আছি তোমার পাশে পর্ব ৮

0
192

#আছি_তোমার_পাশে
পর্ব ৮
লেখায়- #Anjum_Tuli
[কপি করা সম্পূর্ণ নিষেধ]
.
.
ওখানে যেতেই রোদুসির বাবার দেখা পাই। বাবাকে এডমিট করে উনার সাথে কথা বলতে গেলে উনি বারবারই আমাকে এড়িয়ে যেতে চান। আন্টি মানে রোদুসির মা কেদে কেদে বলতে থাকেন ‘আমার মেয়েটা শেষ বাবা। শেষ’
উনার কথা আমার বোধগম্য হচ্ছিলো না। কি হয়েছে জিজ্ঞাসা করতেই উনি আমাকে হাতের ইশারা করেন। এগিয়ে যেতেই গ্লাসের ফাকে চার পাচেক রোগীর মাঝে একটা মুখ স্পষ্টভাবে ভেসে উঠে। সে আর কেউ না রোদুসি। হাতে ব্যান্ডেজ। অক্সিজেন মাস্ক লাগানো। সারা গায়ে সাদা কাপড়ে ঢাকা। চোখ বুজে শান্ত হয়ে শুয়ে আছে। কিছু সময়ের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। কি কিভাবে কেন তা মাথায় আসে নি এসেছে কেবল ‘মেয়েটা না জানি কতটা কষ্ট পাচ্ছে’

রায়ানের মুখে স্পষ্ট বেদনার ছাপ। মনে হচ্ছে সে তার চোখের সামনেই রোদুসির কষ্টটা উপলব্ধি করতে পাচ্ছে। আমি কাপা কাপা কন্ঠে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কিভাবে কি হলো? জিজ্ঞেস করেছিলেন? ‘

‘হু করেছিলাম। রোদুসির মায়ের দিকে তাকাতেই বললেন সেদিন সকালে রোদুসিকে নিয়ে উনারা গ্রামে যাওয়ার জন্য রৌনা দিয়েছিলেন। কিন্তু মাঝপথে কয়েকটা ছেলে নাকি তাদের গাড়িতে হামলা করে। ছেলেগুলোর টার্গেডই ছিলো রোদুসি। তারা রোদুসির বাবা মাকে বেধে ড্রাইভারকে মেরে রোদুসিকে গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে যায়। পুলিশের সহায়তায় রোদুসিকে খুজে পেলেও…. ‘

রায়ান মুখে হাত দিয়ে কেদে দেয়। আমি প্রথমবারের মত এই শক্ত মনের মানুষটার চোখে পানি দেখলাম। কিভাবে শান্তনা দিতে হয় তার ভাষা পাচ্ছিলাম না। কাধে হাত রাখতেই রায়ান আমার দু হাত তার হাতের মুঠোয় এনে বলে, ‘আমায় কেউ বোঝে না রোদু। আমার পাশে কেউ নেই। তুমি থাকবে তো!’

রায়ানের চোখের পানি হৃদয়ের ক্ষতবিক্ষত অবস্থা দেখে আমার চোখের পানিও হার মেনে ঝড়তে লাগলো। মুখে বলতে পারলাম না আছি। আছি তোমার পাশে। সর্ব পরিস্থিতিতে। তবে চোখের ইশারায় আস্থা দিলাম।

রায়ান দম ফেললো। হাত ছাড়লো না। হাত ধরে রেখেই বলল, ‘সি ওয়াজ রেপড।’

কথাটা শুনতেই বুকটা ধ্বক করে উঠলো।

‘পুলিশের ধারণা মতে যারা তুলে নিয়েছিলো কাজটা তাদেরই। বাবার অসুস্থতা রোদুসির অবস্থা সব কিছু মিলিয়ে আমি ভীষণ অসহায় হয়ে পরেছিলাম। ধীরে ধীরে রোদুসি রেসপন্স করতে শুরু করলো। তাকালেই কেবল দু-চোখ দিয়ে পানি পরতো। আমার চোখে চোখ রেখে তাকাতো না। দূর দূর করে তাড়িয়ে দিত।

এদিকে বাবার হার্ট ব্লক ধরা পরে। ডাক্তার ইমিডিয়েট অপারেশনের কথা বলেন। এত টাকা কি করে ম্যানেজ করবো না করবো ভেবেই মাথায় বাশ পরে। সেদিনই বেড়িয়ে পরি। এক ফ্রান্ডের সহায়তায় লোন তোলার চেষ্টা করি। সেদিন একটা আননোন নাম্বার থেকে কল আসে। কলটা ছিলো ভাইয়ের। উনি আমাকে বলেন টাকা নিয়ে চিন্তা যেনো না করি। আমার একাউন্টে উনি টাকা পাঠিয়ে দিয়েছেন বাবার চিকিৎসায় যেনো কমতি না পরে৷ কথাটা বলেই সে কল কেটে দেয়। যেনো প্রয়োজনের বেশি কিছু বলে ফেলেছে।

সেদিনই বাবার অপারেশনের ব্যাবস্থা করি। অন্য হস্পিটালে ট্রান্সফার করি। এদিকে রোদুসির কথাটা ধীরে ধীরে স্প্রেড হতে থাকে। তাদের আত্মীয়স্বজনরা দেখতে আসে। আমাকে দেখে নানা রকমের প্রশ্ন করে। রোদুসি একদিন রেগে আমাকে বলে, ‘আর কতবার যাওয়ার কথা বলবো? এত বেহায়া কেন তুই? যাহ চলে যা। আমি আর তোর যোগ্য নই। আমি অপবিত্র’

কথাটা আমাকে বিন্দুমাত্র কষ্ট দেয় নি। রোদুসি আমাকে একশ বার তাড়িয়ে দিলেও আমি তার পায়ের কাছে পরে থাকতে রাজি ছিলাম। কিন্তু দিন দিন তার পাগলামু কেবল বেড়েই চলছিলো। বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার পর নিজেকে ঘর বন্দি করে রাখতো। কারো সাথে কথা বলতো না। তাদের বাড়িতে গেলেই মনে হত যেনো কোনো মৃত্যু পুড়িতে গিয়েছি।

বাবার অপারেশনের পর ডাক্তার বাবাকে রেস্টে থাকতে বললো। বাবাকে বাড়িতে রেখে সেদিন কিছুটা সস্থি পেয়েছিলাম। বাবাকে সুস্থ দেখে একটা টেনশন কমেছে ভেবে সস্থি নিতে চাইলেও ভাগ্য মানে নি।
পরেরদিন থেকে চাকরির জন্য দৌড়াদৌড়ি শুরু করলাম। রেসাল্ট ভালো হওয়াতে আর পরিচিত বড় ভাইয়ের সহায়তায় একটা ব্যাসরকারী প্রতিষ্ঠানে চাকরি পাই। সকাল টু সন্ধ্যা ডিউটি করে রোদুসিকে দেখে। বাবার চেকাপ লাগলে করাতাম অথবা ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ। এক সপ্তাহেই হাপিয়ে উঠেছিলাম। সায়ান ভাইকে মনে মনে ডাকছিলাম। যেনো খুব করে সে সময়টাতে ভাইয়ার অভাব বোধ করছিলাম।

ভাইয়া এসেছিলো। তবে একা নয়। সাথে তার পাহাড়সম অন্যায় সাথে নিয়ে। রোদুসির বাড়ির ড্রয়িংরুমে বসে ছিলাম। অধীর অপেক্ষায় বসেছিলাম। একটিবার তার মুখ দর্শন করার আসায়। কিন্তু না। সে নাকি সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে আমার সামনে আর আসবে না। হাজার বার ডাকার শর্তেও সে আসে নি। তাও অপেক্ষায় ছিলাম যদি দরজা খুলে টুক করে ঢুকে যাবো। তাকে দেখার তৃষ্ণায় মন বেকুল ছিলো। সে সময়টাতেই পুলিশের কল আসে। রোদুসির কেইসের সাথে জড়িত আসামীরা ধরা পরেছে। আমি আর রোদুসির বাবা দুজনই আর বসে থাকি নি৷ সাথে সাথেই যাই।

একের পর এক ধাক্কা যেনো আমি কোনো ভাবেই নিতে পারছিলাম না রোদু। পুলিশ স্টেশনে সায়ান ভাইকে দেখে আমি অবাক হয়েছিলাম। তার মাঝে এ আমি কোন সায়ান ভাইকে দেখছিলাম আমি জানি না। বিদ্ধস্ত অবস্থা। চুল মুখ উষ্কোখুষ্ক। পাগল উন্মাদের ন্যায় বসে আছে। শরীরের হাড়গুলা স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছিলো। যেনো সে কতদিনের অনাহারী।

পুলিশ আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এই সে গ্যাং। যারা রোদুসির রেইপ কেইসে জড়িত। এখন রিমান্ডে নিলেই বাকি সব তথ্য বেড়িয়ে আসবে। রোদুসির বাবার সাথে আরো কথা হলো। আমি চুপ করে ছিলাম।

সায়ান ভাইয়ের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এসব কি ভাই? তুমি?’

ভাই আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলো। একটা কথাও বলেনি। আমি পুলিশকে বললাম। আপনাদেত হয়তো কোথাও ভুল হচ্ছে। মানে উনি আমার আপন বড় ভাই। সে যতই খারাপ হোক এমন নিকৃষ্ট কাজে কখনোই সে জড়িত থাকবে না।

উনারা নাকি যথেষ্ট ইনফরমেশন কালেক্ট করে তাদের ধরে এনেছে। এবং সেখানে যথেষ্ট প্রমাণ পেয়েছে এসব কাজের। তবে রিমান্ডে নিলে বাকি তথ্য বেড়িয়ে আসার আগে কিছু বলতে পারছেন না।

কোর্টে চালান দিবে। কথাটা ভেবেই আমি কূলকিনারা হারিয়ে ফেললাম। এবার আমি কার জন্য লড়বো। আমার ভাই? নাকি প্রেমিকার জন্য?

সায়ান ভাই আমার ভাই জানার পর থেকে রোদুসির বাবা মাও আমার সাথে আর ভালো ব্যাবহার করে নি। তাদের ধারণা মতে বড় ভাই এমন হলে ছোটটার উপর তারা কিভাবে ভরসা করবে? কথাটা যথেষ্ট যৌক্তিক হলেও আমাকে তো তারা চিন্তো তাই না বলো? তবুও আমাকে তাদের বাসায় যাওয়া আসা করতে সম্পূর্ণ ভাবে নিষেধ করে দিলো। বাবার অবস্থার কথা চিন্তা করে বাবা মা’কে সায়ান ভাইয়ের কথা না জানাতে চাইলেও এসব ব্যাপার কখনো গোপন থাকে না। মা জেনে যায়।
মা জেনেই যেকোনো উপায়ে সায়ান ভাইকে উনার কাছে ফিরিয়ে আনতে বলে। আমি অথৈ সাগরে পরি।

অনেক ভাবার পর সিদ্ধান্ত নেই। সায়ান ভাই আমার ভাই হলেও সে যদি সত্যি এসবে জড়িত থাকে তাহলে সে একজন অপরাধী। আর অপরাধ করে সে পার পেয়ে গেলে এমন অপরাধ করতে আর কারো গায়েও লাগবে না। একটা মেয়ের জীবন ধংস করে অপরাধী মুক্ত হয়ে ডানা মেলবে কেনো? হুয়াই। প্রকৃত অপরাধীকে সাজা পেতেই হবে।

এভাবেই প্রায় মাসখানেক চলে গেলো। রিমান্ডের শুনানি শুনে ভাইয়ের সাথে কথা বলার সিদ্ধান্ত নিলাম। এর মাঝেই রোদুসি মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পরলো। আংকেল আমার হাতে ধরে রিকুয়েষ্ট করলো রোদুসিকে বিয়ে করার জন্য। হুট করে এমন বিহেভে অবাক না হয়ে বিয়েতে মত দিয়ে দিলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম। দূরে কোথাও গিয়ে দুজনে সংসার পাতবো। এ দুনিয়ার হিংস্র পশুগুলো থেকে আগলে রাখবো। বিয়ে করে পবিত্র সম্পর্কে আবদ্ধ হবো দুজন।’

চলবে….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here