আঁধারিয়া অম্বর পর্ব ২+৩

0
72

#আঁধারিয়া_অম্বর
#সুরাইয়া_সাত্তার_ঊর্মি
২।
মধ্যরাত….!
ওয়াশরুমে ভিতর থেকে পানির কলকল শব্দ ভেসে আসচ্ছে। কিছুক্ষণের মাঝেই ওয়াশরুমের দরজা ঠেলে বের হলেন মি.ইজহান মেহরাব জহরান। তাকে দেখেই আমার ভিতরটা তীব্র বিতৃষ্ণায় নাড়া দিয়ে উঠলো। কিছুক্ষণ আগের দেয়া তার মরণ যন্ত্রনা এখন রয়েছে আমার শরীরে। যতবার আলিঙ্গন করেছে মি. ইজহান মনে হয়েছে আমার শরীর ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। বসে গেছে, কামড়, নখের আচরে দাগ। আমার সমবয়সী বান্ধবীদের কাছ থেকে জেনেছিলাম, বিয়ের রাতটুকু হয় কতটা রোমান্টিক, ভালোবাসায় ভরপুর।কিন্তু আমার বেলায় এমন হলো কেন? দ্বিতীয়বার সঙ্গমের সময়-ও এত অসহ্য যন্ত্রণা? আমি কি তার বিয়ে করা রক্ষিতা বলে?? আচ্ছা মানুষটা কি এজন্যই বিয়ে করেছে আমাকে, যে যখন, তখন মিলিত হতে পারে এমন হিংস্র ভাবে? নাকি তার অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে??আমি ভয়ে ভয়ে তাকালাম মানুষটার দিকে, কালো কুচকুচে গভীর নির্লিপ্ত চোখে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। আমি সাদা বিছানার চাদরটা জড়িয়ে নিলাম বস্ত্রহীন গায়ে। মি. ইজহান এগিয়ে এলেন তার নগ্ন পায়ে। ভেজা শরীরে বিন্দু বিন্দু পানি নিদারুণ লাগচ্ছে। ঘরের নিয়ন আলোয় চলচ্চিত্র কিং ইজহান মেহরাব জহরানকে কতটাই না মায়াময় লাগচ্ছে। কিন্তু এই মানুষটির গম্ভীর, শীতল বরফ চাহনিতে জমিয়ে দিচ্ছে আমাকে। আমি হাসার চেষ্টা করলাম। কিন্তু মানুষটি? অব্যক্ত হীন। কত শত মেয়ের স্বপ্নের রাজকুমার উনি। সুঠাম দেহের বাদামি রঙটি নিয়ন আলোয় মারাত্মক সৌন্দর্য লাগছে। উনি এগিয়ে এলেন। আমার মুখোমুখি বসলেন। চোখে চোখ মিলে দৃষ্টি মিলিত হলো। তার চোখ, মুখ দেখে কিছুই বোঝার ক্ষমতা নেই আমার। মুখ ফুটে কিছু বলার সাহস পাচ্ছি না। আমার ভাবনার মাঝে ছেদ ফেলে, তার বরফ ঠান্ডা গলায় বললেন,

“আমাদের মাঝে কি হচ্ছে না হচ্ছে তা যেন কেউ জানতে না পারে। এমনকি তোমার পরিবার আর বাহিরের জগৎ-ও!”

আমি মাথা নত করে ফেললাম। পরিবারকে কিভাবে জানবে? একটা মাত্র ছোট বোন আর বাবাই তো আমার সব। বাবা লড়াই করছে আই সি ইউর বেডে, বোনকে ফেলে রেখেছি হোস্টেলে। এই ছন্নছাড়া জীবনে কাকে কি বলবো আমি??তবুও মাথা নাড়ালাম,

“কেউ জানবে না!”

মানুষটার যেন বিশ্বাস হচ্ছেনা আমার কথা। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলে, চেপে ধরলেন আমার গাল তার শক্ত, সুঠামো হাতে। আমি কুঁকড়ে উঠলাম তার করা হঠাৎ আঘাতে। মুহূর্তেই চোখ ভর্তি হলো জলে। মি. ইজহান হিসহিসিয়ে বললেন,

“আর কেউ যদি জানতে পারেনা…! শেষ করে দিবো তোমাকে, তোমার বাবাকে আর তোমার…. বোনকে…!মাইন্ড ইট!”

আমি ভয়ে এবার সিটিয়ে গেলাম। ঘন ঘন মাথা নাড়িয়ে স্বগতোক্তির মতো বললাম,

“কে.. কেউ জানবেনা। আমি কাউকে বলবো না!”

“গুড!”

পরমুহূর্তেই গম্ভীর শীতল কন্ঠে বললেন মি. ইজহান। এবং দামি আলমিরাটা থেকে কাপড় বের করে বড় বড় পা ফেলে চলে গেলেন জোরে দরজা বন্ধ করে। আমি তার যাওয়ার পানে চেয়ে রইলাম স্থীর দৃষ্টিতে। ক্লান্ত শ্রান্ত শরীরটা এলিয়ে দিলাম বিছানায়। চোখ দুটি উপরের চলন্ত ফেনটির দিকে নিবদ্ধ করলাম। ভাবতে লাগলাম আমার জীবনের সুখের দিন গুলোর কথা। সুখ তো চলেই গেছিলো আমার জীবন থেকে এক যুগ আগে। কিন্তু গত ছয়টি মাস পুরোপুরি ভেঙে গুড়িয়ে দিয়ে গেলো আমাকে। ছোট শ্বাস বেড়িয়ে এলো আমার ভিতর থেকে। আলিশান, লাস্যময়ী ঘরটির নরম তুলতুলে বিছানায় শুয়ে চোখ পাতা ভারী হয়ে এলো। চট করেই নেমে এলো ঘুম। পাড়ি জমালাম স্বপ্নের রাজ্যে।

—————–

তীব্র একটি আওয়াজে ঘুম ভাঙ্গলো আমার। বেড সাইডে রাখা মুঠোফোনটি তুলতেই ওপাশ থেকে আমার বস ম্যানেজিং এডিটর শান্তনু ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ করে উঠলেন,

“এই শ্যামা? কোথায় তুমি? এখনো লাপাতা? চাকরি করার কি ইচ্ছে আছে নাকি? হ্যাঁ??”

ঘুম ছুটেনি তখনো আমার। ম্যানেজিং এডিটরের কথায় ধড়ফড় করে উঠে বসলাম। আমতা আমতা করে বললাম,

” না.. মানে.. স্যার আমি এখনি আসচ্ছি!”

ওপাশ থেকে বললেন তখন শান্তনু,

“অফিসে নয় ডিরেক্ট কলেজগেট পৌঁছাও। আজ মি. ইজহান সেখানে আসবেন। ব্যক্তব্য রাখবেন। গো!”

আমি মি. ইজহানের নাম শুনে থমকে গেলাম। পাশ ফিরে দেখলাম উনি নেই। সেই যে রাতে বেড়িয়ে গেছিলো? উনি আর ফিরেন নি? আমি ওপাশের মানুষটিকে বললাম,

“জি স্যার আমি আসছি!”

বলেই কলটুকু কেঁটে নেমে পড়লাম বিছানা থেকে। তড়িঘড়ি করে তৈরি হয়ে বেড়িয়ে যাবো তখনি মি. ইজহানের কেয়ার টেকার ডেকে উঠলো,

“মে.. মেডাম? স্যার বলেছেন নাস্তা করে যেতে!”

আমার বড্ড তাড়াহুড়ো ছিলো। এর মাঝেই কেয়ার টেকার নিপার কথা শুনে চমকে তাকালাম। মি.. ইজহান আমাকে খেয়ে যেতে বলেছেন? এত কেয়ার? গত দুটো দিনের ব্যবহার এতটা ভিন্ন? আমি শুকনো মুখে হাসলাম। বললাম,

“বাহিরে খেয়ে নিবো!”

বলে আবারো পা বাড়াতেই নিপার কন্ঠ চওড়া হলো,

“মেডাম স্যার আপনাকে না খাইয়া ছাড়তে নিষেধ করেছে! নয়তো কাজে বের হতে দিতে বারণ করেছে!”

আমি বিস্ময়ে বিমূঢ়। বলে কি? খাবার না খেলে বের হতে দিবে না? আমার বড্ড তাড়াহুড়ো। এরই মাঝে আবারো ফোনটা বেজে উঠলো। আমি কথা না বাড়িয়ে চটপট করে খাবার ভর্তি টেবিল থেকে জুস টুকু তুলে এক চুমুকে শেষ করে দিলাম। জুসের টেস্টটি পছন্দ হলো না আমার। কেমন ঝাঁঝালো। আমি আর সেদিকে পাত্তা দিলাম না। এক ছুটে বের হলাম কলেজ গেটের উদ্দেশ্যে।

—————

ইজহান নির্লিপ্ত ভাবে বসে আছে গাড়ির মাঝে। গাড়ি চলে এসেছে প্রায় গন্তব্যে। ঠিক তখনি রাস্তার ধারে শ্যামাকে দেখে বড্ড উদাসীন হয়ে পরে ইজহান। পরক্ষনেই এক রাশ রাগ দলাপাকিয়ে মাথায় চড়ে গেলো। ড্রাইভারকে গম্ভীর শীতল কন্ঠে আদেশ করে বলল,

” তোমাদের মেডামের উপর চালিয়ে দাও গাড়ি!”

উপস্থিত গাড়িতে সবাই থমকে গেলো। ততক্ষণে ড্রাইভার স্পীড বাড়িয়ে দিলো। ঠিক সেই মুহূর্তেই অধিরাজ চেঁচিয়ে উঠে বলল,

” মেডাম যেন ব্যাথা না পায় কবির!”

গাড়িটি ঠিক শ্যামার মুখোমুখি হতেই একদম ছিটকে গেলো কিছুটা দূরে। উদাসীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখলো ইজহান। ভাবলেশহীন তাকিয়ে আছে তার দিকে। ঠোঁটে বাঁকা হাসি।

————–

লাইভ চলছিলো। চ্যানেল টোয়েন্টি থেকে রিপোটার হিসেবে এসেছি আমি। আমি কথা বলছিলাম ছোট মাইক্রো ফোন হাতে আমার। ক্যামেরা ধরেছিলো জাহিদ। ঠিক তখন দূর থেকে একটি গাড়ি স্বা করে এসে দাঁড়ালো আমার সামনে। আমার ভয়ে যেন আত্মা কেঁপে উঠলো। আমি ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে রইলাম গাড়িটির দিকে। বুঝতে বাকি নেই এই কাজটি মি. ইজহানের। কিন্তু কেন করলেন এমন? নিজের চিন্তায় বালু ঢেলে সামলে নিলাম লাইভটি। মুখের মাঝে হাসির রেখা টেনে বললাম,

“আপনার দেখতেই পারছেন, চারিদিকে উত্তেজনা। সবাই অধির আগ্রহ নিয়ে বসে আছে মি. ইজহানের দর্শনের জন্য। ইতি মধ্যে তিনিও উপস্থিত। ”

ইজহানের শীতল দৃষ্টি এখনো মেপে নিচ্ছে আমার শরীর। অস্থিরতায় কাঠ হয়ে যাচ্ছি। ঠিক সেই মুহূর্তে তার ব্ল্যাক বিএমডব্লিউ গাড়িটি থেকে নেমে এলো ইজহান। পরনে সাদা জামা, কালো প্যান্ট
প্রতিবারের মতো নিট এন্ড ক্লিন। আমি চোখ ফিরিয়ে বেঘাত ঘটা লাইভটি আবারো শুরু করতে করতে মাইক নিয়ে এলাম মি. ইজহানের সামনে। উনি তার সুচালো ঠোঁটে হাসি ফুঁটালেন। কিছু বলবেন এমন ভাব করে শীতল বরফ কন্ঠে বললেন,

“নো কমেন্টস! ”

বলেই গটগট করে চলে গেলেন উনি স্টেজের দিকে।
রাগে পিত্তি জ্বলে উঠলো আমার। পর পর করা দুটো অপমান সহ্য হলো না। কিছুই যখন বলবি না, তো এমন কেন করলি? আর আমার লাইভটাই বা নষ্ট করার মানে কি??আমি ছোট শ্বাস ছাড়লাম। মি. ইজহানের সাথে কথা বলার জন্য পথ খুঁজে যাচ্ছি। উনি কি মেরে টেরে ফেলতে চায় নাকি আমাকে? বিয়ে করে রক্ষিতা করতে পারেন উনি! কিন্তু আমার কাজে বেঘাত ঘটনোর অধিকার তার নেই। আমি রাগে ফুঁসতে লাগলাম। ঠিক তখনি উঠে গেলেন উনি বক্তব্য দিতে,

“আসসালামু আলাইকুম। সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য। কেমন আছেন আপনারা?”

মাঠ ভর্তি মানুষদের সরগরম এক সাথে চেচিয়ে উঠলো ভালো বলে। মি. ইজহান হাসলেন। কালো কুচকুচে ঘন পলব চোখ দিয়ে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা আমার দিকে এক দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন। সেই দৃষ্টিতে কিছু একটা ছিলো। যেন ভস্ম করে দিচ্ছে যেনো। তাকিয়ে থাকা গেলো না তার দিকে। উনি আবার বললেন,

“আমি কোনো বক্তব্য দিতে আসিনি। এটা আমার কাছে বড্ড বোরিং লাগে। কিছু মনে করবেন না, আমি ডিরেক্ট কাজের কথায় আসবো। আমার শহরে যার যত অভিযোগ থাকবে তাদের জন্য আমি প্রতিটি এলাকায় একটি করে মোট ১৩ টি অভিযোগ বক্সের স্থাপন করবো। প্রতি সপ্তাহে বক্স গুলো চেক করা হবে। এবং সকলের অভিযোগ দূর করার জন্য আমি আপ্রাণ চেষ্টা করবো। তার জন্য অবশ্যই আপনাদের সাহায্য চাই আমি। কি সাহায্য করবেন তো??”

সকলেই আবার হৈ হৈ করে উঠলো। আমি তাকিয়ে রইলাম এই জনগণ আর উনার দিক। কত ভালোবাসে তারা মি. ইজহানকে। আর মি. ইজহান? নিজেও যেন এই মানুষ গুলোর জন্যই বাঁচে। কিন্তু আমি? এই আমিটাকে কেন উনি এত ঘৃণা করেন? যতবার তার চোখে চোখ পড়ে, আমার জন্য তার চোখে উদাসীন, বিরক্তি, রাগ, ঘৃণা স্পষ্ট দেখেছি। কিন্তু কেন??

আমি আকাশ কুসুম ভাবছিলাম। ঠিক তখনি কারো কন্ঠে আমার ভাবনার ছেঁদ পরে। পিছনে তাকিয়ে দেখি অধিরাজ। মি. ইজহানের ম্যানেজার। আমি হেসে বললাম,

“অধিরাজদা? কিছু বলবেন?”

অধিরাজ হালকা হেসে মাথা নাড়িয়ে বললেন,

“তোমার পায়ে চোট লেগেছে। ঔষধ লাগাওনি কেনো?”

আমি খেয়ালি করিনি কখন চোট পেলাম। পায়ের দিকে তাকাতে রক্তের ছোপ ছোপ দাগ দেখা গেলো। মনে পড়লো, তখন মি. ইজহানের গাড়ির সাথে একটু ধাক্কা লেগেছিলো কিনা। ব্যথা অনুভব হলেও পাত্তা দেইনি আমি। আমি হেসে বললাম,

“সমস্যা নেই দাদা আমি আমি মেডিসিন লাগিয়ে নিবো পরে। আচ্ছা মি. ইজহান কোথায় আছেন? উনি কি চলে গেছেন?”

অধিরাজ আবার মাথা নাড়ায়। যার অর্থ সে চলে গেছে। আমি হতাশ হয়ে বললাম,

“তার সাথে আমার কিছু কথা ছিলো। কোথায় পাবে?”

অধিরাজ বলল,

“ও তো এখন অফিসেই আছে। তুমি বরং সেখানেই যেয়ে দেখা করে আসো?”

আমি মাথা নাড়লাম। জাহিদকে আমার ব্যাগ দিয়ে বললাম অফিসে চলে যেতে। আর আমি ছুটলাম উনার অফিসের দিকে।

অফিসে আসতেই নিচে দেখা মিললো মি. ইজহানের অ্যাসিস্ট্যান্ট রুমার সাথে। হেসে হেসে বলল,

“স্যার মিটিং রুমে। ওয়েটিং রুমে বসে ওয়েট করতে হবে যে।”

আমি প্রতিউত্তরে হেসে হাঁটা ধরলাম ওয়েটিং রুমের দিকে। কিন্তু সেখানে কেউ নেই। আমি বসে কিছুক্ষণ ওয়েট করলাম। ফোনটা হাতে নিয়ে দু বার কল করলাম। রিং হতে হতে কেটে গেলো। ঠিক তখনি খট করে খুলো গেলো দরজা আর…….

চলবে,#আঁধারিয়া_অম্বর
#সুরাইয়া_সাত্তার_ঊর্মি
৩।

ঠিক তখনি খট করে খুলো গেলো দরজা আর ভিতরে প্রেবশ করলেন ৬০/৬৫ বছর বয়সের একজন বৃদ্ধা। থলথলে মোটা শরীর, চোখে মুখে বিজ্ঞ বিজ্ঞ ভাব।মুখে বরাবরের মতোই কাঠিন্যে ভরপুর । সাদা চুল। পরনে সাদা কালো দামি শাড়ি। আমি পা থেকে মাথা পর্যন্ত চোখ বুলাতেই ভয়ে গলা শুকিয়ে গেলো। এই বৃদ্ধাকে দেখে চিনতে একটু সমস্যা হলো না। এ যে রাজনীতিবিদ মি. ইজহানের দাদিজান আলিয়া এবং এই এলাকার সাবেক মন্ত্রী। আর তার সাথেই দাঁড়িয়ে আছে লাস্যময়ী এক রমনী। এটি উনার সাথে আমার প্রথম পরিচয় নয়, এর আগেও হয়েছিলো দেখা আজ থেকে ১২ বছর আগে।তখনও যেমন ছিলো উনার অভিব্যক্তি এখনো তেমনি আছে। চুল পর্যন্ত পরিবর্তন নেই। উনি কঠিন গলায় বললেন,

“এইখানে কেন এসেছো? আমার নাতির ঘাড়েতো চরেই বসেছো! এবার কি অফিসে-ও ভাগ নিতে চাও নাকি? তোমাদের মতো মেয়েদের না.. আমি হারে হারে চিনি। ছি.. টাকার জন্য বিছানায় যেতেও লজ্জা লাগে না? তোমার থেকেতো প্রস্টিটিউট ভালো! অবশ্য ঠিকি আছে যেমন মা তার তেমন মেয়েই হবে কিনা!”

আমার কান ঝা ঝা করে উঠলো। এত অপমান সহ্য করা কষ্টকর।এই মহিলাটি বদলায়নি। অহংকারে আগাগোড়া মোড়ানোই আছে। না হয় আমাকে যা খুশি বলুক। কিন্তু আমার মাকে কেন উল্টো পাল্টা বলবে? যে নেই তাকে কেন টানবে? আমার সহ্য হলো না। ধরে এলো কন্ঠ,

“দেখুন দাদিজান! আমাকে যা ইচ্ছে বলে যান। আমার মাকে টানবেন না!”

আলিয়া ধমকে উঠলেন,

“মেডাম… মেডাম ডাকবে আমাকে। শুধুই মেডাম। আর এত সাহস হয় কিভাবে হ্যাঁ? আমার মুখের উপর কথা? এত সাহস?”

আমি অবাক হয়ে দেখতে লাগলাম তাকে। আমি কোথায় মুখের উপর কথা বললাম? আমি কিছু বলার জন্য মুখ খুলবো তখনি উপস্থিত হয় মি. ইজহান। ঘরের মাঝে তখন একটা ঠান্ডা আবহাওয়া গরম আবহাওয়াকে গিলে নিলো। পকেটে দু হাত গুঁজে, ঠান্ডা শীতল চাহনি নিক্ষেপ করলেন আমার দিকে। বরাবরের মতো ভাবলেশহীন দাম্ভিক মুখখানায়। উনি গম্ভীর কন্ঠে বললেন,

“এখানে কি হচ্ছে?”

মুহূর্তেই দাদিজানের মুখের ভাব পরিবর্তন হয়ে গেলো। কাঁদো কাঁদো মুখে বলল,

“দাদাভাই, দেখ…দেখ কালকেই বিয়ে করেছিস আর আজ এই মেয়ে আমাকে কত কটুবাক্য শুনিয়ে যাচ্ছে? তুই বল মেহরিন কিছু!”

পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটিকে উদ্দেশ্য করে বললেন।আমি হকচকিয়ে গেলাম। এতো সুক্ষ্ম অভিনয়? ভাবা যায়? জল টলমল করছে চোখে। এখনি যেন টুপ করে পড়বে। আমি সাথে সাথে বললাম,

“না.. না.. মি. ইজহান আমি কিছু বলিনি মেডামকে। আমি তো শুধু…”

কথা কেটে দাদিজান বললেন,

“হ্যাঁ হ্যাঁ আমি মিথ্যা বলছি? বিয়ের একদিন-ও হয়নি আর আমি পর হয়ে গেলাম!”

পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেহরিন তাল দিয়ে বলল,

“এ কেমন কথা ইজহান? তুই দাদিজানকে অবিশ্বাস করছিস?”

আমার মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিলো। চলছে কি এসব? এরা যা নয় তাই বলে চলেছে, আমিতো কিছুই বললাম না। আমি মি. ইজহানের দিকে তাকালাম। তার চোখে রাগ, ক্ষোভ স্পষ্ট। তা দেখেই একটা অচেনা ভয় এবার আমার গোটা শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠলো। আমি বহু কষ্ট ঠোঁট দুটি ভাজ করে বললাম,

“দেখুন মি. ইজহান..”

আবারো থামিয়ে দেওয়া হলো আমাকে। গম্ভীর কাঠিন গলায় রাগ প্রকাশ পেলো,

“দাদিজান আপনি বাহিরে জান!”

কথাটা স্বাভাবিক ভাবে বললেও আমার বুঝতে বাকি নেই, কতটা অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটতে চলেছে। আমি ভয়ে ভয়ে তাকালাম মি. ইজহানের দিকে। উনি তাকিয়ে আছেন ঠিক আমার দিকে। চোখে মুখে রাগ। দাদিজান হাসলেন চাপা। পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা মি. ইজহান দেখতে পেলো না। দাদিজান চলে গেলেন মেহরিনকে নিয়ে। আমি অসহায় ভাবে তাকিয়ে বললাম,

“মি. ইজহান আমার কথা…”

আবারো কথা থামিয়ে দিলেন।আমার কথা শুনতেই নারাজ যেন উনি। মুহূর্তে একদম কাছে চলে এলেন। এবং চেপে ধরলে টেবিলের সাথে। আত্মাকে উঠলাম আমি। চোখ বন্ধ করে নিলাম। তখনি বললেন উনি,

” হাউ ডেয়ার ইউ? তুমি জানো না? সে আমার দাদিজান? তার মুখে উপর কথা বলার অধিকার কে দিয়েছে? ভুলে যেও না তুমি শুধু আমার রক্ষিতা, বউ না..!”

আমি স্তম্ভিত হলাম। অশ্রু সিক্ত চোখে তাকালাম। কানের মাঝে বারবার বাজছে ‘রক্ষিতা’ শব্দটি। আমার ভিতরটা পুড়িয়ে ছাড় খাড় করে দিচ্ছে। এই মুহূর্তে উনি টেবলের সাথে আমাকে চেপে ধরেছেন। টেবিলের কোনা আমার কোমড়ে গিথে যাচ্ছে। বড্ড ব্যথা হচ্ছে শরীরে। তার থেকে ১০০ গুন বেশি ব্যথা হচ্ছে বুকের মাঝে। নিস্প্রভ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। বললাম,

“আমি ভুলিনি মি. ইজহান। ভুলিনি। বার বার মনে করিয়ে দেয়ার প্রয়োজন নেই। আমি আমার লিমিট জানি!”

উনি তাতেও সন্তুষ্ট নয় যেন। আমার গালে এক হাতে জোরে চাপ দিয়ে বলল,

“এমন ভুল আমি দ্বিতীয় বার সহ্য করবো না। এ পৃথিবীতে আমার দাদিজান সব। উনি মনে কষ্টে পেলে পৃথিবী ধংস করে ফেলবো। মাইন্ড ইট।”

আমি মাথা নাড়ালাম। উনি এবার আমাকে ছেঁড়ে দূরে গিয়ে দাঁড়ালেন। আগের মতোই পকেটে হাত গুঁজে বললেন,

“এখানে কি জন্য এসেছো? ”

আমি চোখের জল মুছে নিলাম। ভাগ্যের সাথে সমঝাতা করে নিলাম। বললাম,

“আপনি কি আমাকে মারতে চান?”

মি. ইজহান ভ্রু কুচকে চাইলেন,

“তোমার কি মনে হয়?”

“আমার তাই মনে হয়! আপনি আমাকে মারতে চান!”

মি. ইজহান দু কদম এগিয়ে এলেন। কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বললেন,

“মারতে তো চাই, আমার রাগের দহনে পুড়ে ছাই করে নদীর বুকে ভাসিয়ে দিতে চাই!”

আমি ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে রইলাম। বদ্ধ ঘরটিতে অস্বাভাবিক নিস্তব্ধতা বয়ে যাচ্ছে। শুধু ভেসে আসছে এসির খট খট শব্দ। পুঙ্খানুপুঙ্খ নিরবতা আমার গায়ে কাঁপিয়ে তুলছে। আমি কাঁপা কন্ঠে বললাম,

“আপনার… আপনার মতলবটা কি? কি চান আমার কাছে?”

মি. ইজহান হেসে ফেললেন। পরমুহূর্তেই গম্ভীর হয়ে ক্রুদ্ধ কন্ঠে বললেন,

“গেট লস্ট! ”

কথাটি খানিকটা জোরেই বললেন উনি। যার ফলে চমকে উঠলাম আমি। মনের কথা গুলো টুপ করে গিলে নিলাম। এক পলক চোরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখে নিলাম এই অতি সুদর্শন লোকটিকে। তারপর বেড়িয়ে পড়লাম নিজের গন্তব্যে। শুধু শুধু লোকটির সামনে মাথা মেরে লাভ নেই। উনি যা বুঝেন তাই করবেন। আমি দীর্ঘ শ্বাস ফেললাম। কোমড়ের পাশটা ভালোই চোট লেগেছে। বড্ড জ্বালা হচ্ছে। আমি আর সেদিকে পাত্তা না দিয়ে,একটা সি এন জি ডেকে চলে এলাম অফিসে। ভিতরে ঢুকতেই জাহিদ ছুটে এলো। কন্ঠে তার উৎকন্ঠা,,

“বইনা কই ছিলি? খুশির সংবাদ আছেরে। আমরা এতদিন ধরে যে মাফিয়া গ্যাং টার খোঁজ নিচ্ছিলাম আজ তা সাফল্য পেতে চলেছে! ”

আমার বিষন্ন মনটা এবার একটু খুশির ছোঁয়া পেল। হেসে বললাম,

“তো চল ভাই কাজে লেগে পড়ি। তা কোথায় আসচ্ছেন তারা?”

“বোর্ড ক্লাব আজ রাত ১০ টায়। গোপন তথ্য জেনেছি, আজ নাকি তারা কজন নারীকে নিলামে তুলবে, দেশের নামি দামি লোকেরাও থাকবে এখানে, তবে খুব সচেতন ভাবে করতে হবে কাজটুকু।”

নারীকে নিলামে তুলবে শুনে মনটা আবার বিষিয়ে উঠলো। দেশ স্বাধীন আমাদের ঠিকি কিন্তু নারীর স্বাধীনতা নেই।এই লোকেদের মুখোশ উম্মোচন তো করেই ছাড়বো আমি। কাল সকালের হেডলাইন হবে এরা। এসব ভেবেই জাহিদের সাথে প্ল্যান করতে লাগলাম। ঠিক তখনি খড় খড়ে কন্ঠে বলে উঠলেন শান্তনু,

“এত খুশি হয়োও না মেয়ে, যে খেলায় নামতেছো তুমি? জানটাও যেতে পারে তোমার! বাকিটা জীবনতো এখনো পড়ে আছে। ”

আমি হাসলাম। এই নরকীয় জীবনের থেকে মৃত্যু শ্রেয়ো! আমার এই বিষাদময় জীবনের বিনিময়ে যদি সেই নারীরা একটা সুন্দর জীবন পায়, তাহলে ক্ষতি কি?

——————-

সন্ধ্যা সাতটা বেজে কুঁড়ি।
বাহিরে আজ বৃষ্টি পড়ছে টুপটাপ করে। চারিদিকে নিস্তব্ধতা। দূরে কোথা থেকে ভেসে আসছে কোলা ব্যাঙের ডাক। শহরে তখন ঝাপিয়ে নেমেছে অন্ধকার।রাস্তার স্ট্রিটলাইটের হলদে আলোয় দেখা যাচ্ছে বৃষ্টির ফোঁটা । তার সাথে ধাপিয়ে নামছে থেকে থেকে স্ব স্ব শীতল বাতাস। আমি মাত্রই পা বাড়ালাম মি. ইজহানের রাজ্যে। বাসার ভিতরটা আজ কেমন যেন গুমোট বাতাবরণ হচ্ছে। গা যেন ছমছম করে উঠেছে। আমি ধীরে ধীরে এগিয়ে এলাম। উপর থেকে ভেসে আসছে কিছু ভাঙ্গার শব্দ। আমার মাথা কাজ করছিলো না। কি হচ্ছে উপরে? সিড়ির পাশেই ভয়ে জড়সড় হয়ে আছে নিপা। আমাকে দেখেই ভয়ে ভয়ে বলল,

“মেডাম উপরে যাবেন না আজ!”

আমি জিজ্ঞেস করলাম,

“কিন্তু কেনো?”

নিপা মাথা নত করে বললো,

“স্যারের বাবা এসেছিলেন তাই!”

আমি বিস্ময় বুঁদ কিছু বলবো তার আগেই ভেসে এলো এক আর্তনাদ। আমি দাঁড়াতে পাড়লাম না। এক ছুটে উপরে আসতেই। পিছন থেকে নিপা বলে উঠলো,

“মেডাম যাবেন না, প্লিজ। ”

কিন্তু নিপার কথা আমার মানতে ইচ্ছে করলো না। আমি এক ছুটে রুমে আসলাম মি. ইজহানের। একি ঘরে অবস্থা? একটা ছোট্ট ঝড় যেন এই ঘরটির উপর বয়ে চলে গেলো।ঘরের আসবাব উল্টো পাল্টে আছে, দামি ফুলদানি ভেঙ্গে গড়াগড়ি খাচ্ছে দামি কার্পেটে। ড্রেসিং টেবিলের আয়নার কাজ গুলো টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে মাটিতে। আমি ডান দিকে তাকালাম, সোফায় বসে আছেন মি. ইজহান। চোখ মুখে বিষন্ন উদাসীন। উস্ক খুস্ক চুল। হাত থেকে টুপ টুপ করে রক্ত পড়ছে। বুঝতে বাকি নেই উনি হাত দিয়ে ঘুসি মেরে ভেঙ্গেছেন আয়না। কেন জানি এমন অবস্থায় তাকে দেখে বড্ড মায়া হলো। তার হাতের রক্ত গড়িয়ে পড়া দেখে বুকের মাঝে মোচর দিয়ে উঠলো আমার। আচ্ছা? তার বাবা এসেছিলেন বলে এত তান্ডব চলালো কেন? মনের মাঝে এক গাদা প্রশ্ন বাসা বাঁধতে লাগলো। আমি সব ভাবনা বাদ দিয়ে এবার এগিয়ে গেলাম তার দিকে।পাশে বসে কেটে যাওয়া হাতটি ধরলাম। কাচের টুকরো গিলো নির্মম ভাবে গেথে আছে সুন্দর হাতে। আমি ফাস্টেড বক্স নিয়ে এলাম। কাচ গুলো সরিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিলাম। কাচ গুলো যতবার সরিয়ে দিচ্ছিলাম মনে হচ্ছেলো আমার শরীরেই গিঁথে আছে। আমি এবার সাহস করে ডাকলাম,

“মি. ইজহান? আর ইউ ওকে? আপনি ঠি.. ঠিক আছেন?”

মি. ইজহান চাইলেন আমার দিকে। দৃষ্টিতে আগুন ঝড়ছে, সটান দাঁড়িয়ে গেলেন উনি।এতক্ষণ যেন হুশ ছিল না। আমার ডাকে যেন হুশ ফিরলো। হতবিহবল হয়ে আমি-ও দাঁড়ালাম। আমার এখন কি করা উচিত এ মুহূর্তে? ভেবে পাচ্ছি না। তার অভিব্যক্তি বুঝতে অক্ষম বরাবরের মতোই। আমার কন্ঠ নালিতে আটকে গেছে কথা। বললাম,

“আপনার হা… হাত!”

বলতেই উনি হুংকার ছাড়লেন। টকটকে লাল হয়ে উঠলো চোখ জোড়া। আমার বাহু চেপে ধরে ফেলে দিলেন বিছানার উপর। পরমুহূর্তেই উনি নিজেও উঠে এলেন আমার উপরে, রাগে ফোসতে ফোসতে শরীরের কাপড় খুলে নিতে লাগলেন। একটি কথাই আওড়াতে লাগলেন,

” সব তোমার জন্য হয়েছে, তোমার দোস, আই হেইট ইউ!”

বলেই আমার উপর ঝাপিয়ে পড়লেন। মনের আক্রোশ কামুকতায় পরিণত হলো। মিটাতে লাগলেন দেহের স্বাদ। আর আমি? কেঁদে কুটে রক্ষে হলো না। ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে আমার দেহ, মন। কি এমন দোষ করেছি যার শাস্তি এভাবে দিচ্ছেন উনি। আমি চিৎকার করলাম। কিন্তু কেউ এলো না, না আসবে, আগের দুবারের মতো এবারো সহ্য করতে হলো মরণ যন্ত্রণা।

চলবে,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here