আত্মার অস্তিত্ব পর্ব শেষ

0
86

গল্পঃ আত্মার অস্তিত্ব। ( ৩য় এবং শেষ পর্ব )

দাদী উপরের দিকে তাকিয়ে সাদিয়াকে সিলিংয়ে উল্টা হয়ে ঝুলে হাটতে দেখে ভিরমি খেয়ে স্লো মোশনে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লো।

সাদিয়া নিচে নেমে এসে দাদীর মুখে পানি ছিটিয়ে দিতেই দাদীর জ্ঞান ফিরলো। উঠে বসে বিস্ফারিত চোখে সাদিয়ার দিকে তাকিয়ে দাদী বললো,– একটু আগে না দেখলাম তুই সিলিংয়ে উল্টা হয়ে হাঁটছিস!

সাদিয়া মুচকি হেসে দাদীকে বললো,– দাদী, তোমার ভিসার মেয়াদ প্রায় শেষ পর্যায়ে তো, তাই চোখের প্রেরিত বার্তা মস্তিষ্ক ভুলবাল বিশ্লেষণ করতেছে। কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হও।

দাদীর মেজাজ গরম হয়ে গেল, উঠে দাড়িয়ে কড়া মেজাজে সাদিয়াকে বললো,– বেশি বাড় বেড়ে গেছিস, এই বাড়ির ভাত আর তোর কপালে জুটবে না মনে রাখিস।

সাদিয়া হা হা করে হেসে সামনের দিকে হাত বাড়িয়ে দিতেই সাদিয়ার হাতে গরম গরম এক প্লেট বিরিয়ানি দৃশ্যমান হলো, সাদিয়া বিরিয়ানির প্লেটটা দাদীর সামনে ধরে বললো,– ভাত না জুটলে বিরিয়ানি, চলবে নাকি দাদী, গরম গরম।

সাদিয়ার কর্মকাণ্ড দেখে দাদী ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল,– বিরিয়ানি পরে খেলেও চলবে, আগে হাল্কার উপ্রে একটা ভিরমি খেয়ে নেই।

তারপর দাদী অজ্ঞান।

পরদিন হাসানের চাচাতো ভাই মজনুর উদয় হাসানদের বাড়িতে। দাদী মজনুকে ডেকে গোপনে সাদিয়ার অদ্ভুত আচার-আচরণের কথা বললো। সবকিছু শুনে মজনু বললো,– ভূত, সে এক অদ্ভুত জিনিস দাদী, যে জীবনে প্রেম ভর করেনি বয়ে চলি প্রেমহীন জীবন আর হাহাকার, সে জীবনে প্রেম অথবা পেত্নী কি আবার। ইয়ে দিল হ্যায় মুসকিল দাদী।

দাদী মজনুর কথাবার্তা শুনে ধমক দিয়ে বললো,– এই ছ্যারা এই, তোরে ভূত সমস্যার সমাধান করতে বলছি, বিরহের কবিতা রচনা করতে বলিনায়।

মজনু আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,– কেউ বোঝেনা দিলের পেইন; দাদী ভূত নহে জীবনে প্রেমটাই মেইন।

দাদী রাগে গজগজ করে বললো,– প্রেম প্রেম করতে করতে তোর জীবনের গেম ওভার হইয়া যাবে বদ, মাঠে আর নামতে পারবি না।

মজনু আবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,– ভীষণ ব্যাথা দিল মে, সুন্দরীরা সবাই গেছে ফিল্মে।

দাদী ভ্রু কুঁচকে বললো,– এই ছ্যারারে অতি শীঘ্র পাবনা পাঠানো দরকার।

কথা শেষে দাদী চলে গেল। মজনু দাদীর উদ্দেশ্যে বিড়বিড় করে বললো,– তুমি যেই চিজ দাদী, তোমার জ্বালায় হয়তো হাসানের নতুন বউয়েরও পাগল হবার উপক্রম।

বিকেলে সাদিয়ার রুমের সামনে এসে মজনু ভেতরে যাবার অনুমতি চাইলো।

সাদিয়া অনুমতি দিলে মজনু ভেতরে গিয়ে বসলো।

সাদিয়া খাটে জানালার দিকে মুখ করে বসে আছে, মজনু একটা চেয়ার টেনে সাদিয়ার কাছাকাছি বসে বললো,– এগুলো কি ভাবি, তোমার কি এখন পাগলামি করার বয়স আছে, তুমি এখন সন্তানের জননী হবা, সন্তানকে ফিডার খাইয়ে মানুষ করবা, তা না করে করো কাঁধে ভূত চাপার অভিনয়।

মজনুর কথা শেষ হতে না হতেই সাদিয়া টেনে মজনুর কানের নিচে একটা মেরে দিলো। মজনু চেয়ার সমেত চিৎ হয়ে পড়ে গেল।

মূহুর্তে সাদিয়ার চেহারা আখির চেহারায় পরিবর্তন হয়ে গেল, লাল টকটকে চোখ, ফ্যাকাসে রক্তহীন মুখ। মজনুর ওপর ঝুকে পড়ে বললো,– নাটক মানে! সাদিয়ার মাঝে আমি আছি, তোর বড়ো ভাবী আখি। আর একবার যদি ভূত পেত্নী শব্দ উচ্চারণ করিস তাহলে আছাড় মেরে পরপারে পাচার করে দেবো বজ্জাত।

মজনু গাল চেপে ধরে মিনমিন করে বললো,– দেবর মশকরা করতেই পারে তাতে এত উত্তেজিত হবার কি আছে! আর একটু হলেই তো ভয়ের আউটপুট প্যান্ট ভিজিয়ে সর্বনাশ করে দিতো।

মজনুর কথা শুনে আখির আত্মা হেসে ফেলে বললো,– তুমি কি কখনোই ভালো হবেনা মজনু?

তারপর আখির আত্মা সাদিয়ার দেহ ত্যাগ করলো।

আখি খাটের ওপর বসে পড়লো। চোখ ঘুরিয়ে মজনুকে ফ্লোরে চিৎ হয়ে পড়ে থাকতে দেখে সাদিয়া হকচকিয়ে উঠে বললো,– একি! আপনি পড়ে গেলেন কীভাবে?

মজনু গাল চেপে ধরে উঠে দাড়িয়ে বললো,– জীবনের ওপর দিয়ে হাল্কা করে ঝর বয়ে গেল, যথেষ্ট প্রমানের অভাবে দোষী নির্দোষ ভাবী।

সাদিয়া মিষ্টি হেসে বললো,– কি জে বলেন মজনু ভাই, আপনি একটা মজার লোক আসলেই।

মজনু আবার গালে হাত দিয়ে মনে মনে বললো,– মজার ঠেলায় গাল এখনও জ্বলছে।

সাদিয়া বললো,– আচ্ছা মজনু ভাই, একটা সত্যি কথা বলবেন।

মজনু ভ্যাবাচেকা খেয়ে মনে মনে ভাবলো, মিথ্যা বললে তো সাদিয়ার কাঁধে ভর করা আখির আত্মা ধরে ফেলবে, তারপর আবার কিনা কানের ওপর অথবা গালের ওপর দিয়ে ঝড় বয়ে যায়, ধোলাই খাবার চেয়ে সত্য বলা ভালো। মজনু অনিচ্ছাকৃত হেসে বললো,– একটা সত্য কথা মানে! এই মজনুর শিরা-উপশিরায় সত্য প্রবাহমান, হাজারটা সত্য বলতে প্রস্তুত আমি।

: মজনু ভাই, আপনার জীবনে কখনও প্রেম আসেনি? মানে লায়লা টাইপের কেউ।

: লায়লা তো এসেছিল ভাবী বর্ষা রূপে।

: মানে?

: বর্ষাকে ফর্সা দেখে ভরসা করে এই মজনু এখন একপ্রকার দেবদাস, এ বুকে বিরহ বারোমাস।

: হা, হা, হা, কেন বর্ষা আবার কি করলো?

: বর্ষা আর আমার প্রেমের বয়স যখন ছ’মাস, তখন একদিন বর্ষার ঠোঁটে চুমু খেয়েছিলাম, তার পরদিন কয়েকজন পুলিশ এসে আমাকে তুলে নিয়ে যায়, থানায় গিয়ে জানতে পারি বর্ষা লেডি পুলিশ ইনসপেক্টর! ভালোবাসার প্রতিদান ডান্ডার মাধ্যমে পশ্চাতে সম্প্রদান করে আনুষ্ঠানিক ভাবে ব্রেকআপ ঘোষণা করলো বর্ষা। বর্ষা বলেছিল প্রেমের উদ্দেশ্য যদি এসব হয়, তাহলে কিছুতেই সেটা প্রেম নয়।
কিন্তু বর্ষাকে কিকরে বুঝাই এ যুগের পোলা মাইয়া আজ প্রেম শুরু করলে কাল চুমু খেয়ে পরশু বিছানায় যাবার প্রস্তুতি গ্রহণ করে। যা-ই হোক এভাবেই সমাপ্তি ঘটে আমার প্রেমের।

সাদিয়া মজনুর প্রেম কাহিনী শুনে হেসেই অস্থির। মজনু বললো,– আচ্ছা ভাবী, আখি ভাবীর আত্মা সবার ওপর ক্ষেপে আছে কেন?

হাসি থামিয়ে সাদিয়া বললো,– এ বাড়ির লোকজন আঘাত দিয়ে দিয়ে আখিকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করেছে সে জন্য। একটা মেয়ে স্বামীর সংসারে আসে একবুক স্বপ্ন আশা নিয়ে। স্বামীর বাড়ির লোকজন যদি আঘাতের ওর আঘাতে সেই মেয়েটিকে তিলে তিলে শেষ করে দেয়, স্বপ্ন গুড়িয়ে আশা পুড়িয়ে ছাই করে দেয়, তখন তাদের প্রতি ক্ষোভ ছাড়া আর কি থাকে বলো।

আখির আত্মাকে খুশি করার জন্য মজনু মনে মনে একটা প্ল্যান করলো, ব্যাস সন্ধ্যা হতে যতক্ষণ, তারপর মজনুর প্ল্যান প্রয়োগ করা হবে–

সন্ধ্যায় মজনুর প্ল্যান অনুযায়ী দাদী সাদিয়ার রুমের সামনে এসে কড়া মেজাজে বললো,– কিরে নবাবজাদি, পায়ের উপরে পা তুলে বসে থাকার জন্য বুঝি করছো শাদী। কাজকাম নেই কোনো না কি।

দাদীর কথা শুনে আখির আত্মা সাদিয়ার শরীরে প্রবেশ করে বললো,– কিরে বুড়ী, সময় আসার আগেই মরতে মনে চায় বুঝি?

দাদী ভয়ে দৌড়ে এসে মজনুর পেছনে লুকিয়ে বললো,– এ মজনু তুই আখির আত্মাকে খুশি করার প্ল্যান করছিস নাকি আমারে পৃথিবী থেকে বিদায় করার! তোর প্ল্যানের উপ্রে তো ভরসা পাচ্ছি না বদ।

মজনু বললো,– দাদী ভয় কিসের, আমি তো আছি।

দাদী ভ্রু কুঁচকে বললো,– পেত্নীর হাতে প্রাণ যাবার পরে কি তোরে দিয়া ভর্তা খামু!

“আহ! কিছু হবেনা দাদী” বলে মজনু দাদাীকে আবার ঠেলে পাঠালো।

দরজার সামনে গিয়ে দাদি আবার বললো,– দরজা থাকলে সাহস খোল সাদিয়া।

মজনু ইশারায় দাদীকে বললো,– কি বলছো এসব উল্টাপাল্টা ডায়লগ।

দাদী মজনুর ইশারা বুঝতে পেরে আবার বললো,– ইয়ে মানে সাহস থাকলে দরজা খোল সাদিয়া।

দাদীর কথা শেষ হতে না হতেই খটাস করে দরজা খুলে সামনে দাড়ালো সাদিয়া। ভয়ে দাদীর হার্ট-অ্যাটার্ক হবার অবস্থা।

হাসান দৌড়ে এসে সাদিয়ার হাত ধরতেই সাদিয়ার মাঝে ভর করা আখির আত্মা শান্ত হয়ে গেল। হাসান সাদিয়ার হাত ধরে রুমে নিয়ে খাটের ওপর বসালো। সাদিয়া মাথা নিচু করে চুপচাপ বসে আছে।

হাসানের মা-বাবা এসে রুমে ঢুকলো। হাসান, মা-বাবা, দাদী,মজনু, সবাই সাদিয়াকে ঘিরে দাড়িয়ে আছে। সাদিয়ার মাঝে থাকা আখির আত্মাকে উদ্দেশ্য করে হাসানের বাবা বললো,– মা’রে, আমরা তোর সাথে যে দুর্ব্যবহার করেছি, তোকে কষ্ট দিয়েছি, তার জন্য সত্যিই লজ্জিত, পারলে আমাদের ক্ষমা করে দিস, শ্বশুর নয় বাবা হিসেবে তোর কাছে আমার এই অনুরোধ।

দাদী কান্না জড়িত কণ্ঠে বললো,– জানি আমি খুব জালিয়েছি তোকে, এর জন্য আমি অনুতপ্ত। যদি ক্ষমা করতে না পারিস তাহলে তোর যা মনে চায় কর আমাকে, এমনিতেই তো আর বেশিদিন বাঁচবো না। তবুও যদি তোর রাগ কমে, খুশী লাগে।

হাসানের মা বললো,– আখি তোকে তো আর ফিরে পাবো না মা, তবে কথা দিচ্ছি আমাদের দ্বারা আর এমন ভুল কোনদিন হবেনা, সাদিয়াকে পুত্রবধূ হিসেবে না, মেয়ে মনে করে আগলে রাখবো কথা দিলাম।

সাদিয়ার মুখ দিয়ে আখি বললো,– অসংখ্য মেয়ে খুঁজলে পাওয়া যাবে যারা কোনো না কোনো পিছুটানের জন্য আত্মহত্যা করতে না পারলেও স্বপ্ন ভঙ্গ ও মানুষের অযত্ন অবহেলায় ভেতরে ভেতরে ঠিকই মরে যায়। কোনো মেয়েকে আপন না ভাবতে পারলে অন্তত তার সাথে দুর্ব্যবহার করার আগে তাকে ছেলের বউ, নাতির বউ, ভাইয়ের বউ, এসব না ভেবে রক্তে-মাংসে গড়া একজন মানুষ ভাবা উচিত। মেয়েরা অসহায় নয়, সমাজ তাদের অসহায় করে রাখে। মেয়েরা শক্তিহীন নয়, সমাজ তাদের শক্তি কেড়ে নিতে ব্যস্ত সবসময়। একটা মেয়ের সাথে দুর্ব্যবহার করার আগে একবার সেই মেয়ের স্থানে নিজের মা, বোন, স্ত্রীর কথা ভাবুক একবার সমাজের নীচু মানসিকতার লোকজন, দেখবেন দেশে নারী নির্যাতনের পরিমাণ দিনকে দিন হ্রাস পাবে। কিন্তু কোটি কোটি মানুষ থাকা সত্বেও সেরকম ভাবার মানসিকতা নেই আর কারো! আর একটা কথা সবার মনে রাখা উচিৎ, মেয়েরা কেবল মেয়ে নয়, মেয়েরাও মানুষ। আমি চলে যাচ্ছি তবে আমার সাথে যা ঘটেছে সেরকম যদি সাদিয়ার সাথে কিছু ঘটে, তাহলে আমি আবার ফিরে আসবো এবং কাউকে দ্বিতীয় বার আর ক্ষমা করবো না।

তারপর আখির আত্মা সাদিয়ার দেহ ত্যাগ করলো।

সবাই নিজেদের করা ভুলের জন্য অনুতপ্ত। যত দিন যায় সবার ভালোবাসায় সাদিয়ার সংসার সুখে ভরে ওঠে কানায় কানায়।

সাদিয়া মনে মনে কৃতজ্ঞতা জানায় আখির প্রতি। এভাবেই সুখে শান্তিতে কেটে যাচ্ছে এখন সাদিয়ার সংসার।

সমাপ্ত।

লেখাঃ ইমতিয়াজ আহমেদ চৌধুরী।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here