আঁধারিয়া অম্বর পর্ব ১৯+২০

0
77

#আঁধারিয়া_অম্বর
#সুরাইয়া_সাত্তার_ঊর্মি
১৯।

১২ বছর আগের কোনো এক দিন….

পরন্ত বিকেলে কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে হেলে-দুলে শ্যামা প্রাইভেট পড়ে, ফিরছিলো বাসায়। মুখে তার বরাবরের মতো ললিপপ। স্কুল ড্রেস আর দুই বেনুনিতে একটা কিউট পুতুল যেন। ছোট থেকেই শ্যামা ছিলো খুব সুন্দরী। যেখানেই যেত, ছেলেরা তার দিকে তাকাবে না? তাকে কি হয়?

শ্যামা যখন বাসার কাছে তখনি কিছু পা এসে দাঁড়ালো তার পথ আটকায়। শ্যামা চমকে উঠে। চারিদিকে তখন আবাছা অন্ধকার ঘনিয়ে আসচ্ছে। হয়তো বৃষ্টির আগাম বার্তা দিচ্ছে। শ্যামা ভয়ে ভয়ে মাথা তুলে তাকাতেই চোখ বড় বড় হয়ে গেছিলো। এ যে আর কেউ না, রিদ আর তার বন্ধুরা। শ্যামা শুকনো ঢুক গিললো। কটা দিন আগে হলে হয়তো শ্যামার কাছে ভালো লাগতো। কিন্তু এখন? শ্যামার মনে ভয় হচ্ছে। গভীর ভয়। রিদের চোখে মুখে অদ্ভুত অভিব্যক্তি দেখে গা শিউরে উঠছিল শ্যামার।

সব মেয়েদের মতোই ছিলো শ্যামা চোখে স্বপ্ন, একজন রাজকুমার আসবে, পালকি করে নিয়ে যাবে। শ্যামা ভেবেছিলো, সেই সময় রিদ তার রাজকুমার। কিন্তু রিদের সাথে রিলেশন হওয়ার ১ বছরেই তাদের ব্রেক আপ হয়ে যায়। তেমনি একটি দিন ছিলো আজ.. রিদের সাথে আজ তিন দিন হয়েছে শ্যামা সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। এতে যে সে শান্তির শ্বাস ছাড়লো। রিদ সব বিষয়ে শ্যামার উপর অধিকার খাটাতো, বকা ঝকা করতো, ছোট করতো। হাঁপিয়ে উঠে ছিলো শ্যামা এই সম্পর্কে । কিন্তু সেদিন অতিরিক্ত করেছিলো রিদ….

শ্যামার সাথে রিদের কথা হতো ফোনে। একদিন হুট করেই বলে বসে রিদ,

” শ্যামা তোমার ওই লাল ঠোঁটের স্পর্শ চাই!”

শ্যামার এমন কথায় কেমন মিয়ে যায়। শ্যামা সব সময় বলতো,

“আমরা যা করবো, বিয়ের পরে!”

কিন্তু রিদ নাছোড় বান্দা। যে করেই হোক সে শ্যামাকে ছুঁতে চায়, স্পর্শ করতে চায় তার শরীর। কিন্তু শ্যামা এই ব্যপার টা এড়িয়ে গেলেও, ইজহানদের ফেয়ার অয়েলের দিন আর পারেনি। সেদিন রিদ শ্যামাকে ক্লাস রুমে আসতে বলে গিফট দিবে বলে। আর শ্যামা সেখানে যায়। সে ভাবতেই পারেনি রিদ এমন কিছু করবে। শ্যামা যখন ক্লাসে প্রবেশ করলো? দেখলো রিদ তার দুই বন্ধকে নিয়ে বসে আছে ফাঁকা ক্লাসে। শ্যামা আমতা আমতা করে বলল,

“কি জন্য ডেকেছো?”

রিদ তখন শ্যামার দিকে হেটে আসে, হাতে একটি গিফট বক্স। পুরো স্কুলের স্টুডেন্ট হলে উপস্থিত। তাই এদিকে কেউ নেই। শ্যামার ক্ষানিকটা ভয় ভয় করছিলো। রিদ যখন তার দিকে এসে, বক্সটি হাতে দিয়ে বলে,

“এটা তোমার জন্য শ্যামা।খুলে দেখো!”

শ্যামার চোখে মুখে খুশি ঝিলিক দিয়ে উঠলো। নিজের বয়ফ্রেন্ডের কাছ থেকে পাওয়া গিফট কেই বা না পছন্দ করে? শ্যামা খুশি হয়ে বলল,

” থ্যাঙ্কু ইউ!”

রিদ হাসলো একটু। তারপর চোখের ইশারায় বন্ধু গুলো বেড়িয়ে যেতে বলল এবং তার শব্দহীন পায়ে ক্লাস থেকে বের হয়ে রুমের দরজাটা বন্ধ করে দেয়। এতেই চমকে উঠে শ্যামা। রিদ তখন বাঁকা হেসে শ্যামা কাছে এগিয়ে গেছিলো। এক হাত শ্যামার গালে রেখে অন্য হাতে শ্যামার নরম পাতলা কোমরে হাত রেখে কাছে টেনে জড়িয়ে ধরে ছিলো। শ্যামা সেদিন অস্বস্তিতে কাঠ হয়ে গেছিলো। মাথা যেন হ্যাং হয়ে যাচ্ছিলো শ্যামার। কিশোরী বয়সে প্রথম কোনো ছেলের স্পর্শ পেয়েছিলো শরীরে। কিন্তু রিদের স্পর্শ কেন জানি, শ্যামাকে বড্ড জঘন্য মনে হয়ে ছিলো। এদিকে রিদ যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেয়ে ফেলেছিলো। সে শ্যামাকে সেই অবস্থাতেই চুমু খাবার জন্য ঠোঁট বাড়াতেই, শ্যামা নিজের সর্বশক্তি দিয়ে এক ধাক্কা মেরেছিলো। রিদ তখনি মাটিতে পরে যায়। এতে রাগ আরো দিগুণ বেড়ে যায় রিদের। কিড়মিড় করে এক বিশ্রি গালি দিয়ে শ্যামার কাছে যেতে নেয় তখনি শ্যামা রিদের মাথায় তার গিফট করা কাঁচের তাজমলটি ছুঁড়ে মারে। এবং রিদের গাল কেঁটে রক্ত বেড়িয়ে আসে। রিদ সেদিন ব্যথায় এক হাতে গাল চেপে গগনবিদারী চিৎকার করতে থাকে। তার চিৎকারে, বাহিরে দাঁড়িয়ে থাকা তার বন্ধু গুলো এক প্রকার ছুটে আসে। শ্যামা সেদিন ভয়ে পালিয়ে যায়। এর পর থেকেই শ্যামা ওর ফোন আর ধরতো না, কোনো যোগাযোগ ও করতো না। কিন্তু রিদ তাকে হুমকি দেয়া ছাড়ে নি। মেসেজে হুমকি দেয়া শুরু করে দিলো। তাতে শ্যামা ভয়ে ফোনের সিম ভেঙ্গে ফেলে। বাসা থেকেও বের হওয়া বন্ধ করে দেয়। এক প্রকার গুটিয়ে নিয়েছিলো নিজেকে। কিন্তু কে জানতো? তার জন্য এর থেকে বড় কিছু অপেক্ষা করছে…

শ্যামা এবার ভয়ে ভয়ে বলল,

“তুমি…! তুমি না চলে গেছো?”

রিদের গালে বেন্ডেজ করা। রাগে গজ গজ করছে। বলল,

” তোমাকে এত সহজে ছেড়ে দিবো? ভাবলে কিভাবে?”

শ্যামার কিশোরী মুখ তখন কাঁদো কাঁদো। সে কখনো ভাবতেও পারেনি, এমন একটি ছেলে তার প্রথম ভালোবাসা ছিলো। শ্যামা বলল,

“দেড়ি হয়ে যাচ্ছে আমাকে যেতে দাও!”

রিদ এবার চেচিয়ে বলল,

“তুই আমার থেকে কখনো ছাড় পাবিনা!”

বলেই শ্যামার হাত মুচড়ে ধরেছে রিদ। ম্যামা ব্যথা চিৎকার করে বললো,

“ছাড়ো আমাকে!”

রিদ হাসলো। ভয়ংকর হাসি। শ্যামা এতটুকু বুঝতেই পারছে, রিদ তার সাথে আজ বাজে কিছু করতে চাইছে! তার উপর এখন চারিদিকে ঘন কালো অন্ধকার। থেকে থেকে গুড়ুমুড় শব্দ করছে আকাশে৷ বৃষ্টি হবে ভেবে রাস্তা ঘাট, পথ ফাঁকা। এই সুযোগটাই যেন কাজে লাগিয়েছে রিদ। শ্যামা আশেপাশে বার বার দেখতে লাগলো। দোয়া করতে লাগলো, কেউ আসুক তার সাহায্যের জন্য। কিন্তু কেউ নেই এই পথে। শ্যামা কেঁদে দিলো, চোখের জলে ভিজে যেতে লাগলো তার টমেটোর মতো গাল দুটি। মায়া হলো না যেন এত বিন্দু ফোঁটা -ও। টেনে নিয়ে যেতে লাগলো পথের ধারের ভাঙ্গা, পোড়া একটি বাড়িতে। ততক্ষণে ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছিলো। ম্যামার জামা লেপ্টে গেছিলো তার বাড়ন্ত শরীরের সাথে। রিদের চোখে মুখে তখন অন্য কিছু। শ্যামা সেদিন বার বার নিজেকে দোষারোপ করেছিলো, কেনো? কেনো এই ছেলেটিকে সে ভালোবেসে ছিলো?

কিন্তু…. কিন্তু আল্লাহ যেন তার দিকে চোখ মেলে চাইলো। পর তিনটে গাড়ি এদিকে আসতে দেখে রিদ ভয় পেয়ে গেলো। গাড়িটি আর কারো না.. ইজহানের দাদি আলিয়ার ছিলো। তখন উনি ছিলেন এই এলাকার নেত্রী। ভয় পেতো সবাই তাকে।

আলিয়ে একটি মিটিং থেকে ফিরছিলো। পথের ধারে একটি মেয়েকে কিছু ছেলের সাথে দেখে তার চিন্তে অসুবিধা হলো না মোটেও এটি আজিজুল হকের মেয়ে। আর হুমায়ুন চৌধুরীর ছেলে। কিন্তু তারা এখনে শ্যামার সাথে এমন ব্যবহার কেন করছে? ভাবতেই গাড়ি থেকে নেমে তাদের সামনে আসে আলিয়া। সুন্দর প্রগাড় কন্ঠে কঠিন ভাবে প্রশ্ন করেন,

” রিদ? শ্যামার সাথে জোরাজোরি কেন করছো?”

রিদের রাগ যেন বাড়ছিলো। তৃতীয় ব্যক্তির নাক গলানো দেখে রেগে বলল,

“নান ওফ ইউর বিজনেস! ”

আলিয়া বুঝতে পেড়ে গেছিলো, বেয়াদব রিদ কি করতে চায়ছে। সে শ্যামার কাঁদো কাঁদো ফোলা মুখটা দেখে বলল,

“শ্যামা গাড়িতে বসো৷”

শ্যামা মাথা সম্মতি দিয়ে তাই করতে গেলো, রিদ ছাড়লো না উল্টো আরো চেপে ধরলো। তখনি আলিয়ে তার গার্ডসদের ডেকে বলল,

“এই ছেলেটিকে পুলিশ স্টেশনে নিয়ে যাও । , ”

এ পর্যায় রিদের চোখে মুখে ভয়ের ছাপ দেখা গেলো। রিদের বাবা হলেন বড় এডভোকেট। যত ঝামেলাই রিদ করতো না কেন? তার বাবা সামলে নিতো সব সময়। কিন্তু, আলিয়া যদি, কিছু করে? তাহলে হুমায়ুন নিজে-ও কিছু করতে পারবে না। সেদিন শ্যামা বেঁচে তো গিয়েছিলো। কিন্তু ইজহান যে এই মেয়েকে পছন্দ করতো, তাও আলিয়া জানতো।কিন্তু সে পছন্দ করতো না মেয়েটিকে। বরাবরই মেয়েটিকে তার কাছে উশৃংখল, উড়নচণ্ডী, ঠোঁটকাটা স্বভাবের মনে হয়েছে। তাও আবার আজকে এমন এক পরিস্থিতিতে দেখে আরো খারাপ ধারণা তৈরি হয়েছে। এই মেয়েটিকে কখনোই মেহরাব বাড়ির বউ করবেন না তিনি। সেদিন না পেরে কিছু তিক্ত কথাই বলেছিলেন আলিয়া,

” এভাবে শরীর দেখিয়ে চললে তো ছেলেরা ঘুর ঘুর করবেই। তোমাদের মত মেয়েদের লজ্জা থাকা উচিত! বাবা-মা সারাদিন টাকার পিছনে ছুটে, মেয়ে কি করছে না করছে? কোনো খেয়াল নেই!”

শ্যামা গাড়িতে বসে শুধু চোখের জল ফেলেছিলো। মনে মনে শুধু বার বার বলছিলো, ককনো যেন এই দজ্জাল মহিলার সাথে আর তার দেখা না হোক। অথচ ভাগ্যের কি পরিহাস। ওই দজ্জাল মহিলা আজ তার দাদি শাশুড়ী।

————

কোনো এক বন্ধ ঘরে চোখ, মুখ, হাত পা বাঁধা অবস্থায় শ্যামা। কানের মাঝে ভেসে আসচ্ছে জাহাজের শব্দ আবার থেকে থেকে আসচ্ছে পাখিদের মিষ্টি কন্ঠ। শ্যামা নিজের হাতের বাঁধন খুলতে চেষ্টা করছে। কোথা সে? তার ছোট বোনটি কোথায়? জান্নাতের কোনো ক্ষতি হলো নাতো??
শ্যামার মাথার মাঝে হাজারো চিন্তার ভিড়ে একটি পুরুষালী কন্ঠ ভেসে এলো। শ্যামা কান খাড়া করে শুন্তে লাগলো সেই আগুন্তক কথা…

“তোমার অপেক্ষায়,
পাড় হলো দিন,
পার হলো মাস,
পাড় হলো বছর,
শেষ পর্যন্ত উঠলো,
এক ফালি চাঁদ…
আঁধারিয়া অম্বরের বুকে…

শ্যামার গায়ের লোম দাঁড়িয়ে গেলো। পুরোনো কিছু অনুভূতি নাড়া দিলো মনে। বুকের ভেতর ডিপ ডিপ করে বাদ্য বাজাতে লাগলো হৃদপিণ্ড । বিড়বিড় করে বলল,

” সুফিয়ান…..”
#আঁধারিয়া_অম্বর
#সুরাইয়া_সাত্তার_ঊর্মি
২০।

একটা পুরুষালী মিষ্টি গন্ধ নাকে ঠেকছে শ্যামার, পরিচিত সেই গন্ধ। শ্যামার মস্তিষ্কের নার্ভ যেন ধীরে ধীরে অচেতন হয়ে যাচ্ছে। শরীরে ভর করছে অসাড়তা। এত বছর.. প্রায়… ১১ টা বছর এই ব্যক্তিটির জন্য অপেক্ষা করেছিলো শ্যামা, সাত বছর আগে সেই দিনটি এখন ভুলতে পারেনি শ্যামা। প্রথম বার.. প্রথম বার দেখা করতে গেছিলো এই আগুন্তকের সাথে। কিন্তু সে আসেনি। চোখ বাঁধা শ্যামার ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটলো। অতিমাত্রায় আতঙ্ক, ভয়ের জন্য কি না! তার মস্তিষ্ক সুফিয়ানের অবয়ব তৈরি করছে? শ্যামা এবার চুপ করে গেলো। ঘর ভর্তি মৌ মৌ করছে সুবাস। শ্যামার এবার একটু ভয় করতে লাগলো। তার খুব কাছে এসে কেউ একজন দাঁড়ালো। স্পর্শ করলো গালে। নরম কন্ঠে ফিসফিস করে বলল,

“মনে পড়ে? আমাদের সেই প্রথম চাঁদ দেখার কথা?
মনে পড়ে? রাত জেগে হাজার তারার ভিড়ে, দুজন দুজনকে খুঁজা?
মনে পড়ে? সেই মুঠোফোনের এপার-ওপার হৃদছন্দের মিষ্টি স্বর?
মনে পড়ে সেই নিশ্বাস , যার শব্দ কানে না গেলে, ঘুমাতে পাড়তো না সেই সুফিয়ান?”

শ্যামা এবার কাঠ হয়ে গেছে। অগণিত গড়িয়ে পড়ছে চোখের কোনের জলের ফোয়ারা। শ্যামার টিকালো নাকটাও লাল হয়ে এসেছে টমেটোর মতো। সে দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললো ইজহান। শ্যামা চুপ। এখন তার মস্তিষ্কের সাথে লড়াই করে যাচ্ছে। সে বুঝতেই পারছে না, যা হচ্ছে? এটা কি সত্যি? নাকি কোনো কল্পনা? শ্যামার এই মুহূর্তেই মন চাইছে খুলে ফেলতে চোখের বাঁধান, হাতের বাঁধন। একটা বার… একটা বার দেখতে ইচ্ছে করছে সামনের ব্যক্তিটিকে। হাজার… হাজার প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করছে এই লোকটিকে। কিন্তু কি অদ্ভুত! মুখে রা নেই শ্যামার। শ্যামা বলতে চাইছে, চিৎকার করতে চাইছে, চেচিয়ে বলতে চাইছে,

“কেনো? কেনো এলে না সেদিন? কেনো.. কেনো এভাবে ধোকা দিলে আমায়? ”

শ্যামার মাথায় এবার তীব্র ব্যথা করছে..। সে এবার ঠোঁট নাড়লো,

“সুফিয়ান… ইট’স ইউ?”

ঠোঁট জেনে অনেক কাঁপছে শ্যামার। সে অধির আগ্রহে আগুন্তকের বলা কথা শোনার জন্য অপেক্ষা করছে…. সামনে থেকে কোনো বাক্য ভেসে এলো না… উল্টো পায়ের শব্দ হলো। হয়তো সুফিয়ান চলে যাচ্ছে? শ্যামা এবার চেয়ার থেকে উঠতে চাইলো, চিৎকার করে বার বার বলল,

“সুফিয়ান… আমি জানি এটা তুমিই… প্লিজ যেও না….. প্লিজ। সুফিয়ান????”

ততক্ষণে দরজা বন্ধ হয়ে গেলো। ঘরের মাঝের কিছুক্ষণ আগের সেই মিষ্টি গন্ধটা এখন রয়ে গেছে। শ্যামা শুধু কেঁদেই যাচ্ছে। মনে হচ্ছে আবারো েকবার হারিয়ে ফেলেছে সুফিয়ানকে??

—————–

রিদ পায়চারি করছে। মাথা বিন্দু বিন্দু ঘাম। তখনি হুমায়ুন ঘরে প্রবেশ করলো। চোখে মুখে চিন্তার ছাপ। রিদ চেচিয়ে বলল সেই সময়,

” বাবা শ্যামা কোথায়? তুমি বলেছিলে তোমার কাছে শ্যামা। তাহলে.. তাহলে কোথায় সে?”

হুমায়ুন চৌধুরী বলল,

“আমার লোক তাদের নিয়েই আসছিলো, আর তখনি… তখনি তাদের উপর কারা জানি এট্যাক করে.. আর ওদের..!”

রিদ রেগে তার বাবার কলার চেপে ধরে বলল,

“আমি অত কিছু জানি না, আমার শ্যামাকে চাই বেস। নয়তো, সব সব ধংস করে দিবো!”

হুমায়ুন চৌধুরী ভয় পেয়ে যান। ছেলের এমন রূপ আর কখনো দেখেন নি তিনি। ঠিক তখনি একটি লোক ছুটে এসে বলল,

“স্যার রেট পড়েছে আমাদের সকল আস্থানায়। আর খবর পেয়েছি পুলিশ যে কোনো মুহূর্তে এখানে আসচ্ছে। ”

রিদের রাগ আরো বেড়ে গেলো। রাগের বসে এক লাথি বসালো সামনের টেবিলে। আর চেচিয়ে বলল,

“ইজহান… তোকে আমি ছাড়বো না!”

সেই মুহূর্তে ভেসে এলো শীতল, ঠান্ডা, বরফ কন্ঠ। বলল,

” আমি তোমার সামনেই আছি কি করবে তুমি? আছে নাকি কিছু করার ক্ষমতা? ”

রিদ রাগে ইজহানের দিকে তেড়ে যেতেই পিছন থেকে পুলিশের একদল বেড়িয়ে তাদের ঘিরে ফেলো। রিদ যেন আকাশ থেকে পড়েছে। ইজহান বাঁকা হেসে বলল,

” লুকোচুরি খেলা না হয় এবার শেষ হলো…! দ্যা গ্রেট মাফিয়া লিডার এখন কারাদণ্ডে.. নাইছ হেডিং না!”

রিদ কিড়মিড় করে উঠলো,

“আমি তোকে ছাড়বো না!”

ইজহান বলল,

” আগে নিজে মুক্ত হো। তারপর দেখা যাবে ছাড়বি কি ধরবি!”

রিদ রাগে শুধু ফুসতেই লাগলো। ইজহান আবার হেসে বলল,

” আশা করছি.. তোর জেলের সফর খুব রোমাঞ্চকর হবে! অফিসার প্লিজ। ”

এগিয়ে এসে রিদকে এক পুলিশ নিয়ে যেতে লাগলো। তখনি ইজহান আবারো ফিসফিস করে বলল,

“বলেছিলাম, শ্যামাকে তুই স্বপ্নে পাবি!”

রিদ শুধু কিড়মিড় করতেই লাগলো।

এদিকে যেই হুমায়ুন মুখ খুললো,

“ইজহান… এসব কি করছো? তুমি কোন ব্যাসিসে রিদকে এরেস্ট করাচ্ছো?”

ইজহান হেসে বলল,

” কটা বলবো বলুন তো আঙ্কেল? মুলত মাথাটা ওর আপনি নষ্ট করেছেন, এরেস্ট তো আপনাকে করানো উচিত। ”

হুমায়ুন থতমত খেয়ে বলল,

” আমি তোমাদের নামে মান হানির কেইস করবো!”

ইজহান হেসে বলল,

” ওহো শিউর।”

বলেই পা বাড়ালো। তারপর আবার পিছনে ফিরে বলল,

“বাই দ্যা ওয়ে আঙ্কেল, আপনার লাইসেন্স কিন্তু ক্যান্সেল করা হয়েছে। ”

হুমায়ুন চৌধুরীর মাথায় বাজ পড়লো এবার বলল,

“কিন্তু কেন?”

ইজহান কাঠ গলায় বলল,

“একটি অসহায় মেয়েকে জালিয়াতি করে তার বাবার সই নিয়ে বিক্রি করার মিথ্যা উইল করার জন্য।”

হুমায়ুন চৌধুরী জায়গায় জমে গেছে। চোখ বড় বড় করে দেখছে ইজহানকে। ঠান্ডা, চুপচাপ স্বভাবের ছেলেটি কিভাবে ঠান্ডা ভাবেই বাজি পালটে চলে গেলো…! হুমায়ুন চৌধুরী শুকনো ঢুক গিললো শুধু।

—————–

স্নিগ্ধ দুপুর, মৃদুল হাওয়ার ঝাপটা পড়ছে ম্যামার মুখে। চলতি গাড়ির বাহিরে তার স্থীর দৃষ্টি। থেকে ছোট ছোট চুল উড়ছে। আনমনে থাকা শ্যামার শুকনো মুখটি দেখে বড্ড মায়া হচ্ছে ইজহানের পুরোনো হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসা আবারো খট খট করে নাড়া দিচ্ছে মনের দরজায়। গাড়ির মাঝে এখন পিনপতন নিরবতা। ইজহান গাড়ি চালাচ্ছে বার বার তাকাচ্ছে আনমনা এই নারীর দিকে। মেয়েটিকে চাইলেও সে বলতে পারে সেই তার সুফিয়ান। কিন্তু… কিন্তু কোথা একটা আটকা পড়ে যায় ইজহান। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বাহিরে চেয়ে রইলো সে। তখনি পিছন থেকে জান্নাত বলে উঠলো,

“বড়পু, আজ ইজহান ভাইয়া, সময় মত না আসলে, রিদ ভাইয়া আমাদের হয়তো গুম করে দিতো। যতবার এসব মনে হয়, গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যায়।”

শ্যামা বাহিরে তাকিয়েই বিষন্ন উদাসীন কন্ঠে বলল,

“ভুলে যা সব!”

জান্নাত হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়লো। ততক্ষণে গাড়ি এসে থামলো ইজহানদের বাড়ির সামনে। শ্যামা অবাক হয়ে বলল,

” এখানে আনলেন যে?”

ইজহান গম্ভীর কন্ঠে বলল,

” এখন থেকে এখানেই থাকবে!”

শ্যামা বলল,

“কিন্তু!”

ইজহান তাকালো একবার নিষ্প্রাণ চাহনিতে। মনে হচ্ছিল চোখ দিয়ে ভস্ম করে দিবে শ্যামাকে। শ্যামা যা বলতে চেয়ে ছিলো, সব টুকু কথা গিলে ফেললো।
তারপর হাটা ধরলো বাসার ভিতর। আর তখনি,

চলবে,
চলবে,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here