আঁধারিয়া অম্বর পর্ব ২৫+২৬

0
78

#আঁধারিয়া_অম্বর
#সুরাইয়া_সাত্তার_ঊর্মি
২৫।

বুকের ভিতর ভাড়ি অনুভব হচ্ছে। মাথাটাও ঝিম ঝিম করছে। পাশেই বসে আছে জান্নাত। হাত দুটি শক্ত করে ধরে রেখেছে বোনের। বার বার বলে যাচ্ছে,

” বড়পু সামলাও তুমি নিজেকে? তুমি না স্ট্রং ছিলে? ইউ আর ব্রেভ গার্ল!”

কোনো লাভ হলো না তাতে। শ্যামা কান্না জড়িত কন্ঠে বলল,

” মা জীবিত আমার সামনে ছিলো? অথচ সে… সে আমাকে চিন্তে পারলো না? কিভাবে?”

জান্নাত বলল,

” বড়পু… আমাদের মা সেই কবেই মারা গেছে, উনি আমাদের মা না। উনি এখন অন্যের স্ত্রী। ”

শ্যামা ফুপিয়ে উঠলো। জান্নাত তখনো স্বাভাবিক। হবেই বা না কেন? যখন তার মাকে খুব দরকার ছিলো, পরীক্ষার রাতগুলোতে যখন অন্য সব মেয়েদের মা পাশে থেকে সারা রাত তাদের খেয়াল রাখতো, মুখে তুলে খাইয়ে দিতো? বয়ঃসন্ধি সময় যখন মা-রা এত কিছু বুঝায়, পাশে থাকে। জান্নাতের বেলায় কিছুই হয়নি। এবং কি শ্যামা-ও থাকতো হোস্টেলে। শেষ পর্যন্ত তার বাবাই তাকে সাহায্য করে। সেদিন সে ধিক্কার দিয়েছিলো তার লোভী মাকে। এক মাত্র তারাই বুঝতে পারবে তার দুঃখ, যাদের মা তাদের ছেড়ে অন্য পুরুষের হাত ধরে চলে যায়। জান্নাত গাল ফুলিয়ে শ্বাস ছাড়লো। বোনকে বুকে জড়িয়ে ধরে একে একে সব বললো। শ্যামা হতভম্ব হয়ে গেলো।

“আগে বলিস নি কেন এসব আমায়?”

” আমি সুযোগ পাইনি আপু!”

শ্যামা চোখের জলটুকু মুছে হাসলো। বলল,

” তার মানে.. ইজহানের দাদিজান যা বলেছিলেন, তার সব সত্য!”

জান্নাত কিছুই বলল না। কি বলার আছেই তার? শ্যামা এবার দীর্ঘ শ্বাস ছাড়লো বলল,

” এই জন্য-ই এত ঘৃণা করে আমাদের এই পরিবার? ”

তখনি চকিতে বলল জান্নাত,

“আপু তারা সবাই যদি ঘৃণা-ই করতো? তাহলে ইজহান ভাই কেন তোমাকে বিয়ে করলো?”

শ্যামা জান্নাতের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল,

” আমি জানি না। চল এবার যাওয়া যাক ওই দিকে!”

শ্যামা কথাটুকু এড়িয়ে গেলো পুরোপুরি। কিভাবে বলবে সে? যখন এদিক ওদিক ছুটেও বাবার চিকিৎসার টাকা সে পাচ্ছিলো না? তখন এই ব্যক্তিটাই তাকে সাহায্য করেছিলো। কিন্তু আফসোস তার বাবা… বেশিদিনের মেহমান ছিলেন না…!

কিছুক্ষণ পর…

ওয়ান্টাইম গ্লাসে চা নিয়ে এলো জান্নাত আর শ্যামা। ইজহানের চোখ এতক্ষণ তাকেই খুঁজে যাচ্ছিলো। শ্যামা বলল,

” তোমরা চা খেয়ে নাও, ভালো লাগবে!”

বলো একে একে এগিয়ে দিলো সবাইকে। শ্যামা মেহরাবের হাতে দিলো। উনি মায়ের খবর পেয়ে ছুটে এসেছেন অন্য শহর থেকে তাই একটু দেড়িই বৈকি..! তারপর শ্যামা ইজহানের হাতে কাপ ধরিয়ে দিলো। ইজহান বিনা বাক্যে কাপ নিয়ে নিলো। এবং তার ভাঙ্গা কন্ঠে বলল,

“কোথায় ছিলে তুমি?”

শ্যামা মুচকি হেসে বলল,

” এই তো সবার জন্য চায়ের ব্যবস্থা করতে গেছিলাম!”

ইজহান বলল,

” আমার পাশে বসো!”

শ্যামা তাই করলো। ইজহান সাথে সাথে তার ঘাড়ে মাথা এলিয়ে দিলো। শ্যামার বুঝতে বাকি নেই ইজহানের মতো এত শক্ত পক্ত মানুষ একদম ভেঙে পড়েছে।

এদিকে জান্নাত আয়ানাকে চায়ের কাপ নিয়ে আরমানের কাছে যেতেই এক রাশ বিরক্তি নিয়ে নাক ছিটকালো। বিনা বাক্য অবজ্ঞা করে পাশের চেয়ারে রেখে চলে এলো। যেন এখানে আরমান নয়, কোনো রাক্ষস বসে আছে। তা দেখে আরমান হা হয়ে গেলো। বুঝতে পারলো, ভার্সিটিতে করা রেগিং করাতে জান্নাত অনেকটাই রাগ করেছে তার উপর। কিন্তু তাতে তার কি? তবে এই মেয়ের আরমানের সাথে এমন ব্যবহার করার সাহস হয় কিভাবে? একে তো মজা দেখিয়েই ছাড়বে আরমান।


শ্যামা তিন তলার হসপিটালে দাঁড়িয়ে বাহিরটা দেখে নিয়ে চোখ বুঝলো। ভেসে উঠলো তার মায়ের অবজ্ঞা, অবহেলার কথা গুলো। ভেসে উঠলো কিছুক্ষণ আগের কথা গুলো। যখন শ্যামা দৌড়ে তার মায়ের কাছে গেছিলো, তার মা তাকে চিনতেই অস্বীকার করে দিলো। কিন্তু শ্যামা তার মায়ের মুখটা বার বার দেখে যাচ্ছিলো। ভাবলেশহীন ভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। বলেছিলেন,

” সরি মা তুমি ভুল করছো! অন্যকারো সাথে হয়তো গুলিয়ে ফেলেছো আমাকে!”

শ্যামা আফিয়ার হাত ধরে বলেছিল,

” মা তুমি তোমার সন্তানকে কিভাবে চিন্তে পারছো না?”

“আশ্চর্য মেয়ে তো তুমি, এত গায়ে পড়া কেন? আমার মা যখন বলছে সে তোমাকে চিনে তার পরেও এমন করছো? বুঝকে পেরেছি, টাকার লোভে এসব করছো তো? দাঁড়াও দাঁড়াও দেখাচ্ছি মজা। ”

কথাটুকু বলল আফিয়ার পাশে থাকা একটা টিনএজ ছেলে। তার হাত বেন্ডেজ করা। হয়তো তাকেই নিয়ে এসেছিলো আফিয়া। শ্যামা ছেলেটির কথায় হা হয়ে গেলো। এর আগে কিছু বলবে তখনি ছেলেটি শ্যামাকে ধাক্কা দিয়ে বসে। এবং শ্যামা টাল সামলাতে না পেরে দু কদম পিছিয়ে পড়ে যায়। আফিয়া তখন ছেলেকে শাসন করে বলে,

“নিয়ন! এসব কি? সে তোমার বড় না? সে সরি?”

ছেলেটি তাচ্ছিল্য ছুঁড়ে বললো,

” দুটাকার মেয়ে আমার মাকে কেড়ে নিতে চাও? নেক্সট টাইম সামনে এসো না গাড়ি চাপা দিয়ে দিবো!”

শ্যামা শুধু বিস্ময় নিয়ে নিচে পড়ে এদের কথা শুনছিলো। সেই মুহূর্তে-ই জান্নাত এসে বোনকে ধরে। নিজের মায়ের দিক এক পলক তাকায় সে। একটা অদ্ভুত ব্যাপার হলো, আফিয়ার চেহারা-ই যেন জান্নাতের মুখটিতে বসানো। তাই জান্নাত বার বার এই চেহারাকে ঘৃণা করে। জান্নাতকে দেখে আফিয়া-ও হা হয়ে গেলো। মায়ের দিক তীক্ষ্ণ দৃস্টিতে তাকিয়ে জান্নাত বলেছিলো,

” আপু? কেন ভুলে যাস, আমাদের মা মারা গেছে। উনি অন্য কেউ।”

আফিয়া অবাক হয়ে দেখেছে শুধু তার মেয়েদের। তখনি সেই টিনএজার তার মাকে টেনে নিয়ে চলে গেছে।

একটা ঠান্ডা আর পেশীবহুল শক্ত হাত শ্যামার কাঁধে পড়তেই শ্যামা চোখ মেলে যায়। পিছনে ফিরে ইজহানের বিষন্ন মুখটা দেখতে পায়। ইজহান এতক্ষণ শকডে ছিলো। দাদিজানের কেবিনের বাহিরেই ঘাপটি মেরে বসে ছিলো। কিন্তু ডাক্তার যখন বলল,

“চিন্তার কারণ সেই,ডেঞ্জার কেটে গেছে। ২৪ ঘন্টা পর জ্ঞান ফিরে আসবে।”

ইজহান সে সময় স্বস্তির শ্বাস ফেললো। আয়ানা, আরমান, আর জান্নাতকে বাসায় পাঠিয়ে, সে শ্যামাকে এদিক ওদিক দেখতে না পেয়ে খুঁজতে লাগলো তাকে। ঠিক সেই মুহূর্তে হাসপাতালের শেষ কর্ণারে বর্ডার ঘেষে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে শ্যামাকে। ইজহান সময় ব্যয় না করে চলে আসে। ইজহান বলল,

” কাঁদছো কেন?”

শ্যামা মাথা নাড়লো,

” কিছু না.. চোখে কি জানি গেছিলো, ঝাল পোকা হবে। খুব জোলছিলো আর কি! এখনি ঠিক হয়ে যাবে। ইজহান দাদিজান এখন কেমন আছে?”

ইজহান শ্যামার মুখের দিক এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। মনে মনে ভাবলো, কেন শ্যামা তার থেকে সব লুকিয়ে বেড়ায়? কেন? শ্যামাকি বুঝতে পারে না? ইজহান তার সব দুঃখ কষ্ট মুছে দিতে চায়,? কিন্তু প্রতিবার-ই সে আরো কষ্ট দিয়ে ফেলে তার এক ফালি চাঁদকে। ইজহান সপ্তপর্ণে একটা শ্বাস লুফে নিলো। গম্ভীর কন্ঠে বলল,

“ভালো!”

তারপরেই আবার বলল,

” তুমি কিছু খেয়েছো?”

না করলো শ্যামা। এতক্ষন তো খুদার কথা বেমালুম ভুলে গেছিলো। ইজহানের কথায় যেন পেটের ভিতর ইঁদুর দৌড়াতে লাগলো। এর মাঝেই তার পেটের ভিতর ডেকে উঠতেই, শ্যামা লজ্জা লাল হয়ে গেলো। ইজহান বলল,

” রাত অনেক হয়েছে, ক্যান্টিন ও বন্ধ, চল বাহির থেকে কিছু খাওয়া যাক!”

শ্যামা বলল,

” কিন্তু দাদিজান?”

“সমস্যা নেই নার্স আছে তার সাথে”

“আচ্ছা! ”

এ বলেই তারা রাস্তায় বেড়িয়ে গেলো। মধ্যরাত। চারিদিকে নিস্তব্ধতায় মোড়া। শুধু শির উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা স্টেডিয়ামের হোলদে আলো।তাতে দেখা যাচ্ছে ইজহান আর শ্যামার রাস্তায় পড়া ছায়াটুকু। আবার কখনো এদিক-ওদিক ছুটে যাওয়া দু-একটা গাড়ি। শ্যামার রাতে শহর খুব পছন্দ। সুফিয়ানের সাথে রাতের শহর ঘুরবে বলে কত রকম প্ল্যান করেছিলো শ্যামা। যদিও তা শুধু স্মৃতিতেই। ইজহান কি ভেবে যেন গাড়ি নেয়নি। তাইতো.. তার সুবাদে রাতের শহর দেখতে পারছে সে। সেই সময় শ্যামা অনুভব করলো। ইজহান তার আঙুলের ভিতর শ্যামার আঙুল গুলো চেপে ধরেছে শক্ত করে। যেন শ্যামা ছুটে পালিয়ে যেতে না পারে। শ্যামা অবাক হয়ে দেখছে তখন ইজহানকে। ইজহান তখন মুচকে হেসে বলল,

” এভাবে তাকিয়ে আছো কেন?”

শ্যামা হেসে বলল,

” আমার বরটাকে দেখছি!”

ইজহান এবার লজ্জা পেয়ে গেলো। এই প্রথম ইজহানকে লাজুক হাসতে দেখে শ্যামা হা হয়ে গেলো। ইজহান তা বুঝতে পেরেই বলল,

” পিঠা খাবে?”

শ্যামার ধ্যান ভাঙ্গলো। মাথা নেড়ে সম্মতি দিলো। ইজহান পাবলিক ফিগার হওয়াতে রাস্তায় হাটা, যখন তখন বেড়িয়ে, যাওয়া, রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে খাওয়া, এসব কিছুই করতে পারতো না। কিন্তু এত রাতে শ্যামার সাথে এভাবে রাতে ঘুরতে পাওয়ার সুযোগ কিভাবে হাত ছাড়া করতো সে? তাই তো ইচ্ছে করে সঙ্গে গাড়ি আনেনি। তার যে এখনো মনে আছে, শ্যামার সেই দিনের কথা,

” জানো আমার রাতের শহর দেখার খুব শখ। যখন পুরো শহর ঘুমিয়ে থাকবে, আমি আর তুমি মিলে ঘুরবো, খালি পথ ধরে হাটবো। গরম গরম চা আর চিতই পিঠা খাবো আলুভর্তা দিয়ে!”

ইজহান প্রতি উত্তরে বলেছিল,

” যেমনটি আমার মহারানী চায়, তেমনটিই হবে! সব সময় এ বান্ধা হাজির থাকবে আপনার জন্য!”

এসব শুনে শ্যামা খিল খিল করে হেসে উঠতো।আর সেই হাসির শব্দ ইজহানের মন, প্রাণ সতেজতায় ভরে উঠতো।

আজো তার ব্যতিক্রম নয়…..
#আঁধারিয়া_অম্বর
#সুরাইয়া_সাত্তার_ঊর্মি
২৬।
গরম গরম ধোয়া উঠা চিতাই দুটো প্লেটে সাইড দিয়ে সাজানো আলু ভর্তা.. শ্যামার জিবে যেন জল চলে এলো। সময় ক্ষণ নষ্ট না করে, একটু ছিড়ে ভর্তা মাখাইয়ে পুরে নিলো মুখের ভিতরে। এত গরম গরম খাবার মুখে পুরতে দেখেই ইজহান বলল,

” ঠান্ডা হতে দাও, মুখ পুড়ে যাবে নয়তো!”

শ্যামা ক্যাবলাকান্তের মতো হেসে মাথা নাড়লো। বলল,

” তোমার মনে আছে? আমাদের স্কুলের একজন আন্টি পিঠা বানাতেন যে, রোজ সকাল সকাল ঠিক এমনি.. ধোয়া উঠা আলুভর্তা দিয়ে৷ খেতাম আমি। এত এত মজা লাগতো!”

ইজহান হাসলো,

” হুম। মনে আছে, লাইন লেগে থাকতো স্কুলের সামনে। আমারো অনেক প্রিয় ছিলো। লাস্ট সেই স্কুলেই খাওয়া হয়েছিলো আমার। ”

হালকা একটু শ্বাস নিয়ে আবার বলল ইজহান,

” তবে আজ এক যুগ পড়ে পেটে যাচ্ছে!”

শ্যামা অবাক হয়ে শুধু চেয়ে রইলো ইজহানের দিকে।
তারপর দুজনেই চুপ করে গেল সে।

কিছুক্ষণের মাঝেই ঝালের কারণে হাসফাস করতে লাগলো ইজহান। টিকালো নাক টকটকে লাল টমেটো আর চিকন ঠোঁটে যেন এক দলা রক্তে মাখা-মাখি। শ্যামা এভাবে ইজহানকে দেখে হেসে ফেললো। চিতই স্টেলের আন্টির কাছ থেকে এক গ্লাস পানি নিয়ে ইজহানকে দিলো। হাসতে হাসতে লুটোপুটি খাচ্ছে শ্যামা..!

” তুমি এতটুকু ঝাল সহ্য করতে পারো না?”

ইজহান কিছু বললো না। চোখ, মুখ, লাল করে ঢক ঢক করে গিলতে লাগলো পানি টুকু। এক নিশ্বাসে শেষ করে, ঝালে ফোপাঁতে ফোঁপাতে বলল,

” খুব মজা পাচ্ছো? না..!”

শ্যামা হাসতে হাসতে বলল,

” হ্যাঁ অনেক। ভাবো তো কেউ যদি এমন অবস্থায় তোমাকে দেখে ফেলে তখন কি কান্ড হবে? খবরের কাগজের প্রথম হ্যাডলাইন হয়ে যাবে,
‘ দেশে হ্যান্ডসাম হান্ট, যার জন্য দেশ না.. বিদেশের কোটি কোটি নারী পাগল, সে বসে পিঠা খাচ্ছে মধ্যে রাতে রাস্তার ধারে….!”

ইজহান চোখ ছোট করে চাইলো শ্যামার দিক। ভ্রু কুচকে বলল,

” যতসব উদ্ভট কথা।”

” এই না না। সত্যি বলছি। এই খবরটি যদি আমি ক্যাপচার করি না… একদম মালামাল হয়ে যাবো।”

ইজাহান এবার হেসে ফেললো। বলল,

” পাগলী একটা!”

মধ্যরাতের অন্ধকার গড়িয়ে প্রভাতের স্নিগ্ধ আবছায়া আলো নেমে এলো। কিছুক্ষণের মাঝেই সূর্যি মামা তার লাল আলোয় রাঙ্গিয়ে দিবে ধরনীর বুক। সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা এই পৃথিবী কিশোরীর মতো খিল খিল করে হেসে খেলা করবে প্রতিটি বাড়ির উঠান, মাঠ, ঘাট, বড় বড় দালানের ছেদ করবে স্বচ্ছ কাচের জানালা। হাসপাতালের পাশেই থাকা ফ্লাইওভারের কার্নিষ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে দুজন কপোত কপোতী। স্থীর দৃষ্ট শূন্য ভুবনের কোনো এক জায়গায়। সাপের মতো পেচিয়ে থাকা রাস্তা ঘাট অস্পষ্ট। মেঘের আব নেমে এসেছে সবুজ ঘাসের বুকে। কিছুক্ষণ নিরবতা পালন করে বুক ভরে শ্বাস নিলো তারা। ফ্লাইওভারে এই মুহূর্তে একটা দুটো গাড়ির আনাগোনা। প্রথবার নিরবতা কাটি মুখ মুখলো শ্যামা,

” আজকের এই সময় গুলো আমি কখনো ভুলবো না!”

পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা ইজহান তার দাম্ভিক মুখখানা ঘুরলো তার দিকে। মৃদু বাতাসে দুলছে শ্যামার বড় ঘন চুল গুলো। যেন রাতের শেষ ভাগে পৃথিবীর বুক নেমে এসেছে এক পরি। ইজহান শ্যামার কাছে আরো ঘেষে দাঁড়ালো। হাত দিয়ে পেচিয়ে ধরলো শ্যামার মসৃণ কোমর। ইজহানের স্পর্শে কেঁপে উঠলো শরীর হালকা। ইজহানের চোখে চোখ রাখতেই ইজহান বলল,

“আমি-ও..!”

কন্ঠে যেন কি ছিলো ইজহানের। এক রাশ মাদকতায় ভরে উঠলো দুজন। দুজন দুজনের মুখোমুখি আরো কাছে এসে দাঁড়ালো। এক হাত কোমরে আরেক হাত শ্যামার ঘারের পিছন ছুয়ে স্পর্ষ করলো শ্যামার ঘন কালো চুল। শ্যামা আবেশে চোখে বুঁজে নিল। ঠিক সেই সময় তাদের বেধ করে উঁকি দিলো সূযি মামা। রক্তিম লাল আলোয় ভিজিয়ে দিলো সব। ভিজিয়ে দিলো ফ্লাইওভারের উপরে থাকা চুম্বন রত এক যুগলকে। উঁড়ে যেতে থাকা ভোর রাতে পাখির কিচিরমিচির যেন তাদের ভালবাসার জয়গান শুনিয়ে ভেসে ভেসে চলে যাচ্ছে… দৃষ্টি এতোই সুন্দর যে ক্যাপচার করে নিলো শ্যামার অগোচরে ইজহান। শ্যামাকে৷ ছবিটি গিফট করবে বলে।

এভাবেই কিছুক্ষণ অতিবাহিত হয়ে গেলো। দুজন দাম্পত্যি ভেসে যেতে লাগলো ভোরের স্নিগ্ধ আলোয়। স্বপ্ন পুরোন হয়ে গেলো শ্যামার তার অগোচরে-ই। সুফিয়ানের সাথে এমনিতো কত স্বপ্ন দেখেছিলো সে। ভোর রাতে সূর্য উদয়ের সময় ঠোঁটে ঠোঁটে কথা বলবে সুফিয়ানের সাথে। কিন্তু কে জানতো? তার স্বপ্ন সত্যি-ই এভাবে পূরণ হয়ে যাবে….! ডুবে যাবে ইজহানের ভালোবাসায়…

ফোনের বিপ বিপ করে ভ্রাইব্রেটের আওয়াজটা শরীরে ঝংকার তুলো। এতখনের ধ্যানখন ভুলে থাকা মানুষ দুজনের মাঝে সম্মতি ফিরে এলো। কিছুক্ষণ আগের কথা ভেবেই লজ্জায় লাল হয়ে গেলো শ্যামা। মুচকে হেসে ইজহান ফোনটা তুলতে দেখলো, তার ছোট বোন আয়ানা ফোন করেছে। ইজহানের কঁপালে খানিকটা ভাজ পড়লো। ফোন তুলতেই অপাশ থেকে ভেসে এলো আয়ানার উৎকন্ঠা গলা,

” দাদা ভাই? কই তুমি? দাদিজানের জ্ঞান ফিরেছে। জলদি আসো?”

ভাজ করা কঁপাল দেখে শ্যামা একটু চিন্তায় পরে গেছিলো। পরমুহূর্তেই ইজহানের ঝলমলে করে উঠা মুখের হাসি দেখে স্বস্তির শ্বাস ছাড়লো। ইজহান ” আসচ্ছি” বলে কল কেঁটে দিলো। অনুভূতিহীন, উদাসীন মানুষটির মাঝে আজ অনুভূতি খুঁজে পেয়েছে সে। ইজহান শ্যামাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

” দাদিজানের জ্ঞান ফিরেছে, আমাদের যেতে হবে!”

শ্যামা হেসে মাথা নাড়লো। ১০ মিনিটের মাঝেই৷ পৌঁছে গেলো তারা। সকাল সকাল আরমান, জান্নাত আর মেহরাবে নিজেও এসেছে খবর শুনে। সকলেই আলিয়াকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। আলিয়ার সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সে বার বার করে তাকিয়ে আছে দরজার দিকে। এক পলক তার বড় নাতিকে দেখবে বলে।

” ইজহান.. ইজহান কই! আরমান? তোর ভাই এলো না?”

ব্যথায় জর্জরিত আলিয়ার কন্ঠ। তবুও বৃদ্ধ চোখ মেলে অপেক্ষার প্রথর গুনচ্ছে ইজহানের পদর্পণের।
আরমান বলল,

“দাদিজান, ভাই সারা রাত এখানেই ছিলো। হয়তো কোনো কাজে গেছে। চিন্তা করো না এখুনি চলে আসবে!”

আলিয়া মাথা নাড়লো। ঠিক সে সময় ঘরে পা ফেললো ইজহান। দাদিজান বলে জড়িয়ে ধরলো আলিয়াকে। এতক্ষণে যেন মনের ভার হালকা হলো তার। ইজহানের পিছনেই ছিলো শ্যামা। অফিস থেকে আসা কলের জন্য একটু পরেই ভিতরে প্রবেশ করে শ্যামা। বলে উঠে,

” মেডাম আপনি এখন কেমন আছেন?”

ইজহানের দাদি শ্যামার উত্তর দিবে তার আগেই আয়ানা এক প্রকার ছুটে এসে থাপ্পড় লাগিয়ে দেয় শ্যামার গালে। উপস্থিত সবাই হতভম্ব হয়ে যায়। সময় লাগে কিছুক্ষণ এখানে হলোটা কি? ইজহান যখন বুঝলো সে আয়ানার সামনে এসে ধমকে বলে উঠলো,

” এটা কেমন অভদ্রতা আয়ানা? ”

আয়ানা ইজহানের কথার জবাব না দিয়ে চিৎকার করে বলল,

” এই মেয়ে দাদিজানের কাছে আসবে না। সি ইজ এ মার্ডারার। খুন করতে চেয়েছিলো দাদিজানকে, নিজ হাতে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছিলো। যার জন্য… যার জন্য দাদিজান আজ হাসপাতালে…! ”

বলেই কান্না করে দিলো আয়ানা। শ্যামা হতবাক হয়ে গালে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। এত… এত বড় অপবাদ। শ্যামা ছলছল চোখে চেয়ে রইলো শুধু ইজহানের দিকে। ইজহানের গম্ভীর মুখটা আরো ঘন কালো হয়ে এলো। শ্যামা বলল,

“বিশ্বাস করো ইজহান আমি কিছু করিনি!”

বড্ড আশা নিয়ে তাকিয়ে আছে ইজহানের মুখের দিকে শ্যামা। কি বলবে ইজহান? সে-কি এই কথাটা বিশ্বাস করেছে? তাকে? তাকে কি সে এর জন্য ভুল বুঝবে? শাস্তি দিবে? শ্যামা তাকিয়ে রইলো সমানের লম্বাচওড়া দাম্ভিকপূর্ণ মুখখানার দিক। ইজহান এবার পলক ফেলে তাকালো শ্যামার দিক। তার দৃষ্টির অর্থ কিছুতেই বুঝতে পারলো না শ্যামা। যখন ইজহানের ঠোঁট নড়লো…. শ্যামার শরীর বেয়ে নেমে গেলো যেন একটা শীতল বরফ স্রোত……

চলবে,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here