আনন্দধারা বহিছে ভুবনে পর্ব ১৭

0
108

#আনন্দধারা_বহিছে_ভুবনে (পর্ব ১৭)
নুসরাত জাহান লিজা

শাফিনের কাছে মনে হচ্ছে পৃথিবীটা যেন সহসাই থমকে গেছে। এই চমৎকার গোধূলি বিকেল, এইমাত্র পাশের রেললাইন ধরে দুরন্ত গতিতে ছুটে চলা ট্রেনটা, ঘরে ফেরার জন্য উদ্যত কর্ম ক্লান্ত জনমানব, উড়ে চলা পাখিরা সব যেন ওর মনের সাথে সাথে স্থির হয়ে গেছে। স্তব্ধ হয়ে আছে সময়টা, ঠিক যেন ওর হৃদপিণ্ডটার মতো।

কত সময় গেল সে জানে না, তবে মনে হলো এক মহাকাল পরে যেন অবন্তী ঘুরে তাকালো, চোখ তুলে শাফিনের চোখে চাইল। ঠিক যেন বনলতা সেনের চাহনি, চমকে উঠল শাফিন! শ্যামলা বর্ণের অবন্তীর নাটোরের বনলতা সেনের পাখির বাসার মতো চোখ দুটোতে এক পৃথিবী দ্বিধা, নাকি অভিমান, ক্ষোভ কিছুই বুঝতে পারল না, তবে এটুকু বুঝল আশঙ্কাটাই সত্যি হয়েছে হয়তো!

মস্ত ভুল করে বসেছে, এবার বন্ধুত্ব টিকবে কিনা তার অনিশ্চয়তায় গুমরে উঠল হৃদয়টা! রাশি রাশি প্রগাঢ় নীল ব্যথারা হৃদপিণ্ড চিড়ে কিলবিলিয়ে গলার কাছে উঠে আসতে লাগল। অবন্তীর কথা কানে যেতেই মূর্ত অনুভূতি ফিরে এলো, মোহভঙ্গ হলো।

“শাফিন, তোকে কি আমি কখনো নিজের অজান্তে এমন কোনো ইঙ্গিত দিয়েছি? বল না? আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। কত কথাই তো বলেছি তোকে, ভুলবশত তেমন কোনো ইশারা পেয়েছিস কি আমার দিক থেকে?”

শাফিন বুঝল অবন্তী নিজেকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। তাই নিজেকে দ্রুত সামলে নিয়ে বলল, “তুই মিছেমিছি এসব ভাবছিস অন্তি! তুই কোনোদিন আমাকে এমন কিছু ইশারা দিস নাই রে। আমিই বোকার মতো তোরে ভালোবেসে ফেলছি। অবশ্য আমার কাছে একদমই বোকামি নয়, পৃথিবীর সবচাইতে সুন্দর আর মিষ্টি অনুভূতির একটি। কিন্তু তোকে বলাটা বোধহয় ঠিক হয় নাই।”

স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করলেও শাফিন নিজেকে একেবারেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না, সব হারানো নিঃস্ব কোনো মানুষ মনে হচ্ছে তার। দৃষ্টি আবছা হয়ে আসছে, অন্ধকার নামার আগেই সামনে দাঁড়ানো অবন্তী আড়ালে পড়ে গেছে, কয়েক বিন্দু রঙহীন তরলের আড়ালে।

“তোকে একটা প্রশ্ন করি অন্তি?”

“কর? একটা প্রশ্ন করার আগে পারমিশন নিতে হবে, তোর সাথে আমার এমন সম্পর্ক বুঝি?”

শাফিন জানে এরপর যতবার অবন্তীর সামনে আসবে এই অস্বস্তিকর বিষয় সামনে চলে আসবে, চেতনে কিংবা অবচেতনে। স্বচ্ছ নদীর মতো বয়ে যাওয়া বন্ধুত্বের পথচলা বুঝি এতটুকুই ছিল, নদীর গতিপথ বুঝি দু’দিকে বেঁকে যাচ্ছে এখান থেকেই।

“তুই কাউকে ভালোবাসিস?”

অদ্ভুতভাবে কেঁপে উঠল শাফিনের গলাটা। অবন্তীর গলায়ও একই সুর।
“আয়নকে ভালোবাসতাম।”

অপ্রত্যাশিত মনে হলো শাফিনের কাছে, তবে অবিশ্বাস করল না।
“বাসতি বলছিস কেন? এখন বাসিস না?”

“ও আমাকে রিজেক্ট করে দিয়েছে। আমাকে নিয়ে নাকি তেমন কিছু ভাবে না।”

“আমাকে আগে কোনোদিন বলিসনি তো? তাহলে হয়তো এই ভুলটা করতাম না।”

“সাহস হয়নি। আজ আমার কী মনে হচ্ছে জানিস? মানুষ বোধহয় বেশিরভাগ সময় ভুল মানুষকে ভালোবেসে ফেলে। বিপরীত প্রান্তের মানুষটার মনে হয়তো আমাদের নিয়ে ভাবনার লেশমাত্র থাকে না, কিন্তু আমরা তাদের নিয়ে আমাদের গোটা পৃথিবীটাকে কী সুন্দর করে সাজিয়ে ফেলি!”

নিগূঢ় দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো অবন্তীর বুক বেয়ে। আবারও বলতে লাগল, “যখন সত্যিটা সামনে এসে দাঁড়ায় তখন কাঁচের তৈরি সেই পৃথিবীটা টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙেচুরে গুড়িয়ে যায়! তোর কষ্টটা আমি বুঝি শাফিন। আমার কষ্টটাও তোরই মতো।”

অবন্তীর কথাগুলো শাফিনকে স্পর্শ করতে পারল না। অয়ন তো রাজি হয়নি, তবে অবন্তী কেন তাকে একই কষ্ট দিচ্ছে! ইচ্ছে করলেই তো সে রাজি হতে পারে। ওই মেয়ের কষ্টে সে কি প্রলেপ দিতে পারত না, তার ভালোবাসা দিয়ে! অয়নের প্রতি ঈর্ষার একটা কাঁটা যেন খঁচ করে বিঁধল শাফিনের হৃদয়ে।

“অয়ন কি তোর জীবনে ফিরে আসবে তোর ভালোবাসা উপলব্ধি করে?”

“হাহ্! অয়ন অত্যন্ত নিষ্ঠুর একটা ছেলে শাফিন। বারবার সে আমার ক্ষতে আঘাত করেছে। এখনো সুযোগ পেলে তা হাতছাড়া করে না! আমাকে পুড়িয়ে ওর শান্তি।” করুণ একটা হাসি ঝুলছে অবন্তীর ঠোঁটের কোণে! নিজের প্রতিই যেন কটাক্ষ তাতে।

“তাহলে কীসের এত প্রতীক্ষা? আমি অপেক্ষা করব তোর জন্য। যদি অয়ন ফিরে না আসে, যদি অন্য কাউকে বিয়ে করিস তবে সবার আগে আমাকে মনে করিস। সেটা যেন আমিই হই।”

অবন্তী কথা বাড়ায় না, একটা রিকশা থামিয়ে তাতে উঠে হুট তুলে দিল, রিকশা চলতে শুরু করল। সেই রিকশা দৃষ্টির সীমানায় যতক্ষণ থাকল নির্নিমেষ সেদিকে তাকিয়ে রইল।

একটা সোনা ঝরা লালচে বিকেল নিমিষেই কেমন কালো মেঘে ঢাকা পড়ে গেল। এই হেমন্তেও সবটুকু কালবৈশাখী মেঘ যেন শাফিনের পুরো মনকে আচ্ছন্ন করে ফেলল।

***
সন্ধ্যা পেরিয়ে গেলেও অয়ন নদীর ধারে বসে আছে। হালকা ঠান্ডা আবহাওয়া পড়তে শুরু করছে। সান্ধ্য শিশিরের উপরে পা মেলে বসেছে সে। আশেপাশে বেশ লোক সমাগম। তবে তারা কেউই অয়নের কেউ নয়। সে এই বিশাল জনারণ্যে একেবারে জনহীন। কী ভীষণ একা!

এখন আর ঘরে ফিরতে ইচ্ছে হয় না। ঘরটা একটা বিশাল কারাগার বলে মনে হয়। মন যতই ভাঙা থাকুক, বাইরে থাকলে ডানা মেলে দেওয়া যায় মুক্ত আকাশে, কিছু বিষাদের ভারও বুঝি চাপিয়ে দেয়া যায়। কিন্তু বদ্ধ প্রকোষ্ঠ যে বড্ড অপছন্দ অয়নের।

অয়ন মনস্থির করে ফেলেছে দেশের বাইরে চলে যাবে। যাকে দেখলে হাহাকার বাড়ে তার কাছ থেকে বহুদূরে চলে যাবে! বাসায় কাউকে বলা হয়নি। বলার সময় দ্রুত ঘনিয়ে আসছে। মহিউদ্দিন ভাইয়ের কিছু ছোটখাটো কাজ করে দেবার সুবাদে বেশ ভালো অঙ্কের টাকা আছে হাতে। যদিও কাজটা তেমন সুখকর কিছু নয়, আবার এতটা খারাপও নয়। বাকি টাকা বাবার কাছ থেকে বলে নিতে হবে। তিনি রাজি হবেন কিনা সেটা হলো কথা।

তবে যাবার আগে অবশ্যই জুনায়েদের একটা ব্যবস্থা করে যেতে হবে, নয়তো অবন্তীর বিয়ে পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। বাসায় যেভাবে তোরজোর চলছে পাত্র দেখা নিয়ে, তাতে বলা যায় সেটা খুব শীঘ্রই তা ঘটবে। অদৃশ্য একটা দায়িত্বের ভার হাতবদল করবে সে, কেউ কোনোদিন জানবেও না গভীর আস্থা দেবার জন্যই একটা অদেখা বন্ধনীতে বেঁধে রেখেছিল, আগলে রেখেছিল নিজের অংশ বলে মনে করা মেয়েটাকে। সে যে বড্ড অপারগ, লক্ষ্মীছাড়া, বাঁধনহারা। এর বেশি আর কীই-বা করার সামর্থ্য আছে তার!

জুনায়েদের সাথে বড় রকমের হাতাহাতির পরে কয়েকমাস তেমন কিছুই ঘটেনি। এরপর হঠাৎ লাপাত্তা। পরে অয়ন খোঁজ নিয়ে জেনেছিল ঢাকায় জুনায়েদের বাবার কী একটা নতুন ব্যবসা শুরু করা নিয়ে নাকি খুব ব্যস্ত ছিল। সেখানেই প্রায় আট-নয় মাস ছিল। দুই মাস হলো আবার ফিরে এসেছে। যদিও সেভাবে কিছু বলেনি, তবে ক্ষ্যাপাটে হাসি হেসেছে অয়নকে দেখে৷ অয়ন সেটা সন্তর্পণে এড়িয়ে গেছে। তবে সরাসরি কিছু বলতে এলে ছেড়ে কথা বলবে না অয়ন। এটুকু সে জানে।

***
অবন্তী এবার ভেতরে ভেতরে আরও খানিকটা গুটিয়ে গেছে। শক্ত খোলসের আবরণে নিজেকে গেঁথে ফেলেছে। আরও চার মাস চলে গেছে। অবন্তীর মাস্টার্স শেষ হয়েছে। শাফিনের চূড়ান্ত রেজাল্ট দিয়েছে গতকাল। পিএসসি’র চূড়ান্ত গ্যাজেটে নাম এসেছে। অবন্তী প্রথমে খুব খুশি হয়েছিল। কিন্তু সেটা মিলিয়ে গেল মায়ের কথায়।

“শাফিন তোর এত ভালো বন্ধু। আশা করি এইবার আর আপত্তি করবি না। তোর পড়াশোনা শেষ। সেই বাহানাও আর দিতে পারবি না।”

হতচকিত হয়ে কিছুক্ষণ মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল অবন্তী। শাফিন কীভাবে মায়ের চিন্তায় এলো সেটা সে ভেবে পেল না।

“এগুলা কী বলতেছো আম্মু? নিশ্চিত তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে।”

“হ্যাঁ, আমার মাথা তো সারাজীবনই খারাপ। তোর, তোর বাপের আর অয়নের মাথা সুস্থ আছে খালি, তাই না?”

“আম্মু, তুমি সব কথার মধ্যে অয়নরে নিয়ে আসো কীসের জন্য?”

“কেন রে? অয়নের কথা বললেই তোর গায়ে এত ফোস্কা পড়ে কেন?”

“ছিঃ আম্মু! আমি ভাবতেই পারতেছি না তুমি…”

“যা সত্যি তাই বলি। চুলে পাক ধরতেছে তো এমনি এমনি? অনেক কিছু দেখি আমি।”

অবন্তী কিছু বলল না আর। বিরক্ত লাগছে খুব। রোকেয়া বললেন, “শাফিন কাল যখন মিষ্টি নিয়ে আসছিল, তখন প্রস্তাব দিয়ে গেছে। ছেলেটাও ভালো, বুদ্ধিমান, ঘরেরটার মতো উড়নচণ্ডী না। জীবন কী, সেটা খুব ভালো চিনে। এই শুক্রবার ওর পুরা ফ্যামিলি আসব তোরে দেখতে। এইবার কোনো গাইগুই করবি না খবরদার।”

শাফিনের উপরে রাগ হচ্ছে, এতদিন যেটুকু সহানুভূতি ছিল তা হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। অবন্তীকে জিজ্ঞেস না করে বাসায় মায়ের কাছে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার সাহস ওর কী করে হলো! পরশু রাতে শুধু একবার কথা হয়েছিল শাফিনের সাথে। বলেছিল, অয়নের মনোভাবে কোনো পরিবর্তন নেই। অবন্তীর বিয়ের জোর আলোচনা চলছে। তাতেই প্রশ্রয় পেয়ে গেল? দেয়ালে মাথা ঠুকতে ইচ্ছে হলো। এই ছিল বন্ধুত্ব!

শাফিনের নাম্বারে ডায়াল করতে গিয়েও করল না। আগে নিজের মাথা ঠান্ডা হোক। এখন কিছু বলবে না। সামনাসামনি বুঝিয়ে বলতে হবে। অবন্তী নিজের পাগুলে রাগকে নিজেই ভীষণ ভয় পায়। তাই এই অপেক্ষা। যেদিন দেখতে আসবে সেদিনই শাফিনের সাথে খোলাখুলি কথা বলবে বলে ভাবল অবন্তী।

তার আগে শেষবার অয়নকে বাজিয়ে দেখতে হবে! ছেলেটার মন পৃথিবীর সবচাইতে জটিল গোলকধাঁধা। তাতে আঁতিপাঁতি হাতড়ে যদি একফোঁটা জায়গা জুড়ে নিজেকে পাওয়া যায়!

কুহকিনী যেন হাতছানি দিচ্ছে অবন্তীকে! মিথ্যে জেনেও পিছু নেবার বড্ড সাধ হলো!
……..
(ক্রমশ)

(প্রিয় পাঠক, খুব বেশি ছোট হয়নি আশা করি?)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here