আনন্দধারা বহিছে ভুবনে পর্ব ১১

0
103

#আনন্দধারা_বহিছে_ভুবনে (পর্ব ১১)
নুসরাত জাহান লিজা

“এই ছেলেটার যে কী হবে জীবনে কে জানে? কোনো লক্ষ্য নাই, উদ্দেশ্য নাই, হাল ছাড়া নৌকা নিয়ে সমুদ্রে নেমে কী লাভ? কোন ফ্যামিলি এই ছেলের কাছে নিজেদের মেয়ে দিব? আমি হইলে তো কোনোদিনও দিতাম না।”

অবন্তী নিজের রুমে বসে বসে প্র‍্যাকটিকেল খাতা ঠিক করছিল। মা পাশে বসে ইনিয়ে বিনিয়ে কিছু কথা বলে অয়নের প্রসঙ্গ তুললেন। অবন্তী কাজ থামিয়ে শার্পনার দিয়ে পেন্সিল কাটতে কাটতে মায়ের দিকে সন্দিগ্ধ চোখে তাকালো। এরপর মুখ খুলল,

“আম্মু, তুমি এসব কথা আমাকে শোনাচ্ছ কেন হঠাৎ? তোমাকে কেউ তোমার মেয়েকে ওই ছেলের গলায় ঝুলিয়ে দিতে বলে নাই!”

“আমার মেয়ের এতটাও খারাপ দিন আসে নাই যে ওমন ছন্নছাড়া, বোহেমিয়ান ছেলের সাথে তারে বিয়ে দেব।”

অবন্তী খেয়াল করেছে মা ইদানিং সুযোগ পেলেই অয়নকে কটাক্ষ করতে ছাড়েন না। আগে সেভাবে গা না করলেও আজ কিছুটা ভাবতেই কারণটা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হলো। মা ওর ভেতরটা কিছুটা হলেও পড়ে ফেলেছেন। আজ ধরা পড়েও অবন্তী মনকে শান্ত রাখতে পারল। তবে ভেতরে ভেতরে একটা রোখ চেপে গেল।

“আম্মু, তোমাকে এসব কিছুই বলতে হবে না। তোমার এসব ভণিতা ভালো লাগছে না। যা বলার সরাসরি বলো।”

“তুই বিয়েটা আসলে কী জন্যে ভেঙেছিস আমি জানি না ভেবেছিস? তুই আমার পেট থেকে বেরিয়েছিস, তোর সব নাড়ি নক্ষত্র আমার চেনা আছে।”

মায়ের অন্তর্ভেদী দৃষ্টিতে বুকে অদ্ভুত একটা জ্বালা ধরে যায়, সাথে অয়নের প্রত্যাখ্যানের ব্যথা টনটনিয়ে ওঠে।

“অয়নকে নিয়ে আমার মধ্যে কিছু নেই আম্মু। তুমি তোমার এই ঘ্যানঘ্যানানি বন্ধ করো। আমার এখন ফালতু বকবক শুনে নষ্ট করার মতো সময় নেই।”

“তুই ওর মতো চরম বেয়াদব হয়ে যাচ্ছিস অন্তি। মায়ের সাথে কথা বলছিস সেটা ভুলে যাস না।” কাটাকাটা গলায় রোকেয়া বলে উঠলেন।

অবন্তী এবার আর পাত্তা দিল না, মনে বয়ে যাওয়া প্রলয় সামলে নিয়ে নিজের কাজে মনোনিবেশ করল। রোকেয়া আবারও মেয়েকে তীক্ষ্ণভাবে পর্যবেক্ষণ করে বললেন,

“তেমন না হলেই ভালো। কথাটা সবসময় মাথায় রাখিস।”

কথা শেষ করে রোকেয়া হনহনিয়ে বেরিয়ে যান। অবন্তী মায়ের যাওয়ার দিকে মাথা ঘুরিয়ে তাকিয়ে রইল। নিজের মাকে কেমন অচেনা মনে হচ্ছে। মানুষ এভাবে আচমকা বদলে যায় কেন?

প্র‍্যাকটিকেল খাতার এ-ফোর কাগজের ওপরেই মাথা গুঁজে নিজেকে ধাতস্থ করার চেষ্টা করল। না চাইতেই চোখ বেয়ে বান ডাকল। ভালোবাসায় এমন যন্ত্রণা কেন? হৃদয় পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে। অথচ বাইরে থেকে কেউ তার বিন্দুমাত্র আঁচ পাচ্ছে না! হু হু বিষাদের সাথে অবন্তীর মনে এক পৃথিবী অভিমান জমা হলো!

***
“খুন্তি, এই রাত দুপুরে ছাদে আসার অভ্যাস তোর আর গেল না।”

অবন্তী অয়নের দিকে একবার চোখ তুলে চাইল, কোনো উত্তর দিল না। সেমিস্টার ফাইনাল চলছে, রাত জেগে পড়তে হচ্ছে, মাথা ঝিম ধরে গেছে বলে ছাদে এসেছে। আজ আকাশে ঘুটঘুটে কালো মেঘ ঘিরে আছে, কেমন ভ্যাপসা গরমে প্রাণ জেরবার। সেভাবে বাতাস নেই, এমন গোমট রাত অবন্তীর একদম ভালো লাগে না। শূন্যতা বেড়ে যেন কয়েকগুণ হয়ে যায়!

“অভ্যাস তো অভ্যাসই। তুই কি কোনো অভ্যাস বদলেছিস জীবনে?”

“আমি তো নিজেই বদলে গেছি রে খুন্তি। অভ্যাস আমার কাছে খুবই ঠুনকো।” অয়নের মুখে অসহায়ত্বের ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু বর্ণচোরা ছেলেটা সেটা মুহূর্তেই লুকিয়ে ফেলেছে।

“অবশ্য বাপ মায়ের সোনার টুকরা মেয়ের একটু আহ্লাদ না করলে মানায় না। আছিস তো ফ্যান্টাসি ওয়ার্ল্ডে, বাস্তবতা কেমনে বুঝবি? তাই কথায় কথায় ইমোশন চুয়ে চুয়ে পড়ে।” অয়ন কটাক্ষ হেনে বলল কথাটা।

অবন্তীর খুব রাগ হলো, সে যথেষ্ট প্র‍্যাকটিকেল। অয়ন যে ওর ভালোবাসা নিয়ে খোঁচা দেবে সেটা সে সেদিনই বুঝতে পেরেছিল। কিন্তু তাই বলে কথায় কথায় সেটাকে স্মরণ করিয়ে গভীর ক্ষতে বারবার আঘাত করবে এতটাও অমানবিক ভাবেতে পারেনি। তাই পাল্টা আক্রমণ করে বসে সে।

“আমার ইমোশন চুয়ে চুয়ে পড়ে আর তোরটা কী? অন্যকে ঠিকই বলা যায়, নিজে করতে গেলে তখন সেটা বোঝা যায়। এত যদি বুঝতি তাহলে চাচাকে একটু স্বস্তি দিতি। বাসার সবাইকে এমন অশান্তির মধ্যে রাখতি না।”

“আমি সবাইকে অশান্তির মধ্যে রাখছি?”

“তা নয়তো কী? প্রত্যেকদিন তুই অশান্তি করিস। এই বাসায় যত সমস্যা হয় সব তোর জন্য। তুই যত নষ্টের গোঁড়া। নিজের রাগ, জেদ বজায় রাখার জন্য তুই এতগুলো মানুষকে কষ্ট দিস। মানুষের ইমোশন তোর হাসি-ঠাট্টার জিনিস। তুই…”

অবন্তী হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে কেবল বলেই গেল, অয়নের দিকে চোখ পড়তেই সহসা থমকে গেল। ছেলেটার চোখে আজ যেন অবর্ণনীয় বিষাদ ফুটে উঠেছে। কিন্তু কথা ফিরিয়ে নেওয়ার কোনো সিস্টেম ওর জানা নেই। নিজের রাগটাকে যে কেন নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে না!

অয়ন আচমকা সশব্দে হেসে উঠল, হাসির দমকে যেন চারপাশ কেঁপে কেঁপে উঠছে! কী অপ্রকৃতস্থ সেই হাসি! কৃষ্ণপক্ষের মরে আসা আলোয় কেমন অদ্ভুত একটা আবহ তৈরি হয়েছে!

অয়নের হাসিটা যেভাবে শুরু হয়েছিল তেমন আচমকা ভাবেই থেমে গেল, নিমিষেই অয়ন নিজেকে গাম্ভীর্যের খোলসে ঢেকে ফেলল।

“ঠিকই বলেছিস বোধহয়! আমি খুব খারাপ। আমার অনুভূতি নাই, কষ্ট নাই, দুঃখ নাই৷ হেসে খেলে আমি নিজের জীবন নষ্ট করেছি।”

আবারও সেই অপ্রকৃতস্থ হাসি হাসতে থাকল। অবন্তীর ভারি অনুশোচনা হলো, মরমে মরে গেল। কেন এসব বলতে গেল! সব তো সত্যি নয়! এক পৃথিবী মায়া আবারও টানতে লাগল এই ছন্নছাড়া ছেলেটার দিকে। কিন্তু সেটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না, মায়া প্রতিস্থাপিত হলো ভয়ংকর রাগে!

“আর তুই কী? তুই একটা চরম বদরাগী, জেদি, বিরক্তিকর একটা মেয়ে। আমি এত খারাপ জেনেও যেচে পড়ে কেন আমাকে প্রপোজ করেছিলি? তখনও আমি যা ছিলাম এখনো তাই আছি। আসলে তুই একটা চরম স্বার্থপর। তোকে ফিরিয়ে দিয়েছি বলে তোর আঁতে ঘা লেগেছে, সেই জন্য এখন নিজের প্রত্যাখ্যাত হবার জ্বালা জোড়াতে এসব বলতেছিস। তোকে আমি চিনি না ভেবেছিস?”

অয়নের এসব কথা সহ্য করার মতো ধৈর্য অবন্তীর নেই। ওর ভালোবাসাকে এতটা ছোট করার, নিচে নামানোর স্পর্ধা কেউ দেখাবে আর সে চেয়ে চেয়ে সেটা হজম করবে তা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

ভয়াবহ রাগে প্রবল শক্তিতে নিজের হাতটা অয়নের গালে নামিয়ে আনল। রাগে থরথর করে কাঁপছে অবন্তী। ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে প্রায় চিৎকার করে বলল,

“তুই আর কোনোদিন আমার সাথে কথা বলতে আসবি না। আমার এখন লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছে করছে, কেন তোর মতো একটা ইতর প্রজাতির ছেলেকে আমি ভালোবেসেছিলাম! সেটা আবার বড় গলা করে তোকে জানিয়েওছিলাম। ছি! নিজেকে এতটা ছোট করেছি ভাবতেই…”

গলা ভেঙে আসছে বলে আর কথা বাড়ায় না অবন্তী। দ্রুত পায়ে সেখান থেকে চলে গেল। আজ যেন আলোর গতিতে সিঁড়ি ভেঙে নেমে এলো। দরজার ছিটকিনি টেনে দিয়ে সেখানেই বসে রইল। নিজের আবেগ আর কোনোদিন কাউকে দেখাবে না! যথেষ্ট হয়েছে নিজেকে ছোট করা। অয়নকে মাথা থেকে চিরতরে ঝেড়ে ফেলবে সে! মনে মনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করে বসল ভেঙে পড়া অবন্তী!

***
অয়ন এখনো গালে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে এই কৃষ্ণপক্ষ রাতের সাথে নিজের মিল খুঁজতে ব্যস্ত। আজকের আকাশে একটা দুটো দলছুট তারার মতো সে নিজেও বড্ড একা। জীবনের সাথে লড়াই করতে করতে সে এখন ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত।

একটু শান্তির খুঁজে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে ইচ্ছে করে। যেখানে জীবনের কোনো জঞ্জাল, জটিলতা কিছুই থাকবে না। কেবল স্বপ্নে দেখা এক টুকরো শান্তি থাকবে, বহুদিন ঘুমাতে পারে না, একটু নির্ঝঞ্ঝাট ঘুম কত আকাঙ্ক্ষিত! কার্নিশের গায়ে পিঠ ঠেকিয়ে বসে চোখ বন্ধ করল।

ভেতরটা কেমন চূড়ে ভেঙ্গে যাচ্ছে, অয়ন না চাইতেই সেই ভাঙ্গনের শব্দ শুনছে! প্রাণপণে চেষ্টা করছে সেটা বন্ধ করার, কিন্তু মনের ভাঙ্গা গড়ার উপরে কি কারোর নিয়ন্ত্রণ থাকে! নীল নীল বিষাদ ওর হৃদপিণ্ডে বিষদাঁত দিয়ে যেন কামড় বসাচ্ছে প্রতিনিয়ত!
………
(ক্রমশ)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here