অপ্রত্যাশিত প্রণয় পর্ব -০১

0
90

🍁🍁🍁

-দেখেন আমি জানি আপনার জীবনে একটা কালো দাগ আছে আমার জীবনেও আছে। বিয়ের পর হয়ত আমি আপনাকে স্ত্রী’র মর্যাদা দিতে পারবো না কিন্তু আমি আমার দায়িত্ব ঠিক পালন করবো।আমি জানি আপনি আপনার দায়িত্বটাও সঠিক ভাবে পালন করবেন (রিজু)

কথাটা বলে ওনি চলে গেলেন। কি অদ্ভুত সব কিছু আমার উত্তরটাও তিনি জানতে চাইলেন না চলে গেলেন। যেখানে আমার বিয়েতে আমারই মত নাই।তাতে কারোর কিছু যায় আসে না। তাইতো আমার থেকে ১১বছর বড় একটা লোকের সাথে বিয়ে ঠিক করেছে যে কি না এক সন্তানের বাবা। অবশ্য এটার জন্য আমিই দায়ী।

আমার জীবন নষ্ট হওয়ার জন্য আমি নিজেই দায়ী এটা আমি মানি।কী অদ্ভুত তাই না?নিজের দোষ নিজেই শিকার করছি।অন্য কেউ হলে হয়তো তার দোষটা সে তার প্রাক্তন বা অন্যর ওপর চাপিয়ে দিত!কিন্তু আমি তেমনটা করছি না। আমি জানি আমার সকল অন্যয়ের শাস্তি এটা কিন্তু এতোটা কঠিন শাস্তি না হলেও পারতো যা আমার জীবনকে তীলে তীলে শেষ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। জানালার গ্রিলে মাথা দিয়ে চোখ বন্ধ করে সৃতির পাতায় ডুব দিলাম……

★অতীত★

এমন না অামি ভালো মেয়ে আমি স্কুল লাইফে যখন নবম শ্রেণিতে পড়ি তখন যাকে দেখতাম তাকেই ভালো লাগলো। কিন্তু কিছুদিন পর আর তাকে ভালো লাগতো না আবার নতুন কাউকে ভালো লাগতো। এটা নিয়ে বাসায় অনেক সমস্যাও হয়েছে অবশ্য কিন্তু বাড়ির আদুরে মেয়ে হওয়ায় বেশি কিছু বলত না।এসএসসির পর জেদ করেই আব্বুর কাছ থেকে ফোন নিলাম কিন্তু আব্বুর শর্ত ছিলো আমি কোনো ছেলের সাথে কথা বলতে পারবো না আমি কোনো কিছু না ভেবে মেনেও নিলাম। কিন্তু সেটা পরে ভুলে গেছিলাম।

নতুন নতুন যখন ফেসবুক আইডি খুলি তখন তার সাথে আমার পরিচয় হয়। তখন আমি ইন্টার প্রথম বর্ষে পড়ি। ইন্টারনেট দুনিয়ায় আমার পথ চলা শুরু হয়।খুব শখ করে নিজের পিক, নিজের নাম দিয়েই খুলেছিলাম। অনেকে আমার কাছে ফেন্ড রিকুয়েষ্ট পাঠাতো আমি অচেনা কাউকে এড করতাম না যাদের চিনি তাদেরকেই শুধু এড করতাম। হঠাৎ একদিন একটা ছেলে আমার কাছে ফেন্ড রিকুয়েষ্ট পাঠালো ছেলেটার প্রোফাইল ঘেটে সব পিকচার দেখে আবেগে পড়ে গেলাম নামটাও ছিল চমৎকার ‘আদনান শান’ খুব ভালো লাগলো ছেলেটাকে আমি কাঁপা কাঁপা হাতে কনফার্ম করে দিলাম বুক ধুকপুক করছিলো কেনো জানি না।দিন যেতে লাগলো ছেলেটাও কোনো এসএমএস দেই না আমি ও দি না। কিন্তু দিনে একবার হলেও ছেলেটার আইডিতে ঘুরে আসতাম কেনো জানি খুব ভালো লাগতো। তার আইডির সব ক্যাপশান ছিল মন ছোঁয়ার মতো আমার মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ ছেলেটা একদিন এসএমএস দিলো আমি তখন ওনার আইডিতেই ছিলাম। আমার বুক ধুকপুক করছিলো এসএমএস দেখে। কাঁপা কাঁপা হাতে মেসেজটা সিন করলাম মেসেজে লেখা ছিলো ”OII RONGTULI SUNO” আমায় ‘রংতুলি’ সমদ্ধন করে ডাকাতে আমি চমকালাম! মনের কোণে এক চিলতে ভালো লাগা কাজ করলো। আমি কি উওর দিবো ভাবছি আমার ভাবনার মধ্যে ওনি আবার এসএমএস দিলো ”TULTUL” আমি কনফিউজড হয়ে গেলাম ওনি আমাকেই ডাকছে নাকি অন্য কেউ ভেবে আমাকে গুলিয়ে ফেলেছে। তাই ওনার আর আমার কনফিউশান দূর করতে টাইপিং করলাম “APNAR KOTHAW VUL HOSSA AMI RONGTULl BA TULTUL AMI ‘RUHANI TULl'”

ওনি আবার বাংলিশে টাইপিং করলেন ‘হ্যাঁ জানি তো কিন্তু তোমার মতো কিউট মেয়েকে একটু অন্য ভাবে ডাকলাম’

ওনি আমাকে কিউট বলায় আমার কেনো জানি না খুব লজ্জা লাগলো। রক্তিম লজ্জামাখা মুখে একচিলতে হাসলাম। নিজের কাজে নিজেই অবাক হলাম এর আগেও তো কত ছেলে আমাকে কত কিছু বলল তাও সামনা-সামনি কই তখন ত এমন লজ্জা লাগেনি তাহলে কেনো এখন লজ্জা লাগছে বুজলাম না। আমি ওনার এসএমএসের প্রতিউত্তরে কিছু না বলায় ওনি আবার লিখলেন ‘তোমাকে যদি আমি আমার দেওয়া নামে ডাকি তাহলে কি তুমি মাইন্ড করবে?’

ওনার এসএমএস দেখে আমি সাথে সাথে রিপ্লাই দিয়ে বললাম ‘এমা না না কোনো সমস্যা নাই আপনার নাম গুলো আমার ভালোই লাগছে’

এরপর থেকে প্রতিনিয়ত তার সাথে আমার কথা হতে থাকলো। আস্তে আস্তে বন্ধুত, বন্ধুত থেকে ভালোলাগা তারপর ভালোবাসা। কে জেনো বলেছিলো ‘একটা ছেলে আর একটা মেয়ে কখনো বন্ধু হতে পারে না’ এ কথাটা আমি আগে কখনো বিলিভ করতাম কিন্তু আমার সাথে ঘটার পর থেকে বুঝলাম আসলেই কথাটা সত্য আমি উল্টো ছিলাম এতোদিন। ওনার প্রতিটা কথা আমার কাছে মধুমিশ্রিত মনে হতো যা বলতো সব ভালো লাগতো যা আমাকে করতে বলতো আমিও বাধ্য মেয়ে মতো করতাম।নিজের মনে মনে ভেবে হাসি পাই বাবা-মা’র কথা কখনো এতো মন দিয়ে শুনি না।আমার মন জুড়ে ওনাকে নিয়েছিলো ‘প্রণয়নের জোয়ার’ খুব ভালোবেসে ফেলছিলাম ওনাকে ছাড়া অন্য কিছু ভাবতেও ভালো লাগতো না।

বাসায় আমার এমন পরিবর্তন দেখে সবাই অবাক হয়ে গেলো।সবাই ভাবলো হয়ত আমি নিজের ভুলটা বুঝতে পেরেছি বড় হচ্ছি তো। সবার কথা শুনে আমার ভালোই লাগতো আগে যে ভুল করেছি সব বুঝতে শিখলাম। ওনার সাথে কথা না বলে থাকতে পারতাম না দম বন্ধ হয়ে মরে যাবো এমন অবস্থা হতো।ওনার সাথে যখন তখন দেখা করার কোনো উপায় ও ছিল না। ওনিছিল ঢাকা থাকতো আর আমি চট্টগ্রাম থাকতাম।শান ছিল বড়লোক বাবার একমাত্র ছেলে আর আমি ছিলাম মধ্যেবিত্ত মাঝে মাঝে মনে কড়া নাড়তো এটাকি আদেও ঠিক হচ্ছে নাকি ভুল? কিন্তু এ প্রশ্নের উত্তর কখনো খুজে পেতাম না। প্রথম বার যখন আমাদের সামনা-সামনি দেখা হয়েছিল তখন আমার লজ্জায় মরি মরি অবস্থা ওনি আমার এমন অবস্থা দেখে অনেক লেগফুল করেছে অবশ্য। সেসময় গুলা আমার কাছে স্রষ্ট সময় মনে হত। রাগ -অভিমান-ঝগড়া সব মিলিয়ে ভালোই চলছিলো আমাদের সম্পর্ক।

এরইমধ্যে আমার কানে আসল আব্বু আমার বিয়ে ঠিক করছে ভালো ছেলে পেলেই আমাকে বিয়ে দিয়ে দিবে। আমার মনে ভয়েরা হানা দিলো ‘শান’কে হারানোর ভয় আর যায় হোক না কোনো যেকোনো কিছুর বিনিময় হলেও শানকে আমি হারাতে পারবো না।শানকে সবটা বললাম খুব কান্নাও করলাম।

শান বলল ‘কান্না করছ কেনো জান? জানো না তোমার কান্নায় আমার কষ্ট হয় খুব কষ্ট হয় হচ্ছে হয় সব ভেঙে গুড়িয়ে ফেলি! আর দেখো এখনি তো তোমার বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে না শুধু বিয়ের কথা বলছে বিয়ে কথা বললেই তো আর বিয়ে হয়ে যায় না আর ক’টা দিন দেখো কি হয় আর ২ মাস পর তোমার এইচএসসি পরিক্ষা, পরিক্ষা শেষ হলেই তোমাকে আমার কাছে নিয়ে আসবো প্রমিস কেঁদো না প্লিজ তুল’

আমি খুশি হয়ে বললাম ‘সত্যি তো ‘

শান বলল ‘হ্যাঁ রে বাবা আর এসব বাদ দিয়ে মন দিয়ে পড়শোনা করো একদম এসব দিকে মন দিবে না ওকে’

আমি ও বলছিলাম ‘ওকে’

মুখে যতই যায় বলি না কেনো মনে ভয় থেকেই যায়।অনেক ঝড়-ঝাপটার পর পরিক্ষা শেষ হলো লাস্টের পরিক্ষা দিয়ে বাসায় এসে শুনলাম একটা ছেলে নাকি আমাকে খুব পছন্দ করেছে তারা নাকি বড়লোক আর এ বিয়েতে বাসার সবাই রাজি। আমি কিছু না বলে রুমের দরজা লাগিয়ে শানকে ফোন দিয়ে সব বলি। আমরা প্লান করলাম আর দেরি করা ঠিক হবে না আজ রাতেই আমরা পালিয়ে যাবো। প্লান অনুযায়ী তাই করলাম গভীর রাতেই বাসা থেকে পালিয়ে এলাম দুজনে। রাতে দু’জনে এক হোটেল রুমেই ছিলাম। সকালেই বিয়ে করে নিলাম আমরা এভাবে বেশ কয়েকদিন কাটলো।কিন্তু এভাবে কতদিন হাতে টাকাও নেই বেশি তাই সিদ্ধান্ত নিলাম বাসায় সবাইকে জানাবো হইতো সবাই অনেক টেনশন করছে মেনে নিবে।বাসায় ফিরেএলাম দু’বাড়িকে জানালো হলো তারা সিদ্ধান্ত নিলো বিয়ে যেহেতু হয়ে গিয়েছে সেহেতু মেনে নেওয়াটাই শ্রয়।

শুরু হলো আমার সংসার জীবন। কিন্তু শানের মা প্রথম থেকে আমাকে অপছন্দ করত এটা বুঝতে পেরেও কিছু বলতাম না। ২ মাস খুব ভালোই কাটলো। এরপর থেকে শান একটু একটু করে চেঞ্জ হতে থাকলো। আমাকে প্রতিনিয়ত ইগনোর করতে থাকলো। আমি কষ্ট পাচ্ছি দেখে মনে হতো শান তৃপ্তি পাচ্ছে। এরপর শুরু হলো মারধর।বিয়ের ১বছরের মধ্যে ওনি আমাকে ডিভোর্স দিয়ে দিলেন।পা ও ধরছিলাম ওনার ওনি আমার কথা শোনেন নি। যখন চলে আসছিলাম ওনি আমার কানে ফিসফিস করে একটাই কথা বলছিল ‘কেমন লাগছে এখন’

একথা শুনার পর ওনার দিকে তাকিয়ে দেখছিলাম ওনি কতটা খুশি। কিন্তু এতো খুশির কারণ কি?

ওখান থেকে আসার পর আমি ডিপ্রেশনে ছিলাম। কেউ তেমন আমার সাথে কথা বলতো না আমি ও বলতাম না ঘর থেকে বের হতাম না ঠিক মতো খাওয়া দাওয়া করতাম না। চারিদিকে কানাকানি বাজে কথা শুনতে না পেরে হঠাৎ একদিন সুইসাইডের চেষ্টা করলাম কিন্তু ঠিক সময় হসপিটালে নিয়ে যাওয়ায় বেঁচে গেলাম।এরপর থেকে বাসায় সবাই আমাকে আগের মতো স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেছে কিন্তু আমি তো আমিই আগের মতোই মন মরা হয়ে থাকতাম একদিন রাতে আব্বু এসে বলল

-তোমাকে দেখতে আসবে এভাবে তো আর জীবন চলে না যা হবার আগেই করে ফেলছ আমি এটাতে কোনো রকম ঝামেলা চাইছি না আগে একবার তো আমার নাক কাটিয়েছ এবার কাটিয় না দয়া করে

আর আজ তারা আমাকে দেখে গেলো।আমার জীবনের ওপরে আমি আর আশা রাখি না শুধু একটা কথায় ভাবি ‘যা হবে দেখা যাবে ওতো ভেবে আমার কি কাজ’

#চলবে কি?

[
#তাসনিম_তামান্না
#অপ্রত্যাশিত_প্রণয়
পর্ব-১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here