আত্মার অস্তিত্ব পর্ব ১

0
115

বাসর রাত, সাদিয়ার মাথা থেকে শাড়ির আঁচল পড়ে গিয়ে ঘোমটা খুলে গেল, হাত দিয়ে টেনে তুলে ঘোমটা দিতে যাবে তার আগেই শাড়ির আঁচল নিজে নিজে উপরে উঠে ঘোমটায় পরিনত হয়ে গেল!

সাদিয়া বুঝতেই পারছে না মূহুর্তে কি ঘটে গেল। ইচ্ছে করেই আর একবার ঘোমটার কাপড় ফেলে দিলো। আবার সেই একই কান্ড!

ভয়ে গলা শুকিয়ে আসছে সাদিয়ার, শরীরে কাঁপন ধরেছে, বিন্দু বিন্দু ঘাম জমাট বেধেছে কপালে।
কী হচ্ছে এসব?

হঠাৎ পেছনদিকের জানালা খটাস্ করে খুলে গিয়ে শীতল হাওয়া এসে ছুয়ে যাচ্ছে সাদিয়ার গায়ে। ধীরে ধীরে উঠে গিয়ে কোনমতে জানালা বন্ধ করে কাঁপতে কাঁপতে এসে খাটে বসে পড়লো।

সামনের আলমারি খুলে গেল, কাপড়ে বাঁধা ছোট্ট একটা পুটলি পড়লো নিচে।

আবার উঠে গিয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে পুটলিটা তুলে খুলে দেখলো তার ভেতরে এক পাতা লাল টিপ, কয়েকটা লাল কাচের চুড়ি, চুল বাঁধার ফিতা। সাদিয়া আলতো করে সেগুলোর ওপর হাত বুলিয়ে দিতেই লাল রঙ কেমন ফ্যাকাসে হয়ে গেল।

আজকে সাদিয়ার বাসর রাত, কিন্তু এসব কী হচ্ছে।
জলদি করে পুনরায় পুটলিটা বেঁধে আলমারিতে তুলে রেখে, দরজা খুলে হাসানকে রুমে ডাকলো সাদিয়া। দরজার ওপাশে হাসানের নানী-দাদী টাইপের দু’একজন বসা ছিল। তারা হাসাহাসি করে বলে উঠলো, ‘ তর সইছে না, কোন যুগ আইলো রে।’
তারপর তারা হাসানকে ডেকে বলল, ‘ যাও যাও মিশন শুরু করো গিয়া।’

বুড়িদের কথা শুনে সাদিয়া মনে মনে বলল, ‘ এই ভূতের ঘরে বুড়িদের আটকে রাখলেই বুঝতো মিশন কাকে বলে। ’

হাসান এসে রুমে ঢুকলো। খাটে সাদিয়ার পাশে বসতেই লক্ষ্য করলো সাদিয়ার শরীর থরথর করে কাপছে।

হাসান মিষ্টি হেসে বলল, ‘ ভয় পাচ্ছো কেন, আমি কী বাঘ না ভাল্লুক!

: এহ, আপনাকে ভয় পাচ্ছে কে?

: তাহলে তোমার শরীরের এই ভাইব্রেশনের কারণ কী?

: আমি যা দেখেছি তাতে তো কেবল শরীরে ভাইব্রেশন মুড চালু হইছে, আপনি দেখলে পুরো হ্যাং হয়ে যাইতেন।

: বলো কী?

: যা শুনছেন তাই বলছি, আগে যদি জানতাম এই ঘরে ভূত আছে, তাহলে আজীবন কুমারী থাকতাম, ভূতের কিল খাবার চেয়ে কুমারী থাকা শতগুণ ভালো।

: কী বলছো এসব?

: তো কী, ঘরে ভূত থাকতে আবার বিয়ে করার কী দরকার?

: এই, মাথা ঠিক আছে তোমার, ভূত নিয়া সংসার করা যায়!

: তাইলে এইসব অদ্ভুত সব কান্ড ঘটছে কীভাবে এই ঘরে?

: কি অদ্ভুত কান্ড?

হাসানের কথা শেষ হতেই আলমারির দরজা খুলে আবার সেই পুটলিটা নিচে পড়লো।

সাদিয়া এবং হাসান দুজনেই এগিয়ে গেল আলমারির দিকে। হাসান পুটলিটা তুলে আলতো করে একটা চুমু খেয়ে বুকে চেপে ধরলো।

সাদিয়া প্রশ্ন করলো, ‘ এগুলো কার?’

: আঁখির।

: আখিঁ কে, আপনার আগের স্ত্রী?

: হুম।

: খুব ভালো বাসতেন তাকে, তাইনা?

: বাসতাম না, বাসি, আজীবন বাসবো।

: উনি মারা গেছিলো কিভাবে ?

হাসানের চোখে জল টলমল করে উঠল। পুটলিটা আলমারিতে তুলে রেখে, চোখ মুছে ভাঙা কন্ঠে বলল, ‘ অন্য একদিন বলবো।’

তাহলে সেই আঁখির আত্মা কী ঘুরে বেড়াচ্ছে এই ঘরে? এইসব অদ্ভুত ঘটনা কী তার আত্মার অস্তিত্বের কথা জানান দিচ্ছে?
এরকম অসংখ্য প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে সাদিয়ার মাথায়।

পরদিন রাতে–

সাদিয়া নুয়ে পায়ে নুপুর লাগিয়ে উঠে বসে জানালার দিকে চোখ পড়তেই চিৎকার দিয়ে উঠলো! হাসান দৌড়ে এসে জিজ্ঞেস করলো, ‘ কী হয়েছে?’

কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে সাদিয়া বলল, ‘ জানালার ওপাসে একটি মেয়ে দাড়িয়ে ছিল।’

: মানে?

: মনে হচ্ছিল একটা মেয়ে হাওয়ায় ভেসে আমার পায়ে নুপুর পরা দেখছিল, কী বিভৎস তার চেহারা, রক্তশূণ্য ফ্যাকাসে একটা মুখ, তার ঠোঁটে মনে হয় পৃথিবীর সমস্ত কষ্ট কালো হয়ে লেপ্টে আছে। এলোমেলো চুল, আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছিল।

: হা-হা, তোমার বর্ননা শুনে মনে হচ্ছে কোনো রোহিঙ্গা মেয়ে এসেছিল জানালার ওপাশে। খেয়ে না খেয়ে ওদের অবস্থা তো ওরকম’ই!

: এই তুমি চুপ করো তো।

: আরে ভাত জোটেনা ওরা নূপুর পরবে কোন সময়, তাই তোমার নূপুর পরা দেখছিল…

: হইছে এবার চুপ করো, নইলে ঐ মেয়েকে ধরে এনে তোমার গলায় ঝুলিয়ে দেবো।

: গলায় একজন ঝুলে আছে, তারপর তুমি, আরও একজন ঝুলিয়ে দিলে কেল্লা ফতে, এটা গলা, ক্রেন না বুঝলা।

দুজন হাসাহাসি করছে এমন সময় জানালার ওপাশে সেই মুখটা ভেসে উঠলো। দুজনের চোখ ছানাবড়া, ঠোঁটের হাসি উধাও!

সাদিয়া হাসানকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। সেই মুখটা মলিন, ঠোঁটে শুকনো হাসি, সেই হাসি বেদনা মাখা। চোখ বিষন্নতার অন্ধকারে ছেয়ে আছে।

সাদিয়ার হাত ছাড়িয়ে হাসান দ্রুত উঠে “ আখি ” বলে চিৎকার দিয়ে জানালার দিকে এগিয়ে যেতেই আঁখির আত্মা হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।
জানালার কাছে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে হাসান কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো।

সাদিয়া হাসানের হাত ধরে উঠিয়ে খাটের উপর এসে বসালো। হাসানের
মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, ‘ তুমি কাঁদছো কেন, তুমি আঁখি আপুকে যতটা ভালোবাসো, তারচেয়ে বেশী সে তোমাকে ভালোবাসে বলেই তো তোমাকে ছেড়ে যায়নি, তোমার আসেপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তোমাকে চোখে চোখে রাখছে। একটু বলোনা আঁখি আপু সম্পর্কে, আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছে প্লিজ।

হাসান চোখ মুছে বলল– আখি গরীব ঘরের সাধারণ সহজ সরল একটি মেয়ে, অনেক স্বপ্ন ছিল দুচোখে, আমার ঘরে এসে সেই স্বপ্নগুলো আমায় নিয়ে রঙ্গিন করে সাজাতে চেয়েছিল। এতটা ভালোবাসায় বেধেছিল যে একসময় আখিকে আমার নিশ্বাস আর আমি তার হয়ে গিয়েছিলাম। গরীব ঘরের মেয়ে বলে কেউ ওকে মেনে নিতে পারেনি, সেটা আমি জানতাম না, কখনো বলেনি। বাড়ির সব কাজ শেষ করে দিন শেষে ক্লান্ত শরীরটা নিয়ে সামনে এসে সবকিছু লুকিয়ে ফেলতো মিষ্টি ঠোঁটের মায়াবী হাসির আড়ালে। আমাকে দেখলেই নাকি ওর সব দুঃখ, কষ্ট, ক্লান্তি উধাও হয়ে যেত এক নিমেষে। পাগলিটার একটাই আব্দার, বিছানায় একটা বালিশ থাকবে আমার জন্য, আর তার বাালিশ আমার বুক। তাইতো আমাকে ফাাঁকি দিয়ে চলে যাবার পর বুকটা ভীষণ খালি খালি লাগে।

হাসানের কন্ঠ ভারী হয়ে গেল। নিজেকে কন্ট্রোল করে আবার বলল, ‘ ঘুমোনোর আগে বুকে মাথারেখে ছোটো ছোটো স্বপ্ন গুলো সত্যি করার পরিকল্পনা চলতো আমার সাথে। তারপর ঘুমিয়ে পড়তো। আমি তাকিয়ে থাকতাম তার নিষ্পাপ মায়াবী মুখের দিকে। ঘুমোনোর আগে তার কপালে আলতো করে একটা চুমু খেতাম, গভীর ঘুমের মধ্যেও আমার স্পর্শে স্পষ্ট অনুভব করে আমাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরতো।
ওর জড়িয়ে ধরা দেখে মনে হতো ও বলতে চাইছে, ‘ চিরতরে ঘুমিয়ে গেলেও আমাকে ও এভাবেই আগলে রাখবে।’

‘ তারপর?’ সাদিয়া প্রশ্ন করলো।

হাসান বলল, ‘ বাড়ির লোকজন ওকে মারধর করতো, আত্মীয়স্বজন দুর্ব্যবহার করতো, দাদী একটু বেশি অত্যাচার করতো। এসব আঁখির লিখে রেখে যাওয়া শেষ চিঠি পড়ে জানতে পারি। একদিন রাতে বাড়িতে ফিরে দেখি আঁখির দেহটা ঝুলে আছে, এতকিছু করেও এত কষ্ট, যন্ত্রণা সইতে না পেরে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছিল। এসব আগে জানলে ওকে নিয়ে কোনো দূর অজানায় চলে যেতাম।
কিন্তু ও কখনো আমাদের পরিবার ছেড়ে দূরে যেতে চাইতো না, ছোটবেলায় মা-বাবা হারিয়ে এতিম হয়ে কাকার বাড়িতে বড়ো হয়েছে, এখানে এসে আমার মা বাবার মাঝে নিজের মা বাবাকে খুঁজে পাবার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু ব্যর্থ হয়ে হতাশায় ভেঙে পড়েছিল হয়তো।

হাসান থামলো। সাদিয়া উঠে গিয়ে আলমারি খুলে সেই পুটলিটা বের করে, চুড়ি পরে, কপালে টিপ লাগিয়ে, ফিতা দিয়ে চুল বেঁধে, জানালার কাছে গিয়ে দাড়িয়ে বলল, ‘ আখি আপু, এই দেখো, তোমার ছোট বোন তোমার চুড়ি পড়েছে, টিপ দিয়েছে কপালে, চুল বেধেছে তোমার চুলের ফিতা দিয়ে, বলো তোমার বোনকে কেমন লাগছে।

হাসান অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।

জানালার ওপাশে আঁখির মুখটা ভেসে উঠলো, চোখে জল, কাঁপা কাঁপা ঠোঁটে হাসি কান্নার প্রলেপ। বোঝা যাচ্ছে সাদিয়ার ব্যবহারে আঁখির আত্মা খুশি হয়েছে।

সাদিয়া নিজের চোখের জল মুছে আঁখির আত্মাকে বলল, ‘ তুমি আর বাইরে বাইরে থাকবে না, এখন থেকে আমাদের সাথে এই ঘরে থাকবে।’

আঁখি সাদিয়ার মুখে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল।

সাদিয়া এবং হাসান ঘুমিয়ে পড়লো। মাঝরাতে হঠাৎ সাদিয়ার ঘুম ভেঙে গেল। চোখ খুলে দেখলো আঁখি মাথার কাছে বসে সাদিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। সাদিয়া উঠে বসলো। আঁখি বলল, ‘ আজ থেকে আমার এই লক্ষী ছোট্ট বোনটির খেয়াল রাখার দায়িত্ব আমার, ওরা আমার সাথে যা করেছে তোর সাথে যেন তেমনটা না করতে পারে। সবগুলোকে এবার উচিৎ শিক্ষা দিয়ে ছাড়বো।

সাদিয়া মুচকি হেসে আঁখির পায়ের কাছে শিশুদের মতো গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়লো। আখি পরম আদরে সাদিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো, সাদিয়া ঘুমিয়ে পড়লো।

চলবে…

গল্পঃ আত্মার অস্তিত্ব। ( প্রথম পর্ব )

লেখাঃ ইমতিয়াজ আহমেদ চৌধুরী।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here