আছি তোমার পাশে পর্ব ৫

0
125

#আছি_তোমার_পাশে
পর্ব ৫
লেখায়- #Anjum_Tuli
[কপি করা সম্পূর্ণ নিষেধ]
.
.
‘তুতুল আসলে কে আম্মা?’

আমার কথায় মা বিরক্ত হয়ে গেলেন। বেডে শুতে শুতে বললেন, ‘এক কথা কয়বার বলবো বউমা। আসলে সত্যি কথা হলো তুতুল কেউ না। এখন যাও। আমি ঘুমাবো একটু’

আমি আর কিছু বললাম না। চুপচাপ বেড়িয়ে গেলাম। রায়ান শুয়ে আছে। আমাকে দেখে উঠে বসলো। কিছু বললাম না। ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে এসে দেখি রায়ান তখনো বসে আছে। আমাকে শুতে দেখে মিহি সুরে ডাকলো, ‘রোদু তোমার সাথে আমার কিছু কথা ছিলো’

আমি তাকালাম। তুতুলের দিকে তাকাতেই রায়ান বুঝলো। সে বলল, ‘তোমার কোনো অসুবিধা না থাকলে বারান্দায় চলো।’

আমি মাথা ঝাকিয়ে সম্মতি জানালাম। রায়ানের চেহারা দেখে মায়া লাগলো। এই গম্ভীর বদরাগী মানুষটাকে দেখে কখনো মায়া হবে বুঝতে পারি নি। তবে আমি বুঝতে পারছি। রায়ান বড্ড চাপা স্বভাবের।

বারান্দায় বাতাস বইছে। ঝিড়িঝিড়ি বৃষ্টি পরছে। ইদানিং বেশিরভাগ সময়ই দিন মেঘলা থাকছে। প্রকৃতির কি বড্ড মন খারাপ? নাকি এ শীতের আগমনী বার্তা।

রায়ান দোলনায় বসে আমাকেও পাশে বসতে বলল। গেলাম। রায়ানের পাশে বসতে কেমন যেনো আগষ্ট তায় ভুগলাম। হয়তো সে বুঝতে পারলো। কিছুটা দূরে সরে গেলো। আশ্চর্য সে একটু দূরে সরতেই আমার কেমন কষ্ট লাগলো। তাকালাম না। কষ্টের ছাপ যদি মুখে ভেসে উঠে?

রায়ান হঠাৎই বলে উঠলো,
‘আমি জানি রোদু তোমাকে সব কিছু না জানিয়ে বিয়ে করা আমার অন্যায় হয়েছে। যে অন্যায়ের জন্য আমি বিয়ের দিন থেকে এখন পর্যন্ত আফসোস করছি। তোমাকে আগে থেকেই সব কিছু জানানো প্রয়োজন ছিলো।

আমি ছোট বেলা থেকেই বেশ সিরিয়াস ছিলাম। আর আমার ভাই ছিলো বাউন্ডুলে। যখন যা মন চায় করে বেড়াতো। না বাবার কথা শুনতো না মায়ের। মা একটু বেশিই আহ্লাদ করতো ভাইকে। এমনকি পরীক্ষায় ফেল করলেও বলতো ‘সমস্যা নাই বাবা পরের বার পাশ করে নিস’

কথাটা বলে রায়ান হালকা হাসলো। সাথে সাথেই আমি প্রশ্ন করে ফেললাম, ‘ভাই এখন কোথায়?’

রায়ান এবারে আমার চোখে চোখ রেখে বলল, ‘তুমি বড় অধৈর্য। ইয়ে মানে ধৈর্য অনেক কম তোমার’

আমি ভেংচি কাটলাম। ইস! ধৈর্যের পার্সন রে! তবে সিরিয়াস হয়ে বললাম, ‘মানে উনি কই’

রায়ান আবারো বলল, ‘জানো রোদু আমাদের পরিবারটা খুব হাসি খুশি ছিলো। ভাইয়ের ফাইজলামু গুলাই যেনো আরো ঘর মাতিয়ে রাখতো। মা আমাকে বলতো ভাইয়ের মত হতে। ছেলেদের এতটা গম্ভীর কখনো মানায় না। আমি যখন বুয়েটে চান্স পেলাম। বাবা কি খুশি। ইন ফ্যাক্ট ভাইও খুশিতে আমাকে জড়িয়ে ধরেছিলো। আর কি বলেছিলো জানো সাব্বাস এই না হলে সায়ানের ভাই? অথচ সে তখনও ইন্টার পাশ করতে পারে নাই। মায়ের কি মন খারাপ। এক ছেলে ফেল করে ঘরে বসে আছে। আরেক ছেলে কিনা বুয়েটে পড়বে! মা কিছুতেই তা মেনে নিতে পারছিলো না। মা’কে ভাই রাজি করালো। সেদিন আনন্দে জীবনে প্রথম বারের মত নিজের ইচ্ছায় ভাইকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলাম। ধন্যবাদ ভাই। আমার স্বপ্ন পূরণের পথ ক্লিয়ার করে দেয়ার জন্য। তখনো সব ঠিক ঠাক ছিলো। আমি ক্লাস শুরু করলাম ‘

রায়ান দম নিলো। আমি এক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছি। আমি খেয়াল করলাম রায়ান পকেট থেকে টিস্যু বের করে মুখ মুছলো। সে কি কাদছে! এখন আমার ঠিক কি করা উচিত আমি বুঝে উঠতে পারছি না। এর মধ্যেই ঝড় বাড়তে শুরু করলো। আর আমার মনে এর পরের কাহিনী জানার আগ্রহ ক্রমশ বাড়তে লাগলো। আমি তাকিয়ে রইলাম রায়ানের দিকে সে কি বলে তা শুনার আশায়।

রায়ান আমার দিকে তাকালো। বেদনা মিশ্রিত এক হাসি দিলো। তার এই হাসি আমার বুকে কাটা বিদার মত লাগলো। কি এমন হয়েছিলো? যার দরুন রায়ান এতটা কষ্ট পাচ্ছে সামান্য কথাটা বলতে? আমাকে শুনতেই হবে। আমি রায়ানকে কোনো মতে বললাম,

‘এরপর? এরপর কি হয়েছিলো?’

রায়ান বললো, ‘ বলছি বাবা।

তখন আমি ফাস্ট ইয়ারে। বাসে করে বন্ধুদের সাথে ঘুরতে বেড়িয়েছিলাম। একটা বাচ্চা মেয়ে বাসে উঠে বসলো। গায়ে স্কুল ড্রেস। আমার সাথের বন্ধুরা সব মেয়েটাকে দেখে টিটকারী সিটি মারা শুরু করলো। আমরা হাসাহাসি করছিলাম। মেয়েটি উঠে এসে আমাদের সামনে আসলো। ঠুস করে বলে ফেললো, ‘সিটি বাজাচ্ছো যে! নিজের চেহারা দেখেছো? আমি তুমাদের কারো প্রেমেই পরবো না। তবে ইয়োলো টি-শার্ট পড়া ভাইয়াটাকে আমার খুব মনে ধরেছে সে যদি আমার সাথে প্রেম করে আমি তাকে আই লাভ ইউ বলবো।
আমি বেকুব বনে গেলাম। কারণ সেই মুহুর্তে এক মাত্র আমার গায়েই ইয়োলো কালারের টি-শার্ট ছিলো। আমার সাথের সব বন্ধুরা ফিক করেই হেসে দিলো। কিন্তু আমি পুরো তবদা খেয়ে বসে রইলাম। ‘

রায়ান কথাটা বলেই হেসে দিলো। সাথে সাথেই বললো,

‘তবে মজার ব্যাপার কি জানো? এই বাচ্চা বোকা বোকা ফেইসের মেয়েটার প্রেমেই শেষ পর্যন্ত পরতে বাধ্য হয়েছি’

কথাটা বলতেই আমার মুখের হাসি হাসি ভাবটা সরে গিয়ে এক রাশ কষ্ট এসে ধরা দিলো। যার ফলস্বরূপ মুখটা কুমড়ো পটাশের মত হয়ে গেলো। রায়ান পাত্তা দিলো কিনা বুঝলাম না। তবে হুট করেই বলে ফেললো, ‘এসব আমার অতীত’

আমি কিছু বুঝলাম। তাকালাম। সেও তাকালো। কি জানি কি হলো আমার। তাকিয়েই থাকলাম। তবে রায়ান মুখ ঘুড়িয়ে সোজা করে নিলো। আমি বেহায়ার মত বলে ফেললাম, ‘কিভাবে প্রেম হলো?’

রায়ান মলিন হাসলো। বলল, ‘জানো রোদু প্রেম ভালোবাসা জিনিসটা আমার জীবনে কখনো আসবে তা আমার কল্পনার বাইরে ছিলো। আমি জীবনে পড়ালেখা ক্যারিয়ার এসব ছাড়া কিছুই ভাবি নাই। আমার সব কিছুতেই যেনো প্রথম হওয়া চাই। বয়সটাও যেনো এমনি ছিলো।’

রায়ান থামলো। আমার দিকে সরাসরি তাকিয়ে বললো, ‘আমি আসলে এসব বলতে চাই না। কিন্তু তোমাকে সব জানানো প্রয়োজন। আমি নিজেকে স্থির করে নিয়েছিলাম তোমার সাথে সব স্বাভাবিক করবো। আমি তুমি তুতুল আর মা’কে নিয়ে ভালো থাকবো। কিন্তু আমার মনে হয় তোমার সব জানা উচিত। সব। তুতুলকে নিয়ে তোমার মনে অনেক সন্দেহ।’

আমি থতমত খেয়ে বলে ফেললাম, ‘না না সন্দেহ না শুধু জানতে চাই’

রায়ান বললো, ‘জানাবো। তবে আমার প্রেমের কথা শুনে কি তুমি কষ্ট পাচ্ছো?’

আমি চোখ নামিয়ে বললাম, ‘কষ্ট পাবো কেনো? আমি কি আপনার প্রেমে পড়েছি নাকি?’

রায়ান সাথে সাথেই বলে ফেললো, ‘এই কষ্টটা আমি উপলব্ধি করতে পারি রোদু। তাছাড়া তোমার চোখ কথা বলতে জানে। আর আমি হৃদয় পড়তে জানি?’

আমি অবাকের সুরে বললাম, ‘আচ্ছা! তাই? আপনি কি তাহলে জোতিশি?’

রায়ান আমার কথায় বিরক্ত হচ্ছে না ভাবতেও ভালো লাগছে। রায়ান আমার দিকে তাকিয়েই বললো, ‘যা বুঝো তাই’

‘আচ্ছা? তাহলে বলুন তো আমার মনে এখন কি চলছে?’-আমি বলে দিলাম।

রায়ান চাদের দিকে তাকালো। উদাশীন হয়ে বললো, ‘ভালোবাসতে সবাই জানে না রোদু। দুনিয়া বড় স্বার্থপর। দুইদিনের দুনিয়ায় মায়া দেখিয়ে সবাই চলে যায়।’

রায়ান দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। এর মাঝেই তুতুল কেদে উঠলো। আমার আগেই রায়ান উঠে দৌড়ে রুমে চলে গেলো। তুতুলকে কোলে নিয়ে হাটা শুরু করলো। তুতুলের কান্না থেমে ঘুমের মাত্রা আসলে বেডে নিয়ে আসলো। এর মধ্যেই আমি হামি দিলাম। রায়ান আমার দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বললো,’ তোমার কি ঘুম পাচ্ছে? একটু পরে ঘুমালে কি অসুবিধা হবে খুব?’

আমি ঘড়ির দিকে তাকালাম। ঘুম চোখে এসে ধরা দিলে আমি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারি না। আমি বেডের দিকে তাকালাম। মনে হলো এই বেডটা আমাকে ডাকছে। রায়ান তুতুলকে শুয়িয়ে দিয়ে আমার হাত ধরে আবারো বারান্দায় নিয়ে আসলো। টেনে নিচে বসালো। আবার অর্ডার করলো, ‘যাও দু-কাপ কফি নিয়ে আসো। আজ আমরা বারান্দা বিলাশ করবো?’

আমি অসহায় ভাবে তাকালাম। বারান্দা বিলাশ? হায় কপাল। মানুষ করে চন্দ্র বিলাশ। এত রাতে কফি বানানোর মত মোড আমার কোনো ভাবেই নেই। রাগ হলেও উঠতে বাধ্য হলাম। কেনো যেনো রায়ানের কোনো কথাই ফেলতে ইচ্ছে হয় না। আচ্ছা এটাই কি ভালোবাসা?

রায়ান এমন একটা মানুষ যে গম্ভীর। আবার অসহায়। আবার কখনো কখনো একদম বাচ্চা। আমি দেখেছি তাকে মায়ের কোলে মাথা রেখে কাদতে। আমি এও দেখেছি মায়ের সাথে তার গম্ভীরতা।
আবার কখনো কখনো তার স্পর্শে আমি যখন কেপে উঠেছি। আমি উপলব্ধি করেছি সে ভালোবাসা চায়। তার চোখে মূখে কিসের যেনো একটা অভাব। তবে আমি চাই খুব করে চাই রায়ানের প্রথম ভালোবাসা অন্য কেউ না শুধু আমি হই। জানিনা রায়ান পরে কি বলবে আর না বলবে। তবে ভয় হচ্ছে এমন কিছু শুনবো না তো যার কারণে রায়ানের প্রতি আমার ভালোবাসা কমে যাবে?

চলবে….

[

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here