অন্যরকম ভালোবাসা ২ -পর্ব ৩২ ও শেষ

0
66

#অন্যরকম_ভালোবাসা 💓[২]
#ইফা_আমহৃদ
পর্ব:: ৩২(অন্তিম)

সময় পাঁচটা পঁয়তাল্লিশ মিনিট। বিকেলের রোদ ঝলমল করছে। যার কোনো প্রত্তাপ নেই। ইশরা দুহাতে মাথায় চেপে বসে আছে। তার কিছুটা দূরত্বে বসে ডাক্তার এটা ওটা জিজ্ঞাসাবাদ করছে। বাকি সকলে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। নিরবতা কাটিয়ে প্রশ্ন করলেন তিনি।

— “আপনার নাম কী?”

— “আমার নাম, কি নাম আমার। মনে নেই, কিছু মনে নেই আমার।”

— “মনে করার চেষ্টা করুন মিস্। মাথায় পেসার দিন। ট্রাই এগেইন।”

মাথায় আরো যন্ত্রনা বাড়তে শুরু করেছে ইশরার। চোখের সামনে ঝাপসা ঝাপসা ভেসে উঠছে। যন্ত্রনায় কাতরাতে কাতরাতে পূর্ণ হয়ে এলো আঁখি যুগল। গড়িয়ে পড়লো গাল বেয়ে। অনেকক্ষন সময় অতিবাহিত হওয়ার পরে বিরবির করে বলল..

— “আমি, আমি, আমি ইশরা।”

— “গুড, এবার মনে করার চেষ্টা করুন, আপনি কে? আপনার স্বামীর নাম কী? মেয়ের নাম কী? কি হয়েছিলো সেদিন? চেষ্টা করুন ইশরা।”

ইশরার মাথা ব্যাথা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। মাথা ব্যাথা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। যন্ত্রনা সহ্য করতে না পেরে জ্ঞান হারালো সে। আয়রা জানালার ফাঁক দিয়ে মায়ের এমন দৃশ্য দেখে “মা মা” বলে কেঁদে উঠলো নিমেষেই। তনয়া ধরল তাকে। একহাতে নিজের ছেলেকে অন্য হাতে আয়রাকে ধরে রাখল। তবুও আয়রাকে ধরে রাখতে পারলো না। একপ্রকার তনয়ার হাতে কামড় দিয়ে ছুটে গেল মায়ের কাছে। ইতিমধ্যে আয়ান ভেতরে চলে গেছে।
ডাক্তার আয়ানের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন। বললেন..

— “জ্ঞান ফেরার পর কি হতে চলেছে, তার জন্য প্রস্তুত থাকুন।”

বলেই কক্ষ ত্যাগ করলেন। আয়রা পাপার হাতের ভাজে আঙুল ঢুকিয়ে ঠোঁট উল্টে কাঁদছে। মেয়েকে কোলে তুলে নিলো। চোখ মুছিয়ে দিয়ে বলল..

— “কি হয়েছে প্রিন্সেস, কাঁদছ কেন?”

— “পাপা মাম্মা, আমার মাম্মা এমন করছে কেন? আমার মাম্মাকে ঠিক করে দাও!”

আয়রার ললাটে অধরের স্পর্শ দিয়ে বলল..
— “প্রিন্সেস তোমার মাম্মা ঠিক হয়ে ..

আর উচ্চারণ করতে পারলো না আয়ান। তৃতীয় ব্যাক্তির কাতর কন্ঠস্বরে থেমে গেল তার বুলি। ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে তাকাতেই দেখতে পেল ইশরা জ্ঞানহীন অবস্থায় কিছু একটা বলে চলেছে। পাপা আর মেয়ে এগিয়ে গেল সেদিকে। একটু সামনে যেতেই স্পষ্ট হয়ে এলো সেই স্বর। ইশরা কাতর স্বরে আয়রা আয়রা বলে চলেছে।
আয়রা পাপার কোল থেকে নেমে গেল। মায়ের মাথার কাছে বসলো। ইশরার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো..– “এই তো আমি মাম্মা‌। তুমি ঘুমাও।”

আয়রা বলে চিৎকার করে উঠে বসলো ইশরা। ঘামে ভিজে গেছে। মুখে আতঙ্ক ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। ঘন ঘন শ্বাস নিচ্ছে সে। ভয়ঙ্ক সেই দৃশ্য। নিজের পেটের উপরে হাত রাখলো। শূন্য অনুভব করলো সে। কম্পিত কন্ঠে বলল..

— “আমার প্রিন্সেস‌। কোথাও সে?”
তদানীং নয়ন যুগল আটকে গেল আয়ানের দিকে। ফট করে উঠে দাড়ালো ইশরা। আয়ান দিকে এগিয়ে গেল। আয়ানের শার্টের কলার চেপে বলল..– “আয়ান, আমার প্রিন্সেস কোথায়? দেখ, তার যদি কি-হয় আমি কিন্তু তোমার..

আয়রা এসে ইশরার হাত টেনে ধরলো। ইশরা ফিরে চাইলো। আয়রার তার হাত ধরে বলছে..

— “মাম্মা তুমি পাপাকে বকছো কেন? আমি তো এখানে। দেখ, তোমার আয়রার কিছু হয়নি। সেই কখন থেকে বলছি, আমি ঠিক আছে।”

মুখ ফুলিয়ে বলল আয়রা। ইশরা আয়ানের কলার ছেড়ে আয়রার পায়ের কাছে বসলো। তাকিয়ে রইল গহিন নয়নে। এতো গুলো দিন আয়রা তার যেভাবে যত্ন নিয়েছে সেগুলো মনে পড়েছে তার। আয়রাকে টেনে বুকে মিলিয়ে নিল। কেঁদে উঠলো সে। অজস্র চুমুতে ভরিয়ে দিল ছোট আয়রাকে। মুখে মুখে বলছে, আমার আয়রা, প্রিন্সেস আয়রা।
_________________
বাড়িতে ফিরে আরেক দফা ধাক্কা খেল ইশরা। তার মাকে সাজগোজ বিহীন সাদা মাটা দেখে। ইশরার খবর পেয়ে সেদিন আরেক দফা স্ট্রোক করেছেন তিনি। ইশরা জানতেই পারলো না, সে আরো পাঁচ বছর আগে তার বাবাকে হারিয়েছে। সবকিছুর জন্য নিজেকে দোষারোপ করছে ইশরা। যদি সেদিন আয়ানের উপর রাগ না করে এমন সিদ্ধান্ত নিত, তাহলে আজ তার বাবাকে হারাতে হতো না। তিনি বেঁচে থাকতেন, হয়তো কথা বলতে পারতেন না। তাতে কি চোখের দেখাটা তো দেখতে পারতেন। তমোনার ঘুমের ওষুধ ছাড়া ইদানীং ঘুম হয় না। তাই তিনি আরো আগেই ঘুমিয়েছে।
আয়রা ঘর আলো করে ঘুমিয়ে আছে। আজ স্বজ্ঞানে মাকে পেয়ে খুশিতে হাত্মহারা হয়েছে সে। ইশরার মাথায় তেল দিয়ে দিয়েছে। বেনুনী করে দিয়েছে। তবে বাঁকা হয়েছে। ইশরা তাতেই খুশি। বেনুনীর উপর হাত রেখে মুচকি হাসলো। তার প্রিন্সেস ধীরে ধীরে কুইন হতে চলেছে। মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বেলকেনিতে গিয়ে দাঁড়ালো ইশরা। কিছুবছর পূর্বে যেখানে দাঁড়িয়ে আয়ানের সাথে নতুনভাবে বাঁচার স্বপ্ন দেখেছিলো, সেখানে দাঁড়িয়ে আজকে তাচ্ছিল্যের হাসছে। আয়রা না থাকলে নিজের মায়ের কাছেই থাকতো সে। আয়রার খুশি কেড়ে নিতে চায় না। আকাশ পাতাল ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়লো ইশরা।

মাঝরাতে বেলকেনিতে টপকে আয়ান ভেতরে প্রবেশ করলো। ইশরা তার মায়ের বাড়িতে থাকার কারণে এই অবস্থা নিয়েছে আয়ান।
বেলকেনি টপকে রুমে প্রবেশ করতে চাইলে চোখ আটকে গেল দোলনায় ঘুমানো রমনীর প্রতি। এলোমেলো চুলে হেলান নিয়ে নিদ্রাচ্ছন্ন সে। আয়ান এগিয়ে গেল সেদিকে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল সেই মায়াবী রমনীর দিকে। কল্পনার ছেদ ঘটিয়ে মৃদু ঝুঁকে কোলে তুলে নিতে চাইলে জেগে উঠলো ইশরা। আয়ানকে কাছে দেখে পিছিয়ে গেল সে। সাথে সাথে আঘাত প্রাপ্ত হলো মস্তিস্ক। আয়ান সরিয়ে আনলো ইশরাকে। ইশরা বাঁধ সাধল। অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল। আয়ানের বুঝতে অসুবিধা হলো না সেদিনের ঘটনাটা। দূর্বল কন্ঠে বলল..

— “ইশুপাখি; এতো গুলো বছর অভিমান করে কথা বলো নি। আজও কথা বলবে না থাকবে, দূরে সরে থাকবে! ”
ইশরা উঠে দাঁড়ালো। আয়ান পুনরায় বসিয়ে দিল। কাতর কন্ঠে বলতে লাগলো..

— “আমি জানি, অভিমান করে আছো তুমি। তোমার অভিমান ভাঙানো আমার দায়িত্ব..
আমাদের পরীক্ষার দিনই দিবার সাথে দেখা হয়েছে। তারপরে বহুবার আমার সাথে কন্টাক্ট করার চেষ্টা করেছে সে। রিসিভ করবো না, করবো না বলেও একদিন রিসিভ করলাম,
জানতে পারলাম, সেদিন ওর বাবা ওকে চট্টগ্রামে একটা বড়লোক ছেলের সাথে বিয়ে দিয়ে দেয়। ধীরে ধীরে আমাকে ভোলার চেষ্টা করেছিলো। একসময় পেরেছিলোও বটে, ততদিনে দেরী হয়ে গেল। তার স্বামী ব্যবসায় লোকসান করে এঁকে এঁকে বাড়ি, গাড়ি অফিস সব হারিয়ে রাস্তায় নেমে যায়। একটা কাজের সন্ধানে ঢাকায় এসেছিলো আর আমার কাছে একটা চাকরী চাইছিলো। এমন অসহায়ত্বের কথা শুনে না করতে পারি নি আমি। যাই করুক সে, তার জন্য আমি তোমাকে আমার জীবনে ফিরে পেয়েছি। দিলাম একটা চাকরী। তোমাকে জানালে, অকারণেই তুমি চিন্তা করবে তাই কিছু জানাইনি। কাজের পেসার ছিলো আমার, যত্ন নিতে পারি নি তোমার। তার শাস্তি কি এই পাঁচ বছরে শেষ হয়নি ইশুপাখি। আরো দিবে।

সেদিন দিবার স্বামী দেশে ফিরে যেতে বলে। সেই কথাটা জানাতেই এখানে এসেছিলো সে। দূর্ভাগ্যবশত আমিও সেখানে ছিলাম। পুরাটা শোনার আগেই তুমি সেখানে চলে এলে। বাকিটা তো তোমার অজানা নয়। তবে জানো কি ইশুপাখি, সব আমার দোষ। আগলে রাখতে পারি নি তোমাদের।

রাতের পর রাত নির্ঘুম কাটিয়েছি। আয়রার যত্ন নিয়েছি। সবাইকে দূরে সরিয়ে রেখেছি। কখন কোনটা প্রয়োজন সারাদিন বসে ছিলাম। তাই হয়তো আমি আয়রার সুপার ম্যান।”

ইশরা মাথা নিচু করে রইল। উত্তর নেই তার কাছে। সামান্য একটা ব্যাপার-কে এতোটা জটিল করে তুলেছে সে। ভাবতেই নিজের প্রতি নিজের রাগ হচ্ছে।
— “আম স্যরি আয়ান? আমার জন্য তোমাকে?”

— “তুমি কিছু করো নি, আমি এখনো তোমার বিশ্বাস অর্জন করতে পারিনি। এটাই হয়তো আমার শাস্তি।”

বলেই দেয়ালে আঘাত করলো। ইশরা কেঁপে উঠলো। আয়ান হাত টেনে নিল। তাকিয়ে রইল হাতের দিকে। আয়ান করুনতা মেশানো চোখে তাকিয়ে রইলো। আয়ান নিজেকে সামলাতে ব্যর্থ হলো। দৃঢ় বাঁধনে বেষ্টিত করে নিলো ইশরাকে। আয়ানের অশ্রু ধারা গড়িয়ে পড়লো ইশরার পিঠে। ইশরা আরো দৃঢ় করে জড়িয়ে নিল। বলল..

— “প্লীজ আয়ান কেঁদো না, তোমার চোখ অশ্রু মানায় না। আমি তো ফিরে এসেছি, তোমাকে আর কষ্ট পেতে দিবো না। আই প্রমিজ।”

সরিয়ে নিল ইশরাকে। বাঁকা হেসে বলল..

— “তাহলে কি পেতে দিবে?”

— “ধ্যাত সরো তো, ভালো লাগে না।”

ইশরাকে কোলে তুলে নিলো। সামনের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল..

— “নট সরাসরি অনলি কাছে আসা-আসি।”
.
.
.
.
.
.
.
.
.
.
.
.
— “চড়ুইপাখি বারোটা ডিম পেরেছে তেরোটা। একটা ডিম নষ্ট। চড়ুই পাখির কষ্ট।” (আঙুল গুনতে গুনতে আয়রা)

আঙুল গোনা রেখে গালে হাত দিল আয়রা। কিছুক্ষণ গভীর ভাবে ভাবলো সে। মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল.. — “মাম্মা, চড়ুই পাখি তো বারোটা, তাহলে ডিম তেরোটা হলো কিভাবে আর ডিমটা নষ্টই বা হলো কিভাবে।”

আয়ান ভ্রু কুঁচকালো। ইশরা তার নয় মাসের পেটের উপর হাত রেখে ঘন ঘন পা ফেলে এগিয়ে এলো আয়রার দিকে‌। বলল..

— “সেটা তো জানি না!”

— “তুমি কিছু জানো না মাম্মা। আচ্ছা ঈশান ভাই তুই কি জানিস..

বলেই ইশরার পেটের উপর মাথা রাখল। ইশরা মুচকি হাসলো। তনয়ার ছেলে তীব্র আয়রার পেটে চপল মেরে বলল..– “আয়ু তুই সত্যিই বাচ্চা। ও জানবে কিভাবে?”

আয়রা মুখ ফুলিয়ে বসে রইল তার উত্তর না পেয়ে মন খারাপ করে বলল..
— “কেউ জানে না।”

ইশরার মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি এলো। আয়রার কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলল..

— “তোমার পাপা তো সুপার ম্যান আয়ুসোনা। তোমার পাপা নিশ্চয়ই জানে?”

আয়রা লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। পাপার কাছে গিয়ে একই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলো। আয়ান তখন ইশরার দিকে তাকিয়ে জবাব দিলো..

— “একটা পাখি আগে থেকে ডিম পেরেছে। তাই তেরোটা হয়েছে আর তোমার মা চুরি করে নষ্ট ডিম রেখে দিয়েছে।”

— “মাম্মা তুমি চোর? তুমি জানো না, চুরি করা ভালো না।”

ইশরা চোখ পাকিয়ে আয়ানের দিকে তাকাতেই দাঁত কেলিয়ে দিলো। আয়ান পরিস্থিতি বুঝতে পেরে দৌড় লাগলো, ইশরা ছুটল তার পিছু পিছু। প্রিন্সেস আয়রা পেছনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাতে তালি দিতে লাগলো।
“পাপা ফাস্ট”

_____________ সমাপ্ত_____________

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here