আঁধারিয়া অম্বর পর্ব ১০+১১+১২

0
85

#আঁধারিয়া_অম্বর
#সুরাইয়া_সাত্তার_ঊর্মি
১০।

শ্যামা মনে সাহস নিয়ে দরজা খুলতেই চোখ বড় বড় করে তাকালো….

বাহিরে একটি ছিমছাম গড়নের তামাটে রঙের একটি যুবক দাঁড়িয়ে আছে। ঢুলঢুল করে দুলছে সে বৃষ্টির মাঝে। মদের তীব্র গন্ধ শ্যামার নাকে বাড়ি খাচ্ছে। শ্যামা এই ছেলেটিকে ভালো করেই চিনে, তাদের এলকার কাউন্সিলরের ছেলে। এক নাম্বারে বদমায়েশ ছেলে। এই এলাকার প্রতিটি মেয়েকেই এদের একটু গ্রুপ মিলে বিরক্ত করে বেড়ায়। শ্যামা এদের জন্য পদক্ষেপ নিতে চাইছিলই কি, ওর লাইফে এত এত ঝামেলা হাঝির হয়ে গেছে। শ্যামাকে-ও ছেলেটি বড্ড উত্ত্যক্ত করে। শ্যামার বাবা অসুস্থ হওয়ার পর থেকে এই বাড়িটির উপরেও তাদের লোভ। নানান ভাবে এ বাড়িটি থেকে বের করার পায়তারা চালিয়ে যাচ্ছে। রাত বিরাতে তাদের বাড়ির ছাদে ঢিল মারা, বাসার সামনে ময়লা আবর্জনার স্তুপ করা, বা কখনো বাড়ি বয়ে আসে সাঙ্গু পাঙ্গুদের নিয়ে হুমকি ধামকি দিয়া করেই চলছে। ম্যামা ছেলেটির আগাগোড়া দেখে ঠোঁট ভাজ করলো,

“শিফন তুমি!”

শিফন শ্যামার লতানো শরীরের বাঁক গুলোতে নজর বুলিয়ে বলে উঠলো,

“আর কত একা থাকবা জান? চলে এসো আমার কাছে, এই বাড়িও তোমার, আমাদের বাড়িও তোমার এবং (বুকের মাঝে হাত দিয়ে) এই বুকটাও তোমার!”

শ্যামার ঘৃণায় গা গুলিয়ে এলো,

“তুমি এখান থেকে যাবে? না, মানুষ জড় করবো?”

শিফন সব দাঁত বের করে বিশ্রি হেসে বলল,

“আমি তো চাই মানুষ ডাকো, সবাই জানুক আমাদের প্রেমের কথা!”

কান গরম হয়ে গেলো এবার শ্যামার। দাঁত দাঁত চেপে বলল,

” এই খান থেকে যা কুত্তার বাচ্চা, নর্দমার কিট, নয় খুব খারাপ হয়ে যাবে কিন্তু!”

শিফন বেশরমের মতো হাসলো। বলল,

” ঠিক আছে ঠিক আছে, কাউকে কিছুই বলবো না, তার বদলে না হয়, এই বৃষ্টির রাতে তোমার শরীরের উষ্ণতা ভোগ করতে দাও?”

শ্যামা আর সইতে পাড়লো না। দরড়ার কিনারায় থাকা শ্যামার ছোট বেলার খেলার কাঠের ক্রিকেট ব্যাট নিয়ে বেদম পেটাতে লাগলো । শিফন চেঁচিয়ে উঠলো,

“ওই ছেমরি করছ কি, করছ কি, মাইরা ফেলবি নাকি? আহ্, কার গায়ে হাত তুলতাসোস জানোস তুই? শালি ছাড়!”

বলতে বলতে ব্যাট ধরে ফেলতে চাইলো শিফন। কিন্তু শ্যামার আজ এত বছরের রাগ ঝেড়ে ফেললো মুহূর্তেই। শিফনের দু পায়ের মাঝ বরাবর এক কিক মেরে দিলো। শিফন মদে টাল ছিলো, তার উপর অপ্রত্যাশিত আঘাত পেয়ে মাটিতে গড়িয়ে পড়লো। কাঁদা মাটিতে এক হয়ে যাচ্ছে তার শরীরের কাপড়, ব্যথায় কুকিয়ে যাচ্ছে বার বার। শ্যামা বলল,

“হারামজাদা এর পর এখানে দেখলে গলা কেটে ঝুলিয়ে রাখবো দরজার সামনে। ভাগ”

শিফন উঠে পালাতে পালাতে বলল,

“দেখে নিবো তোকে, এত কিসের দেমাক তোর? সব শেষ করে দিবো।”

শ্যামা বলল,

” আগে ঠিক করে দাঁড়াতো আগে । ”

শিফন এরি মাঝে উধাও হয়ে গেলো। শ্যামা রাগে ফোঁসফোঁস করে তাকিয়ে রইলো অন্ধকার রাস্তার দিকে৷ সব কতটা নিস্তব্ধত। কেউ নেই পথ ঘাটে।

————

“দাদিজান আপনি এত জরুরি তলব কেন করলেন?”

বড্ড অস্থির হয়ে দ্বিতীয় বারের মতো প্রশ্ন করে বসলো ইজহান। আলিয়া আর্ম চেয়ারে বসে আছে। দৃষ্টি তার জানালার বাহিরে। বাহিরের টিম টিম করে জ্বলা লাল-নীল আলো অন্ধকার ঘরটুকু আলোকিত করে দিচ্ছে। আলিয়া সেদিকে তাকিয়ে ছোট একটি শ্বাস ছেড়ে বললেন,

” তুমি কি তোমার মায়ের আত্মচিৎকার ভুলে গেছো?”

ইজহান চ্মকে গেলো। হুট করে শোনা কথাটি তীরে মতো ঢুকলো কানে, অস্থির মুখ খানা কঠিন হয়ে এলো মুহূর্তে। ইজহান বলল,

“আমি তা ভুলিনি, দাদিজান।”

“তাহলে?… তাহলে কেন ছুটে গেলে সেই মেয়েটির পিছনে? যার জন্য…. যার জন্য তোমার বাল্যকালেই মাকে খোয়াতে হয়েছে, হারিয়ে ফেলেছো চিরতরে তার মেয়ের জন্য হঠাৎ তোমার বদলানো রূপটা আমি সইতে পারছি না।”

ইজহানের ভাবমূর্তি পরিবর্তন হয়ে গেলো। গম্ভীর , অনুভূতিহীন দৃষ্টিতে বাহিরে তাকিয়ে রইলো। কিছুই বলল না। আলিয়া আবার উঁচু গলায় বলল,

“এমনি নয়তো ইজহা্ন? মেয়েটিকে আবার তুমি ভালোবাসতে শুরু করেছো?”

ইজহান তখন চুপ। দৃষ্টি শূন্য। আলিয়া হতাশ হয়ে গেলো। নিজেকে সামলে ইজহানের পাশে বসে, ওর হাতটি ধরে বলল,

“আমি তোমাকে কিছু বলতে চাইছি ইজহান, মনযোগ দিয়ে শোনো, নেক্সট উইক মেহরিন দেশে আসচ্ছে, আমি তোমাদের দুহাত এক করতে চাই!”

ইজহান এবারো চুপ। আলিয়া কি করবে? ভেবে পাচ্ছে না। তার নাতির অভিব্যক্তি বুঝা বড় দায়। তবুও সে আশা করছে, আর যাই হোক তার নাতি তাকে ডিসাপয়েন্টেড করবে না। তবুও তার চান্স ৪০ ভাগ। বাকি ৬০ ভাগ…..। হতাশার শ্বাস ছাড়লেন আলেয়া।

————–

দরজা লাগিয়ে ভিতরের ঘর প্রবেশ করতেই আবারো দরজায় কড়া নাড়লো কেউ। শ্যামা রাগে দুঃখ এবার দা নিয়ে ছুটে গেলো দরজা খুলতে। বলল,

“আজ তোর শেষ দিন রে….”

বলেই চোখ বুজে দু হাতে দা তুলে কোপ দিতেই নিচ্ছিলো শ্যামা। তখনি কেউ হায় হায় করে উঠলো একটি পরিচিত কন্ঠ। অধিরাজ বলল,

” এই এই, করছো কি? করছো কি? স্যারকে মেরে দিবে নাকি?”

শ্যামা চট করে তাকিয়ে, জ্বিব কাটলো। ছিঃ একটা অবস্থা করে দিলো সে। শ্যামা আড় চোখে দীর্ঘাকায় সুদর্শন পুরুষটিকে দেখে নিলো। তাকিয়ে আছে তার দিকে, বরফ দৃষ্টি মেলে। শ্যামা শুকনো ঢুক গিললো। চাপা হেসে তোতলাতে তোতলাতে বলল,

“আ.. প.. নারা? এখানে?”

অধিরাজ বলল,

“কেন আসতে পারি না বুঝি?”

“না না তা বলিনি, হঠাৎ এত রাতে যে,,”

অধিরাজ কিছু বলতেই নিতে চাইছিল। ইজহান তার গম্ভীর বরফ কন্ঠে বলল,

“তুমি আসতে পারো। ”

অধিরাজ হ্যাঁ বোধক ঘার নাড়িয়ে চলে গেলো। শ্যামা চোখ গোল গোল করে চেয়ে রইলো অধিরাজের যাওয়ার দিকে। ইজহান পকেটে হাত গুঁজে ভাবলেশহীন চোখে চেয়ে আছে শ্যামার দিকে। শ্যামার অদ্ভুত অনুভূতি হতে লাগলো। সে দিক সেদিক তাকাতে লাগলো। আজ সাত দিন পর একে অপরকে দেখছে। ইজহানের এই মুহূর্তে এক ছুটে জরিয়ে ধর বুকের সাথে মেশিয়ে নিতে ইচ্ছে করছে ইজহানের। কিন্তু পারছে না। একটা অদৃশ্য দেয়াল যেন ইজহানকে আটকিয়ে দিচ্ছে। এই মুহূর্তে তার দাদিজানের কথা গুলো বেমালুম ভুলে গেল ইজহান। তার ঝংকারময় কন্ঠে বলল,

” ভিতরে আসতে বলবে না?”

শ্যামা যেন অন্য জগতে ছিলো। ইজহানের কথায় ভাবনায় ছেঁদ পড়লো, বলল,

“হুমম? ও হ্যাঁ হ্যাঁ আসেন আসেন ভিতরে আসেন।”

ইজহান তার লম্বা লম্বা পা ফেলে এই প্রথমবার শ্যামাদের বাড়িতে প্রবেশ করলো। শ্যামার কাছে মনে হলো, বাড়িটি ইজহানের সাথে যাচ্ছে না। সোনার চামচ মুখে নিয়ে যার জম্ম, বড় বড় হল ঘরে যার চলাফেরা তার অবশ্যই এমন পরিবেশে আর যাই হোক দম ফালতে কষ্ট হবে। শ্যামা কালক্ষণ ব্যয় না করে বলল,

“আব.. মি. ইজহান আপনি এখানে হটাৎ?”

ইজহান জবাব দিলো না। উল্টো জিজ্ঞেস করলো,

“তোমার রুম কোনটা?”

শ্যামা থতমত খেয়ে গেলো। তার মাথা কাজ করছে না। এই ইজহান তার রুমের কথা জিজ্ঞেস করছে কেন? আচ্ছা? আবার… আবার ওসব করবে না তো?? ভাবতেই ঠোঁট কামড়ালো শ্যামা। ইজহান তখন আবার বলল,

“কি হলো? কোথায় হারিয়ে গেলে?”

শ্যামা আমতা আমতা করে বলল,

“উপরের ডান দিকের টা।”

ইজহান কোনো কথায় বলল না। মাথা নেড়ে সোজা হাটা ধরলো শ্যামার ঘরে, শ্যামা তাজ্জব বনে গেলো। আরে? ছেলেটা চায়ছে টা কি? শ্যামা পিছন পিছন গেলো। ইজহান শ্যামার রুম ঢুকেই এদিক ওদিক তাকালো। ঘরটা মাঝারি সাইজের। যেখানে একটি সিঙ্গেল বিছানা, যার চার পাশে ফেরি লাইট দিয়ে সাজানো। ছোট একটি পড়ার টেবিল। পড়ার টেবিলের উপর একটি ফোটোফ্রেম। ইজহান সেদিকে যেতেই শ্যামার কি ভেবে দৌড়ে সামনে যায়, আর লুকিয়ে ফেলে ছবিটি৷ তা দেখে ইজহান ভ্রু কুঁচকা। তা দেখে শ্যামা হাসার চেষ্টা করে বলে,

“এইটা.. এইটা কিছু না। ”

ইজহান কিছু বলল না। চলে গেলো শঢামার আলমারির দিকে। শ্যামা অবাক হয়ে কিছু বলতে নিবে তার আগেই যা হবার হয়ে গেছে। আলমারি দরজা খুলতেই হুড়হুড় করে সব কাপড় ইজহানের মুখে পড়ে গেছে।

শ্যামা বিড়বিড় করে বলল,

“গেলো, গেলো, মান সম্মান গেলো আমার!”

ইজহান বিস্ময়ে বিমূঢ় । আসলে কাজের জন্য নিজের আলমারি কাপড় গুলো গুছাতে পারে না সে। ভেবেছিলো কাল ছুটির দিন। কাল করবে সব। কিন্তু তার আগেই! শ্যামা ক্যবলাকান্তের মতো হাসলো,

“হে, হে!”

ইজহান শ্যামার এই বেকুব মার্কা হাসি দেখে নিজেও হেসে ফেলতে চাইছে। কিন্তু তার অভিব্যক্তি ঠিক রেখে একটি তয়লা নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেলো। যাওয়ার আগে বলে গেলো,

“খাবার কি আছে?”

শ্যামা বলল,

“খিচুরি করেছিলাম সাথে আমারে আচার। ”

“ওকে ”

বলেই চলে গেলো ওয়াশরুমে। শ্যামা মাথা চুলকিয়ে বুঝার চেষ্টা করতে লাগলো, কি হচ্ছে এসব? তখনি আবার ওয়াশরুমের দরজা খুলে গেলো। হালকা মুখ বের করে বলল,

“আঙ্কেলের কোনো কাপড় পাওয়া যাবে কি? আমার কাপড় সব ভিজে গেছে।”

শ্যামা রোবটের মতো মাথা নেড়ে বলল,

“এনে দিচ্ছি, এখনু এনে দিচ্ছি।”

বলেই পা বাড়ালো বাবার ঘরে। মাথা তার পুরোই হ্যাং। এসব হচ্ছে টা কি আজ? আচ্ছা শ্যামা স্বপ্ন দেখছে না তো?? নিজেকে নিজেই চিমটি কেটে চিৎকার করে উঠলো। নাহ্ স্বপ্ন না। সব সত্যি। শুকনো ঢুক গিলে বাবার এক সেট রাতে পরার জামা নিয়ে নিজের মনে বকবক করতে করতে রুমে ঢুকতেই এক চিৎকার করলো শ্যামা। শ্যামার চিৎকার ইজহানও চমকে উঠলো। বলল,

“চিৎকার করছো কেন?”

শ্যামা ঘোরে আছে। আজ পর্যন্ত এই ব্যক্তিকে অর্ধনগ্ন ভাবে কখনো দেখেনি সে। বলতে গেলে সে সুযোগ এই লোকটি তাকে দেয় নি। আর আজ? লোমহীন উদম চওড়া বুক দেখে শ্যামার কি যেন হয়ে গেলো। এতটা.. এতটা সুন্দর কেন এই পুরুষ। একটু কম হলে হতো নাকি? শ্যামাকে এভাবে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে ইজহান নিজেই এক পা এক পা করে এগিয়ে গেলো৷ শ্যামা তা দেখে পিছাতে লাগলো। ইজহান আগায়, শ্যামা পিছায়, এভাবে করতে করতে একে বারে লেগে যায় দেয়ালের সাথে শ্যামা। ইজহান তখন এক হাত উঠিয়ে শ্যামার দিক বাড়াতেই ঘাবড়ে গেলো সে। মনে পড়লো আবার,

” এই এই লোকটা কি সত্যি এবার ওই সব করবে?”

চোখ মুখ কুচকে বন্ধ করে ফেলো শ্যামা। ভয়ে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে গেলো। ঠিক তখনি হাত থেকে কাপড় গুলো নিয়ে নিলো ইজহান। কিন্তু সরে দাঁড়ালো না দূরে। উল্টো এক পলক তাকিয়ে থাকলো শ্যামার ভয়ার্ত মুখটির দিকে। শ্যামা যখন বুঝলো ইজহান কাপড় নিয়েছে তার হাত থেকে। তখনি নিজেকে নিজে হাজার টা গালি দিতে শুরু করলো। ছিঃ কি ভাবছে সে আবোল তাবোল। শ্যামা চোখ খুললো। ইজহান তখন মিটিমিটি হাসছে। শ্যামা ভেবাচেকা খেয়ে বলল,

“হাসছেন যে?”

ঠোঁটে দুষ্ট হাসি রেখে চকিতে বলল ইজহান,

“আমি ওসব করবো না এখন!”

শ্যামার কান গরম হয়ে গেলো, গাল দুটি টমেটোর মতো হয়ে গেলো। লজ্জায় তাকাতে না পেরে বলল,

“খাবার রেডি করছি নিচে আসুন!”

বলেই ছুটে পালালো শ্যামা। ইজহান শ্যামার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললো। শ্যামার বাবার কাপড় পরে নিচে যাবে তার আগেই তার ফোন টুং টাং করে বেজে উঠলো। এই ওসময় কে ফোন করলো? ভেবেই ভ্রু কুচকে ফেললো ইজহান। তারপরেও ফোনটি হাতে না তুলে নিচে চলে গেলো। সে মুলত এসেছে এখানে তার জম্মদিনের শেষ সময়টুকু শ্যামার সাথে কাঁটাতে। একটিবার শ্যামার মুখ থেকে ” হেপি বার্ড ডে” শুন্তে। আচ্ছা শ্যামাকি তাকে উইশ করবে? করলে হয়তো এতক্ষণে করে ফেলতো নাকি? তবুও আশায় বাঁধে বাসা। সেটা ভেবেই নামতে লাগলো নিচে। আর তখনি….
#আঁধারিয়া_অম্বর
#সুরাইয়া_সাত্তার_ঊর্মি

১১।

আচ্ছা শ্যামাকি তাকে উইশ করবে? করলে হয়তো এতক্ষণে করে ফেলতো নাকি? তবুও আশায় বাঁধে বাসা। সেটা ভেবেই নামতে লাগলো নিচে। আর তখনি…ফুস করে কারেন্ট উড়ে গেলো। সিঁড়ির মাঝ পথে এসেই থেমে গেলো ইজহান। আর ঠিক তখনি রান্নাঘর থেকে ঝনঝনানি শব্দ হলো থালাবাসনের। ইজহানের বুক ধক করে উঠলো। ঠিক আছেতো শ্যামা? সে তার গম্ভীর কন্ঠে বলল,

“শ্যামা…! কি হয়েছে?”

রান্নাঘরে থালাবাসন ধুছিলো। ধোয়া শেষে যেই না বাসন কাসন সেলফে রাখতে নিলো, ওমনি কারেন্ট চলে গেলো। শ্যামা হতাশ হলো, এই এলাকার এই এক সমস্যা যখস তখন কারেন্ট চলে যায়। সে অন্ধকারে বাসন,কোসন রাখবে তখন ধুমধাম করে বাদ্যবাজনা বাজিয়ে পড়ে গেলো নিচে। এরি মাঝে যখনি ইজহানের গলা শুন্তে পেলো, তখনি আরো চমকে উঠলো। বলল,

“না.. না.. কি.. ছু হয়নি..! সব ঠি..ক আছে..!”

ওদিক থেকে আর কোনো আওয়াজ পাওয়া গেলো না। শ্যামা হাতরে মোমবাতি বের করে জ্বালিয়ে নিয়ে খাবার টেবিলের সামনে আসতেই দেখতে পেল একটি কাঠিন্যে ভরপুর গম্ভীর মুখ। খাবার টেবিলে বসে আছে, হাতে মুঠোফোনের আলোয় জ্বলজ্বল করছে তার মসৃণ মুখ, ঘন কালো কুচকুচে চোখ জোড়া দিয়ে ডুবে আছে ফোনের ভিতরে। শ্যামা ভাবলো, ছোট বেলায় যতবার এই লোকটিকে সে দেখেছে, তার সাথে এখনের এই মানুষটি বড্ড অপরিচিত। তবে একটা জিনিস এখনো মিল, দাম্ভিক, গম্ভীর, চুপচাপ স্বভাবের মানুষ। মাঝে মাঝে একে বোবা ভেবে বসলে অবশ্যই ভুল হবে না…!

শ্যামার নাক দিয়ে ছোট শ্বাস ছাড়লো। এক হাতে খাবারের প্লেট আর অন্য হাতে মোমবাতি নিয়ে টেবিলের উপর রেখে দিলো। ঘন কালো কুচকুচে গভীর চোখ জোড়ায় তাকালো ইজহান শ্যামার দিকে, হলদে আলোয়
শ্যামার মসৃণ মুখ বড্ড মায়াবী লাগছে। ইজহান এক দৃষ্টি তাকিয়ে রইলো শুধু। এদিকে শ্যামা ইজহানের এমন চাহনি কাঁপিয়ে তুলছে তার দেহ। শ্যামা কিছুতেই উপেক্ষা করতে পারছে না.. এই দৃষ্টি। সে ভেবেই পাচ্ছে না.. এমন করে কেন তাকিয়ে ইজহান? আচ্ছা তার মুখে কিছু লেগে নেই তো? শ্যামা নিজের মুখে হাত ছোয়ালো। টিমটিম করে জ্বলা মমের আলোতেই একটি স্টিলের থালা তুলে নিয়ে, তাতে নিজের মুখ দেখের বৃথা চেষ্টা করলো। আর তখনি শ্যামার অজানতে ফটফট করে ছবি তুলে নিলো কটা ইজহান।

অনেকক্ষণ নিরবতার পর শ্যামা খাবার নিয়ে আসে, এবং খিচুড়ির প্লেট এগিয়ে দেয়, ইজহান তা দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেলো, পলকহীন চেয়ে থেকে ঠোঁটের কোনে হাসি ফুঁটে উঠলো। খিচুড়ির প্লেটে আচার দিয়ে খুব সুন্দর করে লিখা… H B D…পাশেই একটি ডিম অমলেট করে সেটাতেও খুব সুন্দর ডেকোরেশন করেছে। ইজহান তার গম্ভীর কন্ঠে হালকা হেসে বলল,

“তুমি এসব আমার জন্য করেছো?”

বলেই এক চামচ মুখে পুরে নিলো। এত সুস্বাদু খাবার যেন সে আর আগে খাইনি।শ্যামা সাইডেই কাচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো। ইজহানের কথা শুনে ঘাবড়ে গিয়ে মাথা নেড়ে বলল,

” ইয়ে, মানে.. অধিরাজ দা বললেন…!”

হাসি মুখ খানা মুহূর্তেই ফ্যাকাসে হয়ে গেলো ইজহানের মুখ। মাথায় বার বার বাজতে লাগলো, অধিরাজদা বললেন? মানে? এসব তার জন্য না? অধিরাজ বলেছে বলে করেছে সে? ইজহানের অভিব্যক্তি আবারো চেঞ্জ হতে দেখে শ্যামা ঢুক গিললো। ইজহান ততক্ষণে দাঁড়িয়ে গেলো। খাবার প্লেট ছুঁড়ে ফেলে দিলো দূরে।ইজহানের রাগান্বিত দৃষ্টিতে মাথা নত করে ফেললো শ্যামা। ভয়ে থরথর করে কেঁপে উঠে ওর পুরো দেহ। সে তো তাই করেছে, অধিরাজ দা তখন ফোন দিয়ে বলল,

” শ্যামা শোনো না বোন, স্যারের মন টন ভালো নেই, তুমি বরং তার বার্থ ডের জন্য কিছু একটা করে খুশি করে দিও।”

শ্যামা বলল,

“আ..আ..মি কি করবো?”

“যা খুশি! যা আমাদের স্যারের মন ভালো করে দেয়!”

শ্যামা চুপ করে থাকে। কিছু ভেবে সেই ভাবে কাজ করে। তাহলে? তাহলে কেন ইজহান এমন করলো?? শ্যামার ভানার মাঝেই ইজহান দু কদম এগিয়ে আসতেই শ্যামা পিছিয়ে পড়ে। এ দেখে আরো রেগে যায় ইজহান।ঠিক তখনি কারেন্ট চলে আসে। আর হাত মুঠ করে ইজহান বেড়িয়ে যায় সদর দরজা দিয়ে। ম্যামা সেখানেই বসে পরে, মুখের মাঝে হাত চেপে হু হু করে কেঁদে উঠে, কেন? কেন? ইজহান তার সাথে এমন করে? কেন তাকে এত টর্চার করে? কি দোষ ছিলো তার??

——–

খুব সকালে দরজার মাঝে খটখট করে শব্দ শোনা যাচ্ছে। শ্যামা তাদের হল ঘরের সোফার উপরেই শুয়ে পড়েছিলো। বাহিরে এমন সরগরম আর দরজায় কড়া ঘাত উঠে বসলো। বাহিরে কি হচ্ছে? কারাই বা এভাবে দরজা ধাক্কা দিয়ে যাচ্ছে? শ্যামা ওরনা টেনে নিলো। চোখ ঢলতে ঢলতে বাহিরে এসে দেখলো, এলাকার মানুষ ঝর হয়েছে তার দোরগোড়ায়। শ্যামা কিছুই বুঝতে পারছে না। সে ভ্রু কুচকে বলল,

“আপনারা? এত সকালে এখানে কি করছেন? ”

তখনি পিছন থেকে একটি পরিচিত গলা শোনা গেলো,

“আমি বলছি?”

শ্যামা সেদিকে তাকালো। তার আগেই পাশ থেকে এক মধ্য বয়সি মহিলা খেঁকিয়ে উঠলো,

“কিসের বলা বলি? এরে টেনে বের করে দু ঘা বসা আগে রাত বিরাতের ফস্টি নষ্টি বেড়িয়ে যাবে।”

তাকে তাল দিয়ে আরেকজন বলল,

“বাপ হসপিটাল কি গেলো? মেয়েতো নষ্টামিতে নেমে পড়লো!”

তার সাথে আরেকজন তেড়ে এসে বলল,

“বের কর, বের কর, তোর নাগড়কেউ বের কর, দুজনের মুখে এক সাথে চুনকালি মেরে, জুতার মালা পড়িয়ে বের পুরো মহল্লা নাকে খত দিয়াবে!”

শ্যামা এদের কথা কোনো কিছুই বুঝতে পাড়লো না,

“কি সব বলে যাচ্ছেন আবোল তাবোল? মুখ সামলে কথা বলুন!”

এবার শিফন বাঁকা হেসে, শ্যামার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,

“আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে ঘরে তুলবে, তা তো হয় না? রিভেঞ্জ ইজ রিভেঞ্জ…!”

তারপর জোরে চেচিয়ে বলল,

“আমি আমি সত্যি বলছি, কাল রাতের বেলায় দেখলাম এক লম্বা লোককে সে ঘরে ঢুকিয়েছে, আপনার তালাসি নিন।”

শ্যামার চোখ কঁপালে। সে আঙ্গুল তুলে শাসিয়ে বলল,

” খবরদার যদি কেউ এক পা নর, তাহলো খারাপ কিছু হয়ে যাবে। আর এই শিফনকে বিশ্বাস করছো তোমরা? যে দিন রাতে রাস্তা-ঘাটে মেয়েদের উত্যক্ত করে? তার কথা বিশ্বাস করছো?? আমার গরে কোনো ছেলে নেই। শিফন মিথ্যা বলেছে তোমাদের”

শিফন ভ্যাবাচেকা খেয়ে যায়। কারণ শ্যামার বলা কথায় সবাই কানাঘুঁষা শুরু করে। তখনি এক দাদি বলল,

“ঠিক আছে তোমার কথা মানলাম, আমরা না হয় একবার চেক করে দেখি?”

শ্যামার চোখের কোনে জল টলমল করে উঠলো। বলল,

“আজ বাবা-মা থাকলে হয়তো আপনাদের এমন কথা শুন্তে হতো না? এক শয়তান লোকের জন্য আপনারা আমাকে এত নিচে টেনে ধরলেন? আচ্ছা যান করে নিন চেক!”

সকলের মাথা নত হয়ে গেলো। এরি মাঝে জান্নাত নব নিচে এসে বোনকে কাঁদতে দেখে তার কাছে ছুটে এসে বলে উঠে,

“বড়পু কাঁদছো কেন? বলো? এরা.. এরা কিছু বলেছে? একবার বলো, আগুন লাগিয়ে দিবো।”

শ্যামা নিচের ভাগ্যর উপর কখনো দোষরোপ করেনি। কিন্তু আজ আজ বড্ড দোষ দিতে ইচ্ছে করছে। যবে থেকে তার মা মারা গিয়েছে , জীবনটা তছনছ হয়ে গেছে যেন। জান্নাত বোনকে সান্ত্বনা দিয়ে যাচ্ছে। আর পাড়াপ্রতিবেশিরা অনুতপ্ত হচ্ছে কিছুটা। কিন্তু শিফন তার শিকার ছেঁগে দেয় কিভাবে? কাল রাতে তার নিম্নাঙ্গে শ্যামার দিয়া আঘাতের জন্য দাঁড়াতে পারছে না। এত সহজে সে ছাড়বে না এই মেয়েকে। সে জানতো, শ্যামার কথায় সবাই পলটি মারতেই পারে? তাই সে ভারা করে এনেছিলো চর থেকে কতগুলো মহিলাকে। তাদের ইশরা করতেই এক মহিলা ডিম ছুঁড়ে মারলো শ্যামার দিকে। বলল,

“ছোকরি, আমি নিজেও তোহাকে দেখেছি, এক ছোকরার সঙ্গে লটকে লটকে ঘরে ঢুকতে, এখন বল, আমি মিথ্যে বলচি!”

শ্যামা ডিম মাখা গায়ে বিস্ময় নিয়ে মুখ দিয়ে কিছু বলতে নিলো তার আগেই ধাপে ধাপে ডিম ছুঁড়লো আরো কজন, পঁচা ডিমের বিশ্রী গন্ধ গা গুলিয়ে আসার উপক্রম। তাদের সাথে আবারো তাল মিলিয়ে পাড়াপড়শিরা কম করলো না। এক পর্যায় জান্নাত ঘর এক রডের লাঠি এনে তাদের দিকে তাক করলো। বোনকে হেফাজত করার জন্য। বলল,

“আর এক বার যে ডিম ছুঁড়বে তার মাথা ফাটিয়ে দিবো।”

কিন্তু তাতে তেমন লাভ হলো না। কথা থেকে একদল মহিলা এসে ধরে ফেললো জান্নাতকে। চেচিয়ে বলল,

“চোরের মার বড় গলা। রাত বিরাতে করবা দেহ ব্যবসা করবা, আমরা বললেই দোস, এইটা ভদ্র লোকের এলাকা। তোমাদের শিক্ষা দিবোই দিবো!”

বলেই শ্যামাকে আরো কজন নিয়ে এলো মাঠের মাঝে। এবং সবাই লাঠি নিয়ে পিটাতে শুরু করলো। অচমকা আসা আঘাত সামলে উঠতে পারলো না।প্রতিটি বাড়ি মরণযন্ত্রনা দেখিয়ে দিচ্ছে শ্যামাকে। মারার এক পর্যায় যখন শ্যামার মাথায় আঘাত করতে নিলো, তার আগেই বন্দুকের আওয়াজ ভেসে উঠলো পিছনে ঘুরতেই দেখতে পেলো, এক জোরা জলন্ত চোখ……
#আঁধারিয়া_অম্বর
#সুরাইয়া_সাত্তার_ঊর্মি
১২।

পিটপিট করে চোখ খুললো শ্যামা। মাথায় আর শরীরে প্রচন্ড ব্যাথা করছে তার। চারিদিকের ধপদপে সাদা আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে। হসপিটালেরক উটকো গন্ধে নিশ্বাস নিতে পারছে না সে।ডান পাশে তাকালো একবার। পাশের সোফায় ছোট্ট বোন জান্নাত গুটিশুটি মেরে শুয়ে আছে। সে উঠতে চাইলো। ঠিক তখনি বুঝতে পারলো কেউ একজন তার পা আঁকড়ে ধরে আছে। শ্যামা বড্ড অবাক হয়ে হালকা একটু মুখ তুলে দেখতে পেলো একটি পুরুষালী দেহ। মানুষটি তার পায়ের উপর মাথা রেখে শুয়ে আছে।মুখটা দেখতে না পেলেও বুঝতে পারলো এটি আর কেউ না ইজহান। শ্যামার মনের মাঝে অদ্ভুত অনুভূতি হলো। ঠোঁটের কোনে দেখা গেলো এক চিলতে হাসি। তখন মহিলা গুলো এলো পাথরি মারছিলো, শ্যামা ব্যথায়, যন্ত্রণায় নিজেকে রক্ষে করতে ভুলে গেছিলো। শ্যামা এক পর্যায় যখন মাটিতে পরে গেলো, তখন তার পিঠ, বুক, পেটে একের পর এক লাথি পড়ছিলো। শ্যামা ব্যথায় কাতরাছিলো। এক পর্যায় যখন আর সইতে না পেরে চোখের পাতা ভাড়ি হয়ে আসছিলো? ঠিক তখনি একটি পরিচিত মুখ আর তার কন্ঠ কানের বাড়ি খেলো। শ্যামা ঢুলুঢুলু চোখে শুধু ইজহানের মুখটুকু দেখলো। ইজহান তার কাছে এসে বলিষ্ঠ হাতে তাকে তুলে নিয়েছে কোলে। আর চিৎকার করে বলে যাছিলো,

“শ্যামা ভয় পেয়ো না.. আমি.. আমি আছি… সব ঠিক করে দিবো। শ্যামা.. শ্যামা…”

শ্যামা ততখনে ইজহানের বুকে শান্তি ছোঁয়া পেয়ে মাথা হেলিয়ে দিলো। না চাইতেও তার মনে হলো,ইজহানের বুকটা বড্ড বড্ড শান্তির স্থান।

শ্যামা নিচের ঠোঁট কামড়ে ইজহানের ঘুমন্ত মুখটা দেখে ভেবে যাচ্ছিলো হাজার টা ভাবনা। তার মাঝেই জান্নাতের কন্ঠে ভবনার ফোয়ারাটা ছিকে পড়লো।

“বড়পু তুমি উঠে গেছো?”

হাসি হাসি মুখে জান্নাত বলতেই শ্যামা সতর্কের সাথে মুখে আঙ্গুল দিয়ে চুপনথাকতে বলল। জান্নাত কিছুই বুঝলো না। কেন তার বোন তাকে চুক করতে বলছে?

মূলত ইজহানকে সে জাগাতে চায় না। ইজহানের ঘুমন্ত মুখটি দেখতে অনেকটা ছোট বাচ্চাদের মতো লাগে। যদিও জান্নাতের কথায় হালকা হয়ে আসে ইজহানের ঘুম। ইজহান মাথা তুলে তাকাতেই শ্যামাকে দেখে ব্যস্ত ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করে,

“আর ইউ ওকে? এখন কেমন লাগছে তোমার?”

শ্যামার জন্য এভাবে বিচলিত হতে দেখে অবাক হলো খুব। কিন্তু কিছু বলল না। শুধু হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়ালো। ইজহান আবার বলল,

” আমি ডাক্তারকে ঢেকে আনছি!”

শ্যামা আবারো মাথা নাড়লো। আর ইজহান উঠে দাঁড়িয়ে শ্যামার কাছে এসে কঁপালে ঠোঁটের স্পর্স করে বেড়িয়ে গেলো। শ্যামা বিস্ময় ভরা দৃষ্টিতে তার যাওয়ার দিক তাকিয়ে রইলো পলকহীন ভাবে। এক অদ্ভুত অনুভূতি হতে লাগলো শরীরের শিরায় উপশিরায়। শ্যামা সাথে এ-ও লক্ষ করলো নিট এন্ড ক্লিন থাকা ছেলেটি আজ বড্ড অগোছালো। এসব দেখে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা জান্নাতের মনে খচখচ করতে লাগলো। ইজহান দরজার আড়ালে হারিয়ে যেতেই জান্নাত প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো,

“বড়পু? তুমি বিয়ে করে নিয়েছো? আর ইজহান ভাইয়াকে পেলে কই তুমি? বাবা না বলতো, ইজহান ভাইয়ার আব্বুর সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই? তাহলে?”

জান্নাতের ছোট মাথায় থাকা এত এত প্রশ্ন সব করে বসলো আর না পেরে। শ্যামা বলল,

“জান… এখানে বস…! বলছি..”

একে একে সব ঘটনা বোনকে বলল সে, চেপে গেলো শুধু রক্ষিতার টপিকটি। জান্নাত সব শুনে হেসে বলল,

“ইজহান ভাইয়াকে ছোট থেকেই ভালো লাগতো আমার। আমি খুব খুশি হয়েছি তোমার তার সাথে বিয়ে হয়েছে। সে খুব ভালো।কষ্ট তখন হতো, যখন ওই রিদের সাথে তোমার বিয়ে হতো, সে তো তোমাকে কন্ট্রোল করতে চাইতো সব সময়!”

শ্যামা দীর্ঘ শ্বাস ফেললো। ফ্যাকাসে হেসে বলল,

“হ্যাঁ মি. ইজহান খুব ভালো,৷ উনি না থাকলে হয়তো আমাদের এই হাল হতো না…!”

জান্নাত বুঝতে পারলো না তার কথা। চেয়ে রইলো বোনের দিকে। ঠিক তখনি স্ব শব্দ হুড়ডকরে ঘরে ঢুকলো অধিরাজ। পাশেই একজন নার্স। তার হাতে একটি ট্রে, গরম ধোঁয়া উঠা স্যুপের বাটি। অধিরাজ চাপা হেসে বলল,

“শ্যামা এটি খেয়ে নাও ইজহান পাঠিয়েছে।”

শ্যামা আশেপাশে তাকাতেই অধিরাজ আবারো বলল,

“ইজহানকে খুঁজছো? সে তো চলে গেছে!”

“চলে গেছে?”

“হ্যাঁ, আর বললো না, বুঝলে তার দাদিজান ফোন করলো বলল কি জরুরি কাজ আছে। তুমি চিন্তা করো না চলে আসবে, এমনিতেও সারা রাত এখানে বসে ছিলো সে। ঘুমটা টিক মতো হয়নি, বিশ্রাম করা দরকার। কি বলো?”

ইজহান সারা রাত এখানে বসে ছিলো শুনে শ্যামার মনের কোনে এক রাশ ভালো লাগা কাজ করতে লাগলো। এমন একটি গম্ভীর মানুষ যে কিনা তাকে ঘৃণা করে, সেই তার জন্য বসে ছিলো পাশে, তাউ সারা রাত? এটি কি আদো সম্ভব???

———–

এয়ারপোর্টের বাহিরে গাড়ির ভিতরে বসে অপেক্ষা করছে ইজহান। বাসায় গিয়ে ফ্রেস হয়ে বেড় হতেই তার দাদিজানের কড়া আদেশ শুনতে পায়,

“মেহরিনকে নিয়ে সোজা বাসায় আসবি, কে মরলো, কে বাঁচলো তাতে তোর কিছু যায় আসে না। ভুলিস না.. সে তোর শুধু রক্ষিতা। সমাজে যাকে খারাপ দরজা দিয়ে থাকে!”

ইজহান সঙ্গে সঙ্গে হাত মুঠ করে ফেললো। দাদিজানের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,

“দাদিজান ভুলে যেয়ো না সে আমার স্ত্রী।

দাদিজান তাচ্ছিল্যের সাথে হেসে বললেন,

” রক্ষিতা কখনো স্ত্রী হয় না..!”

ইজহান হাত দুটি মুষ্টি বদ্ধ করে নিলো। রাগে গা রি রি করে উঠলো। ঠিক তখনি তার ফোনটা বেজে উঠলো। ইজহান ফোনটি হাতে নিতেই জ্বল জ্বল করে উঠলো একটি নাম। কিঞ্চিৎ হেসে ফোনটি দুলতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো একটি মেয়েলীর উৎকন্ঠা,,

“দাদা ভাই? আম ব্যাক…..!”

ইজহান তার গম্ভীর কন্ঠে হেসে বলল,

“আসছি আমি!”

তার পরেই ফোনটি পকেটে ভরে ইজহান চলে এলো এয়ারপোর্টে। গাড়ি কাচের টুকা পড়তেই ইজহানের ভাবনার ছেদ পড়লো। হেসে দরজা খুলতেই একটি ২০,২১ বছরের মেয়ে ভিতরে ঢুকে জড়িয়ে ধরলো। খুশিতে গদগদ হয়ে বলল,

“কেমন আছো দাদা ভাই!”

“ভালো!”

“তো কেমন কাটলো সফর? ”

চকিতে বলল আয়ানা,

“খুব ভালো, মেহরিন আপুর সাথে সময় কিভাবে কেঁটে গেলো বুঝতে পারিনি!”

ইজহান তা শুনে হাসলো শুধু। তার অন্য পাশে ততক্ষণে মেহরিন বসে পড়েছে৷ সে বলল,

“কেমন আছো ইজহান? ”

ইজহান ইগনোর করলো। যেন শুনেই নি কিছু। এক রাশ দুঃখ নিয়ে জল ছেড়ে দিলো চোখের। এতে বিরক্তি লাগলো ইজহানের। এ মেয়েটি বড্ড গায়ে পড়া। তার উপর কিছু হলেই আগে তার চোখের জল কথা বলবে, অসহ্য।

গাড়ি চলতে শুরু করলো। আধঘন্টার মাঝে ইজহানের বাড়ির সামনে এসে পড়লো। ইজহান তাদের নামিয়ে দিয়ে বিদায় নিলো। তাকে এখন শ্যামাকে দেখতে যেতে হবে, না জানি কি অবস্থা মেয়েটির। ভেবেই আবার গাড়িতে উঠে পড়তে নিতেই আয়ানা বাঁধা দেয়। ছল ছল চোখে বলে উঠে,

“দাদা ভাই, তুমি আমাকে ছেড়ে তার কাছে চলে যাচ্ছো? আমার থেকে ওই মেয়েটি বেশি ইম্পর্টেন্ট?? ”

ইজহান স্তম্ভিত হলো। আমতা আমতা করে বলল,

“সে অসুস্থ আয়ানা, আমার যেতে হবে!”

আয়ানা হুহু করে কেঁদে দিলো। বলল,

“দাদা ভাই তুমি সব ভুলে গেছো? সব… ওই মেয়েকে তুমি আবারো ভালোবেসে ফেলেছো? ভুলে গেছো? তাদের জন্য আমরা আমাদের মাকে হারিয়েছি? আমি আমার ছেলে-,বেলা হারিয়েছি?”

ইজহানের বুকে মাঝে একটা ধাক্কার মতো লাগলো। সে বিনা বাক্য ব্যয় করে গাড়ি নিয়ে বেড়িয়ে গেল সে।

————-

এদিকে সাত দিন কেঁটে গেলো ইজহানের দেখা পাওয়া গেলো না আর। সেদিনের ঘটনার পর শিফনকে জেলে ভরা হয়েছে, পর পর৷ কেশ ঠুকেছে ১০ টা। তার বাবার কমিশনার পদ চলে গেছে। ধরা পরেছে অবৈধ সব কিছু। শ্যামা না চাইতেও ইজহানের এই সব করা কাজে মুগ্ধ হয়েছে, এবং এক প্রকার মিস করতে শুরু করে দিয়েছে। একা একা সময় গুলো অনেক কষ্টকর হয়ে গেছে। জান্নাতের ছুটি শেষ, সেও চলে গেছে। আজ দু দিন যাবত শ্যামা ইজহানের একটি বাড়িতে গিফট হয়েছে। তার আগের বাড়ি থেকে এ বাড়িটি আরো প্রকন্ড। শ্যামার মাঝে মাঝে ভয় ভয় করে এই বাড়িটিতে একা থাকতে। এখন রাত দুটো বাজে, আধাঁরিয়া অম্বরে সুক্ষ সুক্ষ তারকামন্ডল। শ্যামা বেলকনিতে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইলো আকাশের দিকে। এই পৃথিবীতে সে একা। এক সময় ছিলো, নিশাচর রাতের সঙ্গী হতো একজন সুফিয়ান দ্যা সিক্রেট বয়। হাসলো শ্যামা। এখনো মনে আছে প্রথম এই ছেলেটিকে সে মিসড কল দিয়ে ছিলো। তিন বারের মাথায় যখন কল ব্যাক করে, ও পাশ থেকে থমথমে কন্ঠে বরে উঠে কেউ,

” হ্যালো?”

শ্যামা ভয়েই কল কেটে দিলো। বুকের মাঝে ধীম ধীম করছিলো তখন। অথচ রিদের সাথে কথা বলার সময় নরমালি কথা বলতো। তবে এমন কেন হয়েছিলো? আজো জানে না শ্যামা।

শ্যামা ছোট শ্বাস ছাড়লো। রাতে একাকিত্ব কুঁড়ে কুঁড়ে খেতে লাগলো ওকে। সে না পেরে ফোন তুলে ইজহানকে কল করলো। এবং ঠিক সঙ্গে সঙ্গেই কল রিসিভ করলো ইজহান….

ওপাশ থেকে ইজহানের গম্ভীর কন্ঠ ভেসে আসতেই, একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেলো দেহে। চিরচেনা সেই বুকে ধুকপুক শুরু করলো। বুকের বা পাশটা জোরে চেপে ধরে রাখলো। আর তখনি….

চলবে,

দীর্ঘ সময় পার করেছি মনে হচ্ছে। আজ লিখতে বসে তাল কেঁটেছে খুব। বুঝতেই পারেন বাসার পরিবেশটা ভালো না থাকলে যা হয়। তবে মনে হচ্ছে, আপনাদের আর রেসপন্স পাবো না। অনেই এতো লেইটের কারণে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু আমার করার কিছু ছিলো না। আমার আম্মু সবার আগে আমার লাইফে। আমরা পাঁচ ভাই বোন। বড় আমি। বুঝতেই পারেছেন ঘরের বড় মেয়ে হয়ে কতটুকু চাপ পড়েছে আমার উপর? যাই হোক শেষ ভালো যার সব ভালো তার। এখন আমার আম্মু সুস্থ আছেন, যদিও কথা বলতে আর আগের মতো পারেন না। কিন্তু আশা রাখছি দ্রুত আল্লাহ আমার আম্মুকে সেই তৌফিক দান করবেন। অবশেষে, আশা করছি আপনাদের আগের মতোই রেসপন্স পাবো। নতুন কোনো ঝামেলায় না পড়লে ইন শা আল্লাহ প্রতিদিন গল্প দিবো….

ভালো থাকবেন…
চলবে,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here