অপ্রত্যাশিত প্রণয় পর্ব -শেষ

0
92

#তাসনিম_তামান্না
#অপ্রত্যাশিত_প্রণয়
পর্ব-২ ও শেষ পর্ব

🍁🍁🍁

সেদিনই আমার অমতেই ঘরোয়া ভাবে বিয়েটা হয়ে গেলো। আমি শুধু মূর্তির মতো বসে ছিলাম। শানের সাথে কাটানো মুহুর্ত গুলো বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল।মন একটাই কথা বলছিলো ‘সে কি তাহলে আমাকে ভালোবাসে নি’ সবকি তাহলে অভিনয় ছিল নাকি স্বপ্ন আচ্ছা স্বপ্ন এতোটা স্বচ্ছ হয় কি জানি হয়ত হয়। আমি স্বপ্ন দেখছি ঘুম ভাঙ্গলেই সব দেখবো আগের মতো তা না হলে শান তো বলতো ‘আমার চোখের পানি দেখলে ওর কষ্ট হয় সব ভেঙে গুড়িয়ে ফেলতে মনে চাই’ কিন্তু আমার ঘুম ভাঙছে না কেনো তাহলে এটা সত্যি?

একটা ৬ বছরের ছোট ফুটফুটে বাচ্চা ছেলে আমার হাত ঝাকিয়ে ‘মাম্মা’ বলে ডাকায় আমার ভাবনায় ছেদ পড়লো। আমি ছেলেবাচ্চাটার দিকে তাকালাম ছোট ছেলেটা সাদা মমের নেয় জ্বল জ্বল করছে। ছেলেটাকে দেখে আমার খুব ভালো লাগলো আমি হাত বাড়িয়ে কোলে নিলাম। ও আমার কোলে এসে চুপটি করে বসে রইলো। আমি ওর নাম জিজ্ঞেসা করতেই ঠোঁট নাড়িয়ে বলল ‘নিজাম’।

শুরু হলো আমার দ্বিতীয় সংসার। পরিবারের সকলে ছিল খুব মিশুক আর ভালো মনের তাই সেখানে মানিয়ে নিতে আমার কোনো সমস্যা হলো না। নিজামের সাথে আমার বন্ধুতপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেলো। নিজামকে ছাড়া যেমন আমি থাকতে পারতাম না ঠিক তেমনি নিজামও আমাকে ছাড়া থাকতে পারত না। সবাই আমার সাথে ভালো ব্যবহার করত শুধু আমার স্বামী ছাড়া বিয়ের পর আমার সাথে একটা বারের জন্য কথা বলেছি কিনা তা ঠিক মনে পড়ে না।

সারাদিন শেষে রাতে যখন অতীতের পাতা উল্টে শানের কথা ভেবে চোখের পানি ফেলতাম তখন রিজু বারান্দায় রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে নিকোটিনে ধোঁয়া ছাড়তো তারপর একটার পর একটা সিকারেট খেতে খেতে পুরা সিকারেটের প্যাকেট শেষ করে ঘুমিয়ে পড়ত। রিজুকে খুব জানতে ইচ্ছে করত রিজুকে কেমন অদ্ভুত লাগত সব পুরুষ থেকে আলাদা লাগত। অন্য পুরুষ হলে এতোদিনে ঝাপিয়ে পড়ত আমার ওপর নিজের পুরুষত্ব ফলাত। কিন্তু সেখানে রিজু আমার দিয়ে ঠিক মতো তাকিয়েছে কি না সন্দেহ। রিজু যখন অফিসে যায় তখন শানের মত সব জিনিস এগিয়ে দি কিন্তু শানের সাথে যেমন বকবক করতাম আর সেখানে রিজুর সব কাজ চুপচাপ করে দি। রিজু কখন এসব করতে বলে নি বা বারণ করেনি আমি নিজ থেকে করতাম।

আজ নিজামকে স্কুলে দিয়ে বাসায় আসার সময় শান হঠাৎ কোথা থেকে এসে আমার সামনে দাড়ালো। আমি শানকে দেখে চমকে গেলাম তার সাথে ওর অবস্থা দেখে। শানের চুলগুলো এলোমেলো চোখের তলায় কালি পড়ছে অনেকটা শুকিয়ে গেছে। আমি শানের কাছে যেতে গিয়েও গেলাম না নিজেকে সামলিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে আসতে নিলে শান হাত ধরে আটকে দিয়ে বলল

‘রংতুলি তোমার সাথে একটু কথা আছে প্লিজ একটু শুনো’

শানের কথায় আর আমার হাত ধরায় কেনো জানি হঠাৎ রাগ হলো গা ঘিনঘিন করে উঠলো তাই রাগ নিয়েই বললাম ‘হাত ছাড়ুন! হাত ছাড়ুন বলছি’ বলে ঝাড়া দিয়ে হাত ছাড়িয়ে নিলাম। শান তখন অবাক নয়নে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো। আমি দাঁতে দাঁত চেপে বললাম ‘আমার জীবনটা তো শেষ করে দিয়েইছেন এখন যখন আমি নতুন ভাবে বাঁচতে চাইছি তাহলে কেনো আপনি আবার আসলেন? আচ্ছা বলুন তো আমার কি দোষ ছিল?কি ক্ষতি করছিলাম আমি আপনার? হ্যাঁ? কি হলো বলছেন না কেনো?’

‘আপনি? ওহ গুড’

‘শাট আপ! মিঃ আদনান শান! আমাকে আগের ‘রুহানি তুলি’ ভাবেন না আর আমি আগের তুলি নয় যে আপনাকে দেখেই গলে যাবো’

‘বাহ! কতটা বদলে গেছো! খুব বেশি ভালো আছো বুঝি? আমাকে আর মনে পড়ে না? কাদো না আমার জন্য? ‘

কান্নাগুলা দলা পাকিয়ে আসতে লাগলো। আমি ঢোক গিলে নিজেকে যথাসম্ভব শক্ত করে নিয়ে কঠিন গলায় বললাম ‘না কে আপনি? কোনো এসপেশাল কেউ? মানুষ তো তার এসপেশাল মানুষ বা জিনিসের জন্য মন খারাপ করে কাঁদে। আপনি তো তেমন কেউ নন তাহলে কেনো আপনাকে মনে করে কাঁদবো? নিজেকে এতোটা ইনপটেন্ট ভাবা বন্ধ করুন’

‘হুম! জানি আমি তেমন কেউ নয়। জানি তোমার সাথে অন্যায় করছি অপরাধ করছি তার কোনো ক্ষমা ন্….’

‘আপনার আবার অপমানবোধ আছে নাকি? বাহ আগে জানতাম না তো। সো আপনার এতোদিন পরে মনে হলো আমার সাথে আপনি অন্যায় করছে অপরাধ করছেন যার ক্ষমা হয় না বাহ মজার তো’

‘হাহ হুম মজারই তো চলো এককাপ কফি খাই’

‘আরেকটা মজার কথা বললেন তো আপনার লজ্জা করে না এসব বলছেনতা আপনি কোন বিবেকে বলছেন বলুন তো কথাটা ওপস আপনার তো বিবেক নাই বিবেক থাকলে অন্যের বাড়ির বউকে কফি অফার করতেন না ‘

‘তুলি তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে সেজন্য বলছি তুমি অন্য মাইন্ডে কেনো নিচ্ছ ‘

‘আপনার আর আমার মধ্যে কিসের কথা আছে বলুন তো কোনো কথা নাই’

‘তুলি প্লিজ শুনো এটাই লাস্ট আর কখনো তোমার সামনে আসবো না’

‘আচ্ছা কি বলবেন তাড়াতাড়ি বলেন আমাকে যেতে হবে’

‘তুলি আমি রাগের বশে তোমার সাথে এমনটা করে ফেলছি আমি জানি এটা অন্যায় কিন্তু বিশ্বাস করো আমার কি হইছিল আমি নিজেও জানি না তোমাকে অন্য ছেলে সাথে ছলনা করতে দেখে আমার মনে হয়েছিল এই মেয়েকে আমার শিক্ষা দিতেই হবে। যখন তুমি আমার এক ফেন্ডের সাথে ছলনা করলে আর তোমার বাসার লোক তাকে মেরে আধমরা করে দিলো তখন খুব রাগ হয়েছিল। তোমার সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি তুমি অনেকের সাথেই এমন করছ তাই ভেবে নিয়েছিলাম তোমাকে শাস্তি দিবো সে অনুযায়ী তোমাকে আমার ভালোবাসার জালে ফাঁসিয়ে বিয়ে করি আর তোমাকে খুব কষ্ট দিয়েছি। প্রতিশোধের নেশায় এতো মক্ত ছিলাম যে ভালো খারাপের অনুভূতিটা ভূলে গিয়েছিলাম।তাই তো এতো জগন্য হয়ে গেলাম।’

শানের কথাগুলো শুনে আমার চোখ দিয়ে কয়েক ফোটা পানি গড়িয়ে পরলো কেউ দেখার আগে মুছে নিয়ে হালকা হেসে বললাম ‘শান্তি তো এবার আপনার তাহলেই আমি খুশি। আচ্ছা একটা কথা বলেন তো কুকুর যদি আপনাকে কামড় দেই তাহলে কি আপনি ও কুকুরকে কামড় দিবেন যদি দেন তাহলে আপনার আর কুকুরের মধ্যে পাথক্যটা কোথায়? তাহলে আমি ও যেই ভুল করছি আপনিও সেই ভুলই করছেন এখন আপনার কি শাস্তি দেওয়া উচিত বলুন তো’

শান শান্ত চোখে তাকিয়ে বলল ‘পাচ্ছি তো শাস্তি তোমার শূন্যতা আমাকে পুড়াছে খুব করে পুড়িয়ে ছাড়খাড় করে দিচ্ছে’

‘কথার মায়ায় আমাকে আর আটকাতে পারবেন না আল্লাহ হাফেজ ভালো থাকবেন। হয়ত বা আবার কখনো দেখা হবে নতুন যায়গায়, নতুন শহরে, নতুন ভাবে, নতুন আমিতে,কিন্তু আর যায় হয়ে যাক না কেনো আমি আপনার কাছে কখনোই ফিরব না…’

বলে আমি চলে আসলাম পিছন ফিরে তাকালাম না তাকালে হয়ত দেখতে পেতাম তাহার আকুল মায়া ভরা মুখশ্রী। কিন্তু দেখতে ইচ্ছে হলো না। বাসায় এসে রুমের দরজা দিয়ে খুব কান্না করলাম। কিন্তু পরক্ষণে নিজেকে সামলিয়ে নিলাম। মনে মনে ভাবলাম ‘কার জন্য কাঁদবো যে কিনা আমাকে কষ্ট দিয়েছে ঠকিয়েছে না আমার ছেলে আছে তার জন্য বাঁচবো বেঈমানের কথা ভাবো না’

বেশ কয়েক কেটে গেলো খেয়াল করলাম রিজু সারারাতে বিছানায় আসে না ঠিক মতো খাই না আমি কোনো কাজ গুছিয়ে দিলে কেড়ে কেড়ে নেই মনে হয় খুব রেগে আছে বা মুড ভালো নেই হয়ত এটা ভেবে মনের বুঝ দিতাম।

আজ মাঝ রাতে উঠে না পেড়ে বললাম ‘কি হয়েছে আপনার এমন অদ্ভুত বিভেব করছেন কেনো?ঠিক মত খাচ্ছেন না,ঘুমাচ্ছেন না, এভাবে তো অসুস্থ হয়ে পড়বেন?’

‘আমাকে নিয়ে তোমার এত না ভাবলেও চলবে’

‘ও তাহলে কে আপনাকে নিয়ে ভাববে?’

ওনি কোনো প্রতিউত্তর করলেন না চুপচাপ সিগারেট টানতে লাগলেন। সিগারেটের ধোঁয়ায় আমার কাশি উঠে গেলো। ওনি ব্যাপারটায় মজা পেয়ে আমার মুখের সামনে এসে ধোঁয়া ছাড়তে লাগলেন। আমি সহ্য করতে না পেরে ওয়াসরুমে গিয়ে চোখে মুখে পানি দিলাম। এসে উঁকি দিয়ে দেখলাম ওনি আর সিগারেট খাচ্ছে না তাই পা টিপে টিপে ওনার পাশে গিয়ে গ্রিলে হাত দিয়ে দাড়ালাম কিছুক্ষণ নিরবতার পর ওনি বলেন ‘সবকিছু নতুন ভাবে শুরু করা যায় না?’

আমি ওনার কথায় চমকে তাকালাম।ওনি বাইরের দিকে তাকিয়েই বলেন ‘জানো আমি নিধাকে খুব ভালোবাসতাম এখনো বাসি সারাজীবন বাসবো কখনো ভুলতে পারবো না ওকে ভালোবাসার মানুষকে কখনো ভোলা যায় না তাই আমি ওকে ভোলার চেষ্টাও করি না শুধু চাই ও যেখানেই থাকুক না কেনো ভালো থাকুক। জানো আমি ঘুমালেই ও আমার স্বপ্নে এসে কি বলে?’

‘না। কি বলে?’

‘বলে তোমাকে নিয়ে জেনো নতুন করে সবকিছু শুরু করি। তোমার কষ্টগুলো জেনো ভাগ করেনি।ও যখন হসপিটালের ভর্তি হওয়া অবস্থায় ও বলছিল বিয়ে করে জেনো নতুন করে সবকিছু শুরু করি আমি ওর জায়গায় অন্য কারোর কথা ভাবতেই পারি না। কিন্তু নিজামের মাম্মাকে আমি তার সঠিক মর্যাদা দিতে চাই না হলে যে নিধা কষ্ট পাবে’

‘শুধু কি নিধা আপুর জন্য আমাকে মেনে নিতে চাইছেন?’

‘এমন মনে হলো কেনো? যদি বলি নিজামের জন্য একটা সুন্দর ফ্যামিলি দরকার’

আমি দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে ফিকে হেসে বললাম

‘আমার একটু সময় প্রয়োজন’

৫ বছর পর….

অপারেশন থিয়েটার থেকে বাচ্চার কান্নার আওয়াজ আসছে। কিছুক্ষণ পর নার্স একটা মেয়েবাবু কে কোলে এনে বলল ‘আলহামদুলিল্লাহ আপনাদের মেয়ে হয়েছে এবং মা ও মেয়ে সুস্থ আছে’

সবাই দূঃচিন্তা মুক্ত হয়ে মুখে হাসি ফুটলো। কিছুক্ষণের মধ্যে আমার জ্ঞান ফিরলে দেখলাম রিজু আমার পাশে আমার হাত ধরে বসে আছে। আমি চোখ খুলতেই বলল ‘কেমন আছ? কোথাও কষ্ট হচ্ছে তোমার? দাড়াও ডক্টর ডাকছি’

আমি আটকে দিয়ে বললাম ‘আমি ঠিক আছি। বাবু, নিজাম কোথায়?

আঙ্গুল উঠিয়ে দেখিয়ে বলল ‘ঔ যে ওরা খেলছে’

আমি মন ভরে দু’জনকে দেখলাম বললাম ‘এখানে আনো প্লিজ’

রিজু ওদের দুজনকে আনলো একহাত দিয়ে রিজুকে আর একহাতে আমার মেয়ে নিশাকে জড়িয়ে ধরলাম। তা দেখে রিজু বলল ‘সারাজীবন এভাবে সবকিছু আগলে রেখ’

আমি হাসলাম মনে মনে বললাম

‘অপ্রত্যাশিত সব কিছু পেয়ে গেলাম
কখনো ভাবি নাই
এতো সুন্দর পরিবার পাবো
অপ্রত্যাশিত প্রণয় পাবো
কখনো ভাবি নাই, কল্পনা জল্পনা ও করি নাই!!’

_________________🦋সমাপ্ত🦋 __________________

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here