আমার শহরে তোমার নিমন্ত্রন ৩ পর্ব ১

0
159

‘ভাইয়ের বন্ধু গুলো বয়ফ্রেন্ড হিসেবে সেই রকম ম্যাটেরিয়াল হয়!’

এমন একটা ভয়ংকর রকমের স্ট্যাটাস ফেসবুকে দেয়াটাই কাল হয়ে গেলো ফারিয়ার। ট্রুথ এন্ড ডেয়ার খেলতে গিয়ে রাতে এই স্ট্যাটাস দিয়ে ঘুমিয়েছিল সে। আর সকালে উঠে দেখে ইনবক্স ভর্তি মেসেজ। ফোনটা হাতে নিয়ে হতাশ চোখে সেদিকে চেয়ে আছে সে। তার কাজিন সম্প্রদায় অনেক বিস্তৃত। আর তাদের বন্ধু মহলের মেসেজে ইনবক্স ওভার লোড হয়ে যাচ্ছে। ভয়ে সে মেসেজ গুলো সিন করার সাহসটাও পাচ্ছে না। তনু কে হাজারটা গালি দিয়ে ফোনটার পাওয়ার বাটন অফ করে রেখে দিলো। তার জন্যই আজ এরকম কিছু হয়েছে। বিছানায় গোল হয়ে বসে ভাবছে এই সব বন্ধু জাতি যদি তার কাজিন সম্প্রদায়ের কাছে এই পোস্ট সম্পর্কে কিছু বলে তাহলে তো বিপদ হয়ে যাবে। আবারো ফোনটা হাতে নিয়ে ইনবক্সে চেক করলো। যারা যারা মেসেজ পাঠিয়েছে তাদের সবাইকে ব্লক করলো। এখন একটু হলেও টেনশনটা কমলো।

কিন্তু আসল বিপত্তি শুরু হল খানিকবাদেই। ফোনটা বিছানার উপরে রেখে ওয়াশ রুমে গেলো ফ্রেশ হতে। ফ্রেশ হয়ে বের হয়ে বাইরে গিয়ে টেবিলে বসে চেচামেচি শুরু করে দিলো
–মা খাবার দাও। আমাকে ভার্সিটি যেতে হবে। দেরি হয়ে যাচ্ছে।

খাবার খেয়ে রেডি হয়ে ভার্সিটির উদ্দেশ্যে বের হয়ে গেলো সে। এই ব্যস্ততার মাঝে পোস্টের কথা বেমালুম ভুলে গেলো ফারিয়া। আনমনে রাস্তায় হাঁটছে সে। ঠিক সেই সময় ফোনটা বেজে উঠলো। ব্যাগ থেকে ফোন বের করে দেখল তনু ফোন করেছে। ফোনটা ধরতেই অপাশ থেকে তনু বলল
–কি রে তুই কতদুর?

ফারিয়া শান্ত গলায় বলল
–কাছাকাছি চলে এসেছি।

–ঠিক আছে সোজা ক্যান্টিনে আসিস আমরা সবাই এখানেই আছি।

ফারিয়া ফোনটা কেটে দিতেই দেখল স্ক্রিনে আন রিড মেসেজের সাইন। মেসেজ অন করলো। খুব স্পষ্ট ভাবে বাংলায় লেখা

“এসব ইঁচড়ে পাকামি বন্ধ করো। তোমার এসব ইঁচড়ে পাকামির জন্য আমাকে আবার তাড়াতাড়ি সামনে আসতে না হয়। যদি এরকম কিছু হয় তাহলে কিন্তু তোমার বিপদ হয়ে যাবে।”

মেসেজটা পড়ে ভ্রু কুচকে তাকাল সেদিকে। কে হতে পারে? এরকম মেসেজ তাকে কেউ দিবে সেরকম তো কেউ নেই। নাম্বারটা ভালো করে দেখে নিলো সে। দূর দুরান্ত পর্যন্ত তার পরিচিত মনে হচ্ছে না। সারা মোবাইল ঘেঁটেও এরকম কোন নাম্বারের অস্তিত্ব খুজে পেলো না। ভাবল ভুল করে হয়তো চলে এসেছে। তাই আর মাথা ঘামাল না। একটু অন্যমনস্ক হয়ে আবার হাটা শুরু করলো। কিন্তু পাশ দিয়েই একটা কালো রঙের কার এমন ভাবে গেলো যেন আর কয়েক ইঞ্চির ব্যাবধানে তার গায়ে উঠে যাবে। ফারিয়া বেশ ভয় পেলো। কিছুদুর গিয়ে গাড়িটা থেমে গেলো। সে সেদিকে তাকিয়ে ভাবল যদি তার গায়ে উঠে যেতো তখন কি হতো। এর তো একটা ব্যবস্থা করতেই হবে। যা ভাবা সেই কাজ। আশে পাশে তাকিয়ে একটা ইটের টুকরো তুলে নিয়ে গাড়ি বরাবর মেরে দিলো। টুক করে গাড়ির পিছনের গ্লাসে লেগে চিড়চিড় করে ফাটল ধরল। সেটা দেখেই পৈশাচিক হাসি দিলো ফারিয়া। হাত ঝেড়ে সামনে পা বাড়াতেই দেখল গাড়ির পিছনের দরজা খুলে গেলো। সরু চোখে সেদিকে তাকাল সে। দুই জোড়া পা বেরিয়ে এলো। ব্লু জিন্স পরা। এখনও মুখটা দেখা যাচ্ছে না। ছেলে কি মেয়ে সেটা বোঝা মুশকিল। কারন আজকাল মুখ না দেখলে ছেলে মেয়ের পার্থক্য কোনভাবেই করা যায়না। সবার পোশাক যে একই রকম। তাই অপেক্ষা করতে লাগলো দেখার জন্য। তার অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে কাঙ্ক্ষিত মানুষটা বেরিয়ে এলো। লম্বা মতন একটা ছেলে। খুব একটা ফরসা নয় তবে দেখতে খারাপও নয়। চেহেরায় কেমন একটা মায়া আছে। নিজের মনের কথায় নিজেই হেসে ফেলল। ছেলেদের চেহারায় কি মায়া থাকে? হয়তো থাকে নাহলে এই ছেলেকে দেখে তার এমন মনে হল কেন? ফারিয়ার ভাবনার মাঝেই ছেলেটা এসে তার সামনে দাঁড়ালো। বেশ ভাব সেটা ভাবভঙ্গি দেখেই বোঝা যাচ্ছে। ফারিয়া একটুও ভয় পেলো না। সেও ভাব নিয়ে দাড়িয়ে গেলো। সব রকম উত্তর দিতে প্রস্তুত সে। ছেলেটা চোখ থেকে রোদ চশমাটা খুলে কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকলো। পা থেকে মাথা পর্যন্ত ভালো করে দেখে নিয়ে ভ্রু নাচিয়ে বলল
–সমস্যা কি ম্যাডাম?

ফারিয়া হাত গুঁজে দাড়িয়ে স্বাভাবিক ভাবেই বলল
–কিসের সমস্যা জানতে চাচ্ছেন?

–এভাবে ঢিল মেরে গাড়ির কাঁচ ভাঙ্গার কারণটা জানতে পারি কি?

ছেলেটি কথা শেষ করতেই ফারিয়া ঘাড় বেকিয়ে কাঁচের দিকে তাকাল। তারপর ছেলেটির দিকে তাকিয়ে বলল
–ওহ! আপনার গাড়িটা আর একটু হলেই আমার গায়ে উঠে যেতো। এভাবে বেপরোয়া গাড়ি চালানোর কারনে আমি আপনার গাড়ির কাঁচে ঢিল মেরেছি। আর আমি মনে করি আমি কোন অন্যায় করিনি।

ছেলেটি খুব শান্ত ভাবে বলল
–আমি তো এতদিন জানতাম রাস্তায় কে কিভাবে গাড়ি চালায় সেটা দেখা ট্রাফিক পুলিশের কাজ। কিন্তু এখানে তো অন্য কিছু দেখতে পাচ্ছি।

ফারিয়া সরু চোখে তাকাল। ঝাঁঝালো গলায় বলল
–ট্রাফিক পুলিশের গায়ে নিশ্চয় আপনি গাড়ি তুলে দেন নি। তাই এখন এখানে ওনার কোন কাজ নেই। আমার সাথে যা হয়েছে আমি তার প্রতিশোধ নিয়েছি মাত্র।

ছেলেটি ভ্রু কুচকে বলল
–এক্সকিউজ মি? ফর ইউর কাইন্ড ইনফরমেশন কারো গায়ের উপরে এরকম একটা চলন্ত কার উঠে গেলে সেই মানুষটা ঢিল মারার মতো কোন অবস্থাতেই থাকে না। তাই আমি সাজেস্ট করবো নিজের দিকে একটু ভালো করে খেয়াল রাখতে। বিশেষ করে মাথাটা ঠিক আছে কিনা। মাথা ঠিক থাকলে এরকম উলটা পাল্টা কথা কেউ বলে না।

–দেখুন আমার মাথা একদম ঠিক আছে। আর আমি কোন উলটা পাল্টা কথা বলছি না। আর একটু হলেই আপনার গাড়ি আমার উপরে উঠে যেতো। আর তখন তো আপনি পালিয়ে জেতেন। আমাকে হসপিটালে অব্দি নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবতেনই না। রাস্তায় এরকম অনেক কেস দেখেছি। আমার এসবের অভিজ্ঞতা ব্যাপক।

ফারিয়া ঝাঁঝালো গলায় বলতেই ছেলেটি বলল
–এটাকে অভিজ্ঞতা বলেনা এটাকে নন্সেন্স বলে। জাদের মাথার সব তার ছিঁড়া তারাই এভাবে ভাবে। যেখানে এক্সিডেন্টই হল না সেখানে হসপিটাল পর্যন্ত ভেবে বসে আছে। কি আজব মানুষ।

–আপনি কিন্তু আমাকে অপমান করে কথা বলছেন। আমি কিন্তু আর বেশিক্ষন এসব সহ্য করতে পারবো না। তখন উলটা পাল্টা কিছু করে ফেললে আমাকে কোন দোষ দিতে পারবেন না।

ফারিয়ার কথা শুনে ছেলেটি শব্দ করে হাসল। ফারিয়া সেদিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে। চকচকে দাত বের করে হাসছে। কি অদ্ভুত হাসি। এরকম করে মানুষ হাসতে পারে? ছেলেটি একটু মাথা ঝুকাতেই ফারিয়া সরে দাঁড়ালো। ছেলেটি হাসি থামিয়ে বলল
–বেশ অনেকটা সময় ধরে অপমান করছিলাম। এটা বুঝতে এতটা সময় নষ্ট হবে সেটা ধারনা ছিল না। যা ভেবেছিলাম তাই।

ফারিয়া সন্দিহান চোখে তাকিয়ে বলল
–কি ভেবেছিলেন?

–মাথামোটা। যার মাথায় বুদ্ধি কম কিন্তু নিজেকে সবার থেকে বুদ্ধিমান ভাবে। এসব বাংলার ছাত্রীদের জন্য। এই কথার মানে তারা খুব সহজেই বুঝতে পারে। কিন্তু ফিজিক্সের ছাত্রীরা এসব বুঝবে না।

বলেই রোদ চশমাটা চোখে দিয়ে পিছন ফিরে যেতে লাগলো। তখনই ফারিয়া আবার সন্দিহান চোখে তাকিয়ে বলল
–এই যে মিস্টার! আমি যে ফিজিক্সে পড়ি আপনি কিভাবে জানলেন?

ছেলেটি ঘুরে তাকাল। একটু এগিয়ে এসে ফারিয়ার দিকে হাত বাড়াল। ফারিয়া পিছিয়ে গেলো ভয়ে। প্রশ্নটা করে কোন অপরাধ করেনি তো। এভাবে হাত বাড়িয়ে কি করতে চাইছে ছেলেটি। ছেলেটি ফারিয়ার গলায় ঝুলানো আইডি কার্ডটা হাতে তুলে নিয়ে সেদিকে তাকিয়ে বলল
–ফারিয়া ফারহাসনা। ফিজিক্স ডিপার্টমেন্ট। থার্ড ইয়ার।

ফারিয়া সেদিকে তাকাল। ছেলেটি হাত সরিয়ে নিয়ে চলে গেলো। ফারিয়া ভ্রু কুচকে তাকিয়ে থাকলো ছেলেটির দিকে। ছেলেটির কথা বলার ধরনটা কেমন অদ্ভুত। মনে হল হয়তো সে তাকে অনেকদিন থেকে চিনে। ফারিয়া হেসে ফেলল। প্রথমবার দেখা একটা মানুষকে এতো পরিচিত ভাবার মতো কিছুই নেই। আবার আনমনে হাটা শুরু করলো। পাশ ফিরতেই এবার একটা বাইক এসে দাঁড়ালো। চমকে সেদিকে তাকাতেই বাইকের হেলমেট খুলে নিভ্র বলল
–তুই যেভাবে হাঁটছিস। সারাদিন লাগবে ভার্সিটিতে পৌছাতে। আর একটু পরেই ক্লাস শুরু হবে। বাইকে ওঠ।

ফারিয়া আশে পাশে তাকাল। নিভ্র তার খুব ভালো বন্ধু। কিন্তু তারপরেও এভাবে তার বাইকের পিছনে বসে গেলে পরিচিত কেউ দেখলে বিষয়টা ভালো দেখাবে না। কিন্তু এদিকে আবার সময়ও নেই। এদিক সেদিক তাকিয়ে মাথার ওড়নাটা লম্বা করে টেনে দিয়ে বাইকে উঠে বসলো। নিভ্র বাইক স্টার্ট দিয়ে সেই গাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলো। ঐ ছেলেটা গাড়িতে হেলানি দিয়ে সামনে তাকিয়ে আছে। চোখে রোদ চশমা পরে থাকার কারনে তার দৃষ্টি ঠিক কোথায় সেটা বোঝা গেলো না। কিন্তু উনি যে কারো অপেক্ষা করছেন সেটা বোঝা সম্ভব হল। ফারিয়া ওনাকে দেখেই মুখ ভেংচিয়ে অন্য দিকে তাকাল। তারপর নিভ্রকে কিছুক্ষন আগের কাহিনি শোনাতে শোনাতে ভার্সিটি পৌঁছে গেলো।

—————–
ফারিয়ার পরিক্ষা চলছে। পড়ালেখায় ভীষণ ব্যস্ত সে। পাগল না হলে কোন সুস্থ মানুষ স্বেচ্ছায় ফিজিক্স নিয়ে পড়তে চাইবে না। ভার্সিটিতে উঠলে নাকি পড়ালেখা কমে যায়। সারাদিন আড্ডা আর হই হুল্লোড় করেই সময় কেটে যায়। কিন্তু তার ক্ষেত্রে তো পুরই উলটা। পড়তে পড়তেই জীবন শেষ। প্রচণ্ড হতাশা নিয়ে টেবিল থেকে উঠে দাঁড়ালো। বাইরে গিয়ে রান্না ঘরের দরজার সামনে অসহায় কণ্ঠে বলল
–মা আমাকে এক কাপ কফি দাও না। মাথা ধরেছে প্রচণ্ড।

ফারিয়ার মা বললেন
–তুই টেবিলে বস। আমি দিচ্ছি। আর কিছু খাবি?

ফারিয়া না সুচক মাথা নেড়ে ডাইনিং টেবিলে বসে পড়ল। জগ থেকে পানি ঢেলে একটু মুখে দিতেই কলিং বেল বেজে উঠলো। ফারিয়ার মা বলল
–দেখতো ফারিয়া কে এসেছে?

ফারিয়া ক্লান্ত পায়ে এগিয়ে গেলো। দরজা খুলে বলল
–আরে অনিক ভাইয়া। ভেতরে আসো।

বলেই মাথা বাড়িয়ে পিছনে দেখেই আতকে উঠলো। চোখ বড় বড় হয়ে গেলো তার। শুকনো একটা ঢোক গিলে দাড়িয়ে থাকলো ফারিয়া।

#আমার_শহরে_তোমার_নিমন্ত্রন
সিজন-৩
লেখক-এ রহমান
সুচনা পর্ব

চলবে……?
(নতুন সিজন নতুন ভাবে। অনেক নতুন চরিত্র পাবেন। আগের সিজনের সাথে মিল নেই। একটু বড় করে জানাবেন চলবে কি না।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here