আঁধারিয়া অম্বর পর্ব ৮+৯

0
81

#আঁধারিয়া_অম্বর
#সুরাইয়া_সাত্তার_ঊর্মি
০৮।

ছোট ছোট বরফ টুকরো ছোট একটি বোলে করে নিয়ে এলো শ্যামা। ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের গালটা একবার দেখে নিলো। ফোলা ফোলা। পাঁচ আঙ্গুলের লাল দাগ হালকা । শ্যামা স্বযত্নে বরফের টুকরো গালে ঘসতেই ব্যথা অনুভব করলো। দাঁতে দাঁত খিঁচিয়ে সরিয়ে ফেললো যখন তখন। এই মুহূর্তে তার মার কথা বড্ড মনে পড়ছে। ছোট বেলায় যখন শ্যামা ছুটোছুটি করে ব্যথা পেতো, তার মা কত যত্ন করে ঔষধ লাগিয়ে দিতো, কখনো মাথায় আঘাত পেলে এভাবেই বরফের টুকরো নিয়ে মাথায় ঘসে দিতো। কিন্তু? তখন এতটা ব্যথা অনুভব হতো না। অথচ এখন শ্যামা নিজের ব্যথাতে নিজেই স্পর্শ করছে আর মরিচের মতো জ্বালা করছে। শ্যামা এক পলক আয়নায় দেখে নিলো। তার পরই মনে মনে ছক কেঁটে ফেললো চৈতিকে সে দাঁতে নয়, বাতে বাড়ি দেবে। চৈতির কিছু ছবি আছে এখনো শ্যামার কাছে। রিদের কোলে বসে কিস করছিলো রিদকে। যদিও রিদের চেহারা অস্পষ্ট। কিন্তু চৈতি বড় ট্রোলের স্বীকার হবে। ভেবেই বাঁকা হাসলো শ্যামা। পরক্ষণেই আবার দাঁত খিচিয়ে চোখ বুঁজে চেপে ধরলো পাথরের টুকরো। কিন্তু এবারো সে ব্যর্থ হলো। ব্যথায় কুকিয়ে অস্পষ্ট স্বরে ডাকলো,

“মা..!”

অনেকক্ষণ ধরেই দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ইজহান সবটুকু কাজ পর্যবেক্ষন করলো শ্যামার। মেয়েটি ব্যথায় কুঁচকে যাচ্ছে বার বার। হুট করেই ইজহানের বড্ড মায়া লাগতে লাগলো মেয়েটির উপর। সে ধীমি পায়ে এগিয়ে গেলো শ্যামার দিকে। শ্যামা এখনো বন্ধ চোখ জোড়া কুঁচকে আছে। ঘন ঘন শ্বাস ছাড়ছে। ইজহান অপলক দৃষ্টি তাকিয়ে আছে শ্যামার দিকে। মসৃণ মুখখানায় লাল দাগেও শ্যামার সুন্দর্য কম হয়নি। কঁপালে ছোট ছোট চুল গুলো বড্ড আদুরে লাগছে। শ্যামার গোলাপের পাপড়ির মতো ঠোঁট গুলো কাঁপছে। সব মিলিয়ে এই মুহূর্তে ভয়ার্ত অপ্সরী লাগছে। ইজহানে বড্ড লোভ হলো, মেয়েটি আদুরে ছোট ছোট চুল গুলো গুছিয়ে কানের পিছনে করে দিলো। বরফের বোল থেকে একটুরো বরফ তুলে তার পকেট থেকে রুলাম বের করে ভরে নিয়ে স্বযত্নে লাগিয়ে দিতে লাগলো শ্যামার গালে।

একটা উষ্ণ অনুভতি সারা শরীর ছুঁয়ে গেলো শ্যামার। ইজহানের দিকে হকচকিয়ে তাকালো। চোখে বিস্ময়। উদাসীন ও অনুভূতিহীন গম্ভীর দৃষ্টিতে আজ যেন কিছু বলছে। শ্যামা তাই পড়ার চেষ্টা করছে। ইজহান আলতো হাতে বার বার বরফের টুকরো স্পর্শ করছে গালে। কিন্তু এবার ব্যথা অনুভব করলো না শ্যামা। করবেই বা কিভাবে? এই মিস্টিরিয়াস, অ্যারোগান্ট ছেলেটি তাকে যত্ন করছে? আদো বিশ্বাস হওয়ার কথা?

শ্যামা ঠোঁট নাড়লো,

“মি. ইজহান.. আমি..”

কথার মাঝেই ঠোঁটের উপর তর্জনী আঙ্গুল চেঁপে ধরলো ইজহান। নরম আওয়াজে বলল,

“ডোন্ট টক!”

শ্যামা এবার কিংকর্তব্যবিমূঢ়। বড় বড় চোখে চেয়ে দেখলো শুধু। মি. ইজহান মুচকি হাসলো। এই প্রথম তার ঠোঁটে কোনে হাসি দেখতে পেলো শ্যামা। অপলক দৃষ্টি তাকিয়ে রইলো পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে।এত সুন্দর হাসতে পারেন উনি? পিনপতন নিরবতা ঘরময়। একটি ক্ষুদ্র জিনিস পড়লেও যেন শব্দ হবে মারাত্মক ভাবে । ঠিক তখনি একটি অভাবনীয় কাজ করে বসলো ইজহান। শ্যামার খুব কাছে এসে ব্যথা পাওয়া গালে তার নরম চিকন ঠোঁট স্পর্শ করলো। সাথে সাথে দুহাত মুঠ করে ধরলো। বন্ধ করে ফেললো চোখ জোড়া-ও। ভয়ানক ভাবে বুক উঠানামা করতে লাগলো। ঘন ঘন পড়ল শ্বাস। মি. ইজহান আরো এগিয়ে এলেন। দু হাতে কোমড় চেপে ধরে মিশিয়ে নিলেন শ্যামাকে নিজের সাথে। ছোট ছোট অসংখ্য চুম খেলেন ঘারে, গলায়। এবার তার স্পর্শে শ্যামা হারিয়ে যেতে চাইলো। অস্পষ্ট স্বরে বলল,

“মি. ইজহান? কি করছেন?”

ইজহান আবারো ঠোঁটের উপর আঙ্গুল ছুঁয়ে চুপ করিয়ে দিলো।বড্ড অবাক হলো, আজ তার স্পর্শে কোনো যন্ত্রণা নেই। জোরজবরদস্তি নেই। শ্যামা তার প্রতিটি স্পর্শ ভালোবাসা পাচ্ছে, শান্তি পাচ্ছে। হারিয়ে যেতে চাইছে। এবার ইজহান ওকে কোলে তুলে নিলো। পা বাড়ালো বিছানায়। সেদিন রাতে আবার মেতে উঠলো আদিম খেলায়। তবে, আজ এ খালে কষ্ট নেই। সুখ আর সুখ।

—————–

পরের দিন সকালে শ্যামা আগেই ঘুম থেকে উঠে ওয়াশরুমে চলে যায়। ইজহান তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। ঘুমন্ত ইজহানকে কতটা নিস্পাপ লাগছে, যেন সদ্য ফোটা গোলাপ। ঘুমন্ত মুখটির একটি ছবি অবশ্যই তুলে নিতে ভুললো না শ্যামা। রেডি হয়ে ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে ইজহানকে পেলো না। এতে সে খুশিই হয়েছে। আজ ইজহানের সামনে পড়লে হয়তো লজ্জায় লাল হতে হতো বারবার। এসব ভেবেই ব্যাগ পত্র গুছিয়ে সে নিচে নেমে আসে। টেবিলে উপর সাজানো খাবার গুলো থেকে শুধু একটি ডিম আর দুপিস রুটি খেয়ে জুস টুকু খেয়ে নিলো সে। জুসটুকু বেশি খেতে পারলো না। এতটা ঝাঁঝালো, আর কেমন যেন টেষ্ট। শ্যামা ফেলে দিলো। এবং পানি খেয়ে বেড়িয়ে এলো। বাসে চেপে চলে এলো অফিসে। অফিসের ভিতরে ঢুকতেই ফুসুরফাসুর করতে লাগলো তার কলিগরা। শ্যামা আড় চোখে তাকিয়ে জাহিদের পাশে বসে পড়লো। তখনি জাহিদ খুশি খুশি মনে বলল,

“মামা তোর হয়ে আমি কিন্তু একটা রিভেঞ্জ নিয়া ফালছি। এবার কয় ট্রিট কখন দিবি?”

শ্যামা অবাক হয়ে বলল,

“কিসের রিভেঞ্জ? ”

জাহিদ ফিসফিস করে বলল,

“তোরে কাল চৈতি থাপ্পড় মেরেছিলো, তার প্রতিশোধ।”

শ্যামা বড় বড় চোখ করে বলল,

“তুই তো ছিলি না? জানলি কেমনে?”

জাহিদ ভাব নিয়ে বলল,

“তুমি না বললেও এ জাহিদ সবই জানে!”

শ্যামা জাহিদের মাথায় চাটি মেরে বলল,

“ভাব কম দেখাও, সত্য কও!”

শ্যামার চাটি মারা জায়গায় জাহিদ হাত বুলাতে বুলাতে বলল,

“মারোস কেন মামা? কইতাছিতো। দারোযান চাচা বলল আমি ঢুকতেই!”

শ্যামা বলল,

“ওহো। তা কি রিভেঞ্জ নিছো?”

জাহিদ ফেইসবুক লগ ইন করলো। যেখানে একটা ফেইক পেইজে একটি ভিডিও ছাড়া হয়েছে। তার উপরে নারেশন ছিলো এমন,

‘নায়কা চৈতির কীর্তিকলাপ ফাঁস করায়, এক রিপোর্টারের উপর করলো হামলা। পর পর দুটি চর দিয়ে খেন্ত না উনি। বরং শাসিয়ে গেছেছেন, হুমকি ধামকি ও দিয়েছেন!’

শ্যামা অবাক হয়ে চেয়ে রইলো। আত্মকে উঠার মতো বলল,

“মামা তুই কি করছোস এইটা?”

“কি করছি?”

“তুই সাপের লেজে পা দিছোস! তুই জানোস না এর পরে এই মাইয়া আরো বাড়বো। তুই জানোস না এ মাফিয়ার গফ? কখন কি করে বসে? তার উপর তুই আমার আইডেন্টি ওই রিদ শালা জাইনা যাইবো।”

শ্যামার কঁপালে হাত। জাহিদ বলল,

“তোর আইডেন্টিটি জাইনা ওই বেটার কি লাভ?”

” তুই বুঝবি না!”

শ্যামা চিন্তায় পড়ে গেলো। এদিকে এই ভিডিও ভাইরাল হয়ে গেলো। ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে গেল দ্রুত। চৈতির ফ্যানফোলোয়ার তার পেইজে তাকে থু থু করতে লাগলো। এসব এত জলদি হয়ে গেলো যে চৈতির নতুন যুক্ত বদ্ধ হওয়া মুভি গুলো তার হাত থেকে যেতে লাগলো। ফেইসবুক এখন হটটপিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। চৈতির কমেন্ট বক্সে ঝড়তুলেছে। কেউ কেউ বলছে,

‘একজন রিপোর্টকে মারার সাহস হয় কি করে?’

আরেকজন লিখেছে,

‘রিপোর্টের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে”

তো আবার চৈতির পক্ষ নিযে আবার কেউ কেউ বলছে,

“রিপোটাররা যা ইচ্ছে তাই লিখে, একদম ঠিক করেছে চৈতি। ”

তখনি আরেকজন বলছে,

“আরো দুটি থাপ্পড় দেয়া উচিত ছিলো!”

এসব কমেন্ট পড়ে শ্যামা হতভম্ব। তখনি শান্তনু এসে দাঁড়ালো হন্তদন্ত হয়ে। রাগে কিড়মিড় করে বলল,

“এসব তোমরা করছো তাইনা?”

জাহিদ না বুঝার ভান করে বলল,

“কি করছি আমরা, স্যা….র”

শান্তনু বলল,

“না বোঝার ভান করো না। তোমাদের জন্য আমি না উল্টো কেইস খাই। তোমাদের দুজনকে একসাথে রাখা যাবে না। জাহিদ কোমার পোষ্টিং আমি অন্য জায়গায় করে দিচ্ছি। তোমরা আমার প্রতিষ্ঠান লাটে উঠাতে চাইছো? তা হতে দিচ্ছি না।”

বলে শান্তনু চলে গেলো। এদিকে শ্যামা ভয় পেয়ে গেলো। বলল,

“তুই চলে গেলে, আমার কি হবে? কিভাবে সামলাবো সব??”

জাহিদ আশ্বাস দিয়ে বলল,

“তুই চিন্তা করিস না, স্যার প্রতিষ্ঠান থেকে বের করলেই বা কি, আমাদের বন্ধুত্ব তো আর নষ্ট করার ক্ষমতা তার নেই! যাষ্ট একটা ফোন করবি বান্দা হাজির।”

হেসে ফেললো শ্যামা। বলল,

“তোরে বড্ড মিস করবো! ”

“আমিও!”

এর মাঝেই পাঁচটি দিন কেঁটে গেলো। জাহিদের পোষ্টিং হয়ে গেলো। এর জায়গায় নতুন একজন মেয়ে জয়েন হলো। নাম সানজিদা। মেয়েটিকে প্রথম দেখাতে ঝগড়া বাজিয়ে দিলো শ্যামার সাথে। শ্যামা হতবুদ্ধি। শান্তনু স্যারের কাজিন বলে দাপট আরো বেশি। শ্যামা চুপ করে রইলো। দুদিনেই মেয়েটি তুলকালাম বাজিয়ে দিয়েছে এর থেকে দূরে থাকাই বেটার। এর মাঝে চৈতি নিউজটা হুট করেই চেপে গেলো সব। হ্যাকার্স ধারা পেইজটি বন্ধ করিয়ে দিলো।যেখানে চৈতিকে চলচ্চিত্র জগত থেকে বায়টক করতে মেতে উঠেছিলো সব, তখনি গুজব বলে চালিয়ে দিলো। একপ্রকার সব ঠান্ডা। শ্যামা আর মাথা ঘামালো না চৈতি তার শাস্তি ঠিকি পেয়েছে। এর পর আর লাগতে আসবে না। হয়তো কখনো ওর সাথে, এসব ভেবেই ওর শান্তি। অফিস শেষে বরাবরের মতোই ইজহানের বাসায় চলে আসে সে। বাড়িতে কেউ নেই, ইজহান সাত দিনের জন্য বাহিরে গেছে। সেই রাতের পর আর ইজহানকে দেখেনি শ্যামা। মনের মাঝে কেমন একটা খচখচ করছে। মনে হচ্ছে অজানা বিপদ আসতে চলেছে তার সামনে। শ্যামা ইজহানের রুমে বিছানার উপর শুয়ে আছে। পুরো বাড়িতে একা থাকতে বড্ড ভয় হচ্ছে। তখনি মেইন গেটে খটখট শব্দ হয়। শ্যামা বুজতে পারে না. এতো রাতে কে এলো এখানে? তার রুমের জানালা দিয়ে বাহিরে তাকাতেই চক্ষু চড়কগাছ। ইজহানের দাদিজান হেসেছে। কিন্তু কেন?ইজহানতো বাড়িতে নেই, তা উনারা জানেই তাহলে কি শ্যামার কাছে এসেছে??শ্যামার ভাবার মাঝে আবার ডোর বেল বেজে উঠে।চমকে উঠে শ্যামা। খানিকটা ভয়ে ভয়ে দরজা খুললতেই, খড়খড়ে আওয়াজে বলে উঠলো দাদিজান,

“কি হ্যাঁ মেয়ে, এতখন লাগে দরজা খুলতে? ”

শ্যামা শুকনো ঢুক গিললো। কুশলবিনিময়ে বলল,

“সরি দাদি জান!”

দাদিজান চেচিয়ে উঠলেন,

“বলেছিনা মেয়ে, মেডাম ডাকবে আমায়?”

শ্যামা দমে গেলো,

“জি মেডাম। তা আপনি এখানে? ইজহান তো বাড়ি নেই!”

দাদিজান চোখ গরম করে বললেন,

“ওই ছোকরা বাড়ি নেই তো কি হয়েছে? আমি আমার নাতি বাড়ি আসতে পারি না নাকি? ”

“না না, তা বলি নি। আপনি কেন আসতে পারবেন না!”

“তাহলে কথা কম বলো। যাও চা নিয়ে আসো আমার জন্য। ”

শ্যাম হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়িয়ে চলে গেলো। চা এনে দেখলো দাদিজান ঘুমিয়ে গেছে। শ্যামা কিছুই বুঝলো না কি করবে? সেও পাশে বসে রইলো। এক পর্যায় সেও ঘুমিয়ে গেলো।শ্যামার যখন ঘুম ভাঙ্গলো তখন দেখলো দাদিজান নিপার সাথে বসে গল্প করছে আর নিপে টেবিলের উপর খাবারের আইটেম সাজাচ্ছে। আজ কোনো অনুষ্ঠান কিনা? বুঝতে পাড়লো না শ্যামা। রেডি হয়ে অফিসে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই দাদিজান বলে উঠলো,

“এই মেয়ে যাচ্ছো যাও আর আজ এ বাড়িতে এসো না। আজ ইজহানের বার্থ ডে। বড় বড় মানুষ আসবে। তোমাকে দেখে আবার কে না কে কি ভাবে? আমরা তো আর একটি রক্ষিতাকে বউ বলে পরিচয় করিয়ে দিতে পারি না।”

শ্যামার বুকের মাঝে সুঁইয়ের মত গিঁধে গেলো কথা গুলো। হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়িয়ে বলল,

“ঠিক আছে মেডাম, আজ আর আমার ছায়াও পড়বে না এ বাসায়!”

বলেই মলিন হাসলো শ্যামা। সেদিকে তাকিয়ে দাদিজান মুখ বাঁকালেন, “আদিখ্যেতা ”

—————-

আর কিছুক্ষণ পরেই প্ল্যান ল্যান্ড করবে বাংলাদেশে। ইজহানের বড্ড ছটফট করছে মন। আজ সাত দিন চলছে সে দেখে না শ্যামাকে। বুকটা খা খা করছে যেন চৌচির মাঠের মতো। যেন মরুভূমির তৃষ্ণার্থ পথিক সে। ইজহান বার বার ঘড়ি চেক করলো। ঘড়ির কাটা যেন নরছেই না আজ। হতাশার শ্বাস ছাড়লো সে। তার পামে তাকা অধিরাজ তার স্যারের হাসফাস দেখে হাসচ্ছে, মুখে যতই বলে তার শ্যার মেয়েটিকে ঘৃণা করে, কিন্তু মন থেকে এখনো ভালোবাসে সে।

কিন্তু ইজহানের এই ছটফটানি দূর হবে তো? এক পলক শ্যামার দেখা পেয়ে তৃষ্ণা মিটবে তো? শ্যামা তার জন্য অপেক্ষা করবে? যেমনটি সে গুনছি অপেক্ষার প্রহর??
#আঁধারিয়া_অম্বর
#সুরাইয়া_সাত্তার_ঊর্মি
০৯

ঝুমঝুমিয়ে বৃষ্টি নেমে গাছ-পালার শরীরের জমা ধুলোর স্তপ ধুয়ে দিচ্ছে। রাস্তার ধারের গর্ত গুলোও ভরে আছে। সন্ধ্যার টিমটিম আলোয় বৃষ্টির লিলা খেলায় ব্যস্ত শহর থমকে গেছে কিছুক্ষণের জন্য। কেউ কেউ আশ্রয় নিয়ে দূরের টি স্টলে আব্র কেউ কেউ মাথা ঠাই করেছে বন্ধ হয়ে যাওয়া দোকানপাঠে। আবার কেউ কেউ রিকশা, অটো, সি এন জি চাপিয়ে চলে যাচ্ছে নিজের গন্তব্যে। এসব মানুষের মাঝে এক মাত্র ব্যস্ততা নেই শ্যামার। রাস্তার ধারেই ছোট একটি পার্ক। সেখাই সিমেন্টের তৈরি বসার জায়গায় বসে আছে। ভিজে চুবুচুবু অবস্থা। সাজের আলোয় ফ্যাকাসে হয়ে আসার ঠোঁট জোড়া কাঁপছে শ্যামার। তবুও সে বসেই আছে। এর মাঝেই ওর ফোনটি স্ব শব্দে চিৎকার করে উঠলো। ফোনটি বের করতেই ফ্যাকাসে ঠোঁটে হাসির রেখা দেখা গেলো। শ্যামা কানে ফোন চাঁপলো। খুশি খুশি কন্ঠে বলল,

“ছুটকি? ”

ওপাশ থেকে ভেসে এলো শ্যামার ছোট বোন জান্নাতের অসংখ্য অভিযোগ জড়ানো কন্ঠ,

“আপুই কই তুই? আমি কতক্ষণ বাহিরে দাঁড়িয়ে থাকবো?”

বড্ড অবাক হলো শ্যামা, কঁপালের মাঝে সুক্ষ্ম ভাজ ফেলে অনুসন্ধানী কন্ঠে বলল,

“তুই কোথায়?”

“কোথায় আবার? বাসার বাহিরে দাঁড়িয়ে আছি। ”

চোখ বড় বড় হয়ে গেলো শ্যামার। বলল,

“জান তুই দাঁড়া আমি এখনি আসচ্ছি!”

বলেই কল কেটে একটা রিকশা নিয়ে ছুটলো তার বাড়ির দিকে। রাস্তায় রিকশা দাঁড় করিয়ে কিছু বাজারো করে নিলো সে। দশ মিনিটের মাথায় পৌঁছে গেলো তাদের বাড়ি। পুরোনো একটি দোতলা বাড়ি। এক সময় ঝাঁকঝমক থাকলেও এখন জীর্ণশীর্ণ অবস্থা। রিকশা থেকে বেগ নামি যেই বাড়ির ভিতরে পা দিলো। ওমনি ছুটে এলো জান্নাত শ্যামার কাছে। শ্যামাও পরমযত্নে বোনকে বুকের সাথে আগলে নিলো। ভালো-মন্দ কথা বলতে বলতে ভিতরে চলে এলো। জান্নাত নিজের রুমে চলে গেলো চেঞ্জ করতে। এর মাঝেই শ্যামা কাপড় পাল্টে লেগে পড়লো বোনের পছন্দ মতো খাবার বানাতে। অনেক দিন পর ছোট বোনকে নিজ হাতে খাইয়ে দিবে সে।

এদিকে মেহরাব বাড়ি রাণী রূপে সাজানো হয়েছে। চারিদিকে মেহমানদের সমাগম গিজগিজ করছে। বড় বড় সেলিব্রিটিদের দেখা যাচ্ছে জায়গায় জায়গায় গোল করে গল্প গুজব করতে। বিশাল লিভিং রুমে নিয়ন হলদে আলো। সবাই অপেক্ষা করছে বার্থ ডে বয়ের জন্য। চলচ্চিত্র জগতে এক যুগ রাজ্যত্ব করা কিং এর জন্য। এদিকে দাদিজান বার বার নিপাকে এটা সেটা বলেই যাচ্ছে। এর মাঝেই রেলমন্ত্রী আরাফ হোসাইন তার সুন্দরী তরণী মেয়েকে নিয়ে হাজির হয়েছে। মেয়েটি টাইটফিট আউট ফিটে , এক গাদা মেকাপ করে এসেছে। আরাফ এসেই কুষল বিনিময় করে বলল,

“ইজহান বাবা জি বুঝি এখন আসে নি?”

দাদিজান চাপা হেসে বললেন,

“কিছুক্ষণের মাঝে চলে আসবে। আর একি আপনার মেয়ে নাকি?”

আরাফ হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়ায়। দাদিজান আবারো চাপা হেসে বলে,

“বাহ্ ভাড়ি মিষ্টি মেয়ে তো! নাম কি তোমার?”

মেয়েটি লাস্যময়ী ভঙ্গিতে হেসে বলল,

“মৌপ্রিয়া!”

দাদিজান বললেন,

“বাহ্ সুন্দর নাম!”

এর মাঝে আরো কিছু কথা বললেন তারা। তার পর চলে গেলেন ভিতরে। একে একে সবাই এসে পড়েছেন। সবার সাথেই এসেছে বিয়ের বয়সি মেয়ে। সবার একই ধান্দা। ইজহানের গলায় ঝুলে পড়ার। কিন্তু তা কি আদো সম্ভব? দাদিজান জানে ভালো করে, এদের সকলের চিন্তায় এক গাদা বালি ছিটিয়ে দিবে তার নাতি। এরি মাঝে স্বা করে বাড়ির ভিতর প্রবেশ করে একটি কালো গাড়ি। বরাবরের মতোই মেয়েদের বুক কাঁপানো লুকে নেমে আসে ইজহান। তখনি দাদিজান এসে পাশে দাঁড়ালো। আশেপাশের মিডিয়ার লোকজন ফটফট করে ছবি তুলতে লাগলো। ইজহানের সেদিকে মাথা ব্যথা নেই। সে ভিড়ের মাঝে চোখ বুলিয়ে দেখে নিলো তার পরিচিত মুখখানা দেখা যায় কি না, এত রিপোটারের ভিতরে। কিন্তু নাহ্। শ্যামা নেই। তাহলে সে কই? সে কি পার্টির ভিতরে আছে??

বড় বড় পা ফেলে ইজহান ভিতরে ঢুকলো। নাহ্ নেই। শ্যামা নেই। তার শরীরের গ্রাণ নেই এই ঝাঁক ঝমক মহলে। তাহলে? তাহলে সে কই? ইজহান দাদিজানের কাছে গেলো, ঠান্ডা গম্ভীর কন্ঠে বলল,

“শ্যামা কই দাদিজান?”

দাদিজান সোজাসাপটা উত্তর দিলেন,

“আজ ওকে বাসায় আসতে না করে দিয়েছি আমি!”

ইজহান এতে আহত হলো খুব। বলল,

“দাদিজান সে আমার স্ত্রী, সে এখানে না আসলে যাবে কোথায়?”

দাদিজান চোখ মুখ শক্ত করে বললেন,

“জাহান্নামে যাক, একটা রক্ষিতার জন্য এত দরদ ভালো না!”

ইজহান দাদির দিকে ঠান্ডা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। এতে দাদিজানের কিছুই যায় আসে না। উনি উনার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। ঠিক সেই সময় কেউ এসে জড়িয়ে ধরলো ইজহানকে, ইজহান চমকে পিছনে তাকাতেই একটা পুরুষালি কন্ঠ বলে উঠলো,

“হেপি বার্থ ডে ভাই!”

ইজহান খুশিতে ভাইকে বুকে টেনে বলল,

“তুই কবে দেশে এলি?”

“আজ সকালেই! কিন্তু তুমি তো ছিলেই না..”

” হ্যাঁ একটা জরুরি কাজে গেছিলাম! ”

“নিজের বার্থ ডে তেও কাজে? চলো এবার কেক কাঁটা যাক। মাম্মা পাপা ওয়েট করছে তোমার জন্য!”

ইজহান মলিন হাসলো। ভাইকে টেনে নিয়ে কেক কাটলো সে। কিন্তু তার মন? তাতো অন্য কোথাও। কেক কাটা শেষ হতেই বাসা থেকে বেড়িয়ে গেলো। এত এত মানুষের মাঝে কেমন যেন দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। শুধু মনে হচ্ছে, একটি বার, একটি বার তার শ্যামাকে দেখা চাই। সে গাড়িতে চড়ে বসলো। কানের মাঝে ব্লুটুথ লাগিয়ে কল করলো শ্যামাকে। শ্যামার নাম্বার বন্ধ। এতে আরো টেনশনে পড়ে যায় ইজহান। সে এখন কোথায় খুঁজবে শ্যামাকে? এসব ভাবতেই মাথায় আসে শ্যামার আগের ঠিকানার কথা। চট জলদি সেখানে চলে আসে ইজহান। বাসার বাহিরে গাড়ির ভিতর বসে এক দৃস্টিতে তাকিয়ে থাকে সামনের প্লাস্টার উঠে যাওয়া, রং নষ্ট হয়ে যাওয়া বাড়িটির দিকে।

এদিকে শ্যামা বোনকে খাইয়ে দিচ্ছে আর বোনের নানান কথা শুনছে। জান্নাত আজ এত এত গল্পের ঝুঁড়ি খুলে বসে আছে। কার সাথে ক্লাসে কি হলো? ভার্সিটি কোচিং-এ কোন ভাইয়াকে তার ভালো লাগে, কোন ভাইয়াটা বিরক্ত কর। এসব আর কত কি…! শ্যামা এক মনে শুনে যাচ্ছে। আর নলা পুরে দিচ্ছে মুখে। তখনি বলল আবার,

“জানো আপুই, একদিন কে যেন আমাকে বক্স ভর্তি করে চকলেট পাঠিয়েছিলো। পরে সবাই শেয়ার করে খেয়েছি!”

শ্যামার মাথায় কথাটি ঝংকার তুললো,

“চকলেট? কি দিলো এই চকলেট??”

শ্যামা ভ্রু কুচকে বলল,

“খবর নিসনি পড়ে কে দিলো?”

“নিয়েছি, কিন্তু ব্যক্তিটা কে খুঁজে পায়নি।”

শ্যামার মাথায় চিন্তার ভাজ পড়লো। এই আননোন ব্যক্তিটি আবার রিদ নয় তো?ভাবতেই আত্মকে উঠলো শ্যামা। নিজেকে সামলে বোনকে সময় দিলো। এবং ঘুম পারিয়ে দিতে লাগলো জান্নাতকে। বাহিরে আবার ঝুমঝুমিয়ে বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। ইজহান গাড়ি সাথে হেলে এখনো এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে দোতলার আলো জ্বলা ঘরটিতে। বৃষ্টির পানিতে ভিজে গেছে একদম। সুন্দর চুল গুলো চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে পানি। এরি মাঝে ইজহানের মেনেজার এসে ছাতি দাঁড়ায় তার পাশে। বলে,

“ইজহান, বড় স্যার তোমাকে ইমিডিয়েটলি যেতে বলেছে।”

ইজহান গম্ভীর কন্ঠে বলল,

“উনাকে বলো দাও আমি এখন বিজি আছি!”

অধিরাজ বলল,

“ইট’স ইট’স আর্জেন্ট। ”

ইজহান আবার বলল,

“এই মুহূর্তে এটি ছাড়া আমার কাছে ইমপোর্টেন্ট কিছুই না।”

অধিরাজ হাল ছেড়ে দিলো। ইজহান কিছুখন সেখানে দাঁড়িয়ে পা বাড়ালো ম্যামার বাসার দিক। অধিরাজ এক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো তার স্যারের দিকে।

জান্নাতকে ঘুম পাড়িয়ে নিচে নেমে আসে শ্যামা। অফিসের কিছু কাজ করে সে ও ঘুমাতে যাবে। তখনি দরজায় খটখট শব্দ হয়। শ্যামা ভয় পেয়ে যায় কিছুটা! এত রাতে তার বাড়ি কেউ আসার মতো কোনো লোক তো নেই, তাহলে কে এলো? শ্যামার ভাবার মাঝে আবারো দরজা নক করলো কেউ। একটা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লো সারা গায়ে। শ্যামা টেবিলের উপর থেকে একটি স্টিলের চামচ তুলে নিলো। ভয়ে ভয়ে দরজার কাছে এসে বলল,

“ক…কে? ক…কে বাহিরে?”

কোনো শব্দ নেই। থমথমে গুমাটে একটি পরিবেশ সৃষ্টি হলো মুহূর্তেই। শ্যামা আবার জিজ্ঞেস করলো। তখন সব নিস্তব্ধত। শ্যামার মাথায় এর মাঝেই বিন্দু বিন্দু ঘাম দেখা যাচ্ছে। শব্দ বন্ধ হওয়াতে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে দুকদম পিছিয়ে যেতেই আবারো শব্দ করে উঠলো। শ্যামা মনে সাহস করে দরজা খুলতে চোখ বড় বড় করে তাকালো….

চলবে,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here