আলো আঁধারের খেলা পর্ব অন্তিম

0
181

#আলো_আঁধারের_খেলা
#Part_10
#লেখনীতে_Nusrat_Hossain

বিয়ে বাড়িতে হুলস্থুল কাণ্ড বেধে গেল।এই এলাকার-ই মেয়ে জাইমা বিয়েতে বাগড়া দিতে এসেছে তাও আবার পুলিশসুদ্ধ হাজির হয়েছে।বিয়ে বাড়িতে একটা অস্বস্তিকর পরিবেশ বিরাজ করছে। বর কনের গাঁ-য়ে হলুদ ছোয়ানোর আগেই এমন একটা পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে সেটা কেউ ভাবতেও পারেনি।বাড়ির সবার চেহারায় অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে।তাদের ছেলে মেয়ের বিয়েটা আদৌ হবে কিনা এই চিন্তায়।রেহানা বেগম মুখে কুলুপ এঁটে দাঁড়িয়ে আছেন।বেচারি কিছু বলার সুযোগ পাচ্ছেনা পুলিশদের ভয়ে।হাসান আহমেদ পাংশুটে মুখ নিয়ে অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা সারার দিকে তাকালো। মেয়ের চেহারা দেখে তিনি ঠাহর করতে পারলেননা মেয়ের মনের মধ্যে কি চলছে! মেয়েটা কত বোঝানোর চেষ্টা করেছিল এই বিয়েটা না দিতে কিন্তু উনি কানেও নেননি মেয়ের কথা ।বাড়ির উঠোনের এক কোণায় গুটিসুটি মেরে সারা,শিমু দাঁড়িয়ে আছে।সারা বাড়ির উঠোনটায় চারদিকে চোখ বুলাল।রাহি, রোহান কাউকে দেখতে পাচ্ছেনা।এরা কই?পুলিশ কি ওরাই পাঠিয়েছে নাকি জাইমা আপু নিজেই নিজের আক্রোশ মেটাতে পুলিশ নিয়ে এসেছে? তা ঠিক বোধগম্য হচ্ছেনা সারার। যাইহোক, পাড়াপ্রতিবেশিরা উঠোনে জটলা বেধে উৎসুক হয়ে তামাশা দেখছে খুব মজা নিচ্ছে।যারা বিয়েতে আমন্ত্রিত না তারাও ইতিমধ্যে সারাদের বাড়ির উঠোনটায় এসে জটলা বেধে দাঁড়িয়েছে।

‘কুত্তা তুই কি ভাবছিলি আমার জীবন তুই নরক বানায়া দিয়া, তুই সুখে শান্তিতে ঘর করবি আর এটা আমি তাকায়া তাকায়া দেখুম? তোর আশায় সেগুরে বালি ‘ বলেই চটাস চটাস করে জুতোপেটা করতে লাগলো জাইমা জায়িফকে।

জায়িফ জাইমার হাত চেঁপে ধরে বলল, ‘আমার বিয়েতে বাগড়া দিলি কোন সাহসে ? যা এখান থেকে বলছি নষ্ট মাইয়া কোথাকার.. নইলে খুব খারাপ হবে।’

জাইমা দাঁতে দাঁত চেঁপে ফোঁসফোঁস করতে করতে বলল, ‘খারাপ তোর হইব আমারনা।গত পাঁচমাসে একটা দিনও আমি শান্তিতে নিশ্বাস নিতে পারেনি, ঘুমাইতে পারিনাই একটা রাতও।আর তুই আমার ঘুম নষ্ট কইরা নিজে বিয়া কইরা সুখের সংসারা পাতবি? আমি জাইমা তা হইতে দিমুনা। আজকে থেকে তুইও ঘুমাইতে পারবিনা শান্তিতে। বলেই ভারাক্রান্তভাবে হাসলো জাইমা।

‘ম্যাম একে আমাদের হাতে ছেড়ে দিন। একে আমরা দেখবো।’ বলেই পুলিশ অফিসার জায়িফের গাঢ় শক্ত করে ধরে রক্তাক্ত চোখে তেজীগলায় বলল,

‘প্রতিদিন কলজের বাইরে বসে ছুটির সময় মেয়েদের উত্তক্ত করা, আবার মেয়েদের বোকা বানিয়ে তাদের সাথে সম্পর্কে লিপ্ত হওয়া, ভোগ করা শেষে ছেড়ে দেওয়া এসবই তো করে বেরাসনা তুই?আগেও অনেক মেয়ে কমপ্লেইন করেছিল তোর নামে কিন্তু আমরা ব্যাপারটা পাত্তা দিইনি। আগেই ঐ মেয়েগুলোর কথা শুনে তোকে উচিত শিক্ষা দেওয়া উচিৎ ছিল আমাদের কিন্ত…।দোষটা আমাদেরও। তবে আর না। তোর গুটিবাজি করা তাইনা! চল। এবার থেকে চার দেয়ালের মাঝে থেকে গুটি খেলা কয় প্রকার ও কি কি তা হারে হারে টের পাবি।’ বলেই তিনজন পুলিশ জায়িফকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেল।জায়িফের বাবা জাহাঙ্গীর আহমেদ চেয়েও পারলেননা ছেলেকে রক্ষা করতে। জায়িফের মা শিউলি রেহেনা বেগমকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।

এমন সময় জাইমার বাবা আরহাম রহমান বাড়ির উঠোনে এসে মেয়েকে সেখান থেকে টেনে নিয়ে যেতে যেতে বললেন, তোরে না বলছি বাড়ি থেকে বের না হতে, তুই বাড়ি থেকে বের হইছিস কেন? আমার মান সম্মান আর বাকি রাখলিনা কিছু।’

জাইমা কান্নামিশ্রিত গলায় চিৎকার করে বলল, আব্বু ছাড়ো আমায়। ও আমার লাইফটা নষ্ট করে দিয়ে এখন সুখে শান্তিতে সংসার করব এটা আমি কিভাবে সহ্য করব আব্বু?’ তুমিই বলো?বলেই গুমরে কেঁদে উঠল জাইমা।

আরহাম রহমান মেয়ের কান্না দেখে নিজেও কেঁদে দিলেন।মেয়েটা যে কতটা কষ্ট পেয়েছে তার সাক্ষিতো উনি নিজেই।জায়িফের কাছ থেকে ধোকা খেয়ে পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিল মেয়েটা। কতবার যে আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেছিল তার হিসেব নেই।চোখের সামনে মেয়েটাকে ধুকে ধুকে মরতে দেখেছে।ঘুমের মধ্যে চিৎকার করে উঠত। মেয়েটার কষ্টে বাড়িটা যেন একটা নরকে পরিনত হয়েগিয়েছিল।তিনি চোখের জল মুছে বললেন,

‘আজকে থেকে তুইও শান্তিতে ঘুমাবি মা।’

‘আব্বু আমার হাতটা একটু ছাড়ো। ‘ আরহাম রহমান হাত ছেড়ে দিতেই জাইমা গুটিগুটি পায়ে সারার সামনে এসে দাঁড়ালো।বলল,

‘তুই জানতিস না জানোয়ারটা আমায় শেষ করে দিয়েছে। তারপরও ওকে বিয়ে করতে যাচ্ছিলি?’ জাইমা কথাটা জিজ্ঞেস করে সারার দিকে টলমল চোখে তাকাল।

সারা মাথা নাড়িয়ে বলল, ‘আমি চাইনি বিয়ে করতে। ‘

‘তোর বাপ, মা জানতোনা?’ কথাটা বলেই জাইমা এবার সারার বাবা, মাসহ বাড়ির সবার দিকে চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে তাকালো।জাইমার তাকানোতে সবাই অপ্রস্তুত হয়ে গেল।হাসান আহমেদ, সুরাইয়া খাতুন মাথা নিচু করে ফেললেন।

জাইমা সবার দিকে একপলক তাকিয়ে গুটিগুটি পায়ে আবার বাবার কাছে ফিরে এল। বাবার হাত ধরে বাড়ির উঠোন বেদ করে চলে গেল।

জাইমা চলে যাওয়ার পর পাড়া প্রতিবেশীরাও একে একে চলে গেল।তবে কেউ কথা না শুনিয়ে যায়নি জায়িফের বাবা, মাকে। ছেলে মানুষ করতে পারেনি,ফাজিল ছেলের জন্য কত মেয়ের লাইফ নষ্ট হয়ে গেল, এসব ছেলেদের জন্য সমাজ নষ্ট হয়। কেউ কেউ আবার সারার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল বেঁচে গেছিসরে সারা এই বজ্জাত ছেলের হাত থেকে।যে যেভাবে পারলো অপমান করে চলে গেল।

অপমানে মুখ থমথমে হয়ে গেছে সবার।এবার রেহানা বেগমও সুযোগ বুঝে পল্টি মারলেন।আচ্ছামত ধুয়ে দিলেন মেয়ে আর মেয়ের জামাইকে।বললেন, ছেড়ারে মানুষ করতে না পারলে জন্ম দিলি কেন? আদর দিতে দিতে ছেড়ারে কুলাঙ্গার বানায় ফালাইছিস তোরা।যে বাইত(বাড়ি) কোনোদিন পুলিশ আসেনাই হেই বাইত আজ তোদের কুলাঙ্গার ছেড়ার জন্যি পুলিশ আইল…আমার বাড়ির মান সম্মান সব শেষ কইরা দিল তোদের ছেড়ায় ।আইজ থেকে যানি তোদের আর না দেখি আমার বাইত।বাইর হ তোরা..

সারা অবাক নয়নে তাকিয়ে আছে তার পল্টিবাজ দাদির দিকে।দুইদিন আগেও এই দাদি তাকে কত গালাগাল করল জায়িফের সাথে বিয়েতে রাজি হচ্ছিলনা বলে আর এখন! সারা দাদির থেকে দৃষ্টি সরিয়ে বাবার দিকে তাকাল।সারা দেখল বাবাও অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে নিজের মায়ের দিকে।দেখা গেল বাড়ির প্রত্যেকেই হতভম্ব, রেহানা বেগমের এত দ্রুত পল্টি নেওয়ার কারণে।

শিমু সারার কানে ফিসফিস করে বলল,
বজ্জাত বুড়ি কোথাকার! কিভাবে পল্টি নিল দেখছো? দুইদিন আগেও তোমায় যা তা বলল।আর এখন জায়িফরে গালাগাল করে ভালো সাজছে বজ্জাত বুড়ি কোথাকার!

মায়ের অপমানে বুক ভার হয়ে আসলো শিউলির। শিউলি স্বামীসহ, গাঁ-য়ে হলুদে আসা স্বামীর বাড়ির আত্মীয় স্বজনদেরকে নিয়ে বাড়ি থেকে চলে গেল ।

রেহানা বেগম এবার সবাইকে আদেশের স্বরে বললেন,
‘যা হইসে, হইসে অনেক রাইত হইসে এহন সবাই ঘুমাইতে যাও।’

সবাই যে যার রুমে চলে গেল।সারা রুমে এসে একবার চাইছিল রাহিকে কল করতে।অনেক রাত হয়ে গেছে এখন ডিস্টার্ব করা ঠিক হবেনা ভেবে আর করলোনা কল। বিয়েতো ভেঙেই গেছে।পরইবারের সবাই নিজেদের ভুলগুলো বুঝতে পেরেছে। জায়িফের প্রতি যে অন্ধভালোবাসাটা ছিল সেটাও সবার কেঁটে গেছে। এখন আর টেনশন কি? আজকে রাতে শান্তিতে ঘুম হবে ভেবে সারা বিছানায় গাঁ এলিয়ে দিল।
__________

আমাদের তেমন কিছু করতে হয়নি। আমরা শুধু আগুনে ঘি ডেলে দিয়েছি আর বাকি কাজ জাইমা-ই করেছে।সব ক্রেডিট জাইমার।কথাগুলো বলে রোহান এবার একটা দম ছেড়ে বলল বুজলে, মেয়েটা মনে প্রাণে চাইত জায়িফের শাস্তি হোক।
যাইহোক, দুইদিন পর আমরা সিলেট ফিরছি।আমি ট্রেনের টিকেট কেঁটে রাখবো বাই বলে রোহান ফোনটা রেখে দিল।
সকাল সকার সারার সাথে কথা বলে মনটা কেমন ফুরফুরে হয়ে গেল রোহানের।

দুইদিন পর,

হাসান আহমেদের মনটা কেমন করছে।মেয়ে আজ ফিরে যাবে সিলেটে।উনার সারাকে আটাকাতে ইচ্ছা করছে।এতদূর যাওয়ার দরকার কি?দরকার হলে এখানেই কলেজে ভর্তি করিয়ে দিবে।পরোক্ষনে আবার মায়ের কথা মনে আসতেই সেই ভাবনা পালিয়ে গেল।মায়ের মন আবার ক্ষনে ক্ষনে পল্টি খায়। যদি আবার সারার পড়াশোনা করায় বাধা দেয়, তাহলে মেয়েটার সব আশাই ভেঙে যাবে।এসব ভেবেই তিনি আর সারাকে সিলেট যেতে বাধা দিলেননা।তবে সারাকে বারবার বলে দিলেন, নিজের খেয়াল রাখতে কোনো সমস্যা হলে বাসায় ফোন করে জানাতে। আর প্রতি মাসে সারার জন্য বরাদ্দ টাকা পাঠিয়ে দিবে বলেছে।

হাসান আহমেদ আর তার বড় ভাই তারেক আহমেদ স্টেশনে পৌঁছে দিয়ে গেল সারাকে।সারা বাবা, আর জেঠাকে বিদায় দিয়ে ট্রেনের ভেতরে ঢুকল।ট্রেনের ভেতরে ঢুকতেই রোহান সারার হাত ধরে কেবিনে নিয়ে গেল।রোহান সিটে বসে বলল,
‘তোমার বাবা আসছিল তোমাকে পৌঁছে দিতে তাইনা?’

সারা অস্ফুটস্বরে বলল,
‘হুম।’

সারা রোহানের পাশের সিটে বসল।

রোহান সারার বিষন্নভরা চেহারার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,

‘মন খারাপ?’

‘তেমন কিছুনা। ‘ সারা বলল।
সত্যি কথা বলতে সারার নিজের পরিবারকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছেনা।তবে তানিরা তার জন্য এত কষ্ট করে তাকে নিজেদের টাকা দিয়ে ভর্তি করিয়ে দিল,তার জন্য তিনমাসে অনেক টাকা খরচ করেছে মেয়েগুলো। সেটারোতো একটা মূল্য আছে। দুঃখের সময় যেই মেয়েগুলো তার পাশে ছিল তাদেরকে কোনোদিনও কষ্ট দিতে পারবেনা সারা।

ট্রেন চলতে শুরু করল।ট্রেন চলা শুরু হতেই সারার মনে হলো তার জীবনেরও আবার নতুনভাবে সূচনা হলো।আবার শুরু হলো নতুন করে পথচলা…

রোহান সারার হাতটা শক্ত করে চেঁপে ধরল।সারা আড়চোখে রোহানের দিকে তাকালো। রোহান তার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট টিপে হাঁসছে।রোহানকে দেখে মনে হচ্ছে, সে এখন পৃথিবীর সবথেকে সুখী মানুষ। রোহানের এত আনন্দ কেন হচ্ছে? সেটা সারার জানা নেই। সে রোহানের থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে সিটে হেলান দিয়ে চোখজোড়া বুজে নিয়ে রোহানের হাসির প্রত্যুত্তরে সেও মলিন হাসলো।

সমাপ্ত

(প্রথম খন্ড শেষ।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here