আলো আঁধারের খেলা পর্ব ১

0
177

বিয়ে করবেনা বলে ভোরের আলো ফুঁটতেই নিজের বাড়ি ছেড়ে পালালো সারা।চারদিন পর তার বিয়ে।আর যাইহোক, সে তার ঐ অসভ্য, মেয়েবাজ ফুপাতো ভাইকে কোনোদিনও বিয়ে করতে পারবেনা। জায়িফ নামের অসভ্য ফুপাতো ভাইকে বিয়ে করার চেয়ে মৃত্যুকে বরন করা শ্রেয় মনে হয়েছিল সারার।
কিন্তু সে কেন মরবে? দরকার হলে লড়াই করে বাঁচবে। তারপরও ঐ অসভ্যটাকে বিয়ে করবেনা। তাইতো ভোরের আলো কিছুটা স্পষ্ট হতেই নিজের বাড়ি,নিজের পরিবার সবার মায়া ত্যাগ করে পালালো সে। জায়িফ নামের ছেলেটার হাতাহাতি করার স্বভাব আছে। বড় হোক বা ছোট হোক কোনো মেয়ে যদি ওর পাশে বসে তাহলে সুযোগ বুঝে ও সেই মেয়ে বা মহিলার শরীরে বিভিন্নভাবে স্পর্শ করার চেষ্টা করে। একবার তো ঘুমের মধ্যে তার শরীরেও হাত দেওয়ার চেষ্টা করেছিল।বাড়ির সবাই সেদিন নানুর বাড়ি দাওয়াত খেতে গিয়েছিল। সে যায়নি ঘুমিয়েছিল নিজের রুমে। তাকে একা পেয়ে জায়িফ শয়তান টা সেই সুযোগ নেয়। ভাগ্যিস সে তখন সজাগ হয়ে গিয়েছিল। নাহলে কি হতো! ভাবতেই সারার শরীরের লোম দাঁড়িয়ে যায়।এখানেই শেষ না, জায়িফ অনেকবার বিভিন্নভাবে তার গাঁ-য়ে স্পর্শ করার চেষ্টা করত। তখন সারার গাঁ ঘিনঘিন করত। কাউকে কিছু বলতেও পারতোনা লজ্জায়। জায়িফ উচ্চবিত্ত পরিবারের ছেলে।আর সে মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে।তার বাড়ির অনেকেই জায়িফের চারিত্র সম্পর্কে অবগত ।কিন্তু কেউ বিষয়টাকে আমলে নেয়নি।কারণ সবার ধারণা, ছেলে মানুষ তাই এমন একটু আধটু করবেই।উল্টো ওকে মাথায় তুলে রাখত সবাই।বিশেষ করে সারার দাদু রেহানা বেগম।সারার দাদুর কথামতোই তার বাবা হাসান আহমেদ দীর্ঘ তিন বছর পর দেশে ফিরে এই জায়িফের সাথেই তার বিয়ে ঠিক করে। সে কত বোঝানোর চেষ্টা করেছিল বাবাকে।এমনকি লজ্জা শরম ভুলে জায়িফের সব কুকীর্তির কথাও বলতে হয়ে ছিল বাবাকে। কিন্তু তার বাবা এক কথার মানুষ। উল্টো বলে , ছেলে মানুষ একটু আধটু ভুল করেই,বিয়ের পর সব ঠিক হয়ে যাবে। তখন বাবাকে চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছিল, যে বাপ নিজের মেয়ের মানহানির কথা শুনেও সেই ক্যারেক্টারলেস ছেলের কাছে বিয়ে দিতে চায়, সে কোনো বাপ না। মনের কথা মনেই রয়ে গেল সারার। কিছুই বলতে পারেনি বাবাকে।কয়েকটা দিন যখন বাবাকে বুঝাতে ব্যর্থ হলো সারা। তখন বাড়ি ছেড়ে পালানো ছাড়া আর কোনো উপায় রইলনা।ভাবতে ভাবতে সারার চোখজোড়া দিয়ে একফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল।আপন মানুষগুলো কেউ বুজতে চাইলনা তাকে। ভোরের আলো এখন অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে গেছে।ধীরে ধীরে রাস্তায় লোকজনের সমাগমও বাড়ছে। কেউ কেউ সারার দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে।সারা নিজের পড়নের বোরখাটা ঠিকঠাক করে, সাথে আনা ব্যাগটা শক্ত করে চেঁপে আবারো নিঁচু হয়ে হাঁটতে শুরু করলো। এই এলাকার মোটামুটি সবাই সারাকে চিনে। চিনে ফেললে সর্বনাশ হয়ে যাবে।তাই খুব দ্রুত হেঁটে মেইন রোডে এসে পৌঁছালো।মেইন রোডে আসতেই ওর-ই মতো বোরখা পরিহিতা একটা মেয়েকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলো।মেয়েটা আর কেউ না ওর-ই বেস্ট ফ্রেন্ড রাহি । রাহিকে দেখতেই সারার ঠোঁটে হাঁসি ফুঁটে উঠল।সারা রাহির সামনে গিয়ে দাঁড়ালে রাহি ধমকে বলল,
‘এত তাড়াতাড়ি আসলি কেন? দুপুরবেলা আসবি তো!’ রাহির চেহারায় রাগ স্পষ্ট।

সারা চেহারা মলিন করে বলল,
‘ আহ! রাগ করিস না। হেঁটে আসছি তো তাই একটু দেরি হল। ‘

বান্ধবির মলিন চেহারাটা দেখে রাহির রাগ পানি হয়ে গেল। সে বলল,
‘আর দেরি করা যাবেনা। এখনি তোকে বাসে উঠতে হবে। আর শোন ফুপিকে আমি বলে দিয়েছি।কোনো সমস্যা হবেনা তোর।’

সারা মাথা ঝুলিয়ে হ্যাঁ বোঝালো।রাহি সারাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
‘সাবধানে যাস।আর মনে সাহস রাখবি সব সময়।একদম সাহস হারাবিনা।মনে রাখবি পরিস্থিতি সব সময় এক রকম থাকেনা। পরিস্থিতির সাথে সব সময় মানিয়ে চলবি। পারবিনা? ‘

সারা মাথাটা ঝুলিয়ে বলল, ‘পারবো। ‘

রাহি সারাকে টিফিনবক্স , পানি আর একটা বাটন মোবাইল হাতে দিয়ে বাসে উঠিয়ে দিল। সারা বাসে উঠে সিটে বসতেই বাসটা চলতে শুরু করলো। আর পিছে ফিরে তাকানোর সুযোগ পেলোনা সে।সারার মনটা হুঁ হুঁ করে কাঁদছে। ভবিষ্যতে কপালে কি আছে কে জানে! সারা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বাসের সিটে মাথাটা এলিয়ে দিল। কালকে সারারাত বাড়ি ছেড়ে পালানোর চিন্তায় ঘুম হয়নি। এখন খুব ঘুম পাচ্ছে। সিটে মাথাটা এলিয়ে দিতেই সারার চোখজোড়া গভীর ঘুমে ঢোলে পরে।

বাসের তীব্র ঝাকুনিতে সারা তড়াক করে জেগে উঠলো। সে ভরকে গিয়ে বোকার মতো আশপাশ তাকাতে লাগলো। বাস থামিয়ে দেওয়া হয়েছে। অনেকেই বাস থেকে নেমে পরছে। সে খুব দ্রুত ব্যাগ থেকে রাহির দেওয়া ঠিকানাটা বের করল। ঠিকানা অনুযায়ী তাকে এখানেই নামতে হবে।সে বাসের ভাড়াটা মিটিয়ে বাস থেকে নেমে পরলো।

কিছুদূর হেঁটে রেলওয়ে স্টেশনে আসলো। বাস থেকে নামা অনেক যাত্রী ট্রেনে উঠছে।তাদের অনুসরণ করে সারাও ট্রেনে উঠে সিট খুঁজে নিয়ে নিজের সিটে গিয়ে বসল।তার সিট জানালার পাশে পরেনি।একটু খারাপ লাগলো তার।ভেবেছিল জানালার পাশের সিটে বসে প্রকৃতি দেখতে দেখতে যাবে।কিন্তু তা আর হলোনা। জানালার পাশে শ্যাম বর্নের পঁচিশ -ছাব্বিশ বছরের একটা ছেলে বসে আছে। তার অপর পাশে দুইজন ছেলে, মেয়ে বসেছে। সম্ভবত তারা হাজবেন্ড আর ওয়াইফ।

কিছু সময় পর, একটা শব্দ করে ট্রেনটা ছেড়ে দিল। ট্রেন চলছে নিজ গতিতে।এদিকে সারার সময়টাও কাঁটছেনা। এই দীর্ঘসময়ের জার্নিটা কিভাবে যে কাঁটাবে এটা ভাবতেই সারার কান্না পেয়ে যাচ্ছে।সামনের সিটে বসা ছেলে,মেয়ে দুটি নিজেদের মত জমিয়ে গল্প করছে।তাদের দিন দুনিয়ার হুশ নেই। সারা আড়চোখে তাকালো তার পাশের সিটে বসা ছেলেটার দিকে। ছেলেটা জানালার বাইরে একমনে তাকিয়ে আছে। হয়তো প্রকৃতি উপভোগ করছে।সারার আর কি করার!সে নিজের পরিবারের মানুষগুলোর কথা ভেবে কিছু সময় কাঁটানোর চেষ্টা করলো। আচ্ছা তার পরিবারের মানুষগুলো এখন তাকে না পেয়ে কি করছে? বাবা নিশ্চিত খুঁজতে বেরিয়ে গেছে তাকে। আর তার সহজ সরল মা টা নিশ্চয়ই কান্না করছে।ইশশশ মায়ের কথা ভাবতেই তার ভেতরটা ধক করে উঠলো।চোখজোড়া ভিজে আসলো সারার।এতক্ষণে জায়িফ শয়তানটার কানে নিশ্চয়ই তার বাড়ি ছেড়ে পালানোর খবরটা চলে গেছে।বিয়ে ভেঙে যাওয়ার দুঃখে হয়তো জায়িফ শয়তানটা নিজের মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে।এটা কল্পনা করতেই সারা ফিঁক করে হেঁসে দিল।তার হাঁসির শব্দ শুনে পাশের সিটে বসা ছেলেটা তার দিকে ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিত তাকিয়ে আছে।সারা অস্ফুটস্বরে বলল,

‘ সর‍্যি।’

ছেলেটা হাল্কা মাথাটা ঝুলিয়ে আবার জানালার বাইরে তাকালো।সারাও আবার ভাবতে শুরু করল তার পরিবারের কথা।

ট্রেন একটা ঝাকি দিয়ে থামলো। কিছু সময়ের বিরতি এখন।ট্রেনে থাকা অনেকেই চা টা পান করছে। আবার অনেকেই খাবার খাচ্ছে।সারারও ক্ষুধায় পেট টা চো চো করছে।রাহির দেওয়া টিফিনবক্সটা ব্যাগ থেকে বের করে খেতে লাগলো। আড়চোখে তাকালো তার পাশে বসা ছেলেটার দিকে। আশ্চর্যজনকভাবে ছেলেটা তার দিকেই তাকিয়ে ছিল।সে তাকাতেই ছেলেটা ভরকে গিয়ে জানালার বাইরে তাকালো।সারার অবেচেতন মন বলল ছেলেটা নিশ্চয়ই ক্ষুধার্ত। আচ্ছা তার কি ছেলেটাকে খাবার সেধে দেখা উচিত?এখনো চারটা সেন্ডউইচ, পাঁচটা পরোটাসহ বাজি আছে। যা ভাবা তাই কাজ। সারা আর এক মুহূর্ত দেরি না করে ছেলেটাকে খাবার সাধল।কিন্তু ছেলেটা না করে দিল।তবে সে-ও হার মানার পাত্রী নয়।ছেলেটার চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে ছেলেটা খুব ক্ষুধার্ত। ছেলেটা কিছু বলতে নিলেই সারা বলল,

‘আপনি নিশ্চয়ই বাড়ি থেকে খাবার আনতে ভুলে গেছেন? দেখুন পেটে ক্ষুধা রেখে জার্নি করাটা ঠিক না। তা-ও আবার লং জার্নি। আপনি তো অসুস্থ হয়ে পরবেন।খাবারটা নিন না প্লিজ।’ অবশেষে সারার জোড়াজুড়িতে ছেলেটা সারার দিকে শান্ত দৃষ্টিতে একবার তাকিয়ে একটা সেন্ডউইচ হাতে নিল।সারার ঠোঁটে এক চিলতে হাঁসি ফুঁটে উঠল।বিপদে আপদে মানুষকে সাহায্য করতে পারলে সারার কেন যেনো খুব আনন্দ হয়।ভালো লাগে খুব মানুষকে সাহায্য করতে সারার।

বিরতি নিয়ে ট্রেন আবার ছুটল। এর মধ্যে ছেলেটার সাথে আর কোনো কথা হয়নি। সারাও আর আগবাড়িয়ে কথা বলতে যায়নি। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে নামার পথে।অবশেষে সন্ধ্যা সাতটায় ট্রেন এসে থামলো সিলেটে।

জোড়ে জোড়ে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। বৃষ্টি আসবে মনে হয়।সারা প্ল্যাটফর্মে ঘুটিসুটি হয়ে বসে আছে।রাহির কথা অনুযায়ী ওর ফুপির বাড়ি থেকে
ওকে নিতে আসার কথা ছিল।কিন্তু সাতটা চল্লিশ বাজে এখনো কেউ আসেনি।আর মনে হয় কেউ আসবেওনা। সারার অবেচেতন মন এটাই বলল। কাগজে লেখা ঠিকানাটায় একবার চোখ বুলিয়ে রাহির ফুপির বাড়ির উদ্দেশ্যে নিজেই রওনা হল।ইতিমধ্যে ঝড় শুরু হয়ে গেছে।এত ঝড়ের মধ্যেই সারা ব্যাগটা শক্ত করে চেঁপে ধরে রাস্তার কিণার দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে।সারার মনে হচ্ছে কখন যেন এই ঝড়টা তাকেও উড়িয়ে নিয়ে যায়।

(নিয়মিত চমৎকার গল্প পড়তে হলে গল্পের শহর চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করে রাখুন যাতে পোস্ট হওয়ার সাথে সাথেই আপনি নোটিফিকেশন পান।গল্পের শহর আর গল্পের ঠিকানা ওয়েবসাইটের গল্প অন্য কোথাও শেয়ার দেওয়া হবে না গল্পের শহর চ্যানেল ছাড়া)

চলবে,
@Nusrat Hossain

#আলো_আঁধারের_খেলা
#Part_1
#লেখনীতে_Nusrat_Hossain

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here