আঁধারিয়া অম্বর পর্ব ৬+৭

0
75

#আঁধারিয়া_অম্বর
#সুরাইয়া_সাত্তার_ঊর্মি
৬।

এসব ভাবার মাঝেই ফোনের রিং বেজে উঠলো। ফোনের উপর ভেসে উঠলো, “মি হাসবেন্ড ” নামটি। কিন্তু উনি হঠাৎ কল কেন করলেন? বুঝতে পারছে না শ্যামা। তখনি মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষ স্ব তেজ হলো। কালকের পানিশমেন্ট দেয়ার জন্য নয়তো?শ্যামা ভয়ে ভয়ে রিসিভ করতেই, ওপাশ থেকে শোনা গেলো মি ইজহানের ঠান্ডা, শীতল কন্ঠ…

“কোথায় তুমি?”

দুটো শব্দ। দুটো শব্দেই যেন জমে গেলো শ্যামা। এত গরমের মাঝে অনুভব করলো তার শরীরের কাঁপ। এত, এত ঠান্ডা গম্ভীর কন্ঠ যে কারোই হাড়কাঁপানোর জন্য যথেষ্ট। শ্যামা শুকনো ঢুক গিললো বলল,

” আ.. আমি, অফিসে!”

ওপাশ থেকে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর এলো,

“বাড়ি এসো, ইন ফিফটি মিনিট’স!”

শ্যামা ফোনের এপাশে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বসে রইলো। ঠিক তখনি জাহিদ এসে বলল,

” কিরে মুখ এমন পাংশুটে বানিয়ে আছিস কেন?”

শ্যামা ছোট শ্বাস ফেলে বলল,

“বাড়ি যেতে হবেরে!”

“ঠিক আছে যা। চিন্তা করিস না সামলে নিবো আমি এদিকটা।”

“কিন্তু শান্তনু স্যার?”

জাহিদ আশ্বাস দিয়ে বলল,

“মে হু না…!”

ফিক করে হেসে দিলো শ্যামা। জাহিদকে বিদায় জানিয়ে বেড়িয়ে পড়লো বাসার উদ্দেশ্যে।

এদিকে অনেকক্ষণ যাবত বসে আছে মি. ইজহান। ঘরের নিয়ন আলো জ্বলছে। এই টুকু আলোতেই ইজহানের মসৃণ মুখখানা দেখা যাচ্ছে। দৃষ্টি বাহিরের সন্ধ্যা হয়ে হয়ে আশা আকাশটার দিকে। বিক্ষিপ্ত মনে হাজারটা প্রশ্ন, রাগ, অভিমান পুশে আছে। ডান হাতের দু আগুনের ভাজে জ্বলন্ত সিগারেট ধরে আছে। কিছুক্ষণ পর পর পুরে নিচ্ছে নিজের ঠোঁটের ভাজে। তামাকে তীব্র গন্ধ বিষাদ করে দিচ্ছে ভিতর টা। একটা.. একটা ঘোরের মাঝে আছে যেন ইজহান। ঠিক তখনি খট করে দরজাটি খুলে গেলো ঘরের। গুটিশুটি পায়ে ভিতরে ঢুকলো শ্যামা। কঁপালের মাঝে দুটো ভাজ শ্যামার। এই অসময়ে মি. ইজহানের বাসায় থাকার তো কথা না.. তাহলে? সত্যিই কি পানিশমেন্ট দিতে চান? শ্যামা কঁপালে এবার ঘাম বিন্দু বিন্দু জমতে লাগলো। সে ঠোঁট ভাজ করে বলল,

“মি. ইজহান?”

ইজহান পূর্ণ দৃষ্টি মেলে চাইলো আলুথালু চুলের মেয়েটির দিকে। পড়নে লাল টপ, নেভি চিন্স, গলায় ঝোলানো স্কার্ফ। সে বলল,

“বসো এখানে!”

শ্যামা বিনা বাক্যে বসে গেল। সুক্ষ্ম ভাবে তাকিয়ে রইলো সামনের ব্যক্তিটির অভিব্যক্তি বুঝতে। কিন্তু ব্যর্থ বরাবরের মতোই, ঠান্ড, গম্ভীর তার দৃষ্টি। শ্যামা লক্ষ করলো, এই যুবকটিকে এই মুহূর্তে ভিষণ সুন্দর লাগছে। তার তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করছে। তবে কি শ্যামা তাকে ভালোবাসতে শুরু করেছে? মি. ইজহান যখন চলচ্চিত্রের সাথে যুক্ত ছিলো, সবার মতোই সেও তাকে বড্ড পছন্দ করতো। কিন্তু ভাগ্য আজ তার বউ উর্ফে রক্ষিতা বানিয়ে দিয়েছে। যত যাই হোক, লোকটি তার বর। কিন্তু লোকটি তাকে একটি বারের জন্য কি তার সহধর্মিণী মেনেছে? শ্যামা অনুভব করলো এবার তার বুকের কোনে তীব্র ব্যথা করছে। নিজেকে সামলে লোকটিকে সরাসরি জিজ্ঞেস করলো,

“আপনি কি আমাকে পানিশমেন্ট দিতে ঢেকেছেন?”

মি. ইজহান ম্যামার পা থেকে মাথা পর্যন্ত এক নজর চোখ বুলিয়ে উঠে দাঁড়ালো। অর্ধেক সিগারেট খাওয়া অংশটি মাটিতে ফেলে মারিয়ে ফেললো। জ্বলন্ত সিগারেট ধপ করেই নিভে গেলো যেন। পাশের টেবিল থেকে একটা ওয়াইনের গ্লাস তুলে চুমক দিয়ে এগিয়ে এলো শ্যামার কাছে। বলল,

“তোমার কি মনে হয়?”

শ্যামা ভয়ে চোখ ছোট ছোট হয়ে এলো। বলল,

“দেখুন আমার কাজটাই এমন, যখন তখন যেখানে সেখানে যেতে হয়, আপনি আমাকে তা নিয়ে বাঁধা দিতে পারেন না!”

ইজহান বাঁকা হাসলো। বলল,

“তোমার কি তাই ধারণা?”

শ্যামা চুপ করে গেলো। অবশ্যই সে কখনোই পাড়বে না মি. ইজহানের সাথে। সেই ক্ষমতা তার নেই আজ। আজ তার বাবা যাই যাই অবস্থা নয়তো মি. ইজহানের মুখ পর্যন্ত দেখতো না সে। শ্যামা আবার ভাবলো মি. ইজহান কি কোনো প্রকার রাগ তার প্রতি? শুধুইকি রাতে বাহিরে যাওয়ার জন্যই উনি রেগে? নাকি তার পিছনে আমাকে অপছন্দ, ঘৃণা করার কারণ। তবে শ্যামা বুঝতেই পারছেনা মি. ইজহান কেন, কেন তাকে অপমান করেন? শ্যামা উল্টো প্রশ্ন করলো,

“আপনি কি কোনো কারণে অসন্তুষ্ট আমার উপর?”

মি. ইজনাম থেমে গেলেন যেন কিছুক্ষণ। পরমুহূর্তেই আরো কাছে এগিয়ে এলো শ্যামার দিকে। শ্যামা বসে ছিলো। এভাবে এগিয়ে আসতে দেখে দাঁড়িয়ে গেলো। মি. ইজহান যত এগিয়ে আসচ্ছে, ততোই ঢিপঢিপ করে বেজে চলছে হৃদপিণ্ড। এক সময় থেমে গেলো শ্যামা। পিছনেই মি. ইজহানের নরম তুলতুলে বিছানা। মি. ইজহান তখন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেলো শ্যামার। হাতের ওয়াইনের গ্লাসটি ঢেলে দিলো শ্যামার গালে, ঠোঁটে, ঘাড়ে। শ্যামা চমকে উঠলো একেবারে। কন্ঠ তখন বড্ড কাঁপছে। শ্যামা বুঝে না, কেন ইজহানের সামনে এলেই তার কন্ঠ কাঁপে, কথা বলা বন্ধ হয়ে যায়, দলা পাকিয়ে বসে থাকে গলার মধ্যান্য। শ্যামা বলল,

“এ.. কি করছেন মি. ইজহান?”

মি. ইজহান ভাবলেশহীন, ঠান্ডা তার দৃষ্টি। শ্যামার গা হীম করে উঠলো। কেমন অদ্ভুত ভাবে একটা হাসি দিয়ে গালে হাত ছোঁয়ালো শ্যামার। গায়ে লোম দাঁড়িয়ে গেলো। শ্যামা নিভু নিভু চোখে চেয়ে আছে। মি. ইজহান তখন অল্প আওয়াজে বলল,

“আগে চেষ্টা করি, তারপর নাহয় বুঝবো আমি সন্তুষ্ট নাকি অসন্তুষ্ট! ”

শ্যামা অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলাম, মি ইজহানের কথায়। কিছু বুঝে উঠার আগেই ধাক্কা দিলেন। টাল সামলাতে না পেরে বিছানায় পড়ে গেলো শ্যামা। মুখ দিয়ে কিছু বলবে তার আগেই মি. ইজহান তার হাত, মুখ বেঁধে দিলো শ্যামার গলার স্কার্ফ দিয়ে। শ্যামা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলো মি. ইজহানের দিকে। ইজহান বাঁকা হাসচ্ছে। মনে হচ্ছে ইজহান রূপি কোনো দৈত্য এ মুহূর্তে হামলে পড়েছে শ্যামার উপর। পরনের কাপড় টেনে টেনে খুলে মাটিতে ফেলে দিচ্ছে। হিংস্র হায়না যেমন খাবার পেলে ছিঁড়ে খুঁড়ে খায়, মি. ইজহান এখন তাই করছে। শ্যামা চিৎকার করতে চাইছে, বলতে চাইছে,,

” আমাকে.. আমাকে ছেঁড়ে দিন, আমি আর পারছি না…”

কিন্তু কোনো শব্দ বের করতে পারছেনা সে। বের হচ্ছে শুধু গোঙ্গানির চাপা আওয়াজ, আর চোখের জল।

কিছুক্ষণ আগের ঘটনা। মি. ইজহান তার অফিস কেবিনে বসে ছিলো। ঠিক তখনি তার ইন্সটাতে একটি মেসেজ আসে। এই মেসেজ দাতাকে সে চিনে। এ আর কেউনা তারই বন্ধু, ঠিক বন্ধু বললে ভুল হবে, বিশ্বাস ঘাতক বন্ধু রিদোয়ান খান। বরাবরের মতোই সে মনে করিয়ে দেয়, তার ভালোবাসার মানুষটিকে সে কিভাবে কেঁড়ে নিয়েছিলো। আজ-ও তাই করেছে। লিখেছে,

“আমার জানে জিগার দোস্ত। কেমন আছিস? জানিস আমি শ্যামাকে পেয়ে গেছি। খুব শীঘ্রই আমার বুকে থাকবে সে। মনে আছে? সে দিনের কথা? স্কুলের শেষ দিনটিতে আমাকে কিভাবে শ্যামা চুমু খেয়েছিলো? এবার আমিও খাবো সেভাবেই চুমু, তার পুরো শরীরে। আর তুই তখন দেখেই গিয়েছিস, এবারো দেখেই যাবি। তোর ধারা কিছুই হবার নয় বাছা। এ জম্মে শ্যামা কিন্তু আমার।”

মেসেজটি পড়েই মাথা গরম হয়ে যায় ইজহানের।সেদিনটি সে কিভাবে ভুলবে? সে দিনটি সে কখনোই ভুলতে পারবেনা। চোখের সামনে এখনো ভাসে যেন মি. ইজহানের। দুটো ছেলে মেয়ে একটি ক্লাসে ঢুকে গেলো। পরক্ষণেই বন্ধ হয়ে গেলো দরজা। এইটুকু দেখেই ইজহানের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পরে। এক মুহূর্ত দেড়ি না করে চলে আসে বাসায়, পছন্দের গিটারটি ভেঙ্গে ফেলে, ভেঙ্গে ফেলে দামি আসবাব। ঝনঝন করে গুঞ্জন হয় পুরো রুমে। আজ যেন তার তাই করতে মন চাইছিলো, সব ভাঙ্গিয়ে, গুড়িয়ে জ্বালিয়ে দিতে চাইছিলো। কিন্তু তার মাথায় তখন চলল অন্য খেলা। রক্তিম হয়ে উঠা চোখ জোড়া দিয়ে ফোনটি একবার দেখে নিয়ে কল করলো শ্যামাকে।

এসব ভেবেই রাগ আরো দিগুণ হলো যেন ইজহানের। নিজের শরীরের সবটুকু দিয়ে ছিন্নভিন্ন করতে চাইলো শ্যামার শরীর। ঘন্টাখানেক যেতেই ছেড়ে দিলো শ্যামাকে, হাতের বাঁধন, মুখের বাঁধন খুলে দিলো সে। শ্যামা এবার ফুপিয়ে কাঁদতে লাগলো। শ্যামাকে ছেঁড়ে উঠে দাঁড়িয়ে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়ালো সে। ঠিক কি ভেবে আবার থেমে গেলো। শ্যামার কাছে ফিরে এসে আবারো ঝুঁকে পড়লো। শ্যামা ভয়ে আধমরা। তখনি নরম আওয়াজে অদ্ভুত হাসি দিয়ে বলল মি. ইজহান,

“এখন আমি সন্তুষ্ট, তা বলতে পাড়ি!”

শ্যামা স্তম্ভিত হয়ে গেলো। মি. ইহানের কথা গুলো বারবার কানে বাজতে লাগলো। সে এবার সন্তুষ্ট। শ্যামার মনে এবার প্রশ্ন উঁকি দিলো,

“মি. ইজহানের কি তাহলে শরীরিক চাহিদাটাই সব?”

মি. ইজহান দরজাটি স্ব শব্দ বন্ধ করে চলে গেলেন। সে রাতে আর উনি ফিরলেন না। শ্যামা শরীরের ব্যথায় জ্বর এসে গেলো। কিছুটা খাবার খেয়ে ঔষধ খেলো। এবং ঘুমনের জন্য বিছনায় যেতেই ওর ফোনটা একটা মেসেজ এলো। এত রাতে কে মেসেজ করেছে? ভেবেই কৌতূহলে ফোনটা হাতে তুলে নিলো। একটা আননোন নাম্বার থেকে একটা মেসেজ এসেছে। ফোন স্ক্রল করতেই জ্বলজ্বল করে উঠলো,

“আই লাভ ইউ জান! সি ইউ সুন…..!”

শ্যামা থমকালো। এমন একটি মেসেজ তাকে কে পাঠালো? ভেবেই গা হীম করে উঠলো। কিছুক্ষণ ভাবতেই ঠোঁট দুটি নেড়ে, ভয়ে মাথা কন্ঠে উচ্চারণ করল,

“র..রি..দ!
#আঁধারিয়া_অম্বর
#সুরাইয়া_সাত্তার_ঊর্মি
০৭।

সকালের মিষ্টি রোদের ছোঁয়ায় ঘুম ভেঙে যায় শ্যামার। চোখ পিটপিট করে তাকায় এদিক ওদিক। মি. ইজহান নেই। পরক্ষণেই মনে পরে কাল রাতের কথাটুকু। তিক্ততায় বিষিয়ে উঠলো মন। মনের সাথে লড়াই করে, হতাশার শ্বাস ছেড়ে নেমে পড়লো বিছনা থেকে। রেডি হয়ে বেড়িয়ে গেলো নতুন এক সূচনার পিছনে।

নিউজ এজেন্সি পৌঁছাতে জাহিদ হেসে বলল,

“মামা এই কাগজটা দেখ, আমাদের শান্তনু স্যারর খুঁজে এনেছে। শ্যামা কাগজটি হাতে নিলো। তারপর হো হো করে হেসে উঠলো। গাল ব্যথা করার উপক্রম যেন। শ্যামা জোরে জোরে পড়লো,

” পাত্রি চাই, সুন্দর, দেখতে যেন ক্যাটরিনা কাইফ হয়, বডি ফিগার দীপিকা পাডুকোন, লম্বায় কারিনা কাপুর। হাসলে যেন গালে টোল পড়ে। ”

এতটুকু তাো যেন চলে, কিন্তু এরপরে ছেলেটির ছবি দেখে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়লো চেয়ার থেকে। লোকটি বেটে, মাথায় মোটা, চউড়া টাক, এক হাত পেট বেড়িয়ে, বয়সে ৬০/৬৫ হবে। এর এমন সাধ দেখে হো হো করে হেসে উঠলো আবার। শ্যামার তো চোখেই জল। বলল,

“শান্তনু স্যার এই প্রাণীদের কই থেকে আমদানি করে রে? মানে? এগুলো কোনো কোনো নিউজ? এগুলো পড়ে পাঠকদের না গালি খাইতে হয়!”

তখনি জাহিদ দু হাত তুলে বলে,

“আমিতো একদম চাই এই শান্তনু গালি খাক। খাইশটা বেটা!”

বলে দুজন আবার হেসে উঠলো। তখনি পিছন থেকে সতর্ক ভাবে কেশে উঠলো শান্তনু। তাকে দেখেই চমকে গেলো দুজন। এবং চাপা হেসে ক্যাবলাকান্তের মতো বলল দুজনেই,

“স্যার আপনি?”

শান্তনু চশমার পিছনে লুকানো চোখ দুটো দিয়ে সরু করে চাইলো। থমথমে কন্ঠে বলল,

“মজা করা যদি শেষ হয়! কাজে লেগে পড়েন। এই কদিনতো কোন কাজ আপনারা তেমন করেন নি। যদি কাজে বদলে মজাই করতে ইচ্ছে হয়, তাহলে কোনো কমেডি সোতে জয়েন হন। আমি ও বরং হাফ ছেড়ে বাঁচি। যতসব আবাঙ্গাল!”

শেষ কথাটি চিবিয়ে চিবিয়ে বলল শান্তনু। এবং একটি কাগজ এগিয়ে দিয়ে চলে গেলো ধপাধপ পায়ে। এদিকে মুখ টিপে দুজন হেসে কাজে লেগে পড়লো। শান্তনুর দিয়ে যাওয়া কাগজটি দেখে নিলো। একটি গল্প লিখা তাতে। এটি ছাপানো হবে কালকের কাগজে। শ্যামা ছোট থাকতে এমন গল্পের কত যে ওয়েট করে থাকতো। আর এখন সে নিজেই এসব করে। হালকা হেসে মাউসের উপর হাত রেখে ক্লিক করবে, ঠিক তখনি পুরোনো দিনের একটি স্মৃতি ডায়েরির পাতা উল্টালো।

কল্পনা….

এসএসসি পরীক্ষা সবেই শেষ হয়েছে শ্যামার। বোরিং সময় পাড় করে চলেছিলো সে। বাড়ির ভিতরে লাইব্রেরিখানার মোটামুটি সব বই পড়া শেষ তার। কি করবে, কি করবে ভাবতে ভাবতে বরাবরের মতো পেপার হাতে তুলে নিলো। খবরের কাগজের মাঝে কিছু কিছু মজার গল্প থাকে, যা শ্যামা খুব অগ্রহ সহকারে পড়ে। আজোও তার ব্যতিক্রম হলো না। ১৬ বছর বয়সী মেয়েটি বরাবরের মতোই পড়তে লাগলো গল্প। গল্প শেষে পেপার ভাজ করার সময় চোখে পড়লো একটি বিজ্ঞাপন।

“প্রেমিকা চাই। প্রেম করতে চাইলে ফোন করুন নিচের নাম্বারে!
নামঃ সুফিয়ান দ্যা সিক্রেট বয়। (ছদ্মনাম), ফোন নাম্বারঃ*****

শ্যামা থ মেরে বসে রইলো। এমনো কি কখনো হয় নাকি বিজ্ঞাপন? কিছুক্ষণ ভাবলো। তারপর খিলখিল করে হেসে উঠলো। কিশোরী হাসি শুনে পাশেই বসে থাকা ছোট বোন জান্নাত ড্যাব ড্যাব করে চেয়ে দেখলো। তার বড়পু এভাবে হাসচ্ছে কেন? কিছু বুঝে উঠলো না সে। শ্যামা তখন আপন মনে কাগজটি কেঁটে নিলো। বান্ধবীদের দেখাবে বলে। মনে মনে ভাবলো,

” একটা বার ফোন করে দেখাই যাক না এই বেকুব টা কে? না হয় বান্ধবীরা মিলে প্রেম করার শখ ঘুচিয়ে দিব!”

আবার খিলখিল করে আসলো। ঘরময় মিষ্টি খিলখিল হাসি ঝমঝম করে উঠলো। কিন্তু সে কি আদৌ জানে? তার ভাগ্য তাকে কোথায় নিয়ে যাবে?

সেদিন ঠিকি ফোন করেছিলো গুনে গুনে পাঁচ বার রিং হওয়ার পর ফোনটা অপাশ থেকে তুলে কেউ। একটা ঝংকার তুলা কন্ঠ বেজে উঠলো ওপাশ থেকে। শ্যামা সহ তার বান্ধবীরাও হা হয়ে গেছিলো। ফোন তখন লোডে দিয়া ছিলো। শ্যামার বাবা এস এস সি পরীক্ষা পাশ করাতে শ্যামাকে নোকেয়া বাটন ফোন কিনে দেয়। তখন টার্চ ফোন চালানো অহরহ ছিলো না। চালালেও অ্যান্ড্রয়েড ছিলো না। না এত আপডেট ছিলো সব। শ্যামা সেদিন সেই কন্ঠ শুনে এক প্রকার হারিয়ে গেছিলো অজানা জগতে। মজার ছলে করা এই ফোন কলটি পরবর্তীতে তার জীবনের একটি অংশ হয়ে যায়।

শ্যামার বুক চিঁড়ে দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে এলো। সুফিয়ান দ্যা সিক্রেট বয়, সিক্রেটি রয়ে গেলো। আজ জানতে পারলো না৷ ওই পছন্দের মানুষটির কথা।

————-

অফিস থেকে বের হতে হতে প্রায় সন্ধ্যাই হতে চলেছে। একে একে সবাই বাসার দিকে পা বাড়াচ্ছে। শ্যামা নিজের কাজ গুছিয়ে নিচে নেমে এলো। অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে রিকশা খুঁজতে লাগলো। আজ জাহিদ বিকেলেই ছুটি নিয়ে চলে গেছে। তার গার্ল ফ্রেন্ড বাড়ি চলে যাবে গুড বায় জানতে হবে বলে। নয়তো প্রতিবার জাহিদ তাকে রিকশায় তুলে দিয়ে বাইক নিয়ে সটান করে চলে যায়। এদিকে মাগরিবের আজানে চারপাশে সুন্দর সুর তুলেছে। শ্যামা মাথার কাপড় ভালো করে টেনে দিয়ে আবার চোখ ঘুরালো। নাহ্, কোথাও নেই খালি রিকশা, যা আসচ্ছে সব কটাতেই প্যাসেঞ্জারে ঠাসা। এরি মাঝে একটি সাদা গাড়ি খুব জোড়ে ব্রেক কসলো শ্যামার সামনে। শ্যামা ভয় পেয়ে গেলো। বুকে মাঝে থুতু দিয়ে কিছু কথা বলার জন্যই মুখ তুলতেই চক্ষু চড়কগাছ। মুখের মাস্ক আর সানগ্লাস খুলে ওয়েস্টার্ণ একটি ড্রেস পড়ে, হিলের কটকট শব্দ তুলে এগিয়ে আসচ্ছে একটি মেয়ে। কিছুটা কাছে আসতেই শ্যামা বলল,

” একি…. মিস. চৈতি যে। এ আবার এখানে কেনো?”

শ্যামা ভাবছিলোই তখনি চৈতি এসে দাঁড়ালো তার সামনে। মেজাজ খারাপ করে বলল,

” হাউ ডেয়ার ইউ? আমার সম্পর্কে এসব গুজব ছড়িয়ে দিচ্ছো কেন মেয়ে?”

শ্যামা প্রথমে বুঝতে না পাড়লেও এবার ঠিকি বুঝতে পেরেছে, চৈতি আসার কারণ। সে শক্ত কন্ঠে বলল,

“আপনি কি ড্রাগস নিন না? এটা কি মিথ্যা? ”

চৈতি কিড়মিড় করে উঠলো,

“শোনো মেয়ে আজেবাজে বকবে না। তোমার চাকরি খেতে আমার এক মিনিট ও লাগবে না। সো ডোন্ট ওভার স্মার্ট। তোমাদের মতো মেয়েদের আমার চেনা আছে। টাকার ভুক্ষা সব।”

শ্যামার গায়ে জ্বলন্ত কয়লা যেন লাগিয়ে দিলো কেউ। বলল,

” এক্সকিউজমি? আমার মতো মেয়ে মানে? কি বলতে চাইছেন? আর টাকার ভুক্ষা মানে কি? এসবের যদি ইচ্ছেই থাকতো, আপনার মতো আমিও হয়তো কোনো ধনী ব্যাক্তি বা মাফিয়াদের কোলে বসে থাকতাম।”

খোঁচা টা যেন জায়গায় মতো লেগে গেছে। আগুনের পিন্ডর মতো চোখ করে ঠাস করে এক চড় মারলো শ্যামাকে। শ্যামা মোটেও এর জন্য প্রস্তুত ছিলো না। থাকলে হয়তো নিজেকে রক্ষা করতে পাড়তো সে। শ্যামা নিজের গালে হাত দিলো। ব্যথায় টনটন করে উঠলো ডান পাশের গালে। সে অবাক হয়ে চাইলো চৈতির দিকে। চৈতি গগনবিদারী চিৎকার করে বলে উঠলো,

” আমি বুঝেছি, তুই রিদকে কেড়ে নিতে চাস তাই না? তা কখনো হবে না। কখনো না। রিদ শুধুই আমার। আমি… আমি তোকে দেখে নিবো!”

বলতে বলতে গাড়িতে চড়ে বসলো চৈতি। শ্যামা তখন থ কিছুই বুঝতে পারছেনা সে। রিদের সাথে যার তার সাথে সম্পর্ক তাক তাতে শ্যামার কি? যা চলে গেছে তা তো ফিরে আসার কোনো পথ থাকে না। আর এখন তো আরো নেই, কারণ শ্যামা তো কারো কাছে বন্দী। এসব ভাবতে ভাবতেই শ্যামা রিকশা করে বাসায় চলে এলো।

এদিকে এতক্ষণে হয়ে যাওয়া সব টুকু ঘটনা স্ব চোখে দেখেছে ইজহান। গাড়ির স্টিয়ারিং এ শক্ত করে ধরে আছে হাত। এই মুহূর্তে মনে যাইছে চৈতিকে সে খুন করে ফেলতে। কত বড় সাহস তার? তার শ্যামার গায়ে হাত তুলে? কঁপালের রগ দাঁড়িয়ে গেলো ইজহানের। চৈতির গাড়ি পিছনে ছুটলো এবার। ওভার ব্রীজে উঠতেই চৈতির গাড়ির পিছন থেকে ধাম করে ধাক্কা বসালো ইজহান। ভয়ে আর্তনাদ করে উঠলো চৈতি। ড্রাইভার রীতিমতো গাড়ির দরজা খুলে ছিটকে পড়েছে রাস্তার কিনারে। ইজহান রাগে হতবুদ্ধি। আরেক ধাক্কায় একেবারে গাড়ি চলে যায় রেলিং এর সিমেন্ট ভেঙ্গে অর্ধেক বাহিরে। চৈতি তখন একাই ভিতরে বসে। কঁপাল, নাক ফেঁটে রক্ত ঝড়ছে। বহু কষ্টে গাড়ি থেকে বের হতেই গাড়িটি নিজে পড়ে গেলো সাথে সাথে। চৈতি হাউ মাউ করে কেঁদে দিলো প্রাণে বেঁচেছে বলে। ভয়ে ভয়ে যখন পিছনে তাকালো তখনি চোখে পড়লো একটি ব্ল্যাক কার। ভিতরে কে? বুঝা যাচ্ছে না। ঠিক তখনি হালকা করে নেমে গেলো কাঁচ ভিতর থেকে তখন কেউ একজন বলে উঠলো,

“এটা শুধু ট্রেইলার ছিলো। ফিল্ম দেখতে না চাইলে, শ্যামার থেকে দূরে থাকবে। নয়তো……!”

গাড়ির কাচটি উঠে গেলো। এবং স্বাই করে চলে গেলো। চৈতি স্তম্ভিত হয়ে রইলো। মাথার মাঝে কিছুই ঢুকছে না তার। যেন ট্রমায় আছে সে। কিছুতেই বুঝতে পাড়ছে না, সামন্য নিউজ এজেন্সির একটি কর্মচারির গায়ে হাত তোলায়, তার জানটাই চলে গেছিলো প্রায়? কে এই ব্যক্তি??

চলবে,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here