অন্যরকম ভালোবাসা ২ -পর্ব ২৮

0
70

#অন্যরকম_ভালোবাসা 💓[২]
#ইফা_আমহৃদ
পর্ব:: ২৮

চারিদিকে রোদের উত্তাপ ক্রমশ বাড়ছে। সময়টা চৈত্র মাসের শেষের দিকে। তার মধ্যে বিরাজ করে ভিড় ভাট্টা। ভিড় দেশের একটা নিত্তদিনের সমস্যা হলেও ভিড়টা মোটেও তেমন নয়। ফাইনাল ইয়ারে পরীক্ষা। আয়ান আর ইশরা পরীক্ষায় অংশ নিতে এসেছে। মেইন প্রবেশদ্বারের বাইরে এমন ভিড় পরিলক্ষিত হচ্ছে। ইশরার পেট বেশ ফুলে উঠেছে। সাত মাসের সময় ফুলে ওঠা অস্বাভাবিক কিছু নয়। প্রয়োজনীয় জিনিস পত্র দিয়ে নিজের উঁচু পেট টা ঢেকে নিল ইশরা। তবুও চারদিকের লোকজন কেমন বাঁকা চোখে তার দিকে অবলোকন করছে। সেই দৃষ্টিতে বিরাগী ইশরা। শুধু লোকদের উপর সে বিরক্ত নয়, আয়ানের উপরও। এতো উঁচু পেট নিয়ে কিছুতেই সে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করবে না। কিন্তু তার কথনগুলোকে তোয়াক্কা করলো না আয়ান। ইশরা ফোঁস করে দম ছাড়লো। সে এখন আয়ানের বাহুডোরে। ভিড় ঠেলে ঠুলে ভেতরে এগিয়ে গেল আয়ান। মনুষ্যত্ব হীন মানসিকতার মানুষের মাঝে জ্ঞান বিচক্ষণ মানুষ গুলোও রয়েছে। তারা সরে দাঁড়ালো সামনে পথ থেকে। ঢিলেঢালা পথ দিয়ে নিমিষেই অতিক্রম করতে পারবে সেই পথ।
ফাঁকা ভার্সিটির মাঝে ইশরা আয়ানকে অনায়াসেই প্রবেশ করার অনুমতি প্রদান করা হলো। ইশরাকে বসিয়ে দিল তার কাঙ্খিত জায়গায়। আয়ানের সিট অন্যক্লাসে। প্রয়োজনীয় পানিসহ জিনিসপত্র ইশরার কাছে দিয়ে নিজের আসন গ্ৰহন করলো আয়ান।

ঘড়ির কাঁটা তখন পরীক্ষার মাঝামাঝি সময়ে অবস্থান করছে। প্রথমে ভালোভাবে পরীক্ষা দিতে পারলেও পরে ব্যর্থ হলো ইশরা। শরীরটা খারাপ লাগছে তার। ভেতরটা অস্থির অস্থির লাগছে। ইশরাল অবস্থা উন্নতির চেয়ে অবনতি লক্ষ্য করা গেল। খবর পৌঁছে দেওয়া হলো আয়ানের নিকট। ইশরার এমন অস্থিরতার সংবাদ আয়ানের কাছে পৌঁছাতেই পরীক্ষা ফেলে ছুটে এলো সে। ব্যাগ থেকে দুটো ট্যাবলেট আর পানির বোতল বের করে ইশরাকে খাইয়ে দিলো।

মাঝখানে কেটে গেল অনেকটা সময়। আয়ানের বুকে মাথা রেখে কলম চালাচ্ছে ইশরা। অনুগ্রহ হলো পরীক্ষায় অর্ধায়নরত প্রোফেসরের। ইশরা আয়ানের ভালোবাসা দেখে মুগ্ধ হলেন তিনি। আয়ানের পরীক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করে দিলেন ইশরার ক্লাসে।

সবই ভালোই চলছিলো। ধীরে ধীরে সময় অতিবাহিত হয়ে পরীক্ষা শেষ হলো। তবে বিপত্তি ঘটল অন্য জায়গায়। পরীক্ষার হল থেকে বেরিয়ে হসপিটালের যাওয়ার উদ্দেগ হলো তারা। ইশরার অস্থিরতা না জানা পর্যন্ত শান্তি নেই আয়ানের। সাথে ড্রাইভার নিয়ে এসেছিল। গাড়ি বেরিয়ে যাওয়ার পূর্ব মুহুর্তে গ্লাসে নক করলো কোনো রমনী। আয়ান কাঁচ খুলে দিলো। ৪২৯ ডিগ্রি বোল্ডের শখ খেল সে। সেই পূর্ব পরিচিত মুখ, কন্ঠস্বর, এটিটিউট, কথা বলার ধরণ। হাতের মাঝে কাঁচের চুড়ি গুলো রিনিক ঝিনিক বাজছে। হাত নাড়িয়ে ক্রমাগত বলে চলেছে..– “আয়ান আমার কথাগুলো শোন তুমি!”
আয়ানের একবার দৃষ্টি গোচর হতেই নয়নজোড়া সরিয়ে নিল। কাঁচ বন্ধ করে দিল। বিনিময়ে কাঁচে আঘাত করলো। অসন্তুষ্ট হয়ে পুনরায় কাঁচ নামিয়ে বলল..

— “কি চাই এখানে?”

— “আমাকে একটু লিফট দিবে আয়ান? প্রচন্ড দরকারী।”

আয়ান সামনের দিকে ঝুঁকে দরজা খুলে দিলেন। ধন্যবাদ জানিয়ে ভেতরে ঢুকলো দিবা। একসময় এই গাড়িতে দিবা যা ইচ্ছে তাই করতো আর আজ ঢুকতে পার্মিশন নিতে হচ্ছে। এটাই হয়তো নিয়তি।

দিবা ফন্ট সিটে বসলো। পেছনে ইশরার দিকে একবার নজর বুলিয়ে নিল। কিছুক্ষণ পেটের দিকে তাকিয়ে থেকে দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করলো। হয়তো এটাই নিয়তি, আজ ইশরার জায়গায় তার থাকার কথা ছিল।

গাড়ির গতি বাড়তে শুরু করলো ধীরে ধীরে লাগল। একসময় গাড়ি থেকে নেমে গেল দিবা। কিন্তু আয়ান ইশরার মাঝে তৃতীয় ব্যাক্তিটি গেল না। প্রায় প্রায়ই তাদের মাঝে কারণে অকারণে ঝগড়া হতো। অভিমান করতো ইশরা। আয়ান তাকে বকতো আবার তার অভিমান ভাঙিয়ে দিতো। দিনগুলো ভালোই চলছিল। ইশরার তখন নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলো। মন খারাপ করে বসে ছিল ইশরা। আয়ানের কাছে তার ছোট আবদার ছিলো, আজকে বাইরে ঘুড়তে যাওয়ার। কিন্তু ছোট আবদার টা অপূর্ণ রেখে অফিসের কাজে চলে গেছে আয়ান। তাই নিজের অবুঝ মনের দায়িত্ব নিজেই নিয়েছে ইশরা।
নদীর তীরে পাঁচ ফুট প্রশস্ত ব্রিজ অবস্থিত। সেই ব্রিজের মাঝখান দিয়ে হেঁটে চলেছে ইশরা। শীতের হাওয়া গুলো আঁচড়ে পড়ছে শরীরে। জায়গাটা মোটামুটি নিরিবিলি। মনে খারাপের সময় নিরিবিলি পরিবেশ বেশ ভালো লাগে তার। হাতে গোল আলুর চিপস্। আসার সময় ফুটপাত থেকে কিনে এনেছে। অনেক দিন পর খেতে বড্ড ইচ্ছে করল তার। ব্রিজের রেলিং এ হাত রেখে নদীর দিকে মুখ করে দাঁড়ালো ইশরা। বড় বড় লঞ্চ, ইস্টিমার যাচ্ছে বিধায় ঢেউ খেলে যাচ্ছে। তার এই ভাবনার পথে চোখ আটকে গেল নির্জন গাছের ঝোপঝাড়ে। পেছন থেকে একটি ছেলেকে একদম আয়ানের মতো লাগছে। আয়ানের এখানে আসার কারণ বুঝতে ব্যর্থ হলো সে। কয়েক কদম এগিয়ে গেল সেদিকে। এবার সিউর হলো ছেলেটি আর কেউ নয় আয়ান। এক মুহুর্তের জন্য হাঁসি ফুটলেও মিলিয়ে গেল পরক্ষণে। তার পাশে লাল জামা পরিহিতা একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আরো কিছুটা এগিয়ে যেতেই অভিমানে জমানো পাহাড়-টা শিলায় পরিনত হলো। ব্যালেজ হারিয়ে গেল শরীরের। পাশের সবুজ শেওলা জন্মানো গাছটি ধরে সামলে নিল। বিনিময়ে হাত থেকে খসে পড়লো পার্সব্যাগটা। মৃদু শব্দে ধ্যান ভাঙল দুজনের। ফিরে চাইলো ইশরার দিকে। এমন নির্জন জায়গায় ইশরাকে অনুমান করতে পারে নি আয়ান। আয়ানের অবাক চাওনিতে দূর্বল হাসলো ইশরা। নয়নজোড়া তখন ছলছল করছে। কাতর কন্ঠস্বর নিয়ে বলল..

— “স্যরি, আমি জানতাম না, এখানে তোমরা আছো। তাহলে ভুলেও এদিকটায় আসতাম না।”

উল্টো হাঁটা ধরলো ইশরা। পা দুটো বরফের কাঁচার মতো ঠেকছে ইশরার কাছে। যাকে গতিশীল করে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সম্ভব হচ্ছে না তার দ্বারা। তবুও কিছুটা দূরে গেল। আয়ান ছুটল ইশরার পিছুপিছু। ইশরার শক্তিহীন হাতটা ধরে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলো। কিন্তু থামলো না ইশরা, ধীরে ধীরে সামনের দিকে এগিয়ে গেল। এবার নিজের কৌতুহল দমিয়ে রাখতে প্রশ্ন ছুঁড়ল আয়ান..

— “ইশু কি হয়েছে তোমার? এই অবস্থায় এখানে কি করছো তুমি?”

— “এমনিই এসেছিলাম। আগেই তো স্যরি বলেছি আয়ান।”

— “কি সব বলছো তুমি ইশু? তুমি যেটা মিন করছো, আমি তেমন কিছু বুঝাতে চাইনি‌। আমি বোঝাতে চাইছি, এই অবস্থায় তুমি বাড়ি থেকে কেন বের হয়েছো? যদি কিছু হয়ে যেত?”

তাচ্ছিল্যের হাসলো ইশরা। কষ্টগুলো চাপা রেখে বলল..
— “আমার কিছু হলে তোমার কোনো যায় আদোও আসতো আয়ান? বরংচ খুশি হতে তুমি। আচ্ছা বলো তো, আয়রাকে জন্ম দিতে চেয়ে কি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অপরাধ করে ফেলেছি?”

— “কিসব বলছো তুমি ইশু?”

— “মিথ্যা বলছি বুঝি? তাহলে কোথায় গেল তোমার সেই কেয়ারিং গুলো? কেন আমার উপর দয়া করছো? এই মেয়েটাকে বিয়ে করে নিলেই পারতে। শুধু শুধু কেন রক্ষ..

আর উচ্চারণ করতে পারল না ইশরা। ভুবন ভোলানো চড় পড়লো ইশরার গালে। অধর কামড়ে ধরলো ইশরা
হয়তো এটাই তার প্রাপ্ত। পরক্ষণেই দৃঢ় বাঁধনে মুড়িয়ে নিল আয়ান। উঁচু পেটে কারণে পুরোপুরি পারল না, তবে যতোটা সম্ভব হয়েছে ঠিক ততোটা। মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। কাঁধে বিন্দু বিন্দু জলকণা পড়তেই হুস ফিরলো আয়ানের। ইশরাকে ছাড়ল। নয়নজোড়া মুছিয়ে দিল। আদুরে গলায় বলল..

— স্যরি ইশুপাখি, আম স্যরি। এভাবে প্লীজ বলো না। আমি সহ্য করতে পারি না। আমার কাছে তুমিই সব।

ছাড়িয়ে নিল ইশরা। বলল..

— “হয়তো কখনো বাসতে, তবে তোমার প্রতি আমার কোনো অভিযোগ নেই। তবে পাহাড় সমান অভিমান রয়েছে। যেগুলো বোঝার ক্ষমতা তোমার নেই।
বলতে পারবে, পরীক্ষার পর কবে তোমার সাথে মন খুলে কথা হয়েছিলো। কবে একটু সময় দিয়েছিলে আমাকে? গভীর রাতে বাড়িতে ফিরতে। আমার মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিতে। খাবার খাইয়ে দিয়ে ঘুমাতে বলতে। সকালে ঘুম থেকে জাগার পর তোমাকে আর কোথাও দেখতাম না আয়ান, টেবিলের উপর খাবার সাজানো থাকতো। নিজের কাজ সেরে দুপুরে আন্টি এসে খাবার দিয়ে যেত, আয়রার কথা ভেবে খেয়ে নিতাম। তার সাথে তেমন কথা হতো না। বাবা অসুস্থ তার সেবা করতে করতে মায়ের কথা বলার সময় হয়ে উঠে না। মাঝে হয় সপ্তাহে একবার। কোথাও ঘুড়তে নিয়ে যেতে চাইতে না। এভাবে একাকিত্বে কাটত দিনগুলো। তোমাকে বাধ্য করা কেয়ারিং গুলোতে বিরক্ত হয়ে গেছিলাম। খেয়ে দেয়ে চুপ করে শুয়ে থাকতাম। কিন্তু ঘুমাতাম না, অভিনয় করতাম। কিন্তু তুমি বুঝতে না। অভিনয় করতে করতে ঘুমিয়ে পড়তাম। বালিশ ভিজে যেত আমার। ঘরের বাইরে বেরুনো বন্ধ। আমার জীবনটা একটা জেলখানার সমান হয়ে গেছে।

(চলবে.. ইনশাআল্লাহ)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here