অন্যরকম ভালোবাসা ২ -পর্ব ৩১

0
60

#অন্যরকম_ভালোবাসা 💓 [২]
#ইফা_আমহৃদ
পর্ব::৩১

চারদিকে শান্ত পরিবেশ। আয়রার খুশির সাথে যোগ দিয়েছে প্রকৃতি। যেন তাদের মন-কেও জয় করে নিয়েছে আয়রা। হাতে তার আইসক্রিমের বাটি। সামনেই টেবিল ভর্তি আইসক্রিমে। একটা একটা করে খাচ্ছে সে। সবগুলো এঁটো করে রেখেছে। হাত মুখ ইতিমধ্যে মেখে ফেলেছে। আয়রার অদ্ভুত কান্ড দেখে নিঃশব্দে হাসলো ইশরা। টিস্যু পেপার দিয়ে পরিস্কার করে দিল আয়রার হাত, মুখ। চামচ দিয়ে মুখে পুড়ে দিল। আয়রা খেয়ে জিভ দিয়ে ঠোঁট মুছে নিল। যেন এই খাবারের চেয়ে সুস্বাদু আর কিছু নেই। হয়তোবা নেই, প্রথমবার মায়ের হাতের খাবার বলে কথা। ফট করে নেমে গেল চেয়ার থেকে। লাফ দিয়ে ইশরার কোলে উঠে পড়লো। মায়ের মুখে আইসক্রিম ঢুকিয়ে দিয়ে গলা পেঁচিয়ে ধরে রইলো।
আয়ান হাত টেবিলের উপর রেখে তাতে থুতনি স্থাপন
করলো। ভ্রু কুঁচকে বলল..

— “আমি বুঝি কেউ নই। মাকে পেয়ে প্রিন্সেস তার পাপাকে ভুলে গেছে।”

পুনরায় লাফ দিয়ে ইশরার কোল থেকে নেমে দাঁড়ালো। ছুটে গেল আয়ানের দিকে। আয়ানের কোলে উঠে বসলো। আইসক্রিমের বাটি থেকে এক চামচ তুলে দিলো তার মুখে। টিস্যু পেপার দিয়ে আয়ানের গাল পরিষ্কার করে দিলো। শব্দ করে চুমু দিলো আয়ানের গালে। দাঁত বের করে বলল..

— “আমি তোমাকে ভুলি নি পাপা। প্রিন্সেস-রা কখনো ভুলে না। আমি তো মাকে আইসক্রিম খাইয়ে দিচ্ছিলাম। বিশ্বাস করো, আমার ভাগের টা খাইয়ে দেয় নি।”

বলেই দুহাতে তালি দিলো। মেয়ের পাকা পাকা কথায় হাসলো ইশরা। তার ছোট মেয়েটা বাবা মা দুজনেই প্রচন্ড ভালোবাসে। সেদিকে আক্ষেপ নেই আয়রার। সে খেতে মন দিয়েছে।
.
.
ঘড়ির কাঁটা দশটা ছুঁই ছুঁই। আশেপাশের মানুষগুলো এখনো জেগে আছে কিন্তু তাতে কোনো যায় আসে না। ইশরা আর আয়রা ঘুমিয়ে আছে বেডের উপর। এমন সময় রুমে প্রবেশ করলো আয়ান। মা মেয়েকে কাছাকাছি ঘুমিয়ে থাকতে দেখে তৃপ্তিকর হাসি ফুটে উঠল তার মুখশ্রী জুড়ে। বাড়িতে ফেরার পথ থেকে ঘুমিয়ে আছে ইশরা। ঘুমাচ্ছে বললে ভুল হবে, মেডিসিনের সাহায্যে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে আয়ান। নিজের রুমে প্রবেশ করার পূর্ব মুহুর্ত পর্যন্ত ঠিকই ছিল ইশরা। কিন্তু রুমে পদচরণ ফেরতেই চোখ আটকে গেল দেয়ালে থাকা ছবির দিকে। শুরু হয়ে গেল যন্ত্রনা। থামানোর চেষ্টা করল আয়ান। ব্যর্থ হয়ে মেডিসিন খাইয়ে দিলো ইশরাকে। এখন বেশ শান্তশিষ্ট হয়ে ঘুমিয়ে আছে। আয়ান হাতের খাবারের প্লেট টা নিঃশব্দে সেন্টার টেবিলের উপর রাখল। ইশরার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। আজ নিজেকে পূর্ণ পূর্ণ লাগছে আয়ানের। মৃদু স্বরে ইশরা বলে কয়েকবার ডাক দিলো। বিনিময়ে ইশরা জাগল না, আয়রার ঘুম ভাঙল। চোখ ডলে পাপার দিকে তাকিয়ে ঠোঁটে আঙুল দিয়ে হুঁস বলল। আয়ানও ঠোঁটে আঙুল দিলো। আয়রা নিচে নেমে গেল। পাপার হাত ধরে খানিকটা দূরে সরিয়ে নিয়ে এলো, যাতে ইশরার ঘুমে ব্যাঘাত না ঘটে। ফিসফিসিয়ে বলল..

— “পাপা তুমি দেখতে পারছো না, মাম্মা ঘুমাচ্ছে। তাকে কেন জাগাচ্ছো? সুপিরম্যান রা এতো পঁচা হয় বুঝি। ”

আয়ান একহাটু ভাঁজ করে আয়রার পায়ের কাছে বসলো। আয়রার সাথে তাল মিলিয়ে সেও বলল..

— “তোমার মাম্মা তো এখনো অসুস্থ। তোমাকে ভালবাসে তাই তোমার সাথে এসেছে। তাকে মেডিসিন খাইয়াতে হবে না। খাবার না খেলে মেডিসিন খাবে কিভাবে আর ঘুম না ভাঙলে খাবার খাবে কিভাবে?”

ঠোঁটের উপর রাখা হাতটা নিয়ে কোমরে রাখল। বেশ বিরাগী মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে। আরেক হাতের ইশারায় বলল..– “জানি জানি, সব জানি। আমি তোমার মতো নই যে, সব ভুলে যাবো। আমি অনেক আগেই মাম্মাকে খাইয়ে দিয়েছি। খাবার আর মেডিসিন দুটোই। বুঝেছো তুমি! এখন আর ডিস্টার্ব করো না, ঘুমাতে দাও বাপু।”

আয়ান দোটানায় পড়লো। আয়রা না বুঝেই তাকে মেডিসিন খাইয়ে দিয়েছে। এতে হিতের বিপরীত না হলেই হয়। আয়ানকে ভাবনায় বিভোর দেখে আয়রা বলল..

— “পাপা তুমি চিন্তা করো না। আমি প্রেসক্রিপশন মিলিয়ে মিলিয়ে খাইয়ে দিয়েছে। এসো দেখাচ্ছি। তুমি আমাকে ততোটা ছোট মনে করো, ততোটা ছোট নই আমি।”

অতঃপর আয়ানকে টেনে নিয়ে এলো আয়রা। বেডের উপর বসিয়ে এঁকে এঁকে মেডিসিনগুলো আয়ানের নিকট এগিয়ে দিলো সে। আয়রার দায়িত্ব জ্ঞান দেখে অবাক হলো আয়ান। একদম ইশরার মতো। যেমন তার দায়িত্ব জ্ঞান তেমন দেখতে। হয়তো ইশরার কপি। তৃপ্তিকর হাসির রেখা ফুটি উঠলো মুখমন্ডল জুড়ে। মেয়েটা ইশরাকে এতোটা ভালোবেসে।
আয়রা গিয়ে শুয়ে পড়লো বেডের এক প্রান্তে। ইশরার বাম পাশে। আয়ান এগিয়ে গেল সেদিকে। আয়রাকে মাঝখানে আনতে চাইলে বাঁধ সাধল আয়রা। বলল..

— “পাপা, মাম্মাকে আমি যতোটা মিস্ করেছি তুমিও ততোটা করেছো। তাই তো মাম্মা আমাদের দুজনের। এখন থেকে মাম্মা আমাদের মাঝখানে ঘুমাবে।”

আরো একবার শব্দহীন হাসলো আয়ান। আয়রার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বেডের কিনারায় কোল বালিশটা রেখে দিল। যাতে আয়রা নিচে পড়ে ব্যাথা না পায়। পায়ের কাছে গোটানো ভাঁজ করে রাখা ব্লাঙ্কেট-টা বুক পর্যন্ত তুলে দিলো। আলো বন্ধ করে ইশরার অপর পাশে শুয়ে পড়লো। অনেকদিন পরে ছুয়ে দেখলো প্রিয়শ্রীকে। হাহাকার করা বুকটার তৃষ্ণা মিটিয়ে নিলো। ঘুমের দেশে পাড়ি জমালো সে।

_________
রাত তখন গভীর। চারদিকের লোকজন ঘুমের তলদেশে। বাড়ির আলো গুলো বন্ধ। রাস্তার ধারের ল্যাম্প-পোস্টের আলো জ্বলছে। আয়ান আয়রা নিদ্রাচ্ছন্ন। সবে অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে নিদ্রা ভঙ্গ হয়েছে ইশরার। নয়ন জোড়া মেলতেই নিজের শিকলে আবদ্ধ কোনো রমনী মনে হলো। দুজন মানব তাকে পেঁচিয়ে ধরে নির্ভাবনায় ঘুমিয়ে আছে। নড়াচড়ার শক্তিটুকু অবকাশ নেই। ধীরে ধীরে দুজনকে ছাড়িয়ে উঠে বসলো ইশরা। হাফ ছেড়ে বাঁচলো। এতোক্ষণ মনে হচ্ছিলো তার শরীরের উপর কোনো চালের বস্তা রাখা।
বেলকেনিতে গিয়ে দাঁড়ালো ইশরা। বাইরের দিকে মুখ করে রেলিং এর উপর বসলো। হাত মেলে মেলে দিলো গ্ৰিল বিহীন বেলকেনিতে। মুক্ত পাখিদের ন্যায় নিজেকে লাগছে। কিছুদিন আগেও সে সুইসাইড করতে গিয়েছিলো। কিন্তু সক্ষম হয়নি অথচ আজ সেই সুযোগ থাকার সত্ত্বেও সে ঝাঁপ দিচ্ছে না। নিজের জীবনের নতুন মানে খুঁজে পেয়েছে। তদানীং শীতল স্পর্শে কেঁপে উঠলো ইশরা। কোনো শক্তপোক্ত পুরুষের হাত তার কোমর বেধ করে গেছে। অতিশয় অনুভুতিতে গ্ৰথণ করে নিলো নয়ন যুগল। সাথে সাথে পেছনে তাকানোর চেষ্টা করলো কিন্তু ব্যর্থ হলো। তার আগেই কেউ কাঁধে মুখ গুঁজে দিল। অন্যহাত দিয়ে ইশরাকে পুরো পেঁচিয়ে নিল। ইশরা কাঁপা কাঁপা অধর জোড়া নাড়িয়ে বলল..

— “ককি কি-করছেন? ছা-ছাড়ুন। পরে যাবো।”

আয়ান আরো দৃঢ় বাঁধনে মুড়িয়ে নিল ইশরাকে বলল..

— “তুমি একসময় নিজের চেয়েও আমাকে বেশি বিশ্বাস করতে পারতে ইশুপাখি। তোমার সেই অন্ধবিশ্বাস কোথায় গেল।”

ইশরা ছলছল চোখে অবলোকন করলো আয়ানকে। এই স্পর্শ তার শতজন্মের চেনা। কোনো অস্বস্তি হচ্ছে না। মনে হচ্ছে, এই স্পর্শটার জন্য সে হাহাকার করছে। পরক্ষণেই স্মৃতিশক্তি সচল হয়ে উঠলো। দুহাতে মাথা চেপে মনে করার চেষ্টা করলো পূর্বের ঘটনাগুলো। বিনিময়ে মাথায় প্রচন্ড ব্যাথা অনুভব করলো। চিৎকার করে উঠল। — “আমার কিছু মনে পড়ছে না। কি করবো আমি।”

— “ইশুপাখি, তোমাকে কিছু মনে করতে হবে না। তুমি শান্ত হও।”

আয়ান তট জলদি ইশরাকে কোলে তুলে নিলো। বেলকেনিতে থাকা দোলনায় বসিয়ে দিল। জড়িয়ে নিলো ইশরাকে। বলল..

— “প্রয়োজন নেই কিছু মনে করার। শুধু তুমি একটু সুস্থ হও আমার আর কিছু চাই না।”

— “আয়ান, আমি চাই সবকিছু মনে করতে। আপনাদের সাথে ভালোভাবে, প্রাণখুলে বাঁচতে। কিন্তু পারছি না। প্লীজ আমাকে নিজের সাথে গুছিয়ে নিন।”

— “নিবো ইশুপাখি খুব কাছে গুছিয়ে নিবো। তুমি যেমন থাকো না কেন, আমার শুধু তোমাকে চাই।”

(চলবে.. ইনশাআল্লাহ)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here