আমার তুমি আছো পর্ব ৯

0
78

#আমার_তুমি_আছো

#Season_3

#Susmita_Jana

Part—9

আমি মানুষটার কাছে যাবো বলে প্রাণপণে ছুটছি। সামান্য দূরত্বটাই যেনো আমার কাছে কয়েক হাজার মাইল পথ। দৃষ্টি স্থির রেখে মানুষটার কাছে ছুটে যাচ্ছি। ডাকছি না তাকে, যদি হারিয়ে যায়! ওই ভয়ে। হঠাৎ আমার সামনে কয়েকটা বাচ্চা বল খেলতে খেলতে আমার রাস্তায় এসে পড়লো। ওদের দিকে দেখে আলতো হাতে সবাইকে সরিয়ে সামনে তাকাতেই, দূর দূরান্তর আর কোন চিহ্ন নেই মানুষটার। আমি ভালো করে চারদিকে দেখলাম। না রাজের কোন চিহ্ন নেই! তাহালে কি আমার চোখের ভুল ছিল! আচ্ছা রাজ কি সত্যিই এখানে আছে?

— হঠাৎ করে দৌড়াতে শুরু করলে কেন?

পিয়াস হাঁপাতে হাঁপাতে কথাগুলো বলে আমার কাঁধে রাখলো। আমি বাঁকা চোখে তাকালাম।

— আপনাকে কি সব কথাই বলতে হবে?

— হ্যা হবে তো। কারণ আমি তোমার স্বামী। তোমার যদি দৌড়ানোর ইচ্ছা ছিলো। আমাকে বলতে পারতে কম্পিটিশন করতাম।

পিয়াস কথাটা বলে হাসতে শুরু করলো। আমি চলে আসতে গেলেই পিয়াস আমার হাতটা ধরে ফেলে। আমি হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে কিছুটা এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াই।

— আমার ভালো লাগছে না। আমি হোটেল রুমে ফিরতে চাই।

— কি এতো তাড়াতাড়ি! আর কিছুক্ষণ পর তো সূর্য অস্ত যাবে। আমরা দেখেই চলে যাবো প্লিজ।

আমি পিয়াস এর মুখের দিকে তাকালাম। ভেতর থেকে একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো।

ঘোলাটে কালো বর্ণের বড়ো পাথরের উপর বসে পড়লাম। চারদিকে আকাশটা লালচে রঙে রাঙিয়ে আছে। মনে হচ্ছে কেউ যেনো লাল রং ছড়িয়ে দিয়েছে আকাশে। সমুদ্রের পানিতেও তার প্রতিফলিত হচ্ছে। সমুদ্র আর আকাশ একসাথে মিশে আছে। আর তার মাঝখানে পরে আছে বেচারী সূর্য। ও র আভা দেখে মনে হচ্ছে সূর্যটা আরও কিছুক্ষন থাকতে চায়। কিন্তু ধীরে ধীরে সমুদ্র ও কে ডুবিয়ে নিচ্ছে নিজের মধ্যে। এর মাঝখানে সমুদ্রটাকে কিন্তু বেশ স্নিগ্ধ লাগছে!মন চাইছে সূর্যের মতোই সমুদ্রটা আমাকে যদি ওর গভীরে ঢুবিয়ে নিতো! মাঝে মাঝে ছোট্ট ছোট্ট ঢেউ গুলো এসে আমার পায়ের পাতা ছুঁয়ে চলে যাচ্ছে। ঢেউ গুলো যেনো খেলা পেয়েছে, ওদের বেশ মজা হচ্ছে মনে হয়! তাই তো বারবার আমার পায়ের পাতা ভিজিয়ে দিচ্ছে। ভাবছি একটা বড়ো ঢেউ উঠলে বেশ ভালো হতো! ঢুবিয়ে না হোক আমাকে ভাসিয়ে তো নিয়ে যেতে পারে! সমুদ্রটা শেষ পর্যন্ত সূর্যটাকে নিজের মধ্যে ঢুবিয়েই ছাড়লো। যদি আমাকে এই ভাবে ঢুবিয়ে নিতো! একটা মিষ্টি হালকা বাতাস মনে হলো আমার গাল দুটো স্পর্শ করলো। আর তারপরেই আমি কিছু বুঝে উঠার আগেই, একটা বড়ো ঢেউ এসে আমার শরীরে আছড়ে পড়লো। আমি চেয়েছিলাম আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাক। সমুদ্র হয়তো শুনতে পেয়েছিলো আর তাই জন্যই বড়ো ঢেউ সৃষ্টি করে আমাকে ভিজিয়ে দিলো!

আমার হাত ধরে টেনে তুলে এনে পিয়াস জোরে ধমকে উঠলেন।

— কি দরকার ছিলো সমুদ্রের একদম কাছে এসে বসার?জানোই তো সন্ধ্যা হয়ে গেলে সমুদ্রের ঢেউ কাছে এগিয়ে আসে। দূরে দাঁড়িয়ে থাকলে কি এমন ক্ষতি হতো? দেখো ভিজে গেলে তো?

— আপনি রেগে যাচ্ছেন কেন? ভিজেছি তো আমি।

— তাই না! এখন এই অবস্থায় তুমি হোটেলে ফিরবে কেমন করে? তুমি আন্দাজ করতে পারছো কি? অতো লোকের ভিড়ের মাঝে তুমি এই অবস্থায় কিভাবে যাবে!

— আমার কথা আপনাকে না ভাবলেও চলবে?

আমি আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে হোটেল রুমের উদ্দেশ্যে চলে আসতে লাগলাম। তা নাহলে এক্ষুণি আবার স্বামী স্ত্রীর জ্ঞান দিতে বসবেন।আমি শাড়ির আঁচলটা ভালো ভাবে শরীরে জড়িয়ে নিলাম। তখন রাগ দেখিয়ে ওভাবে চলে আসলাম ঠিকিই কিন্তু এখন বড্ড অপ্রস্তুতে পড়েছি। আর তাছাড়া পুরোটাই ভিজে গেছি। শাড়িটাও ভিজে পাতলা হয়ে শরীরের সাথে লেপ্টে আছে। হোটেলে ঢুকতেই সবার দৃষ্টি যেনো আমার উপর। কেউ হয়তো এমনিই তাকিয়ে আছে, আবার কারুর দৃষ্টি হয়তো খারাপ। ভেজা আঁচল দিয়েই শরীরটাকে ঢাকার ব্যর্থ চেষ্টা। এই মুহুর্তে আমার রাগ হচ্ছে ওই পিয়াস বাচ্চাটার ওপর। এমনি সময় তো চলে আসতে গেলেই হাত ধরে টেনে নেয়। তুই যখন বুঝতেই পারলি এই অবস্থায় আমি একা হোটেলে আসতে সমস্যায় পড়বো, তাহলে তোর উচিৎ ছিলো আমার সাথে আসার। কেউ তাহলে আর এভাবে তাকিয়ে থাকতো না। ইচ্ছা করছে এই পিয়াস বাচ্চা টাকে বালির নীচে পুঁতে দিই। বেটা খবিশ, তুই দেখিস পিঁপড়ের কামড়ে মরবি। একপ্রকার ছুটে এসেই রুমে ঢুকে ওয়াশরুমে চলে আসলাম।

🍂
🍂
🍂
🍂

আচ্ছা আমি কি তখন ভুল দেখলাম তাহলে! কিন্তু আমি যে স্পষ্ট দেখলাম ওটা রাজ। আমি কি করে জানতে পারবো যে রাজ সত্যিই এখানে! আমার ফোনটাও তো নষ্ট হয়ে গেছে। পিয়াস কে একবার জিজ্ঞাসা করে দেখবো!

— ওই মেয়েটা চুলটা ভালো করে মুছতে শেখো নি?দেখো এখনো কেমন পানি টপছে! আমাকে দাও আমি মুছিয়ে দিচ্ছি।

হঠাৎ পিয়াস কোথা থেকে এসে আমার ভাবনার জগৎে ছেদ ঘটালো। আমি তোয়ালে হাতে নিয়ে বসেছিলাম চুলটা মোছার জন্য। রাজকে ভাবতে ভাবতে আমি চুলটা মোছা থামিয়ে দিই। আর তখনই পিয়াস কোথা থেকে এসে আমার হাত থেকে তোয়ালেটা নিয়ে চুল মুছাতে থাকে। আমি কিছু বলি না। পিয়াস নিজের মতো কাজ করতে থাকে।পিয়াস আমাকে জোর করে নিজের হাতে গাঢ় সবুজ রঙের শাড়ী পড়িয়ে দেয়। আমাকে আয়নার সামনে বসিয়ে নিজের হাতে সাজিয়ে দেয়। সাজানোর শেষে কপালে একটা গভীর চুম্বন দেয়। আমায় নিয়ে আসে একটা অন্ধকার জায়গায়। আমি হাত ধরে হাঁটতে থাকি। পায়ের মধ্যে কিছু একটা সরাতে সরাতে যাচ্ছি তা অনুভব করতে পারি। আমার হাত ধরে কোন কিছুর ওপর বসিয়ে দেয়। আমি কিছু বলতে যাওয়ার আগেই ঝট করে আলো জ্বলে উঠে।

— আজকের রাতটা আপনার জন্য স্পেশাল ম্যাম। আপনি চেয়েছিলেন না কেউ আপনাকে এভাবে সারপ্রাইজ দিক!

চারদিকে আলো ঝলমল করছে। আর পুরো ফ্লোরটায় লাভ চিহ্ন আকারের বেলুনের ছড়াছড়ি। আর তার সাথে চারপাশে ধোঁয়ায় ভর্তি। ঠিক ধোঁয়া না কুয়াশাচ্ছন্ন বলা যেতে পারে। আমার সামনে টেবিল আছে তাতে লাল, গোলাপ, হলুদ রঙের মোমবাতি জ্বলছে।হঠাৎ করে আলোগুলো বন্ধ হয়ে যায়। জ্বলে ওঠে শত শত মোমবাতি।

— তুমি ক্যান্ডেল লাইট ডিনার পচ্ছন্দ করো। তাই তোমাকে সারপ্রাইজ দিলাম। তার সাথে আজকের প্রতিটিই খাবার তোমার ফেভারিট।

এই লোকটা কিভাবে জানলো আমি ক্যান্ডেল লাইট ডিনার পচ্ছন্দ করি! আর তাছাড়া এরকম সারপ্রাইজ তো আমি রাজের কাছে আশা করেছিলাম। আর রাজকেই তো কথাগুলো বলেছিলাম তাহালে কি!

পিয়াস আমার চোখের সামনে তুড়ি বাজালো। আমি চমকে উঠে এদিক ওদিক তাকাই। পিয়াস আমার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে দেখলো।

— কি হল মুখে হাসি নেই কেনো? পচ্ছন্দ হয়নি বুঝি? দেখো এখানে কিন্তু কেউ নেই। চারদিকে নিরাবতা ভালো লাগছে না তোমার?

আমি কিছু বলি না চুপ থাকি। কারণ উনি বারবার এমন অনেক কাজ করছেন যা রাজের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন। খুব কষ্ট হচ্ছে বারবার শুধু রাজের সাথে কাটানো পুরানো স্মৃতি গুলো মনে পড়ছে।

🍂
🍂
🍂
🍂

না আমি ভুল দেখিনি তখন ওটা রাজই ছিল। একটু আগে ডিনার কমপ্লিট করে যখন বেরোলাম তখন রাজ পিয়াসের সাথে এসে দেখা করলো। কারণ ও কিছু একটা কাজে এখানে এসেছিলো। আর সেটা পিয়াস জানতো। ও এই হোটেলেই আছে কাল বাড়িতে চলে যাবে। পিয়াসের সাথে কথা গুলো বলে রাজ রুমের দিকে যাচ্ছে। পিয়াস এর কল আসতে পিয়াস অন্য সাইডে গিয়ে কথা বলছে। তাই আমি সুযোগটা কাজে লাগালাম। রাজের পিছনে চলে গেলাম। ও রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করতে যাবে আমি ওর হাত সরিয়ে রুমে ঢুকে পড়লাম।

— কি ব্যপার তুমি এখানে কি করো? ছোটো ভাইয়া জানতে পারলে খারাপ ভাববে। তুমি যাও এখান থেকে।

আমি রাজের শার্টের কলার টেনে ধরলাম।

— আমি কোথাও যাবো না। আমি তোমার কাছেই থাকবো বুঝেছো।
এই তুমি আমার দিকে তাকাও রাজ। তুমি কি বুঝতে পারছো না আমার বুকের ভিতরটা যে ফেটে যাচ্ছে। আমাদের এক বছরের সম্পর্কটার কি কোন মুল্য নেই। এই রাজ তুমি চুপ করে আছো কেন বলো না।

আমি রাজের শার্টের কলার টেনে ধরে চিৎকার করে কান্না করতে করতে ফ্লোরে বসে পড়ি। রাজ আমাকে তুলে বিছানায় বসায়।

— আলো ভুলে যাও পুরোনো সবকিছু এবং আমাকেও । তোমার স্বামী আছে, তুমি এখন অন্যকারো স্ত্রী। তোমার স্বামী তোমাকে অনেক ভালোবাসে।

— আর তুমি বাসো না?

— তুমি এখান থেকে চলে যাও আলো। তোমার স্বামী হয়তো তোমার জন্য অপেক্ষা করছে।

— আমি কোথাও যাবো না। আমি উনাকে স্বামী হিসাবে মানি না। এই রাজ আমাকে বিয়ে করে নাও না। চলো না আমরা এখান থেকে পালিয়ে যাই।

আমি রাজের হাত ধরে কথাগুলো বলতেই রাজ আমাকে এক ঝটকা মেরে সরিয়ে দেয়।

— আর ইউ ক্রেজি? কি বলছো বিয়ে করেছো আর তাকে স্বামী হিসাবে মানো না? আবার বলছো তোমায় আমাকে বিয়ে করতে?
আচ্ছা আমি তোমাকে বিয়ে করবো। তুমি আমাকে কি দিবে? না মানে দেওয়ার মতো আর তোমার কাছে কিছু আছে?

— কি বলতে চাইছো তুমি?

— তোমার মধ্যে যে লজ্জা জিনিসটা চলে গেছে সেটা তো দেখতেই পাচ্ছি। রাত 11:00 টা বাজে ঘড়িতে দেখো। আর এতো রাতে তুমি একটা পুরুষের সাথে দেখা করতে তার রুমে চলে আসলে। লজ্জা নেই বলেই তো করতে পারলে তাই না। এখন তোমাকে আর আমাকে কেউ দেখে ফেললো হয়তো তোমার স্বামীই দেখলো, তাতে তোমার লজ্জা করবে না ঠিকই কিন্তু আমার লজ্জা করবে। লোক ছিঃ ছিঃ করবে, বলবে ছেলেটা অন্য লোকের বউকে নিয়ে রাত কাটায়।

— রাজ…।

— তাই বলছি চলে যাও এখান থেকে।

— আমি তোমাকে ভালোবাসি রাজ। আমার মন প্রাণ জুড়ে তুমি আছো আর তুমিই থাকবে। কেন এমন করছো রাজ। তুমিও তো আমাকে পাগলের মতো ভালোবাসো…।

— বাসতাম এখন আর বাসিনা। আর তাছাড়া অন্যের স্ত্রী কে ভালোবাসার অধিকার আমার নেই।

— কেনো তখন থেকে অন্যের স্ত্রী বলে চলেছো? ভালোবাসি তোমাকে, তোমাকেই স্বামী হিসাবে পেতে চাই।

— তোমার মতো বেহায়া মেয়ে আমি দুটো দেখি নি। আরে আমি যে তোমাকে বিয়ে করবো কি দিবে তুমি?

— কি চাও বলো। তুমি যা চাইবে তাই দিবো।

— হুম তোমার কাছে চাওয়ার জিনিস আর কিছু নেই। মুখে বলছো স্বামী হিসাবে মানো না। কিন্তু এক রুমে থাকা, এক বেড ইউজ করা কি বলছি বুঝতে পারছো নিশ্চয়ই?

আমি আর সহ্য করতে পারলাম না। রাগে রাজের গালে থাপ্পড় মারি।

— ছিহ্ রাজ তুমি আমাকে এই কথা বলছো। যেই রাজ মেয়েদের দিকে চোখ তুলে তাকানোর সাহস পেতো না। সবসময় মুখ নীচু করে কথা বলতো আর আজ সে ছিহ্।

— আমি খারাপ নোংরা একটা ছেলে। চলে যাও এখান থেকে।

আমি একছুটে রুমে চলে আসি। বিছানায় শুয়ে চাদর খামচে ধরে কান্না করতে থাকি। বারবার রাজের কথাগুলো কানে আসছে। আমি দু হাত দিয়ে কানে বালিশ চাপা দিই।

আমি কখনো ভাবতে পারি নি আমার রাজ এইভাবে আমার সাথে কথা বলবে! রাজ শেষের বলা কথাগুলোতে যে ইঙ্গিতটা দিল! ছিঃ আমার রাজ আমার সাথে এইভাবে কথা বললো!

না আমি পারবো না এই লোকটার সাথে সংসার করতে। আর না পারবো রাজকে ভুলতে। আমি এখন কি করবো! এতো অশান্তি যে আমার সহ্য হয় না। আচ্ছা আমিই যদি না থাকি তাহলে তো কোন সমস্যাই থাকবে না! রুমের মধ্যে ফলের ঝুড়িতে একটা ছুরি আছে। আমার চোখটা ওখানেই চলে গেলো। ছুরিটা বেশ ধারালো। ছুরিটা হাতে তুলে নিয়ে মুচকি হাসলাম। হাতে বসিয়ে টেনে দিতেই আমার সারা শরীরে বিদুৎ বয়ে গেলো। আমার মাথা ঘুরছে সারা শরীর অবশ হয়ে আসছে। চোখ বন্ধ করতেই আমি মুক্তি পেয়ে গেলাম।
.
.
.
.
চলবে… …
(ভুল ত্রুটি ক্ষমা করবেন)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here