আঁধারিয়া অম্বর পর্ব ২৩+২৪

0
146

#আঁধারিয়া_অম্বর
#সুরাইয়া_সাত্তার_ঊর্মি
২৩।

রাত যতই আধাঁরিয়াই হোক… সকালের জ্বল জ্বল মিষ্টি রোধ দূরে করে দেয় এক নিমেষে। ভুলিয়ে দেয় রাতের আঁধার কতটুকু কালো ছিলো। শ্যামা বিছানায় গুটি শুটি মেরে শুয়ে। মুখের উপর পড়ছে ঝিলমিল রোদের মিষ্টি আলো। নাকে ভেসে আসচ্ছে বেলীফুলের সুভাষ…. শ্যামার ফুলের ঘ্রাণে ঘুম ভেঙে গেলো। আড়মোড়া ভেঙে চোখ খুলতেই এক মুঠো বেলীফুল দেখতে পেলো সাইড টেবিলে। সাথে গোলাপ একটুকরো কাগজ। শ্যামা ভিষণ অবাক হয়ে হাতে নিলো গোলাপি চিরকুটটা…. কাগজের মাঝ থেকে ভুড়ভুড় করে আসচ্ছে বেলীফুলের গন্ধ….

শ্যামা নাক টেনে সুভাষ নিলো। মুখে এক চিলতে ফুঁটলো হাসি। শ্যামা যখন সুফিয়ানের সাথে কথা বলতো, তেমনি একটি রাতের শেষ ভাগে কোথা থেকে যেনে ভেসে আসচ্ছিলো বেলীফুলের সুভাষ। শ্যামা এভাবেই লম্বা শ্বাস টেনে ঘ্রাণ নিয়েছিল বেলীফুলের। এবং সুফিয়ানকে আদরে আহ্লাদে বলেছিল,

” শোনো সুফিয়ান! তুমি তোমার এক ফালি চাঁদের জন্য খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে বেলীফুল নিয়ে আসবে…! যেন তোমার চাঁদ বেলীফুলের সুভাষ নিয়ে ঘুম থেকে উঠতে পারে… বুঝলে?”

সুফিয়ান প্রতিউত্তরে শুধু,

“হুম ”

বলেছিলো। তাতেই শ্যামা আত্মাহারা হয়ে এক গাদা চুমুর বর্ষণ করে বসে ছিলো ফোনের ওপার থেকে। কিন্তু শ্যামা বুঝতেও পারেনি…! সুফিয়ান দ্যা সিক্রেট বয়… তাদের বাগানে তার পরের দিনেই একটা নয় গুনে গুনে দশটা চারা গাছ লাগিয়ে ছিলো নিজ হাতে….

শ্যামা তার পুরোনো স্মৃতি থেকে ফিরে এলো। হাতে চিরকুটটির গোটা গোটা অক্ষর গুলো মিলিয়ে পড়তে লাগলো,

” একটি সুন্দর সকালের শুভেচ্ছা…
খাবার খেয়ে দেন অফিসে যেয়ো। আর আমি তোমাকে আনতে অফিসে যাবো, অপেক্ষা করো…!”

শ্যামা নিষ্পলক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো ইজহানের দেয়া চিরকুটটির দিকে। বুক চিঁড়ে দীর্ঘশ্বাস বেড়িয় এলো এবার তার বুক চিঁড়ে…. একটা সময় এসব কিছুর স্বপ্ন দেখতো শ্যামা.. শুধু… শুধু আজ মানুষটা ভিন্ন।

তবে…
হুটহাট ইজহানের পরিবর্তনের কারণ কি?? সে কি তার ভুল গুলো শুধরে নিতে চাইছে? নাকি এর পিছনে আছে অজানা কোনো সত্য..! নাকি এটিও তার প্রতিশোধ নিয়ার কোনো অংশ??

শ্যামা আর ভাবতে পারলো না। তার এখন শুধু নিজের মাকে নির্দোষ প্রমাণ করাই লক্ষ্য… এক মাত্র..!

এসব ভেবেই দৌড়ে রেডি হতে চলে গেলো শ্যামা। ফ্রেস হয়ে, সাদা একটি জামা গায়ে জড়িয়ে ব্যাগ হাতে নেমে এলো নিচে। ঘড়িতে তখন ৯ টা ৫ মিনিট। খাবার টেবিলে আসতেই দেখতে পেলো, আরমান, আয়ানা আর তাদের শ্রদ্ধেয় দাদীজান বসে। শ্যামাকে দেখেই আয়ানা নাক ছিকটে ফেললো। বলল,

“দাদীজান আমার খাবার শেষ আমি চললাম।”

বলেই উঠে চলে গেলেন। দাদীজান নিজেও বেড়িয়ে যেতে যেতে এক পলক শ্যামার দিক নজর বুলিয়ে বলে গেলেন,

” এ বাড়িতে থাকতে হলে… কিছু রূলস আছে মানতে হবে। মনে থাকে যেনো!”

শ্যামা চুপ করে রইলো। চেয়ার টেনে বসতেই আরমান ধারালো অথচ নরম কন্ঠে বলল,

” আপনার জন্য আমার ভাই আগে অনেক কষ্ট পেয়েছে। এবার এমন কিছু করবেন না যাতে সে কষ্ট পায়, আদার ওয়াইস… আই শুট ইউ!”

বলেই সে-ও টেবিল ছেড়ে চলে গেলো। শ্যামা আরমানের যাওয়ার দিকে চেয়ে রইলো। কিছুই ঢুকলো না তার মাথায়.. আগে কষ্ট পেয়েছে মানে কি? দু ভাইয়ের চরিত্র একই রকম। কথায় কথায় হুমকি ধামকি। এসব ভেবেই ব্রেডে কামুড় বসালো শ্যামা। তখনি পিছন থেকে জান্নাত হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,

” বড়পু! আমাকে একটু ছেড়ে দিবে অলরেডি অনেক দেড়িয়ে হয়ে গেছে। ভার্সিটির প্রথম দিন-ই লেট!”

শ্যামা আশ্বস্ত করে বলল,

” দিবো দিবো। এতো হায়পার হোস না। আগে নাস্তা করে নে!”

” না না আপু… প্লিজ এখন চলো। আমি কেন্টিন থেকে খেয়ে নিবো কিছু!”

“আচ্ছা বাবা আচ্ছা! ”

হেসে উত্তর দিয়ে দুজনেই বেড়িয়ে গেলো। দশ মিনিটের মাথায় জান্নাতকে নামিয়ে চলে গেলো অফিসে! এতদিন পর অফিসে যাওয়া শান্তনু রাগ রাগ চোখে তাকিয়ে এত এত কথা শুনিয়ে তার পর শ্যামাকে ছাড়লো। শ্যামা সব গিলে নিলো। চাকরিটা যে তার প্রয়োজন। ডেস্কে বসতেই সিনথিয়া নামের মেয়েটি বলল,

” এভাবে কাজ করতে থাকলে দু দিন পর তোমার জায়গায় অন্য কেউ বসবে! তাতে অবশ্যই আমারই ভালো। আমার এক বান্ধবী এপ্লাই করে রেখেছে বুঝলে… তুমি ছাড়লেই তাকে তোমার সিটে বসাবো! হুম.. বলছি কি? ছেড়েই তাও চাকরিটা!”

শ্যামা চোখে মুখে রাগ নিয়ে বলল,

” এত-ই যখন বান্ধবীর জন্য দরদ? তোমার চেয়ার টাই ছেড়ে দাও না! অন্যের সিটের উপর শকুনের মতো উৎ পেতে না থেকে!”

সিনথিয়া রেগে কিড়মিড় করে বলল,

” এক দিন তোমাকে বের করবোই এখান থেকে!”

শ্যামা তাচ্ছিল্য ছুঁড়ে হেসে বলল,

“হ্যাঁ হ্যাঁ অবশ্যই.. তবে তোমার স্বপ্নে!”

বলেই শ্যামা নিজের কাজে মনোযোগ দিলো। আর এদিকে রাগে ফোঁসফোঁস করতে লাগলো সিনথিয়া..।শ্যামা সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ না করে পেন্ডিং কাজ গুলো শেষ করে ফেললো। দুটো প্রায় বাজে। হাতে আরো এক ঘন্টা। শ্যামা এবার একটু টান টান করে বসলো। হাত পা ব্যথা করছে তার। ঠিক তখনি শান্তনু একটি ফাইল এনে ধরিয়ে দিলো শ্যামার হাতে। এবং বলল,

” তিন দিন সময় পাচ্ছ এই কাজের জন্য। নয়তো ইউ আর ফাইয়ার!”

শ্যামা ছোট শ্বাস ছাড়লো। ফাইলটা খুলে পড়তে শুরু করলো। এখনকার পরিচিত মুখ আরিয়ান শেখের সম্পর্কে একটি গুজব… সে কি বিবাহিত? আবার অনেক জায়গায় এমন ও খবর আছে.. তার একটি বাচ্চা-ও আছে। শ্যামা এতটুকু দেখেই হতাশার শ্বাস ফেলে। কেন? কেন? তরকাদের নিজের সম্পর্কে এসব লুকাতে হয়? আর না থাকলে।। এসবের স্টেটমেন্ট দিলেই তো হয়! যে সব গুজব। তাহলে তো এত খাটতে হয় না শ্যামাকে… শ্যামা এসব ভাবছিলো। ঠিক তখনি তার পেটে তীব্র পিড়া অনুভব হতে লাগলো। চট জলদি ওয়াশরুম চলে গেলো সে। এবং চমকে উঠলো খুব। কিছুদিন আগেই তো তার পিরিয়ড শেষ হয়েছিলো। তাহলে? তাহলে এভাবে… হটাৎ ব্লাড? এর এমন ব্যথার মানে কি?”

শ্যামা ব্যথা সইতে না পেরে পাশের ক্লিনিকে এসে চেকাপ করালো। রিপোর্ট আসতেই ডাক্তার তাকে যা বললো। তাতেই বুক ফেঁটে পড়লো। কান দুটি লাল হয়ে গেলো। নিজের অজানতেই জল গড়িয়ে পড়লো এক ফোঁটা। শ্যামা কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলল,

” আমি.. আমি.. প্রেগনেন্ট ছিলাম!”

ডাক্তার নবনিতা মাথা নাড়লেন,

” হ্যাঁ আপনি কনসিভ করেছিলেন ২ সপ্তাহ যাবৎ। তবে…!”

“তবে!”

“মিসক্যারেজ হয়ে গেছে আপনার।”

শ্যামা কান্না জড়িত কন্ঠে বলল,

” কিন্ত কেনো?”

ডাক্তার কিছুক্ষণ চুপ রইলেন। তারপর শ্যামার হাতের উপর হাত রেখে হালকা চাপ দিয়ে বলল,

” আপনার শরীরে আমরা এম এম কিট খুঁজে পেয়েছি। যেটি খেলে বাচ্চা নষ্ট হয়ে যায়..!”

শ্যামা অবাক হয়ে বলল,

“কিন্তু আমি.. আমি এমন কোনো ঔষধ খায় নি!”

ডাক্তার বললেন,

“আপনি নিজ থেকে না খেলে-ও কেউ তো আপনার শরীরে যে কোনো ভাবে এটি পুষ করেছে।”

শ্যামার পুরো দুনিয়া যেন উল্টে পাল্টে যেতে লাগলো। নিজের পেটের মাঝে হাত বুলিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লো৷ সে জানতেও পারলো না? তার বাচ্চা দুনিয়ায় আসার আগেই হারিয়ে গেলো? শ্যামা কি করবে এখন? এই খবর কি সে ইজহানকে দিবে? কারণ এই বাচ্চার পিতা তো… সে। শ্যামা খুব কষ্ট সামলে নিয়ে অফিসে আবার ছুটে গেলো। এক ঘন্টা ব্রেক নিয়েই এসেছিলো সে। অফিসে বসে আর মনোযোগ দিতে পাড়লো না কাজে। হাতে রিপোর্টের দিকে বার বার চোখ বুলিয়ে যেতে লাগলো। ভাবতে লাগলো কে সেই নিকৃষ্ট মানুষ? যার জন্য আজ তার বাচ্চা এই পৃথিবীর মুখ দেখতে পেলো না? আর যাই হোক কোনো মাকি তার সন্তান হারিয়ে যাওয়ার কষ্ট সইতে পারে? শ্যামা কাউকে ছাড়বে না।

ঘড়ির কাঁটার সময় অতিবাহিত হতে লাগলো। পাঁচটার কাঁটা টিক টিক করে বেজে উঠতেই শ্যামার ফোনে মেসেজ এলো,

“আমি অপেক্ষা করছি!”

শ্যামা মন মরা হয়ে রিপোর্ট গুলো তুলে নিচে হাটা ধরলো। সামনেই ইজহানের কালো গাড়িটি দাঁড়িয়ে আছে। শ্যামা কাঁপা কাঁপা পায়ে এগিয়ে গেলো সেখানে। গাড়িতে উঠে ভয়ে ভয়ে তাকালো ইজহানেরর শুভ্র মুখ, আর শক্ত চোয়ালের মিষ্টি হাসির দিকে। শ্যামা রিপোর্ট কার্ড গুলো শক্ত করে ধরে ইজহানকে বলতে চাইলো তার মৃত বাচ্চার কথা কিন্তু, অজানা ভয়! অজানা আশঙ্কায় থেমে গেলো। মনের মাঝে প্রশ্ন উঁকি দিলো,

“আচ্ছা? ইজহান যদি বাচ্চাটা না চাইতো? তখন… তখনি কি হতো?”

শ্যামা এবার রিপোর্ট গুলো পার্সে লুকিয়ে ফেললো। তখনি ইজহানের ঝংকার তুলা কন্ঠ ভেসে এলো,

“কেমন কাঁটলো আজ তোমার দিন?”

শ্যামা চকিতে তাকালো ইজহানের হাসোজ্জল মুখের দিকে। অল্প আওয়াজে বলল,

” ভা..লো!”

ইজহান প্রতিউত্তরে আবার হাসি দিলো। শ্যামা কিছু ভেবো তখন বলল,

“আচ্ছা একটা কথা জিজ্ঞেস করি?”

ইজহান মাথা নেড়ে সম্মতি দিলো। শ্যামা বলল,

” আ.. মি য.. দি কখনো কনসিভ করি তখন?”

ইজহান খানিকক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর বলল,

——-
#আঁধারিয়া_অম্বর
#সুরাইয়া_সাত্তার_ঊর্মি
২৪।
ইজহান মাথা নেড়ে সম্মতি দিলো। শ্যামা বলল,

” আ.. মি য.. দি কখনো কনসিভ করি তখন?”

ইজহান খানিকক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর বলল,

” তুমি কনসিভ করেছো?”

কিছুটা গম্ভীর শুনালো ইজহানের কন্ঠ। শ্যামা আমতাআমতা করে বলল,

” এমা না.. না.. তেমন কিছু না। আমি শুধু জানতে চাইছি, যেহেতু আমরা একটা কন্ট্রাকের মাঝে আছি! সেখানে কোথাও লিখা ছিলনা এ বিষয়ে তাই আর কি…!”

গাড়িটা জোরছে ব্রেক কসে ইজহান ঠান্ডা দৃষ্টিতে তাকালো শ্যামার দিকে। শ্যামা ভয় পেয়ে গেলো একদম। ইজহানের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো। ইজহান গম্ভীর কন্ঠে বলল,

” নামো..!”

শ্যামা বুঝতে পারলো না। লোকটা কি রেগে গিয়ে অর্ধেক রাস্তায় ছেড়ে দিয়ে যাবে নাকি? সে বলল,,

” হুমম!”

ইজহান আবার বলল,

“গাড়ি থেকে নামো!”

শ্যামা অবাক হয়ে বলল,

” কিন্তু কেন?”

ইজহান চোখের ইশারায় বাহিরে তাকিয়ে বলল,

” বাড়ি এসে গেছে তাই!”

শ্যামার জানে জান এসে গেলো যেন। বাহিরে এক ঝলক তাকালো, কখন বাড়ির বাহিরে এসে দাঁড়িয়েছে গাড়ি বুঝতেই পারেনি ইজহান। শ্যামা হাসার চেষ্টা করে বলল,

” ওহো হ্যাঁ বাড়ি.. বাড়ি এসে গেছি…!”

বলে গাড়ির দরজা খুলে বের হয়ে গেলো শ্যামা। এদিকে শ্যামা যেতেই ইজহান হাসলো। মনের কোনে দমিয়ে রাখা এক্সপ্রেশন বেড়িয়ে এলো এবার। চট করে ফোন বের করে অধিরাজকে কল করলো। অধিরাজ ফোন তুলতেই শুনতে ফেলো তার বসের খুশিতে গদগদ হওয়া কন্ঠ। ইজহান বলল,

” আধিরাজ… আমি.. আমি মনে হচ্ছে বাবা হতে চলেছি। আমি.. আমি কি করবো? বলো তো? বাচ্চার জন্য খেলনা কিনবো আগে? না দৈনন্দিন সামগ্রিক? না না? আগে ডাক্তার দেখাই? কি বলো? আরে কথা বলছো? না যে? বলো কিছু! আমি কি করবো?”

অধিরাজ ইজহানের প্রতফুল্লো কন্ঠ শুনে কি বলবে বুঝতে পারছেনা। সে ধাতস্থ হয়ে বলল,

” স্যার আপনি শান্ত হোন আগে! আপনি কি শিউর? ”

ইজহান বলল,

” নাহ্ তবে.. শ্যামা বলল, কনসিভ এর কথা। হুট করে এমনিতে বলবে না সে তাই না?”

অধিরাজ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

” স্যার তাহলে বরং আগে চেক-আপ করিয়েন।”

ইজহান মাথা নাড়লো,

” তাই হবে!”

বলেই গাড়ি থেকে সে-ও নেমে পড়লো। এদিকে শ্যামা সিঁড়ি দিয়ে উপরে যাচ্ছিলো। গেস্ট রুম ক্রস করতেই কিছু টুকরো কথার মাঝে তার নাম শুনে থমকে গেলো। কন্ঠের মালিক তার অচেনা। কিন্তু তার সাথের জনের কন্ঠ যে নিপার সে ভালোই বুঝতে পারছে..

” মেডাম স্যার যদি জানতে পারে, আপনার কথায় আমি এত বড় পাপ করেছি স্যার আমাকে মেরে ফেলবে।

অচেনা মেয়েলি কন্ঠ ভেসে এলো এবার,

” কেউ জানবে, ভয় পাচ্ছো কেন? তুমি কাউকে বলবে না, এ বাড়িতে আমি এসেছিলাম? তাও যেন কেউ জানতে না পারে!’

এর পর নিপার কান্না কন্ঠ ভেসে এলো,

” স্যার জানলে আমাকে মেরে দিবে!”

” তুমি ভয় কেন পাচ্ছো? আমি আছি তো? তুমি যেভাবে শুরু থেকে আমার কথা মত চলেছো তেমনি চলো না।”

” আমার এবার ভয় করছে, যদি তারা জানতে পেরে যায়?”

“তুমি শুধু৷ ভয় পাচ্ছো কেউ জানবে না। শ্যামাকে এই ঔষধ খাওয়াতে থাকবে প্রতিদিন। ধীরে ধীরে ওর শরীরের অঙ্গ পতঙ্গ কাজ করা বন্ধ করে দিবে। শুধু আর কিছু মাস।”

এইটুকু শুনতেই লোম দাঁড়িয়ে গেলো শ্যামার শরীরের। জট জলদি রুমের দরজা ধাক্কিয়ে ভিতরে প্রবেশ করতেই আর কাউকে পেলো না শ্যামা। শ্যামা অবাক হয়ে গেলো। নিপা ছাড়া কেউ নেই ঘরটিতে। শ্যামা রাগে তেরে গিয়ে নিপাকে বলল,

” কে ছিলো এখানে?”

নিপা শুকনো ঢুক গিলে ভয়ে ভয়ে বলল,

“কেউ না মেডাম। কেউ ছিলো না।”

শ্যামা আরো কিছু বলতে নিবে তার আগেই আলিয়ার চিৎকার শোনা গেলো। শ্যামা দৌড়ে সেখানে যেতেই দেখতে পেলো, মাটিতে রক্তের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। আলিয়ার নিথর দেহ সিঁড়ির নিচে পড়ে আছে। শ্যামা এক চিৎকার দিয়ে দাদিজান বলে নেমে এলো আলিয়ার কাছে। অালিয়ার হুশ নেই। ইজহান গাড়ি পার্ক করে ফোনে কথা বলতে বলতে মাত্র ঢুকছিলো। দাদির এই হাল দেখে মাথায় আকাশ ভেঙে পরে। কাছে এসে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলল ইজহান,,

“দাদিজান? কি হয়েছে? কিভাবে হলো এমন? উঠুন!”

কোনো ফায়দা হলো না। রা নেই আলিয়ার মুখে। ফর্সা মুখে রক্তে মাখা মাখি। শ্যামা ইজহানকে উদ্দেশ্যে বলল,

“হসপিটালে নিতে হবে! নয়তো অনেক দেড়ি হয়ে যাবে, অনেক রক্ত বেড়িয়ে গেছে।”

ইজহানের চোখে জল। স্তম্ভিত সে, মার পরে দাদিজান তাদের সামলেছে। তাদের জন্যই তো তার পছন্দের রাজনৈতিক কাজ সব ছেড়ে দিয়ে তিন নাতি, নাতনিকে মানুষ করতে লেগে পড়েছে। আলিয়ার এ অবস্থা দেখে ইজহান ভেঙেই পড়েছে যেন। শ্যামা তাই দেড়ি না করে ড্রাইভারকে গাড়ি বের করতে বলে। আরেক জন কাজের মহিলার সাহায্যে গাড়িতে তোলে। ইজহান জমে গেছে একেবারে। শ্যামা তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল,

“ইজহান দাদিজানের হাসপাতাল যাওয়া জরুরি, নয়ত..! বুঝতে পারছো তো?”

ইজহান শ্যামার দিকে তাকিয়ে বলল,

” দাদিজান বেঁচে যাবে তো?”

শ্যামা মাথা নেড়ে বলল,

“ইন শা আল্লাহ! ”

——-

হসপিটালে…

ইজহান করিডরে বসে আছে। আয়ানা ভাইকে জড়িয়ে কেঁদে যাচ্ছে। আরমান তার উল্টো পাশে বসে আছে। জান্নাত শ্যামার সাথে দাঁড়িয়ে আছে৷ ঘন্টা পার হয়ে গেছে। অপারেশন এখনো চলছে। অধিরাজ অন্য পাশে বসে আছে। শ্যামা ইজহানের দিকে নিস্প্রভ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ছেলেটি বরাবরই চাপা স্বভাবের এখন আরো চুপ চাপ হয়ে গেছে। আয়ানা ইজহানকে ধরে বার বার বলে যাচ্ছে,

” দাদা ভাই.. দাদিজান ঠিক হয়ে যাবে তো? এমন কেন হলো উনার সাথে?”

ইজহান কিছু বলতে পারলো না। শুধু বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে যেতে লাগলো।

কিছুক্ষণ পর ওটির দরজা খুলে সাদা ঝকঝকে পোশাকে একটি ছেলে বেড়িয়ে এলো। বলল,

“o+ ব্লাড লাগবে। এই মুহূর্তেই।”

চকিতে শ্যামা বলল,

” আমার o+ আমি দিতে পারবো। ”

ডাক্তার তখন একজন নার্সকে ডেকে শ্যামাকে ব্লাড ব্যাংকে পাঠিয়ে দিলো। রক্ত দিয়ে শ্যামা যখন বেড় হলো তখনি একজনের সাথে ধাক্কা খেলো শ্যামা।

“আম সরি মা!”

একটি পরিচিত কন্ঠ শুনে শ্যামা চোখ তুলে তাকালো। ছিমছাম গড়নের মাঝ বয়সি মহিলাকে দেখে শ্যামা থমকে গেলো। মহিলা ততক্ষণে অনেক দূর চলে গেছে। শ্যামা যখন ঠাহর করলো,,

” মা…! মা.. বেঁচে.. বেঁচে আছে!”

ভেবেই শ্যামা মহিলার পিছনে দৌঁড়ালো। সাথে চেচাতে লাগলো,

” মা.. মা.. মা দাঁড়া-ও….মা…!”

এত বছর পর নিজের মাকে এভাবে সামনে দেখবে ভাবেনি শ্যামা। শ্যামা তো তার মায়ে মরা মুখটি দর্শণ পর্যন্ত করতে পারেনি। আচ্ছা যদি আফিয়া মারাই না যেয়ে থাকে? তাহলে কি বাবা মিথ্যা বলল তাকে? নাকি এটি তার চোখের ভুল মাত্র?

শ্যামা নিজের সব ভাবনা ঠেলে দু তালার বাহিরে ফেলে আরো জোরে দৌঁড়াতে লাগলো। ঠিক তখনি সে থমকে গেলো………

চলবে,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here