আলো আঁধারের খেলা পর্ব ২

0
159

নিয়মিত চমৎকার গল্প পড়তে হলে গল্পের শহর চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করে রাখুন যাতে পোস্ট হওয়ার সাথে সাথেই আপনি নোটিফিকেশন পান।গল্পের শহর আর গল্পের ঠিকানা ওয়েবসাইটের গল্প অন্য কোথাও শেয়ার দেওয়া হবে না গল্পের শহর চ্যানেল ছাড়া)🌺🌺

#আলো_আঁধারের_খেলা
#Part_2
#লেখনীতে_Nusrat_Hossain

কিছুক্ষণ হলো ঝড় থেমেছে।তীব্র ঝড়ের শেষে এখন ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে।চুবচুবে গাঁ নিয়ে সারা দাঁড়িয়ে আছে তার অতি কাঙ্ক্ষিত ঠিকানায়।রাহির ফুপির বাড়ি পৌঁছাতে তাকে অনেক বেগ পেতে হয়েছে। বিশ মিনিটের পথ সে একঘন্টা লাগিয়ে এসেছে।এই সতেরো বছরের জীবনে এত কষ্ট কোনোদিন পোহাতে হয়নি তাকে।কমোর ব্যথায় টনটন করছে,পাজোড়া ঝিম ধরে গেছে, চোখজোড়া ঢুলুঢুলু করছে।থরথর করে কাঁপছে সারার সমস্ত শরীর।খুবই অসুস্থবোধ করছে সারা।হাঁটার শক্তিটাও পাচ্ছেনা।গাঁ-এর সবটুকু জোড় দিয়ে কোনোমতে পাজোড়া সামনে এগোচ্ছে।মাঝারি সাইজের মেইনগেইটটা পেরিয়ে সারা বাড়িটার সামনে যেতে লাগলো। বাড়ির বাইরে টিমটিমে আলো জ্বলছে। সেই আলোতে সারা গুটিগুটি পায়ে বাড়ির সামনে গিয়ে বাড়ির গেইটের কলিংবেলটা বাজালো। কেউ গেইট খুললোনা দেখে সারা আরো দুই তিনবার কলিংবেলটা বাজালো।এবার এক মধ্য বয়স্ক মাহিলা এসে গেইট খুলে দিল।সারা অবচেতন মন বলল, এটা নিশ্চয়ই রাহির ফুপি।সারা অস্ফুটস্বরে ভদ্রমহিলাকে সালাম জানালো।কিন্তু ভদ্র মহিলা তার সালামের জবাব না দিয়ে তার দিকে কেমন অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।যেনো তিনি জানতেন-ই না যে, ও এই বাড়িতে আসবে।ঘোলা দৃষ্টিজোড়া দিয়ে সারা ভদ্রমহিলার চেহারায় স্পষ্ট বিরক্তিভাব দেখতে পেল।রাহি তো সব জানিয়েছেই ওর ফুপিকে তাহলে উনার মুখের এমন বিরক্তিভাব কেন?রাহির ফুপির বিরক্তিভাবের কারণ সারার বোধগম্য হলোনা।

রাহির ফুপি সারার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
‘কে তুমি?’

সারা কথাটা শুনে খানিকটা ভরকে গেল।এবার সারার সন্দেহ হচ্ছে, সে কোনো ভুল বাড়িতে এসে পড়েনি তো আবার! কিন্তু কাগজে তো এই ঠিকানাটাই লেখা। সে ইতস্ততভাবে বলল,
‘রাহি কিছু বলেনি আপনাকে। ‘

রাহির ফুপি চোখজোড়া কুঁচকে বলল,
‘ওহ্ তাহলে তুমি সেই মেই।যার কথা রাহি বলেছিল আমাকে। ‘

সারা মাথা ঝুলিয়ে হ্যাঁ বলল।

‘এসো ভেতরে এসো। আমি ভেবেছিলাম তুমি হয়তো আসবেনা তাই গুরুত্ব দেইনি বিষয়টাকে।’
সারা হু হা কিছুই বলল না। তাকিয়ে রইল রাহির ফুপির দিকে।তার সাথে স্বাভাবিকভাবে কথা বললেও উনার চেহারায় বিরক্তিভাব টা এখনো রয়েছে।সারা যা বুঝল রাহির ফুপি মানুষটা একজন অহংকার টাইপের মহিলা।তার ভাবনার মাঝেই রাহির ফুপি গম্ভীর গলায় বলে উঠে,

‘বৃষ্টিতে ভিজে গেছো দেখি।রুমে গিয়ে ড্রেস চেঞ্জ করে নাও।’ বলেই উনি একটা মেইডকে ডেকে বলল সারাকে নিচতলার একটা রুম দেখিয়ে দিতে।সারা মেইডটাকে অনুসরণ করে রুমে যেতে লাগলো। মেইড রুম দেখিয়ে চলে গেলে সারা দরজা খুলে রুমে ঢুকল।ছোটখাটো রুমটায় একটা বেড আর ওয়ারড্রব ব্যতিত আর কিছু নেই।রুমের সাথে লাগোয়া একটা ছোটখাটো ওয়াশরুম আছে।সারা আর দেরি না করে ব্যাগ থেকে একসেট থ্রিপিছ বের করে নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে পরল।ভেজা চুবচুবে জামাটা চেঞ্জ করার ফলে এখন একটু স্বস্তিবোধ করছে সারা।এই মুহূর্তে ঘুমের খুব প্রয়োজনবোধ করল সে। এক ঘনটার মত বৃষ্টিতে ভেজার কারণে গাঁ টা কেমন ম্যাচম্যাচ করছে।ঘুমোতে পারলে হয়ত একটু সুস্থবোধ করবে।তাই সে আর কিছু না ভেবে বিছানায় গাঁ-টা এলিয়ে দিল।বিছানায় গাঁ এলিয়ে দিতেই সারা গভীর ঘুমে ঢোলে পরে।

কালো আঁধার কাঁটিয়ে, স্বর্ণাভ সূর্যকিরণ তার সমস্ত আলো পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে দিয়েছে।পাখির কলকাকলির শব্দ জানান দিচ্ছে রাত গড়িয়ে সকাল হয়েছে।
গাঁয়ে কারোর মৃদু ধাক্কানোতে সারা পিটপিট করে চোখ মেলে তাকালো সারা।জ্বরে গাঁ পুরে যাচ্ছে সারার।চোখজোড়া দিয়ে নোনাপানি গড়িয়ে পরছে।

মেইডটা সারার গাঁয়ে আলতো ধাক্কা দিয়ে বলল,
‘একটু কষ্ট করে উঠে কিছু খেয়ে ওষুধ টা খেয়ে নাও।নাহলে তো জ্বর ছাড়বেনা।’

মেইডের কোনো কথাই সারার কান দিয়ে যাচ্ছেনা।সে বেহুশের মতো পিটপিট করে তাকিয়ে আছে মেইডের দিকে।উঠে বসার জন্য এক ফোঁটা শক্তিও তার শরীরে অবশিষ্ট নেই।মেইডটা অনেক চেষ্টা করেও যখন সারাকে উঠে বসাতে পারলোনা। শেষমেষ হারমেনে সারার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।মেইড চলে যেতেই সারা তার দুর্বল দৃষ্টিজোড়া বুজে রইল।মায়ের কথা মনে পরছে খুব।মাকে ডেকে বলতে ইচ্ছে করছে, আমার মাথায় একটু হাতটা বুলিয়ে দাওনা মা! আমার খুব কষ্ট হচ্ছে মা। সারার অবচেতন মন মায়ের চেহারাটা মনে করার চেষ্টা করল।সারা হঠাৎ রাহির ফুপির ঝাঁজালো গলার আওয়াজ শুনতে পেল।

রাহির ফুপি ঝাঁজালো গলায় বলছে,
‘ উফফফ অচেনা একটা মেয়েকে আশ্রয় দিয়ে পুরো বিপদে পরে গেলাম দেখছি।তারমধ্য আবার জ্বর বাধিয়ে বসে আছে মেয়েটা। রাহিকে কতবার বলেছিলাম এসব ঝামেলা যেন আমার বাড়িতে না পাঠায়! কিন্তু মেয়েটা শুনলোনা। জোর করে আমার গাড়ে চাঁপিয়ে দিল মেয়েটাকে। আমি পারবোনা এর সেবা করতে। রাহীর ফুপির কথার মাঝেই রাহীর ফুপা বলে উঠল,

আহ রেহনুমা আস্তে কথা বলো মেয়েটা শুনতে পাবে তো! যত যাইহোক, মেয়েটা এখন আমাদের দায়িত্বে আছে।

স্বামীর কথা শুনে মিসেস রেহনুমার রাগটা যেন আরো বেড়ে গেল। তিনি রাগে ফোসফাস করে চাপাস্বরে বললেন, তোমরা যা করার করো।আমি গেলাম। তুষার, রোহান তোমরা-ও চলে এসো। ‘ বলেই জোড়ে জোড়ে শব্দে পা ফেলে রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন মিসেস রেহনুমা।

রাহির ফুপির ঝাঁজালো কথাগুলো কিছুটা শুনতে পেল সারা।সে বুজতে পারলো তাকে নিয়ে খুব-ই বিরক্ত রাহির ফুপি।
রাহি মনে মনে একটা সিদ্বান্ত নিল, একটা ব্যবস্থা হলেই সে এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে।অন্যর বাড়িতে কারো বিরক্তির কারণ হয়ে সে থাকতে পারবেনা।এসব ভাবনার মাঝেই নিজের বাহুদ্বয়ে কারো শক্ত হাতের স্পর্শ পেয়ে সারা কেঁপে উঠলো। একজোড়া হাত তার বাহুদ্বয় শক্ত করে চেঁপে ধরেছে।সে বুজতে পারলো এই হাত কোনো মেয়ের হাত না বরং কোনো পুরুষের হাত।হাতজোড়ার মালিক তাকে খুব সাবধানে শোয়া থেকে উঠানোর চেষ্টা করছে।এই পর্যায় সারা তার ঢুলুঢুলু চোখজোড়া মেলে তাকানোর চেষ্টা করেও পারলোনা।উমমম এটা বললে ভুল হবেনা যে সারা সাহস পেলনা চোখ মেলে তাকাতে।দুর্বল সারা না পারলো সাহস করে চোখ মেলে তাকাতে আর না পারলো অচেনা মানুষটাকে মুখ ফুঁটে কিছু বলতে।অচেনা মানুষটা এক পর্যায় তাকে শোয়া থেকে উঠাতে সফল হলো।তাকে একটা বালিশের সাহায্যে হেলান দিয়ে শোয়ালো।ঠোঁটের খানিকটা নিচে অচেনা মানুষটার হাতের স্পর্শ পেতেই সারার সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠলো। অচেনা মানুষটা তাকে একটু একটু করে স্যুপ খায়িয়ে দিচ্ছে। আর কিছুক্ষণ পর পর টিস্যু দিয়ে তার মুখ মুছে দিচ্ছে।কিছুটা খাওয়ানো শেষে তার মুখে একটা টেবলেট গুঁজে দিল। তারপর পানি খায়িয়ে দিল।ওষুধ খাওয়ানো শেষ হলে সারাকে আবার বিছানায় শুয়িয়ে দিল।তার গলা পর্যন্ত কাঁথা টেনে দিল।এরপর আর অচেনা মানুষটাকে সারা আর অনুভব করতে পারলোনা। হয়তো চলে গেছে।
সারা তার ঢুলুঢুলু চোখজোড়া আর আটকে রাখতে পারলোনা। কিছুক্ষণ পর সে-ও ঘুমিয়ে পরল।

এখন ঠিক কয়টা বাজে সারার জানা নেই। ঘুমের মধ্যেও সে অনুভব করতে পারছে কেউ একজন ঠিক সেসময়ের মতো এখন তাকে সেবা করছে।সারার ইচ্ছে করলোনা ঘুমু ঘুমু চোখজোড়া মেলে তাকাতে।

পুরো একদিন জ্বরে ভুগে সারা এখন একটু সুস্থবোধ করছে।এখন বেলা দশটা বারো বাজে।সারা এই চার দেয়ালের রুম থেকে সকালে বেরোয়নি। সকালে একজন মেইড তাকে নাস্তা দিয়ে গেছে।সেটাও খাওয়া হয়নি।যেভাবে রেখে দিয়ে গিয়েছিল সেভাবেই আছে। সারা বিছানায় হেলান দিয়ে বসেছিল।ঠিক তখন-ই মিসেস রেহনুমা রুমের ভেতরে ঢুকে কোনো বাক বিনিময় না করে তাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

‘আমার কিছু করার নেই।তোমাকে এই বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হবে।’

সারা থমথমে দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রাহির ফুপির দিকে।

চলবে,
@Nusrat Hossain

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here