আলো আঁধারের খেলা পর্ব ৩

0
137

#আলো_আঁধারের_খেলা
#Part_3
#লেখনীতে_#Nusrat_Hossain

মিসেস রেহনুমা রুমের ভেতরে ঢুকে কোনো বাক বিনিময় না করে সারাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
‘আমার কিছু করার নেই।তোমাকে এই বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হবে।’

সারা নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল মিসেস রেহনুমার দিকে।

মিসেস রেহনুমা এবার গলাটা নরম করে বললেন,

দেখো, আমার অবিবাহিত দু’জন ছেলে আছে। আর আমরা একটা সমাজে বসবাস করি।প্রতিনিয়ত সমাজের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের চলতে হয়।আশা করি,তুমি বুজতে পারছো? আমি তোমাকে ঠিক কি বোঝাতে চাইছি। কথাটা বলেই তাকালেন সারার শান্ত,নির্বাক হয়ে যাওয়া চেহারাটার দিকে।তিনি চাইলে পারতেন মেয়েটাকে নিজের বাড়িতে আশ্রয় দিতে।এই মেয়ের মতো আরো দশজনকে খাওয়ানোর মতো সামর্থ্য তাদের আছে।কিন্তু একটা অচেনা, অজানা মেয়েকে থাকতে দিতে বললেই তো আর হলোনা। এই মেয়ের পরিবার সম্পর্কেও কিছু জানেননা।শুধু জানেন রাহির ফ্রেন্ড ব্যস এতটুকুই। তাদের বাড়িতে থাকাকালীন এই মেয়ের যদি কোনো কিছু হয়ে যায় তাহলে তার দায়ভার কে নিবে? আর এই অচেনা, আজানা মেয়েটির জন্য কোনো ঝামেলা বইতে তিনি রাজিনা।তারমধ্যে আবার বড়ছেলেটার মতিগতি একদম-ই ঠিক লাগছেনা। তিনি নিজের চোখে দেখেছেন বড় ছেলেকে তিন তিনবার এই রুমে আসতে।আল্লাহ না করুক, তিনি যেটা ভাবছেন সেটা যদি হয়ে যায়! তাহলে তো সারা নামের মেয়েটার এই বাড়িতে থাকাটাই দায়!শেষমেশ দেখা যাবে, এই অচেনা, অজানা মেয়েটা উল্টো তার মাথায় হাড়ি ভেঙে খাবে। তাই কোনোরকম একটা বাহানা দিয়ে মেয়েটাকে এই বাড়ি থেকে বিদায় করলেই বেঁচে যান তিনি।

সারা ঠোঁটজোড়া চেঁপে বসে আছে।এত তাড়াতাড়ি নিজের থাকার জন্য জায়গা কিভাবে ব্যবস্থা করবে তা ভেবে পাচ্ছেনা সারা।ও নিজেও চাইছেনা অন্যর বাড়িতে কারো বিরক্তিকর কারণ হয়ে থাকতে। কিন্তু এত দ্রুত কিভাবে কি করবে! নিজের প্রতি খুব-ই অসহায়বোধ করল সারা।সে কিছুটা ইতস্ততভাবে বলল,

কিন্তু আন্ট্ সারা কিছু বলার আগেই মিসেস রেহনুমা বললেন,
‘তবে তুমি চিন্তা করোনা। আমি তোমার থাকার জন্য একটা ব্যবস্থা করেছি।আমার মেয়ের ভার্সিটির কয়েকটা ফ্রেন্ড আছে, যারা রুম ভাড়া নিয়ে থাকে। তুমি তাদের সঙ্গেই থাকবে।’

মিসেস রেহনুমাকে সারার বলতে ইচ্ছা করল,

থাক আন্টি আমার জন্য আপনাকে আর কিছু করতে হবেনা। কিন্তু সে অপারগ। এই মুহূর্তে থাকার জন্য তার একটা বাসস্থানের প্রয়োজন।সে মিসেস রেহনুমাকে মাথাটা মৃদু ঝুলিয়ে হ্যাঁ বোঝাল।

মিসেস রেহনুমা মনে মনে খুব খুশিই হলেন।তবে চেহারাটা দুঃখী দুঃখী একটা ভাব করে রাখলেন। তিনি বললেন,

‘তাহলে গোছগাছ করে নাও। আজ বিকেলে আমার মেয়ে তোমাকে সেই বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসবে।আর শোনো মনে কোনো কষ্ট রেখোনা।বুজতেই পারছো আমি অপারগ।’ বলেই তিনি একটা মলিন হাঁসি দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন।

রাহির ফুপির বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার কথাটা রাহিকে জানালোনা সারা।সে নিশ্চিত রাহিকে কথাটা জানালে রাহি রেগে যাবে খুব।আবার ফুপির বাড়ির সবার সাথে রাহির সম্পর্কটাও নষ্ট হয়ে যাবে। এসব ভেবেই রাহিকে কিছু জানালোনা সারা। ঐখানে গিয়ে রাহিকে ফোন করে বাড়ি ছেড়ে আসার কারণ হিসেবে কোনো একটা অযুহাত দিয়ে দিবে বলে সিদ্ধান্ত নিল সারা। দুপুরের খাবারটাও সে নিজের রুমে বসেই খেল।এই বাড়িতে আসার পর এক মুহূর্তের জন্য-ও সে রুম থেকে বের হয়নি।আর আজকে তো চলেই যাবে।ভেবেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল সারা।

বিকেল চারটায় নিজের ব্যাগ গোছগাছ করে বিছানার এক প্রান্তে বসে আছে সারা।মূলত সে এখন মিসেস রেহনুমার মেয়ের জন্য অপেক্ষা করছে। মেয়েটা আসলেই সে এই বাড়ি থেকে বিদায় হবে।অতিরিক্ত টেনশনে সেই অচেনা মানুষটার কথা সারার মাথা থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে গেছে।তার মাথায় অনেক চিন্তা-ই ঘুরপাক খাচ্ছে। সারা ভাবছে কেমন হবে সেখানে তার থাকার জায়গাটা! আচ্ছা ঐখানে গেলেও কি তাকে সবাই তুচ্ছতাচ্ছিল্য করবে? ভাবতেই সারার ঠোঁটে শ্লেষাত্মক হাঁসি ফুঁটে উঠল।
_________

বুকের সাথে ব্যাগটা চেঁপে ধরে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সারা।রেহনুমা আন্টির মেয়ে রিফা তাকে রেখে একটু আগে চলে গেছে।যাওয়ার আগে নিজের ফ্রেন্ডদের সাথে তার পরিচয়টাও করিয়ে দিয়ে গেছে।এখন সে কতকগুলো মেয়ের সামনেই জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।রুমে থাকা দুইটা বিছানায় মেয়েগুলো পা ছড়িয়ে বসে আছে আর তার আগাগোড়া এমনভাবে পরখ করে দেখছে! যেন সে কোনো এলিয়েন।সারা কি বলবে বুজতে পারছেনা।এমন সময় রুমের দরজা ঠেলে একটা মেয়ে ভেতরে ঢুকল।সারা গাঢ়টা গুড়িয়ে মেয়েটাকে একপলক দেখে নিয়ে আবার আগের মতো মাথা নিঁচু করে দাঁড়িয়ে রইল।মেয়েটা তার সঙ্গীদের সারাকে ইশারা করে দেখিয়ে ভ্রু নাঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল,

‘এই মেয়েটা কে? ‘

মেয়েটার সঙ্গীদের মধ্যে থেকে একটা মেয়ে উত্তর দিল,

‘রিফা দিয়ে গেছে।আজকে থেকে আমাদের সাথেই থাকবে মেয়েটা।আর হ্যাঁ তানি রিফা তোকে খুঁজছিল।তোর জন্য অপেক্ষা করে একটু আগেই রিফা বেরিয়ে গেছে।’

তানি নামের মেয়েটা ভাবলেশহীন গলায় বলল,
‘ওর সাথে আমি পরে কথা বলে নিব।’ এবার তানি নিজের সঙ্গীদের কপট রাগ দেখিয়ে বলল,

‘তোরা মেয়েটাকে এভাবে দাঁড় করিয়ে রেখেছিস কেন? বসতে বলবি তো! ‘

একটা মেয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে তানির কানে কানে ফিঁসফিঁস করে বলল,
‘অচেনা একটা মেয়েকে ঠিক কি বলব বুজতে পারছিলাম না।’

তানি মেয়েটাকে আলতো ধাক্কা দিয়ে বলল,
‘সর তো তোরা। একটা-ও কোনো কাজের না।’

তানি সারার হাত ধরে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে বলল,
‘নাম কি তোমার?’

সারা অস্ফুটস্বরে বলল,
‘জান্নাতুল সারা।’

তানি মুচকি হেঁসে বলল,
‘মাশআল্লাহ খুব সুন্দর নাম।’

তানি ঠোঁটে হাঁসি রেখেই বলল, আমি তানিয়া।সবাই আমায় তানি নামেই ডাকে।’

এবার তানি সঙ্গীদের দিকে একপলক তাকিয়ে নিয়ে সারার দিকে তাকিয়ে বলল,
তো সারা! এখন তোমাকে কয়েকটা কথা বলব, মন দিয়ে শুনবে।যেহেতু তুমি এখন থেকে আমাদের সাথেই থাকবে। তোমার-ও কথাগুলো জানা প্রয়োজন। তানিয়া বলতে শুরু করল,

আমরা হলাম ছয় জনের একটা গ্রুপ।আমরা ছাড়া-ও এই বাড়িতে আরো একটা গ্রুপ থাকে।আমাদের অপর পাশের ফ্ল্যাট-টায় ওরা থাকে। আমরা এক-ই ভার্সিটিতে, এক-ই ক্লাসে পরি কিন্তু ওদের সাথে আমরা কথা বলিনা। কারণ ঐ গ্রুপটা ভালোনা।ওদেরকে সব সময় আমরা এড়িয়ে চলি।তুমিও ওদের থেকে দূরে থাকবে।বুজলে?

সারা মাথাটা ঝুলিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ বুজতে পেরেছি।’

তানি এবার তার সব সঙ্গীদের সাথে সারার পরিচয় করিয়ে দিতে লাগলো।

‘ রিমা,রাফা,মেঘলা,হাফসা এই চারজন আমরা এক রুমে থাকি।দুই বেডে দুইজন – দুইজন করে চারজন থাকি।আর বাকি দুইজন অনি আর পিউ আমাদের পাশের রুমটায় থাকে। তুমি যেহেতু এসে গেছো, তাই হাফসা আজকে থেকে ওদের সাথে রুম শেয়ার করে থাকবে।আর তুমি আমাদের সাথে এই রুমে থাকবে।’ পরিচয় শেষে তানি বলল।

সারা ইতস্তত করে বলল,
‘হাফসা আপুর সমস্যা হবেনা অন্য রুমে থাকতে ? আমি নাহয় অন্য রুমে গিয়ে থাকি। ‘

হাফসা মুচকি হেঁসে বলল,
‘ অনি আর পিউ একটা বেডে ঘুমোয় আর বেডটা বেশ বড়-ই।তিনজনের জায়গা হয়ে যাবে। আজকে থেকে ওদের সাথেই ঘুমাবো আমার কোনো সমস্যা হবেনা।তুমি নিশ্চিন্ত থাকো বোন।’

তানি বলল, এভাবেই আমরা ছয়জন এক ফ্ল্যাটে, এক সঙ্গে মিলেমিশে থাকি।অবসর সময়ে আমরা সবাই আমাদের এই রুমটায় আড্ডা দিই।ও হ্যাঁ বলে রাখা ভালো ওয়াশরুম কিন্তু একটাই। আর একটা ওয়াশরুম-ই আমরা ছয়জন ইউজ করি।আমাদের সঙ্গে থাকতে হলে তোমাকে একটু কষ্ট করে থাকতে হবে। কোনো সমস্যা হবেনা তো তোমার?’

সারা নির্দ্বিধায় বলল,
‘কোনো সমস্যা হবেনা।’

‘এসো তোমায় আমাদের ছোটখাটো ফ্ল্যাট-টা ঘুরিয়ে দেখাই।’ তানি সারার হাত ধরে ফ্ল্যাট-টা ঘুরিয়ে দেখাতে দেখাতে বলল,

‘আমাদের বাড়িওয়ালাটা ভীষন ভালো বুজলে।স্টুডেন্টদের অনেক সুযোগ সুবিধা দেয়।তোমার হাতে টাকা না থাকলে তুমি যদি দুই মাসের ভাড়া দেরি করেও দাও,উনি তোমায় কিছুই বলবেন না।ভদ্রলোক খুব-ই ভালো মানুষ। এই জন্য-ই অনেক স্টুডেন্ট এই বাড়িতে ভাড়া নেয়।’

তানির মুখে বাড়ি ভাড়ার কথা শুনে সারা স্তম্ভিত ফিরে পেল।এখানে তো এসে পরল ঠিকই কিন্তু বাড়ি ভাড়া কিভাবে দিবে? বাড়িওয়ালা যতই ভালো হোক, ভাড়া তো তাকে দিতেই হবে। এখন কি করবে সে?

তানি সারাকে আলতো ধাক্কা দিয়ে বলল, ‘কই হারিয়ে গেলে।’

সারা ভাবনা থেকে ফিরে এসে ইতস্তত করে বলল,

‘আপু আমায় একটা কাজ যোগাড় করে দিবে?’

তানি সারার দিকে একপলক তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

‘এটা নিয়ে রাতে আলোচনা করব।’

চলবে,
@Nusrat Hossain

(কারেন্ট ছিলনা তাই দেরি হলো গল্প পোস্ট করতে।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here