আঁধারিয়া অম্বর পর্ব ২৯+৩০

0
82

#আঁধারিয়া_অম্বর
#সুরাইয়া_সাত্তার_ঊর্মি
২৯।

শ্যামা নিপাকে ঠাটিয়ে এক চর বসালো। রাগে শরীর কাঁপছে তার। সে চেচিয়ে বলল,

” একদম মিথ্যা কথা বলবে না, নয়তো, ইজহান তোমাকে কাজ ছাড়া করেছে, আর আমি তোমায় শহর ছাড়া করবো!”

নিপা ঘাবড়ে গেলো, গালে হাত দিয়ে মিনমিন করে বলল,

” মেডাম? আমি কেন মিথ্যা বলবো? স্যার আমাকে মেডিসিন দিয়েছিলেন, বলেছিলেন, রোজ আপনাকে দিতে। আমি তো অতোটা শিক্ষিত নই, কিভাবে বুঝবো কোনটা সেটা বাচ্চা নষ্ট করার পিল ছিলো? ”

নিপার লাষ্ট কথা গুলোতে কান্নার স্বর স্পষ্ট। শ্যামা তার পরেও বিশ্বাস করছে না দেখে নিপা বলল,

” মেডাম আমি আমার সন্তানের কসম খাইছি, ইজহান স্যার আমাকে মেডিসিন এনে দিয়েছিলো! আর বলেছিলেন রোজ আপনাকে দিতে, তা কিসের ছিলো? আমি জানি না…! ”

শ্যামার মনে হলো পায়ের নিচ থেকে মাটি স্বরে গেছে। সারা শরীর ঠান্ডা হয়ে মৃদু কম্পন সৃষ্টি হলো। চোখ ভর্তি করে জল গড়িয়ে পড়লো। ধীরে ধীরে নেতিয়ে পড়লো শ্যামা। সত্যি… এসব কি সত্যি? ইজহান তার বাচ্চা নষ্ট করেছে। এই জন্যই? এই জন্য সে দিন য়খন ইজহানকে প্রেগনেন্সির কথা বলেছিলো, যে সে যদি কখনো প্রেগনেন্ট হয়? তখন কোনো ভাবান্তর ছিলো না মানুষটির মাঝে? এই জন্যই…!

শ্যামা এবার ল্যাংড়া তে লাগলো। গাড়ির পাশ কাটিয়ে আপন খেয়ালে হেটে চলে যেতে লাগলো সে অনির্দিষ্ট গন্তব্য….! পিছন থেকে ড্রাইভারের কথা-ও কানে এলো না। ড্রাইভার চিন্তিত হয়ে সঙ্গে সঙ্গে আধিরাজকে কল করে।

এদিকে শ্যামা যেতেই নিপা হাসে। পকেট থেকে নোকেয়া ১২০০ মডেলের ছোট ফোনটি বের করে একটি নাম্বারে ডায়েল করে। ওপাশ থেকে রিং হতেই একটি মেয়েলি কন্ঠ ভেসে আসে,

“হ্যালো… নিপা!”

” জ্বি মেডাম। আপনার কাজ হয়ে গেছে। .. যা আপনি বলেছিলেন? তেমনি হয়েছে৷ আমি শ্যামা মেডামকে সত্যি কথা বলে দিয়েছি..!”

বলেই মুচকি হাসলো নিপা। ফোনের ওপাশ থেকে লাস্যময়ী ভঙ্গিতে বসে, মেয়েটি স্বস্তির নিঃশ্বাস নিলো। বলল,

” তোমার টাকা তোমার একাউন্টে চলে গেছে নিপা! এবার যেন এ-শহর না দেখি!”

” ওকে মেডাম!”

ফোন কাঁটতেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পড়লো রহস্যময় ভঙ্গিতে হেসে বলল,

” ইজহান তো তোমাকে ছাড়বে না, কিন্তু এত কিছুর পর? তুমি অবশ্যই ইজহানের জীবন থেকে নিজেই চলে যাবে। আর তারপর… অসহায়, ভেঙে পড়া ইজহানকে আমি সামলাবো, আদর করবো,তার সাথেই শুইবো!”

বলে খিলখিল করে হেসে উঠলো মেহরিন। বিড়বিড় করে আবার বলে,

“খেলা তো সেই কবেই শুরু হয়েছে, এবার শুধু বাউন্ডারির বাইরে ফেলা বাকি!”

বলেই অট্ট হাসিতে মেতে উঠলো। যেন রাজ্যকে রানী হারা করতে পেরে তার খুশির শেষ নেই।

এদিকে শ্যামা নিজের ভাঙ্গা মন নিয়ে হেটে হেটে চলছে রাস্তার ধারে। সাই সাই করে গাড়ি ছুটছে রাস্তার বুক চিঁড়ে। শ্যামার সেদিকে কোনো হেলদোল নেই। ছোট থেকেই তার জীবনটা কেমন ছন্নছাড়া। বাবা মাকে কাছে পায়নি সে খুব একটা। যতটুকু পেয়েছে ছুটির দিন গুলোতেই। বাবা তার কাজে ব্যস্ত.. মা তার কাজে। তার পরে তো শ্যামা পড়াশোনার জন্য পারি জমালো হোস্টেলে। স্কুলে থাকাকালীন রিদকে পেয়ে শ্যামা নিজের একাকিত্ব ভুলে গেছিলো। কিন্তু সেই কি না তাকে ঠকালো। প্রথমবার প্রেম নাকি টিকে না.. অনেক বার শুনে ছিলো শ্যামা, কিন্তু মনে প্রাণে সে বিশ্বাস করতো! এই প্রেম ভালোবাসা টিকবেই। কত গর্ব করেছিলো শ্যামা। কিন্তু সে ভুল মানুষের হাত ধরে ফেলেছিলো। তাই নিজেকে যেভাবেই হোক সামলে নিয়ে গিয়ে আবারো আরো বার ভুল করে বসে। সুফিয়ানকে ভালোবেসে ফেলে। রাত জেগে আঁধারিয়া অম্বরের দিকে তাকিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। কিন্তু কে জানতো? কে জানতো? শ্যামা এবারো ভুল করে বসবে? এর পরে কত গুলো বছর কেঁটে গেলো। সুফিয়ানের স্মৃতি আঁকড়ে বেঁচে ছিলো শ্যামা। কিন্তঁ হঠাৎ ঝড়ো হাওয়ার মতো ইজহান এসে উপস্থিত হলো। হাজার কষ্টে দিলেও ইজহানের প্রতি বরাবরই টান অনুভব করতো সে। সে টান থেকে যে আবারো ভালোবাসার এক ফোঁটা গোলাপ তৈরি হবে? সে কি জানতো? সেই মানুষটি-ও কিনা এভাবে ঠকালো? কি চায় এই ব্যক্তিটি? কেন করছে এমন? যতবার কাছে যায় ততবার একটা করে ঘা বসিয়ে দেয় সে। শ্যামা আর ভাবতে পারলো না। রাস্তার ধারে বসে জোরে জোরে চিৎকার করতে লাগলো। বুক ফেঁটে বেড়িবাঁধে কষ্ট গুলোর ঢল নেমে এলো। বিষন্ন মন বিষিয়ে উঠলো এক রাশ তেতো অনুভূতিতে। কেন কেন এসব তার সাথেই হচ্ছে? সে কি পারতো না? আর পাঁচটা মানুষের মতো সুন্দর জীবন অতিবাহিত করতে? সে কি পারতো না? একটা সুন্দর সংসার, হাসি খুশি পরিবার পেতে? সে পারতো না? একটা ভালোবাসার মানুষ পেতে? তাহলে কেন?

শ্যামার কান্নার বেগ বাড়ছে। সময়-ও গড়াচ্ছে যেন দ্রুত গতিতে… অফিসের সময় আজ শেষ হয়ে সন্ধ্যা হতে চললো। ঠিক সে সময় একটি দামি গাড়ি এসে থামলো শ্যামার সামনে। হলদে লাল পারের শাড়ি পরে এক মধ্য বয়সি নারী এসে দাঁড়ালো শ্যামার সামনে। তার৷ কাছে কেউ এসে দাঁড়িয়েছে তা দেখে শ্যামা তার লাল ফোলা চোখ মেলে চাইলো। কান্নার ফলে চোখে ঘোলা দেখছে এখন খুব। শ্যামা যখস বুঝতে পারলো, ব্যক্তিটি আর কেউ না, তার মা আফিয়া? সে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লো। যদিও তার পা দুটি অচল, এদিক সেদিক পড়তে পড়তে দাঁড়ালো। মুখটি গম্ভীর করে বলল,

” কি জন্য এসেছেন? দেখতে? বেঁচে আছি নাকি মরে গেছি? ”

আফিয়া শ্যামার এই হাল দেখে নিজেও কষ্ট পায়। সে শ্যামার হাত ধরে বলে,

“আমাকে ভুল বুঝিস না মা!”

“,মা? বাহ্? ওই দিন না চিনতেই পারলেন না? আপনার ছেলে আমাকে দু টাকা মেয়ে বলে গেলো। আর আজ,?মা। বিষয়টা কেমন হাস্যকর হয়ে গেলো না?”

আফিয়া লজ্জিত ভঙ্গিতে মাথা নত করে ফেললো,

” আমার কোনো উপায় ছিলো না শ্যামা। আমি তো সারা জীবন মেহতাবকে ভালোবেসে ছিলাম। কিন্তু তোমার বাবা? তোমার বাবা আমার ফায়দা উঠায়। আমাকে মেহতাবের কাছে ভুল ভাল বলে আমাকে খারাপ করে ফেলে তার নজরে। আর তার পরেই আমাকে ব্ল্যাকমেইল করে বিয়ে করে। ”

শ্যামা হতভম্ব। সে কাঠ কাঠ গলায় বলে,

” আমি কেন বিশ্বাস করবো আপনার কথা?”

আফিয়া হেসে বলে,

” না করারই কথা! যে মহিলা তার দুটি মেয়েকে ফেলে চলে যায়? তার কথা কেন বিশ্বাস করবে বলো? কিন্তু এটি-ই সত্যি। আমি চাইনি তোমাদের ছেড়ে যেতে বাধ্য করেছিলো তোমার বাবা। হ্যাঁ তোমার বাবা। যখন তার ব্যবসার অবনতি হচ্ছিলো? সে আমাকে ওয়ান নাইট স্ট্যান্ড করাতো তার পার্টনাদের সাথে। যখন আমি আওয়াজ তুলতাম? আমার উপর অত্যাচার চলতো। মানসিক, শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতাম। আমার সাহায্য করবে কেমন কেউ ছিলো না। তাই আমি মেহতাবের কাছে যাই। সাহায্য চাই, ভিক্ষা চাই তার কাছে। আর সে সব কিছু তোমার বাবা যেনে ফেলেন। মেহতাবের বউ সানিয়া খুব সেনসিটিভ মানুষ ছিলেন। আজিজুল যা যা দেখিয়ে ছিলেন? তাই বিশ্বাস করে ফেলেন। তোমার বাবা সব কিছুর মিথ্যা ভিডিও ক্লিপ তৈরি করে পাঠায় সানিয়ার কাছে। আর তা সইতে না পেরে সানিয়া আত্মহত্যা করে।”

এইটুকু বলেই চোখের জল মুখে ফেললো আফিয়া। শ্যামা হতবাক হয়ে বসে রইলো রাস্তার ধারের উঁচু জায়গায়টায়। একদিনের মাঝে মেয়েটি আর কত সত্যির মুখোমুখি হবে? শ্যামা এবার শুকনো ঢুক গিললো,,

” এ সব… আগে কেন বলেন নি? ”

” কিভাবে বলতাম? তোমার বাবা জায়গায় বদলে ফেলেছিলো।”

” তাহলে জান্নাত যা দেখেছিলো?”

” তা অংশবিশেষ মাত্র!”

” তাহলে সিফাত ভাইয়ার সাথে আমার বিয়ের কথা কেন বলেছিলেন?”

” চেয়েছিলাম তোমার লাইফটা সিকিউর করতে!”

শ্যামা ব্যথা ভরা মুখ নিয়ে হাসলো,

” আপনাদের দুজনের পিসাপিসিতে আমাদের দু বোনের জীবন ধংস হয়ে গেলো!”

আফিয়া অপরাধীর মতো মাথা নুইয়ে ফেললো। শ্যামা ভার মুখ করে বলল,

” আসি! ছেলের সাথে ভালো থাকবেন! ”

“আমাকে ক্ষমা করা দিও শ্যামা!”

শ্যামা আর দাঁড়ালো না রোবটের মতো হেঁটে চলে গেলো সে নিজ গন্তব্য। মাথার মধ্যে গিজগিজ করতে লাগলো সব ঘটে যাওয়া ঘটনা গুলো। সত্যি বাবা-মা যদি দু মেরুর হয়, সন্তানরাতো ভেসে যাবেই,। এসব ভাবতে ভাবতে এসে দাঁড়ালো ইজহানের রাজ প্রাসাধে। ঠিক সেই মুহূর্তে গর্জণ করে বেজে উঠলো মুঠোফোন। ফোনটি তুলতেই ইজহানের হাসি হাসি কন্ঠ ভেসে এলো,

” তুমি কি আমাকে মনে করেছো? আমার আজ বার বার তোমার কথা মনে পড়ছে। মনে হচ্ছে ছুটে চলে আসি!”

শ্যামা ফোনের এপাশ থেকে বিদ্রুপের হাসি হাসলো, শূণ্য দৃষ্টিতে ঘোলাটে চোখে তাকিয়ে বলল,

” হ্যা! করেছিতো খুব মিস করেছি!”

ফোনের ওপাশের মানুষটির মনের মাঝে কেমন মোচড় দিয়ে উঠলো। শ্যামার কি কিছু হয়েছে?

” তোমার কি মন খারাপ শ্যামা?”

“নাহ্! আমি তোমার সাথে সামনাসামনি কিছু কথা জিজ্ঞেস করতে চাই, কবে আসবে তুমি?”

ইজহানের মন মুহূর্তেই পাথর হয়ে গেলো। হাসি খুশি মুখটিতে নেমে এলো বিষন্নতার ঢল,

“খুব শীঘ্রই..!”
#আঁধারিয়া_অম্বর
#সুরাইয়া_সাত্তার_ঊর্মি
৩০।

“তুমি কি আমার সুফিয়ান? ”

ছল ছল চোখে আবাক হয়ে শ্যামা বলল, ইজহানের উদ্দেশ্যে। বাহিরে ঝুমঝুমিয়ে বৃষ্টি পড়ছে। পাকা দালানের দেয়াল চুয়ে চুয়ে জমা হচ্ছে সামনের অস্থায়ী গর্তটায়। থেকে থেকে আকাষের বুক চিঁড়ে মেনে যাচ্ছে ভয়ঙ্কর চিৎকার। মাথার মধ্যে হাজারটা প্রশ্ন কিলবিল করছে শ্যামা। অবাক, বিস্ময়ে বুঁদ হয়ে চেয়ে আছে একটি প্রশ্নের উত্তরের আশায়…!
সেকি সত্যি তার সুফিয়ান? সে কেন তাহলে সেদিন এলো না? কেন এত দিন তার চোখের সামনে থাকা সত্ত্বেও বললোনা? সেই তার আঁধারিয়া অম্বর! আচ্ছা… আচ্ছা এটা-ও কি তার প্রতিশোধের অংশ না-কি? শ্যামা শুকনো ঢুক গিললো। বুকের ভিতরে তীব্র ব্যথায় হচ্ছে। মাথার নার্ভ গুলো এবার বুঝি ছিঁড়েই যাবে। শ্যামার আবারো মৃদুস্বর ভেসে এলো,

” তুমি কি আমার… সুফিয়ান?? প্লিজ টেল মি দ্যা ট্রুথ!”

ইজহানের দাম্ভিক মুখখানায় বিষন্নতার ছোঁয়া। মাথার মাঝে চলছে অগণিত বুলি। ম্যামাকে সে কি বলবে? হ্যাঁ বলবে? না- কি না বলবে? তার থেকে বড় কথা… শ্যামা জানলো কিভাবে? ইজহান-ই সুফিয়ান?

বৃষ্টির প্রতিফলিত ধারা বেগ বাড়ছে। ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে শ্যামাদের দাঁড়ানো জায়গাটি-ও। এখনো দাঁড়িয়ে আছে তারা বাহিরের গাড়ি পার্কিং এর জায়গায়। ইজহান আড় চোখে একবার তাকালো মেয়েটির দিকে, সাদা ছিমছাম একটা জামা গায়। ওরণার কোনা এক পাশে বেশি ঝোলার ফলে বৃষ্টির পানি ছুঁইছুঁই। চোখের নিজে কালো দাগ, গত দুদিন বুঝি মানুষটি এক ফোঁটা-ও ঘুমোয় নি? কেমন যেন বিধস্ত দেখাছে শ্যামাকে। সুন্দর মুখটা লাল টুকটুকে। ডাগর ডাগর চোখ ভর্তি করছে ছলছল জল। শ্যামা ইজহানকে এভাবে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার দামি সুটের কলারে ধরে ঝাকিয়ে বলল,

” কথা বলো… প্লিজ বলো.. কিছু! তুমি কি সুফিয়ান?”

শ্যামা হাউ মাউ করে কেঁদে বুকে মাথা রাখলো ইজহানের। ইজহানের মনের অনুভূতি গুলো মিক্সড হয়ে গেছে। কি করবে সে এই মূহুর্তে? বুকের মাঝে লুটিয়ে থাকা মেয়েটিকে-ও তার আষ্টেপিষ্টে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করছে। শক্ত করে চেপে ধরতে ইচ্ছে করছে মাথাটা বুকের সাথে। কিন্তু কোনো অদৃশ্য শক্তি যেন পাথর করে দিয়েছে ইজহানের সমস্ত শরীরকে। ইজহান মুর্তির ন্যায় হাত দুটি শক্ত করে মুঠ করে দাঁড়িয়ে রইলো। ঠিক তখনি শ্যামা চট করে তাকালো ইজহানের দিক। ছলছল চোখের অথৈ জল গড়িয়ে পড়লো। সে ইজহানের গালে হাত রেখে আবেগ মিশ্রিত কন্ঠে বলল,

” আচ্ছা এটি তোমার প্রতিশোধের অংশ নয় তো?”

ইজহান এবার কাঠ হয়ে গেলো। শ্যামার চোখের সাথে চোখ মিলে গেলো। কিন্তু মুখ দিয়ে রা বের হতে না দেখে শ্যামা আবার বলল,

” আমার মা-,বাবার উপর প্রতিশোধ নিতেই তো বিয়ে করেছিলে আমায়? বাবা তো মারাই গেলো! মা তার নতুন সংসারে ব্যস্ত। তাহলে আমার দোষটা কোথায়? যাদের জন্য আমাকে তোমার রক্ষিতা করে রাখলে? তারা কেউ নেই-তো আমার জীবনে। তোমার প্রতিশোধের খেলাটা-ও তো শেষ হবার কথা… তাই না সুফিয়ান?”

তাচ্ছিল্য ভরা গলায় কথা গুলো বলে হাসলো শ্যামা। ইজহানের কাছ থেকে দুকদম দূর এসে শক্ত কন্ঠ আবার বললো,

” এই জন্য-ই এই জন্য-ই তুমি আবার বাচ্চাটা-ও কেড়ে নিয়েছো তা-ই তো?”

ইজহান চোখ বড় বড় করে চাইলো।বলল,

“বাচ্চা?”

শ্যামা হো হো করে হাসলো,

” কেন জানো না বুঝি? তুমিই তো দিতে আমায়… ঔষধ গুলো, ভুলে গেছো,!”

ইজহানের এবার মাথা উলোটপালোট হয়ে গেলো। এত সব কথা বার্তা জানলো কিভাবে সে? তার উপর শ্যামা প্রেগন্যান্ট ছিলো? কই জানতো নাতো ইজহান! ইজহান বলল,

” তুমি প্রেগন্যান্ট? ”

কথাটায় ইজহানের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। কিন্তু পরক্ষণেই শ্যামার কথায় ইজহানের মুখ ফিকে হয়ে গেলো।

” কেন তুমি মনে হয় জানতে না? না জানলে আমায় মিসক্যারেজের ঔষধ কেন খাওয়ালে।”

ইজহান আকাশ থেকে পড়লো। শ্যামার কাছে যাওয়ার চেষ্টা করতেই। শ্যামা এবার নিজেকে সংযোগ রাখতে পারলো না। কসিয়ে এক চর বসিয়ে দিলো ইজহানকে। ইজহান হতবাক হয়ে চেয়ে রইলো শ্যামার দিকে। শ্যামা আঙ্গুল তুলে শাসিয়ে বলল,

“ছুঁবে না আমায়! কি ভেবেছো? খেলার পুতুল আমি? সেই ছোট থেকে পুড়চ্ছো আমায়। আর কত… আর কত পুড়বে? কি চাও তুমি? মরে যাই আমি… এটাই তো? তো মেরে দাও একে বারে মেরে দাও আমায়। কিল মি। ”

লাষ্ট কথাটুকু শ্যামা চেচিয়ে বলে ভেজে মাটিতে বসে পড়লো। দু হাতের মুঠোয় হাত রেখে কাঁদতে লাগলো শ্যামা। ইজহানো বসে পড়লো সেখানে। শ্যামা যে তাকে অনেক বড় ভুল বুঝেছে, তা কিভাবে বুঝাবে সে। সে কেন নিজের সন্তানকে মারবে? বাবা হয়ে কেউ তার সন্তানকে ইচ্ছে করে হারাতে চাইবে? ইজহান এবার শ্যামাকে বোঝাতে চাইলো। তার চোখের কোনেও জল চলে এলো,

” শ্যামা শোনো প্লিজ, আমি তোমায় এমন কোনো ঔষধ দিনি। আমি যাষ্ট তোমাকে ভিটামিনস্ ট্যাবলেট দিতাম। তুমি অনেক দূর্বল ছিলে তাই। বিশ্বাস করো!”

শ্যামা শুনলো না ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো ইজহানকে।চিৎকার করে বলল,

” ছাড়ো আমাকে। আর কত মিথ্যা কথা বলবে? আর কত? আর শুনতে চাই না আমি আর না। আর শক্তি নেই আমার সইতে পারবো না আর। ”

তারপর শান্ত হয়ে চোখে জল মুছে উঠে দাঁড়ালো শ্যামা। স্বগতোক্তির মতো বলল,

” তোমার প্রতিশোধ নিয়া শেষ তো? এবার না হয় আমার মুক্তি? ডিভোর্স পেপার টেবিলে রাখাছে তোমার ঘরে। আমাদের পথ এই পর্যন্তই ছিল। এখানেই সমাপ্ত। ইতি টানলাম আমি!”

বলেই শ্যামা বৃষ্টি মাথায় বেড়িয়ে গেলো ইজহানের রাজ প্রাসাদ থেকে। ইজহান কাঠ হয়ে গেছে যেন আজকে এসব কিছুতে। নিজের ভালোবাসাকে আবারো হারিয়ে যেতে দেখে ইজহান সেখানেই তার শরীরের ভার ছেড়ে দিলো। বিড়বিড় করে বলল,

” শ্যামা তাকে এত বড় ভুল বুঝলো? ”

কি করবে এখন ইজহান? কিভাবে ফিরিয়ে আনবে তার চাঁদকে? কিভাবে আবারো অবলোকিত হবে? আঁধারিয়া অম্বর?? ইজহানতো এমনটি চায়-নি, সে চেয়েছিলো শ্যামাকে বড় একটা সারপ্রাইজ দিব। এবং তখনি সে বলবে,

” আমি-ই তোমার সুফিয়ান! ”

কিন্তু তার আগেই এসব কি হয়ে গেলো?

রাতের গভীরতা বাড়তে লাগলো। শ্যামা রাস্তার পথ ধরে হেটে চলে যেতে লাগলো। বুকের ভিতর দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে। ইজহান তার সুফিয়ান যখন কথা শুনেছিলো? শ্যামা সব ভুলে ছুটে চলে আসতে চাইছিলো ইজহানের কাছে। কিন্তু যখন জানলো, সে সন্তান হারা এক মাত্র ইজহানের জন্য-ই সমস্ত শরীর রাগে থর থর করে কাঁপতে লাগলো। শ্যামা মনে করতে চাইলো দু দিন আগে একটি ঘটনা…

ইজহানের সাথে ফোনে কথা বলার পর নিজের রুমে প্রবেশ করে শ্যামা। তখনি এক আগুন্তককে দেখে থেমে যায় শ্যামা। ভ্রু জোরা কুচকে বিরক্তি নিয়ে প্রশ্ন করে,

” মেহরিন? তুমি আমার রুমে কি করছো?”

মেহরিন বিছানার উপর আরামসে বসে শ্যামাকে তাচ্ছিল্য ছুঁড়ে দিলো,

” সত্যি? এটা তোমার রুম, কই জানতাম নাতো। আমার জানা মতে, এটি তো আমার ইজহানের রুম! আর আমি তার হবু স্ত্রী, তো আসতেই পারি কিনা?”

শ্যামার শরীরে থপ করে রাগ উঠে গেলো,

” ফালতু আলাপ রাখো, ভুলে যেও না ইজহান ওল রেডি মেরিড। আর আমি তার স্ত্রী! ”

মেহরিন হাত নাড়িয়ে অলস্য ভঙ্গিতে বলল,

“রাখোতো, তুমি তার বউ নও… আনঅফিসিয়ালি রক্ষিতা। যাকে যখন তখন ইজহান ছেড়ে দিবে। এমনটাই তো লিখা ছিলো তোমাদের কন্ট্রাক্ট পেপারে। ”

শ্যামার বুকের ভিতর কামড় দিয়ে উঠলো। মেহরিনকে বলল,

” আমি ইজহানের কি তা তোমাকে বলতে হবে না। গেট আউট।”

মেহরিন এবার উঠে দাঁড়ালো। আড়মোড়া ভেঙে বলল,

” জানোতো? ইজহান তোমাকে কেন বিয়ে করেছিলো?”

“কেন?”

মেহরিন ফিসফিস করে বলল,

” সানিয়া আন্টির বদলা নিতে!”

শ্যামা চকিতে তাকালো। মেহরিন আবার বলল,

” আরে বাবা… তাই-তো, তাই-তো বছরের তোমাদের প্রেমের পর তোমার সুফিয়ান উরফ ইজহান তোমাকে দেখা দেয়নি!”

শ্যামার মাথায় যেন বাজ পড়লো। সে বিড়বিড় করে বলল,

” ইজহান আমার সুফিয়ান?”

মেহরিন হেসে বলল,

” হ্যাঁ তার সাথে তোমার সন্তানের হত্যাকারী!”

শ্যামার কান গরম হয়ে গেলো এক সাথে অনেক প্রকার অনুভূতি কাজ করতে লাগলো, কখনো ভালো লাগা, কখনো ভালোবাসা, কখনো রাগ, কখনো ঘৃণা। শ্যামা নিজের অনুভূতি গুলো ধরতে না পেরে কাঠ হয়ে গেলো। নিজেকে সামলে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো,

” তুমি কিভাবে জানো এসব?”

মেহরিন হেসে বলল,

” এমা… আমি জানবো না? আমার সামনেই তো সব হলো। তুমি হয়তো জানো না, ইজহান আমার বাগদত্তা। সেই কবে থেকে আমাদের বিয়ে ঠিক হয়ে ছিলো, যেই তুমি আমাদের জীবনে পা রাখলে, ওমনি সব বদলে গেলো। প্রতিশোধের নেশায় মেতে উঠলো ইজহান! কথা ছিল তোমার মা-বাবার প্রতিশোধ তোমার থেকেই নিবে, কিন্তু যখন জানলো, এতে কোনো লাভ হবে না… তাই ইজহান সব ছেঁড়ে দিলো। এমন কি তুমি প্রেগন্যান্ট শুনে বাচ্চা নষ্টের ঔষধ পর্যন্ত দিলো। সে দেশে ফিরলেই ডিভোর্স দিয়ে দিবে তোমাকে। এই যে আমি ওল রেডি তা করে-ও এনেছি!”

শ্যামা বলল,

” তুমি মিথ্যা বলছো? ইজহান কখনো তার সন্তানকে মারবে না।”

” কেউ যদি যেনে শুনে অন্ধ হতে চায়? তাহলে আমার কি করার আছে?”

” আমি মিথ্যা কেন বলবো? বিশ্বাস না হলে দাদিজানকে জিগ্যেস করে দেখো!”

শ্যামা তাই করলো দাদিজানের কাছে ছুটে এসে বলল,

” মেডাম, মেহরিন কি ইজহানের বাগদত্তা? ”

দাদিজান বই পড়ছিলেন। এই কদিনে শ্যামার সেবায় অনেকটা সুস্থ উনি। বলতে গেলে তার মনের মাঝে মেয়েটির জন্য একটি সফট কর্ণার তৈরি হয়েছে। কিন্তু এটি তো সত্য। আলিয়া বলল,

” হ্যা তা সত্য। কিন্তু..!”

কিন্তুটা আর শ্যামার কান পর্যন্ত পৌছালো না। শ্যামা বেড়িয়ে গেলো। এবং ফোন করতে লাগলো ইজহানকে। কিন্তু কোনো ভাবে পেলো না ফোনে। তারপর শুধু অপেক্ষা আর অপেক্ষা।

শ্যামা দীর্ঘ শ্বাস ছাড়লো। তার পুরোনো বাড়িতে এসে পৌঁছোলো সে। ভিজে কাপড়ে চুবুচুবু। ঘরে ঢুকে ভিজা কাপরেই সোফায় বসে পড়লো সে। এবং তখনি শ্যামার হাতে চাপ লেগে টিভি স্ক্রীন ওন হলো। সেখানে একটি গান বাজতে লাগলো বিরহের। যেন এটি শ্যামা আর ইজহানের ভাগ্যের সাথে খাপ খেয়ে গেছে।শ্যামা সোফার হাতল ধরে এবার জোরে জোরে কান্না করতে লাগলো। এত দিনের দুঃখ কষ্ট বাঁধ ভেঙ্গে গড়িয়ে পড়তে লাগলো ঢল নেমে।

ও আল্লাহ আমার,
কত করেছি যে আরজি
বুঝিনা তোমার, কি যে মর্জি।
দিন ভালোবাসা, ওগো দাওনা ফিরিয়ে
বলো তাকে ছাড়া, বাঁচবো কি নিয়ে।

ঘরে ফিরবেই একদিন নদী
প্রেম বুঝলে সে খুঁজবে দরদী,
দাওনা তাকে ফিরিয়ে একটি বার।

জানি আকাশ পাইনা ছুঁতে মাটি
তবু মনতো মানেনা তাই হাঁটি,
যদি পথের ধারে পেয়ে যাই দেখা তার।

ও আল্লাহ আমার,
কত করেছি যে আরজি
বুঝিনা তোমার, কি যে মর্জি।
দিন ভালোবাসা, ওগো দাওনা ফিরিয়ে।
বলো তাকে ছাড়া, বাঁচবো কি নিয়ে।

মেঘলা, দিনে আকাশ জুড়ে দাবি
মন রে, সামলে তাকাস পুড়ে যাবি।

না পুড়লে কিসের ভালোবাসা
ভাঙে মন, তবু ভাঙেনা যে আশা
সে ছাড়া আর কেউ নেই যে আমার।

জানি আকাশ পায়না ছুঁতে মাটি
তবু মনতো মানেনা তাই হাঁটি,
যদি পথের ধারে পেয়ে যাই দেখা তার।

ও আল্লাহ আমার,
কত করেছি যে আরজি
হ্যাঁ বুঝিনা তোমার, কি যে মর্জি।
দিন ভালোবাসা, ওগো দাওনা ফিরিয়ে
বলো তাকে ছাড়া, বাঁচবো কি নিয়ে।

চলবে,
চলবে,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here