অন্যরকম ভালোবাসা ২ -পর্ব ২৬

0
58

#অন্যরকম_ভালোবাসা 💓 [২]
#ইফা_আমহৃদ
পর্ব:: ২৬

অনুভুতি শূন্য হয়ে উঠেছে আয়ান। সবকিছু তাঁর কাছে দুঃস্বপ্ন মনে হচ্ছে। তার চাওয়া সত্যি সত্যি পূর্ণ হতে চলেছে। ভাবতেই শরীর কম্পিত হচ্ছে ক্রমশ। ছোট ছোট একজোড়া হাত তার হাত ধরে হাঁটবে। আধো আধো স্বরে বাবা বলে ডাকবে। স্তব্ধ হয়ে গেছে সে। হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো ইশরার পায়ের কাছে। খানিকটা কাপড় উন্নুক্ত করে তাকিয়ে রইলো সেদিকে। গভীর ভাবে শব্দময় অধর ছুয়ে দিলো সেখানে। কম্পিত কন্ঠ উচ্চারণ করল.. — “আমার অংশ। আমার সংসার। আমার পূর্ণতা।”
ভাঁজ করা পা সমান করে উঠে দাড়ালো। একদম ইশরার মুখোমুখি। নিজের শব্দহীন কন্ঠে বলল..
— “সত্যি! সত্যি ইশু! আমি সত্যি বাবা হবো। তুমি মজা করছো না-তো?”

ইশরা আয়ানের দুহাত মুঠোয় পুড়ে নিল। এই প্রথম অনুভূতিটা সত্যি অসাধারণ। ইশরারও প্রথমে মেনে নিতে কষ্ট হয়েছিল, তার এই পুচকি পেটের ভেতরে একটা ছোট প্রান বেড়ে উঠছে।
আয়ানের গাল টেনে মৃদু হেসে বলল..– “হ্যাঁ আয়ান। তুমি বাবা হতে চলেছো! ভালোবাসার একটা বড় অংশ পেতে চলেছি আমরা।”
আয়ান ক্লান্তিমাখা চোখে তাকিয়ে রইলো ইশরার মুখপানে।‌ যেন আয়ান নামক কোনো জীবন্ত পাথর ইশরার সামনে অবস্থান করছে। সবটা বোধগম্য হতেই ইশরাকে দৃঢ় ভালোবাসার বান্ধনে মুড়িয়ে নিল বাহুডোরে। সেখান থেকে মাথা না তুলেই বললো..
— “ইশু তুমি জানো না, তুমি আমাকে কি উপহার দিচ্ছো? একটা ইরেকটাইল ডিসফাংশন রোগীর কাছে এটা কোনো বড় পাওয়া তুমি জানো না। আমি সক্ষম ইশরা। তাছাড়া প্রথমবার কোনো পিতা বাসর ঘরে জানতে পারছে, সে বাবা হতে চলেছে। বিশ্বাস করো আমি পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি খুশি।”

পরক্ষণেই অন্য উপায়ে নিজের ভেতরের অনুভূতি প্রকাশ করলো সে। ইশরাকে শূন্যতায় তুলে ঘুরাতে শুরু করলো। রুমে এসে থামলো না। ইশরা মাথায় হাতে দিয়ে মৃদু কন্ঠে বলল..– “আয়ান অনেক হয়েছে, এবার নামা। মাথা ঘুড়াচ্ছে আমার।”

আয়ানের কর্ণপথে ইশরার কাতর কন্ঠস্বর পৌঁছাতেই ছেড়ে দিল। বেডের উপর বসিয়ে দিল। অসহায় কন্ঠে বলল..

— “স্যরি, আসলে খুশি আত্মহারা হয়ে গেছিলাম। বেশি ঘুড়াচ্ছে। এটা কোন ধরনের সেটাই বুঝতে পারছি না। সময় নেই, সারাদিন মাথা ঘুড়াচ্ছে।”

আয়ানের শার্টের কর্লার টেনে নিজের কাছে নিয়ে এলো। ফিসফিসিয়ে বলল..

— “এটা প্রিন্সেস আসার লক্ষ্য।”
মুখ ভার করে রইলো। ভেংচি কেটে বলল..– “প্রিন্স আসবে। একদম কিউট।”

— “আমার বেবী তাই আমি বলছি, প্রিন্সেস আসবে।”

শুরু হয়ে গেল দুজনের ঝগড়া। চেঁচামেচির শব্দ দরজার বাইরে থেকেও শোনা যাবে এমন অবস্থা। ইশরা অভিমানী হয়ে মুখ ভার করে বসে রইল। আয়ান চুলগুলো পেছনে হেলিয়ে দিয়ে আদুরে গলায় বলল..

— “ছেলে হোক কিংবা মেয়ে, আল্লাহ খুশি হয়ে যা দিবে তাতেই আমরা খুশী। তবে আমার বিশ্বাস প্রিন্সেস আসবে। ”

ইশরা আয়ানের কথণে প্রথমে খুশি হলেও পরক্ষনে মুখ ভার করে রইলো। শুরু হয়ে গেল পূর্বের ন্যায় মারামারি।
________________
কেটে গেছে কয়েকটা মাস। ধীরে ধীরে পরিবর্তন হয়েছে সবকিছু। আগের তুলনায় অনেকটাই বেড়ে গেছে ইশরার পেট। তা নিয়ে প্রায় প্রায়ই মন খারাপ করে থাকে ইশরা। তার অবান্তর ধারণা মোটা হওয়ার কারণে তার প্রতি আয়ানের ভালোবাসার ফাটল ধরেছে। তবে আয়ান ইশরার মন খারাপ দূর করে দেয়।
বিছানার মাঝ বরাবর ঘুমিয়ে আছে ইশরা। কাল অনেক রাত করে ঘুমিয়ে সে। টেবিলের উপরে বই। আয়ান অফিসের জন্য তৈরি হচ্ছে। ইতিমধ্যে অনেক বেলা হয়ে গেছে। ইশরাকে ডাক দিলো না। সে চাইছে না কিন্তু ইশরার ঘুম ভাঙুক। কিছুদিন পরে পরীক্ষা। পরীক্ষা বাদ দিয়ে বেবীর চিন্তা করলে শুধু একটা বছর নষ্ট হবে‌। তাছাড়া পরে বেবী জন্ম নিলে চিন্তা করার বদলে আরো বাড়তে থাকবে, পড়ার সময় হয়ে উঠবে না।

এগিয়ে গেল আয়ান। ইশরার খোলা এলোমেলো চুলের ভাঁজে ছুঁয়ে দিলো। ব্লাঙ্কেটটা বুক পর্যন্ত টেনে দিল। স্মিত হেসে বলল..– “আর মাত্র কয়েকটা দিন। তারপরে আমি আমার প্রিন্সেস এর কাছে থাকবো।”
থেমে থাকা পায়ের গতি বাড়িয়ে দিয়ে বেরিয়ে যেতে উদ্দেগ হতেই হাত ধরে টান দিলো ইশরা। ঘুম ঘুম নিভু নিভু চোখে তাকিয়ে ক্লান্তিমাখা হাঁসি হাসলো। বলল..

— “তুমি অফিসে যাচ্ছো, আমাকে কেন ডাক দিলে না?”
— “এখন তুমি একা নয় ইশুপাখি! দুইজন। তাই সবকিছুই একটু বেশি করতে হবে।”

— “তাই বলে তুমি টাই ছাড়া যাবে?”

কদাচিৎ হাসলো আয়ান। সাদা শার্টের সাথে কোনো টাই নেই। এই দায়িত্বটা শুধু ইশরার। যেদিন ইশরা জেগে থাকে সেদিন টাই বেঁধে যায়। বাকি দিনগুলোতে টাই বিহীন যাতাযাত করে। কাবার্ড থেকে ইশরার পছন্দ সই টাই এনে দিলো আয়ান। ইশরা বেডের কোণে হেলান দিয়ে বসলো। স্বযত্নে আয়ানের গলায় টাই বেঁধে দিল। আয়ানের ললাটে উষ্ণ ভালোবাসা পরশ লাগিয়ে দিলো। ব্যাগটা নিতে চাইলেই বাঁধ সাধল আয়ান। আবেগীয় কন্ঠে বলল..– “টেবিলের উপর রাখার আছে, খেয়ে নিও। নিজের আর প্রিন্সেসের যত্ন নিও।”
— “আমিও তোমার ফেরার অপেক্ষায় থাকবো।” তাড়াতাড়ি এসো..

ইশরার বাক্য ধ্বনি শেষ হওয়ার আগেই রুম প্রস্থান করলো আয়ান। আয়ানের যাওয়ার দিকে থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে টেবিলে নিবদ্ধ করলো। একটা প্লেট উবুত করে আরেকটা খাবারের প্লেট ঢেকে রেখেছে।
______________
সূর্যের কিরণ অনেকটা হেলে পড়েছে পশ্চিমে। সূর্যের শেষ রশ্মি শক্তিহীন দূর্বল হয়ে পড়েছে। রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে। পাখিরা নিজের যাত্রা শুরু করেছে বাসায় ফেরার উদ্দেশ্য। আকাশে চাঁদের কিছুটা অংশ দেখা যাচ্ছে। পাখিদের সাথে যোগ দিয়ে সূর্যকে বিদায় দিয়ে রুমে ফিরবে ইশরা। তনয়া এসেছে বাড়িতে। একা একা চলাচল করা সম্ভব হচ্ছে না তার পক্ষে। ৬ মাসের উঁচু পেট নিয়ে কোনো প্রকার ঝুঁকি নেওয়া সম্ভব নয়।
কেটে গেল আরো কিছুক্ষণ সময়। সন্ধ্যার আকাশে সূর্য অনুপস্থিত। লাল রঙের আভার সাথে এক খন্ড মেঘ রয়েছে তাকে সঙ্গ দিতে। চারদিকে আযান পড়ে গেছে। তাই অপেক্ষা করার মতো সময় নেই তার কাছে। পেটে হাত দিয়ে তনয়াকে বলল..

— “আযান পড়েছে। চলো নিচে যাই।”
— “স্যরি ভাবী। আমার খেয়াল ছিলো না। ভাইয়া এসে নির্ঘাত আমাকে বকবে।”
তনয়া এগিয়ে এলো। ইশরার হাত ধরে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলো। অজু করে নামাজ আদায় করে নিলো ইশরা। জায়নামাজ ভাঁজ করে রাখল। কিছুক্ষণ রুমের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পায়চারী করলো। কিছুই ভালো লাগছে না তার। ইতোহস্ত বোধ করে আয়ানের নাম্বারে ফোন করলো। রিসিভ হলো না। সময় কাটানোর জন্য অনলাইন থেকে কয়েকটা বেবীর ছবি ডাউনলোড করে দেখতে লাগল। বেবীটার মুখে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল..

— “আমার প্রিন্সেসটা কবে আসবে। আচ্ছা এতো কিউট হবে তো?”

আয়নার সামনে দাঁড়ালো কিছুক্ষণ। পেটে হাত রেখে বলল..– “প্রিন্সেস, আমার এতোবড় একটা জায়গায় থাকতে মোটেও ভালো লাগছে না। তোমার এই ছোট পেটে থাকতে কষ্ট হচ্ছে না তো?”
নড়েচড়ে উঠলো আয়ান ইশরার ছোট প্রিন্সেস। খুশিতে খিলখিলিয়ে উঠল ইশরা। মুখ ফুলিয়ে শুয়ে পড়লো সে। ফোনে সাতটা ত্রিশে এলার্ম দিয়ে পাড়ি জমালো ঘুমের দেশে।
নিদ্রা ভঙ্গ হলো রাত নয়টার দিকে। নিজের কাছে অতি পরিচিত মানুষকে অনুভব করে ভঙ্গ হয়েছে। পাশে তাকাতেই মস্ত বড় একটা টেডি নজরে এলো তার। টেডির একহাত তার ঢিলেঢালা ফ্রোক বেধ করে উন্নুক্ত পেটে অবস্থান করছে। ইশরার কাছে টেডিটাকে কোনো প্রাণহীন বস্তু লাগছে না। বরং ‌রক্ত মাংসে গড়া মানব লাগছে। ধীরে ধীরে উঠে বসলো সে। টেডিটার গাল টেনে দিলো। নাকের ডগায় নিজের নাক ঘসে দিলো। টেডিটাকে পেয়ে খুশিতে এতোটাই আত্মহারা যে কে টেডিটাকে দিলো, সেটাই ভুলে গেল।

(চলবে.. ইনশাআল্লাহ)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here