আত্মার অস্তিত্ব পর্ব ২

0
89

গল্পঃ আত্মার অস্তিত্ব। ( দ্বিতীয় পর্ব )

দুই দিন পার না হতেই রুমের সামনে সাদিয়ার দাদি শ্বাশুড়ি এসে গলা ফাটিয়ে বলল, ‘ এই যে রাজ কুমারী, বিছানা ছেড়ে এবার হাড়ি পাতিল ধোবার জন্য রেডি হও, সবগুলো জমা হয়ে আছে।’ স্প্রিংয়ের মতো ফটাস্ করে দরজা খুলে খটাস করে সাদিয়া সামনে এসে হাজির।

দাদি শ্বাশুড়ি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল, একি মানুষ নাকি জ্বীন-ভূত!
সাদিয়া বলল, ‘ এই যে, সকাল বেলার এই মনোরম পরিবেশটা ফাটাবাঁশ মার্কা গলা দিয়ে চিৎকার করে নষ্ট করছেন কেন হা?

: কী আমার গলা ফাটা বাঁশ?

: তো কী, রেকর্ড করে শোনালে নিজের গলা শুনে নিজেই একশত দশবার বিনা ব্রেকে ভিরমি খাবেন।

: চুপ কর, এই গলার সুর শুনেই তিনি আমার প্রেমে পাগল হয়েছিলেন বুঝলি?

: তিনি আগেই পাগল ছিলেন, আপনার প্রেমে পরে বাকিটুকু গেছে আরকি, পাগল না হলে এমন মেয়ের প্রেমে ভালো মানুষ পড়ে।

দাদি শ্বাশুড়ি রেগে গিয়ে সাদিয়ার চুলের মুষ্টি ধরতে যাবে এমন সময় সাদিয়ার চোখ দুটো হঠাৎ আগুনের মতো লাল হয়ে জ্বলে উঠলো। তাই দেখে দাদির কাম শেষ।
দাদি নিজেকে কন্ট্রোল করে চোখ বড়ো করে বলল, আমাকে ভয় দেখানো হচ্ছে তাইনা।
সাদিয়া মুচকি হাসলো। হঠাৎ সাদিয়ার চেহারা আঁখির চেহারায় পরিবর্তন হলো। তাই দেখে দাদি ‘ মা গো ’ বলে হাজার কিলোমিটার বেগে দৌড় শুরু করলো। এক সময় নিরাপদ স্থানে এসেছে ভেবে দৌড় থামিয়ে দম নিতে লাগলো। ঘুরে দাড়িয়ে দেখলো সাদিয়া পেছনে দাড়িয়ে হাসছে। তারমানে দাদির দৌড়াদৌড়ি জলে গেছে সব, যেখানে ছিল সেখানেই আছে!

সাদিয়া মুচকি হেসে বলল, ‘ দাদি, মোটরসাইকেলের চেন ছেড়া থাকলে ইঞ্জিন একশত কিলোমিটার বেগে চালাইয়া লাভ আছে, চাকা যদি না ঘোরে। আর তুমি যতই স্পিডে দৌড়াও, পায়ের নিচে মাটি না থাকলে কাম হইবো। যাও, পুকুর ঘাটে অনেক থালাবাটি জমে আছে, সেগুলো ধৌত করো সুন্দর করে।’

দাদি ভয়ে ভয়ে চলে যেতে লাগলো।

সাদিয়া পেছন থেকে ডেকে বলল, ‘ দাদি, আইনের হাত লম্বা হোক বা না হোক, ভূতের হাত কিন্তু অনেক লম্বা। বিষয়টা যদি হয় জানাজানি, তাহলে কিন্তু তোমার প্রাণ নিয়ে শুরু হবে টানাটানি। টিকিট কেটে সোজা দাদার কাছে পাঠিয়ে দেবো।’

দাদি চলে গেল। সাদিয়া রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিতেই আঁখির আত্মা দৃশ্যমান হলো। তারপর দুজনের হাসাহাসি।

আঁখি বলল, ‘ এই বাড়ির সমস্ত কাজ নিজে করে, সমস্ত কষ্ট নীরবে সয়ে, অত্যাচার সয়েও চেয়েছিলাম সবার মন জয় করতে, ভেবেছিলাম একদিন হয়তো সবাই আপন করে নেবে। কিন্তু যাদের মনে ধনী গরিবের ব্যবধান বিদ্যমান, তাদের কাছে কোনদিনই প্রিয় হতে পারলাম না। গরীব ঘরের মেয়েরা কী মেয়ে না, তাদের আশা, আকাঙ্খা, স্বপ্ন, ভালোবাসা থাকতে নেই? গরীব বলে কি সমস্ত অত্যাচার মুখ বুঝে সয়ে যেতে হবে? গরীব ঘরের মেয়েরাও রক্ত মাংসের গড়া মানুষ, কোনো অনুভূতিহীন রোবট নয়। এবার একে একে সবগুলোকে শিক্ষা দিয়ে ছাড়বো।

ওদিকে দাদিও ছেড়ে দেবার লোক নয়, গোপনে তিনি তার অন্য ছেলে মেয়েদের ফোন করে আসতে বললেন, সাদিয়াকে এবার উচিৎ শিক্ষা দিতেই হবে।

সকালে বাড়িতে ওঝা এসে কর্কশ গলায় বলল, ‘ কোথায় আসামি, এসে গেছি এই আমি।’

সাদিয়ার দাদি শ্বাশুড়ি এসে বলল, ‘ ঐ মিয়া, তুমি ওঝা হইয়া পুলিশের ভাব নেও ক্যান?’

: ওহ স্টপ গ্রান্ডমাদার! পুলিশ হোক অথবা ওঝা, প্রথমে তো বিষয়টা লাগবে বোঝা, নাকি?

: হইছে হইছে, ভূত ছাড়াতে পারবে তো?

: এই ধরনের কোয়শ্চন করে আমাকে লজ্জায় ফেলবেন না পিলিচ, এই কিং কিসমতের ডিকশনারিতে ‘ পারিবনা ’ শব্দটির জন্য কোনো স্পেস নাই!

: শুধু চাপা’ই পারো, নাকি ভূত ছাড়ানোর মন্ত্র টন্ত্র’ও দুই একটা পারো।

: দাদী, মন্ত্রের যুগ শেষ, এখন চাপার যুগ, দুই চার খান টাটকা চাপা যদি মারি, ভূত ছেড়ে পালাবে এই বাড়ি। এই ধরেন ভূতকে যদি বলি, ফেসবুকে ভূতনাষক গ্রুপের মহামান্য এডমিন এই কিং কিসমত, তখন ভূত বুঝতে পারবে তার কিসমতে কী আছে। জুতা নিয়েও আর পালানোর সুযোগ পাবেনা।

: হইছে থামেন, যে কাজে আসছেন তাই করেন।

ওঝা সাদিয়ার রুমের সামনে এসে বলল, ‘ কোথায় সেই বেত্তুমিজ পেত্নী, আয় আমার সামনে আয়।’

সাদিয়া একটা প্লেট হাতে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো, ওঝার সামনে গিয়ে বলল, ‘ এত কষ্ট করে এসেছেন, প্লেটে নাস্তা আছে, পানি আছে, খেয়ে নিন।’

ওঝা বলল, ‘ আপামনি এগুলো পরে খাবো, ভূত্নী কই, যার ঘাড়ে ভূত চেপেছে।’

দাদি সাদিয়াকে দেখিয়ে ওঝাকে বলল, ‘ ও নিজেই তো সেই ভূত।’

ওঝা সাদিয়ার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল, ‘ এনার চেহারা দেখে তো মনে হয় পরি, এসব উল্টাপাল্টা বলে কী বুড়ী!’

ওঝা দাদীকে বলল, ‘ এমন লক্ষী একটা মেয়েকে আপনি ভূত পেত্নী বলছেন, একবার নিজের চেহারা উইদাউট মেকাপ আয়নায় দ্যাখেন, তাহলেই বুঝবেন আসল পেত্নী কে।’

দাদি রাগে জ্বলে উঠে বলল, ‘ ওরে নেমকহারাম, তোকে আমি ডেকে এনেছি, আর এখন তুই ওর পক্ষে কথা বলছিস।’

: দাদি, চিল্লাইয়া মার্কেট ফাওন যাইতো না, আর আপনার যে ভয়ংকর ভয়েস, পরিবেশে সৃষ্টি করে অস্হির নয়েস, দয়াকরে আপনি সাইলেন্ট মুডে থাকলে ধন্য হইতাম।’

ওঝা ব্যাগ থেকে কয়েকটা হাড়গোড় বের করে সাদিয়ার সামনে এসে কি মন্ত্র পড়ে বলল, ‘ এই পেত্নী, এই কিং কিসমতের হাতে তোর কিসমতের কিসসা খতম করতে না চাইলে জলদি বল তোর নাম কী?

সাদিয়া হেসে বলল, ‘ নামটা সোজা জিজ্ঞেস করলেই হতো, এত ঘুরিয়ে পেচিয়ে বলে কষ্ট করার কী দরকার ছিল?

: খুচরা আলাপ পরে, আগে বল কেন আসলি এই ঘরে?

: আমার ঘরে আমি আসবো না তো কে আসবে?

: এখনও বলছি মানে মানে, চইল্লা যাও বাঁশ বাগানে।

ওঝা একটা হাড্ডি বের করে সাদিয়ার গায়ে স্পর্শ করাবে এমন সময় সাদিয়ার চেহারা পাল্টে আখির চেহারা হয়ে গেল। তাই দেখে ওঝা দৌড়ে গিয়ে লাফ দিয়ে দাদির কোলে উঠে বলল, ‘ পিলিচ সেভ মি দাদি, সামনের মাসে আমার বিবাহ, আমার কিছু হইয়া গেলে আমার হবু বউ যে বিবাহ পূর্বেই বিধবা হইবে।

দাদি ধাক্কা দিয়ে কিসমতকে ফেলে দিয়ে বলল, ‘ হাবভাব দেখে মনে হয় এখনো ফিডার খাওয়া ছাড়িসনাই, তুই অাবার ভূত ছাড়াইতে আইছিস।’

‘ দাদি এই কিং কিসমতের প্রেস্টিজ নিয়া আপনে কিন্তু খেলা করতে পারেন না ’ ওঝা উঠে দাড়িয়ে এইটুকু বলতেই দাদি বলল, ‘ তোর কিং কিসমতের কপালে ঝাঁটা মারি, দূর হ চোখের সামনে দিয়া তারাতাড়ি। তোরে ভূত তাড়াইতে আনলাম সেটাই পারলি না, তোরে দিয়া কি পূজা করমু।’

ওঝা নিজেকে প্রমাণ করার জন্য আবার সেই হাড্ডি নিয়ে সাদিয়ার সামনে যেতেই, সাদিয়া ওঝার কানের উপর টেনে একটা মেরে দিলো। ওঝা ফাস্ট মোশনে বাঁশ বাাগান হয়ে পুকুরের চারপাশে চারবার চক্কর মেরে আবার সাদিয়ার সামনে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ‘ আপামনি, সেই খাবারের প্লেটটা একটু দেন, আপনার এক থাপ্পড়ে শরীরের সব জ্বালানি শেষ, এখন কিছু না খাইলে বাড়ি পর্যন্ত হেটে যাওয়া সম্ভব হইবে না, একেবারে নট পসিবল। আয়াম সরি।’

সাদিয়া খাবারের প্লেটটা দিয়ে, আঁখির কণ্ঠে বলল, ‘ দ্বিতীয়বার তোকে যেন এই বাড়িতে না দেখি।’

ওঝা মনে মনে বলল, ‘ ন্যাড়া বেল তলা একবারই যায়।’

দাদি ওঝাকে বলল, ‘ দেখলি এইমাত্র সাদিয়া অন্য কণ্ঠে কথা বলল, এটা কিভাবে সম্ভব।’

ওঝা একবার সাদিয়ার দিকে তাকিয়ে, আবার দাদির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ ডিজিটাল যুগে সবই সম্ভব দাদি, যেমন অসম্ভবকে সম্ভব করা আমাদের হিরো অনন্ত জলিলের কাজ, তার মতো আরও দুএকজন দেশের আনাচে কানাচে যে থাকবে না তার কোনো গ্যারান্টি আছে? সেই দুই একজনের মধ্য সাদিয়া আপামনি একজন।’

কথা শেষে ওঝা দ্রুত ভেগে গেল।

সাদিয়া ঘরে চলে গেল। দাদি চুপিচুপি গিয়ে সাদিয়ার রুমের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে দিলো।
সারাদিন সেভাবেই রইল, সন্ধ্যায় হাসান বাড়ি ফেরার আগে আগে দাদি দরজা খুলে দিতে গিয়ে দেখে সাদিয়া উধাও, ঘর ফাঁকা, ঘরে কেউ নেই।

চলবে…

বিঃদ্রঃ এটা কেবলই একটি কাল্পনিক গল্প, এবং ভৌতিক গল্প রসালো করতে কমেডি যোগ করা হয়েছে, এখানে কেউ বাস্তবতা টানবেন না দয়াকরে।

লেখাঃ ইমতিয়াজ আহমেদ চৌধুরী।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here