আনন্দধারা বহিছে ভুবনে পর্ব ১২

0
83

#আনন্দধারা_বহিছে_ভুবনে (পর্ব ১২)
নুসরাত জাহান লিজা

সকালে এমদাদ সাহেব বাজারের ব্যাগ হাতে বের হচ্ছিলেন এই সময় হটাৎ করে শরীরটা দুলে উঠল। শিউলি বাবাকে নিরস্ত করে নিজেই বাজারে চলে এসেছে। খুব বেশি দূরে না হওয়ায় হেঁটেই যাবার সিদ্ধান্ত নিল। অনেকদিন থেকে ঘরে বসে থাকতে থাকতে হাঁপ ধরে গেছে। সকালে খোলা আকাশের নিচে মুক্ত বাতাসে হাঁটতে খুব একটা মন্দ লাগবে না ভেবেছিল। কিন্তু পথে পরিচিত একজন প্রতিবেশির সাথে দেখা হলো, তিনি সকালের হাঁটা শেষে বাসায় ফিরছিলেন। তাকে দেখে সৌজন্যতাবশত শিউলিকে দাঁড়াতে হলো। শিউলিকে দেখে তিনি বললেন,

“আরে শিউলি যে, শেফালি ভাবিরে তো এখন দেখাই যায় না। আগে প্রায়ই আসত। কিছু হইসে তোমাদের বাসায়?”

“না আন্টি, কিছু হয় নাই তো। এমনিই শরীর একটু খারাপ।”

“তা তো একটু স্বাভাবিক। এমনিতেই বয়স বাড়তেছে, কিছুটা টেনশন তো থাকবই।”

মেকি সহানুভূতির ছাপ সরে গিয়ে কৌতূহলী হয়ে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি তো মনে হয় মাস খানেক হইল আসছো তাই না? তা আর কতদিন আছো গো মা?”

শিউলি জানে প্রশ্নটা শুধু ওকে একটা খোঁচা দিতেই করা, এটা প্রায় পুরো পাড়ার মানুষই জানে এখন। তবুও মানুষের পরশ্রীকাতরতার এই স্বভাব কেন যে যায় না! নিজের ঘরের কত ভালো-মন্দ হিসেব নিকেশ মিলিয়ে শেষ করা যায় না, আর এদিকে কত মানুষ অন্যের হাঁড়ির খবর নিতে ব্যস্ত! এত সময় মানুষের! অথচ ভালো কোনো খবর বাড়ি বয়ে দিয়ে আসলেও তাদের চোখ কান বন্ধ থাকে। কী বিচিত্র মানসিকতা!

শিউলি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নির্বিকার গলায় বলল,
“আন্টি, আমি এখানেই আছি। চলে আসছি একবারে। আর যাব না।”

তিনি মুখ দিয়ে সহানুভূতিসূচক শব্দ করলেন, এরপর বললেন,
“আহারে, তুমি কষ্ট পাইয়ো না মা। জীবন আর কয়দিন! তবে আমার ভাল্লাগলো যে তুমি শোক কাটায়ে উঠছো। যার মায়া যত কম, সে দুনিয়ায় সবচেয়ে সুখী মানুষ।”
তার কথাগুলোর সাথে শিউলি পুরোপুরি একমত না হলেও, একেবারে ফেলেও দিতে পারল না।

“যার সাথে মনের কোনো টান নাই, তার জন্য দুঃখী দুঃখী ভাব নিয়ে ঘুরার তো কিছু নাই আন্টি। অপাত্রে মায়া করলে শুধু শুধু মায়ার অপচয়! তাতে করে লাভটা কী? খালি খালি নিজের অপমান ছাড়া?”

“তুমি অনেক শক্ত মা। এরকম করে কয়জন চিন্তা করে! অনেক দোয়া থাকল মা। ভালো থাইকো। তোমার মায়েরে আমার বাসায় যাইতে বইলো।”

আন্টি বিদায় নিলেও শিউলির মনে তার রেশ রইল বেশ কিছুক্ষণ। শেষের দোয়াটা তিনি মন থেকেই করেছেন! শুধুমাত্র শেষটুকুর জন্যই তার প্রথমদিকের অযাচিত আলাপ মাফ করে দিল শিউলি। দিনশেষে ভালো মন্দের মিশেলেই তো মানুষ।

বাজার করে ফেরার সময় সাজিদের সাথে দেখা হলো। একই স্কুলে এসএসসি পর্যন্ত পড়েছে। মানুষটাকে বিশেষভাবে মনে রাখার একটা কারণ অবশ্য আছে, এই ছেলেটা যে ওর দিকে একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে তাকাত তা বিদায়ী বছরে বেশ ভালো করে বুঝতে পেরেছিল। ইন্টারমিডিয়েটে গার্লস কলেজে ভর্তি হয়েছিল বলে সেভাবে জমিয়ে ওঠতে পারেনি। তবুও কলেজের মোড়ে প্রায়ই দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যেত সাজিদকে। কখনো চোখে চোখ পড়ে গেলেই টুপ করে পালিয়ে যেত।

আচ্ছা, সাজিদ যদি একটু সাহসী হয়ে ওকে কিছু বলতো, তাহলে কি ওর জীবনটা অন্যরকম হতো! নাকি সময়ের সাথে সাথে ভালোবাসা বিবর্ণ হয়ে যেত! নিজের ভাবনায় শিউলি নিজেই বিরক্ত হলো। সেই কবেকার কোন সাজিদ, সে কি এখনো কৈশোরের একটা না হওয়া ভালোবাসার জন্য অপেক্ষা করবে? শিউলি নিজেই যে বড্ড ফিঁকে, তার জীবনে আর কিছু হবার নেই।

সাজিদ এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, “আরে শিউলি না? তোমারে কতদিন পরে দেখলাম! আমারে চিনছো?”

“চিনব না কেন? কী অবস্থা এখন তোমার?”

“আল্লাহ ভালোই রাখছে। আম্মা বিয়ের জন্য পাত্রী দেখতেছে। ভাবতেছি এইবার বিয়েটা করেই ফেলব।”

“তাইলে তো ভালোই চলছে মনে হয়!”

“তা চলতেছে। তোমার সংসারের খবর বলো।”

শিউলির স্মিত হাসিমুখ সহসাই মিইয়ে গেল, নিজেকে সামলে নিয়ে পাশ কাটিয়ে বলল, “তোমার বিয়েতে দাওয়াত দিও। আজ আসি, পরে কথা হবে।”

কথা শেষ করে দ্রুত পা চালিয়ে চলে এলো, অপ্রিয় কথা বলতে একদমই ভালো লাগে না। ভাবনায় বুঁদ হয়ে হাঁটছিল, আচমকা কোত্থেকে তুহিনের উদয় হলো সামনে। আজ যেন প্রকৃতি শিউলির সাথে আঁড়ি নিয়েছে। সারি বেঁধে পরিচিত মানুষের আনাগোনা শুরু হয়েছে। তবে কথা শুনে বুঝতে পারল বাকিদের সাথে দেখা হওয়া কাকতালীয় হলেও তুহিন তাকে অনুসরণ করছিল।

“ভালো ভালো! এইজন্য তোমার ডিভোর্স নেওয়ার এত তাড়া? আইজ আমি হাতেনাতে ধরছি। কয়টা নাগর লাগে তোর?”

কান ঝাঁ ঝাঁ করে উঠল, ইচ্ছে হলো ঠাটিয়ে চড় মেরে দিতে। কিন্তু বাজারে লোক সমাগম ভালোই। তাই এই মুহূর্তে নিজেকে দমিয়ে রাখা ছাড়া আর কোনো পথ নেই। তবে মুখকে থামাতে পারল না, শিউলি বিরস মুখে বলল,

“সবাইকে নিজের মতো ভাবা বন্ধ করো। অবশ্য তোমারে এইসব বলে ফায়দা নাই, কুত্তার লেজ সারাজীবন বাঁকাই থাকে।”

“তুমি আমারে ইন্ডিরেক্টিলি কুত্তা বললা? তোমার সাহস…”

বাকিটা বলার আগেই শিউলি বলল, “এই তো বুঝতে পারছো। ভালো। আমার পরিশ্রম কমছে।”

একটা রিকশা পেয়ে তাতে উঠে বসল, এভাবে আর কার সাথে না কার সাথে আবার দেখা হয়ে যায় কে জানে! কিন্তু শিউলির আজ কারো প্রশ্নের উত্তর দেবার ইচ্ছে নেই। কেবল ডুব দিতে ইচ্ছে করছে নিজের অন্তঃপুরে!

***
আজ বড়চাচা সকাল সকাল বেরিয়ে গেছেন। খাবার টেবিলের অশান্তি হীন সুন্দরভাবে শুরু হওয়া একটা দিন। অয়নকে আজ অনেকদিন পরে দেখছে অবন্তী। সেই ঘটনার পরে এই দেড় মাসে কখনো সামনে পরে গেলে দু’জনেই প্রাণপণে এড়িয়ে গেছে সচেতনভাবে। আজ অবন্তী মা আর চাচীর সাথে খাচ্ছিল, তখন অয়ন এসে বসল। খেতে খেতে হঠাৎ করে বলল,

“মা, আমারে কিছু টাকা দিও তো, দরকার ছিল।”

“কত?”

“তিনশো হলেই হবে। মাসের এই কয়দিন আর জ্বালাব না।”

“কী করবি?”

“দিতে হবে না, এত কৈফিয়ত দিতে ভালো লাগে না।”

অয়ন হাত ধুয়ে উঠে পড়ল। অবন্তীর মনের উপরে চেপে বসা বোঝাটা আরও ভার হলো। অয়ন তাহলে ওর সাথে সবরকম সম্পর্ক চুকিয়েই দিয়েছে। আগে এমন করে টাকার আবদারগুলো নিয়ে ওর কাছেই আসত। অবন্তী শুধু অয়নের জন্য টাকা জমাত, যাতে নিরাশ না করতে হয়। এই মাসেও জমিয়েছে। কিন্তু সেসবের বুঝি আর কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য পাওয়া হলো না। সব তবে চুকে বুকেই যাক একেবারে, চিরতরে!

অবন্তী খেয়ে উঠে গেল, তাকেও ইউনিভার্সিটিতে যেতে হবে। আজকে শেষ প্র‍্যাকটিকেল পরীক্ষা।

***
অয়ন সব ঠিকঠাক নিয়েছে কিনা চেক করে বাইরে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে। অয়নের মা এসে দাঁড়ালেন। হাতে একটা পাঁচশো টাকার নোট। ছেলেটা বাবার সাথে সাথে তার সাথেও একটা অলিখিত দূরত্ব তৈরি করে ফেলেছে। তবুও ছেলেকে তিনি সবসময় বোঝার চেষ্টা করেন। ক’দিন ধরে যে অয়নের চলাফেরার স্বাভাবিক ছন্দ ব্যাহত হয়েছে এটা তিনি ভালোই উপলব্ধি করেন।

তার ছেলের কী এত দুঃখ! আজ তার মনে হলো তার হয়তো ছেলেকে আরও বোঝার চেষ্টা করা উচিত ছিল, আরেকটু আগলে রাখা উচিত ছিল। অভিমানে ছেলে দূরে যেতে চাইলেই কী তাকে সরিয়ে দিতে হবে? আরও কেন আগলে রাখলেন না, বহুদিন পরে মা হিসেবে নিজেকে কেন যেন ব্যর্থ মনে হলো তার।

“তোর কী হয়েছে বাবা? কেমন যেন উদাসীন মনে হচ্ছে কয়েকদিন থেকে?”

“সিরিয়াসলি কয়েকদিন থেকে? তোমাদের কাছে তো আমারে সারাজীবনই উদাসীন মনে হইছে!”

“মাকে বলা যায় না? কষ্ট মনে চেপে রাখলে দেখবি, বুকে পাহাড় চেপে বসবে। একটু প্রাণ খুলে নিঃশ্বাস নে বাবা।”

অয়নের চোখে কীসের এক অদ্ভুত শূন্যতা যেন, কিন্তু মুখে কটাক্ষ মাখা হাসি। একটু বুঝি চমকে উঠল, তারপর সামলে নিয়ে বলল,

“এতদিন পরে এটা তোমার কেন মনে হলো মা? বুকে চেপে বসা হিমালয় এখন আমি কী করে ঠেলে ফেলব, মা? এত শক্তি তো আমার নেই। চোরাবালিতে গলা পর্যন্ত তলিয়ে গেলে সেখান থেকে ক’জন আর বাঁচে? আমার সব তো শেষ হয়ে গেছে। সব সবুজ হারিয়ে গেছে। এখন মরা ডালপালা ছাড়া আমার আর কিছু নেই।”

সুফিয়ার খুব ইচ্ছে হলে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে কপালে স্নেহের পরশ ছুঁইয়ে দিতে, কিন্তু দীর্ঘ দিনের অনভ্যস্ততায় সেটা তিনি পারলেন না। নিজের কাছে অপরাধবোধের বোঝাটা বড্ড ভারী ঠেকল! অয়ন একবার মা’য়ের দিকে তাকিয়ে টাকাটা নিয়ে বেরিয়ে গেল।

সুফিয়ার মনে হলো, তার ছেলেটা এমন দূরের মানুষ কেন হয়ে গেল! সেই ছোট্ট অয়নের একটু কষ্ট হলেই একসময় মনে হতো তিনি বোধহয় মরে যাচ্ছেন। সেই অয়ন এত বড় হয়ে গেল, ওর এতটা কষ্ট গেল। কই, তিনি তো ছেলের মাথায় হাত বুলাতে পারেননি। আজ তার ভেতরটা ভেঙে গুড়িয়ে যাচ্ছে! বেশিই কঠোর হয়েছিলেন বোধহয়! তারা তো ভালোই চেয়েছিলেন, সব এভাবে উল্টে গেল কেন তবে? বুক নিংড়ে হাহাকার বেরিয়ে এলো।

***
শাফিন আর অবন্তী ভাইভা শেষ হতেই হাঁটতে হাঁটতে জব্বারের মোড়ে এলো। রেললাইন বসে মালাই চায়ের অর্ডার দিল।

“দোস্ত, তুই তাইলে বাসায় যাবি কাল?”

“হ্যাঁ, পরীক্ষা তো শেষ। ফোর-টু’র ক্লাস শুরু হইলেই চলে আসব। বাসার কী অবস্থা বুঝিসই তো।”

“হুম।” কেমন উদাস হয়ে যায় অবন্তী, ওকে আজকাল ভীষণ অচেনা লাগে শাফিনের কাছে। কখনো খুব বেশি অকারণ উচ্ছ্বাস দেখায়, তো কখনো গুম মেরে বসে থাকে। কেমন যেন একটা অস্বাভাবিকতা, একটা গুমোট মেঘে ঘেরা থাকে অবন্তীর মনটা। কী হয়েছে ওর?

ভাবে যত দ্রুত সম্ভব মনের কথাটা বলে দিতে হবে, এই মেয়েটাকে ছাড়া কেমন যেন দম বন্ধ লাগে। অবন্তী মাঝে দু’দিন আসেনি, তখন অনুভূতিটা আরও ভালো করে উপলব্ধি করতে পেরেছে। এবার ফিরেই নিজের ভেতরে বন্দী থাকা অনুভূতির ছিপি খুলে দেবে অতল চোখের মেয়েটার কাছে, ভাবল শাফিন। ফলাফল কী হবে সে জানে না! ভয়টা প্রগাঢ় হয়, অবন্তীকে হারানোর ভয়!
…….
(ক্রমশ)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here