগ্ৰস্থ কন্ঠে বলল..–” ইশু, এই ইশুপাখি। কি হয়েছে তোমার? বলো আমাকে।”
বলেই নিজের সাথে জড়িয়ে নিল ইশরাকে। ইশরা মুরগীর ছানার মতো নেতিয়ে গেল আয়ানের বক্ষপাজরে। আয়ান ইশরাকে শুইয়ে দিলো বেডের উপরে। টাওয়াল দিয়ে ভেজা চুলগুলো মুছিয়ে দিল। ইতিমধ্যে জ্ঞান হারিয়েছে ইশরা। অসহায় হয়ে পড়লো আয়ান। বাইরে হলুদের তোড়জোড় চলছে। এই ব্যাপারটা বাইরে জানাজানি হলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। প্রাথমিক চিকিৎসা চালালো সে। গ্লাসের পানি হাতে ঢেলে ছিটিয়ে ছিটিয়ে ইশরার মুখে দিল। বেষ্টিত ক্লান্তময় নয়নজোড়া খুলে অবলোকন করলো ইশরা। উঠে বসার চেষ্টা করতেই আয়ান দিলো এক ধমক। থেমে গেল সে। শিতল চাওনি দিয়ে বলল..

— “কি হয়েছে তোমার?”

— “তেমন কিছু না।”

— “তেমন কিছু না হলে জ্ঞান হারাবে কেন? হুয়াই?”

— “আসলে কিছুদিন ধরে প্রচন্ড মাথা ব্যাখা করছে। শরীরটা অস্থির অস্থির করছে।”

আয়ানের চোখ মুখ শক্ত হয়ে এলো এবার। দাঁতের সাথে দাঁতের অদ্ভুত ঘর্ষণ সৃষ্টি করে বলল..– “তাহলে এতো দিন কেন বলো নি?”

— “আমি চাইনি কেউ আমার জন্য চিন্তা করুক। তনুর বিয়েতে বিঘ্ন ঘটুক।”

— “হয়েছে তোমার বিঘ্ন। তাহলে চলো হসপিটালে যাবো।”
ইশরাকে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলো আয়ান‌। বাঁধ সাধল ইশরা। হাত ছাড়াতে ছাড়াতে বলল ..– “আয়ান প্লীজ। এখানে হসপিটাল পাবো কোথায়? তাছাড়া এতো আয়োজন। আই প্রমিজ, আমি হলুদে যাবো আর ফিরে আসবো। তবুও..

ক্লান্তময় হাসলো আয়ান। ইশরার গালে হাত রেখে এগিয়ে নিল নিজের দিকে। কপালে কপাল ঠেকিয়ে তৃপ্তিকর শ্বাস ত্যাগ করলো। এই মেয়েটা যে শুধু নিজের কথা না ভেবে অন্যর কথা ভাবে। সেটা বেশ পিড়া দেয় তাকে‌। কেন ভাবে না নিজের কথা। কেন বুঝে না, তার ভালো থাকার সাথে আয়ানের ভালো থাকা মিশে হয়েছে।
হলুদের পুরোটা সময় নিজের সাথে জড়িয়ে রেখেছিলো ইশরার। সবাই মুখ চেপে হেসেছিলো। কিন্তু তাকে পাত্তা দেয় নি আয়ান। তবে ইশরা লজ্জায় কুটিকুটি হয়েছিলো। না পারছিলো আয়ানকে সরাতে, না পারছিলো সবাইকে সত্যটা বলতে। তাই মুখ বুজে মেনে নিয়েছিলো।
__________________
গভীর রাত। ধীরে ধীরে আরো গভীর হয়ে উঠছে। একজোড়া বিয়ে সম্পূর্ণ হয়েছে অনেকক্ষন পূর্বে। বউ সেজে বসে আছে ইশরা। এটা তার জন্য নতুন কোনো বিষয় নয়, তবে নতুন অনুভূতি। এখনো মাথা ঘুরে চলেছে তার। আয়ানকে মিথ্যা বলেছে সে, বলেছে তার মাথা ব্যাথা সেরে গেছে‌। হঠাৎই মনের ভেতরে অন্য অনুভূতির ছোঁয়া খেয়ে গেল। গুগলে সার্চ করে অন্যকিছু জানতে পেরেছে সে। ভারী লেহেঙ্গা স্বল্প উঁচু করে উঠে দাড়ালো। এখানকার স্টাফকে দিয়ে একটা প্রেগনেন্সি কীট আনিয়ে রেখেছে সে। তা নিয়ে ওয়াশরুমে ছুটল।
বেশ কিছুক্ষণ পর লজ্জামাখা মুখ নিয়ে বেরিয়ে এলো সে। সেই মুখের ভেতরে আনন্দের ঢেউ। নয়নজোড়া অম্ভুতে চিকচিক করছে‌। দরজার দিকে অবলোকন করলো সে। নিজের ভেতরে এই খুশিটা একা বইতে পারছে না। কাউকে তার সুখের ভাগ দিতে হবে। একটা খাতা আর কলম নিয়ে কিউট কিউট বেবীদের নাম দেখতে বসলো ইশরা।

অন্ধকারে আবৃত রুমে প্রবেশ করলো আয়ান। অন্ধকার থাকলেও বাইরে থাকা ল্যাম্পপোস্টের আলো রুমের ভেতরে প্রবেশ করছে। সেই আলোতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না ইশরাকে। আরো কয়েক কদম এগিয়ে গেল সে। ইশরাকে অন্ধকারে কিছু লিখতে দেখে ভ্রু কুঁচকালো। যে মেয়ে পরীক্ষা ছাড়া কখনো পড়াশোনা করে না। সেই মেয়ে বাসর ঘরে পড়াশোনা করছে। হাউ ফানি। একটু ঝুঁকে বলল..– “ইশু এতো মন দিয়ে কি লিখছো তুমি?”
আয়ানের বচন গুলো ইশরার কর্ণপথে গেল না। সে নিজের মতো লিখেই চলেছে। আশাহত হলো আয়ান। সে রুমে প্রবেশ করেছে আর ইশরা শুনলোই না। মাথার পাগরীটা খুলে কাবার্ডের উপরে রাখল। দ্রুত পায়ে বেলকেনির দিকে পা বাড়ালো।
বেশ কিছুক্ষণ সময় অতিবাহিত হওয়ার পরে মাথা তুলে তাকালো ইশরা। তার কাজ শেষ। আগে নামগুলো আয়ানকে দেখাবে, তার পছন্দ না হলে আবার নতুন নাম লিখবে। দরজার দিকে দৃষ্টি দিল, ভেতর থেকে দরজা লক করা। বেলকেনিতে দরজা খোলা। নিজেই নিজের মাথায় চপল মারলো। নিজেও বেলকেনির দিকে এগিয়ে গেল। আয়ানের পেছনে দাঁড়িয়ে রইল ইশরা। কিভাবে তাকে জানাবে খুঁজে পাচ্ছেনা সে। অবশেষে ভেতরকার শক্তি সঞ্চয় করে ডাক দিলো,”আয়ান” আয়ান তাকালো না। ইশরার মন খারাপ হয়ে এলো। কাঁপা কাঁপা হাতটা আয়ানের কাঁধ স্পর্শ করতে সরে গেল আয়ান। বেলকেনির ওপর প্রান্তে গিয়ে দাঁড়ালো। ইশরা সেখানেও দিয়ে দাঁড়ালো। আয়ান নিশ্চুপ রইলো তখনও। সরে আসার চেষ্টা করতেই ইশরা আয়ানের বাহু চেপে ধরলো। ইনোসেন্স ফেইস করে বলল..–” কি হয়েছে আয়ান, রেগে আছিস আমার উপর। আমি সত্যিই তখন খেয়াল করি নি। স্যরি।”

— “ইশরা প্লীজ, তোর লেখালেখি শেষ হলে ঘুমিয়ে পড় গিয়ে।”

বলেই আবার হাটা দিল আয়ান। কি হলো জানা নেই ইশরার। আয়ানের ঘড়ি বিহীন বাম হাতটা নিজের পেটের উপর ঠেকালো। অভিমানী সুরে বলল..

— “তুমি যদি আমার উপরে রেগে থাকো, তাহলে আমরা তোমার উপরে রেগে থাকবো।”

ইশরা তখনকার আয়ানের মুখটার দেখার মতো সাহস নেই। তার নয়ন যুগল গ্ৰথণ করে রইলো।

(চলবে.. ইনশাআল্লাহ)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here