আলো আঁধারের খেলা পর্ব ৪

0
139

নিয়মিত চমৎকার গল্প পড়তে হলে গল্পের শহর চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করে রাখুন যাতে পোস্ট হওয়ার সাথে সাথেই আপনি নোটিফিকেশন পান।গল্পের শহর আর গল্পের ঠিকানা ওয়েবসাইটের গল্প অন্য কোথাও শেয়ার দেওয়া হবে না গল্পের শহর চ্যানেল ছাড়া)

আলো_আঁধারের_খেলা
#Part_4
#লেখনীতে_#Nusrat_Hossain

কালো আঁধারে ডেকে গেছে সমস্ত পৃথিবী।নিস্তব্ধতায় ঘিরে ধরেছে চারপাশ। রাত যত গভীর হচ্ছে নিজের একাকীত্ব-টাও প্রবলভাবে অনুভব করছে সারা।নির্বোধ সারার মনে বারবার একটা কথা-ই হানা দিচ্ছে, কি দরকার ছিল বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে আসার? ভালোই তো খাচ্ছিলো, ঘুমাচ্ছিলো, আরামেই তো ছিল সে।পালিয়ে আসার সময় নিজের ভবিষ্যতের কথা একটুও মাথায় আনেনি সারা। ভেবেছিল রাহির ফুপির বাড়িতেই তো থাকবে,কোনো সমস্যা হবেনা। ততদিনে নিজের একটা ব্যবস্থা করতেই পারতো সে।কিন্তু সে ভাবতে পারেনি কল্পনা আর বাস্তবে বিস্তর ফাঁরাক।লাইফটা তাকে হারে হারে টের পায়িয়ে দিচ্ছে বাস্তবতা কি!

সারা বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছে জেনে তানিরা সবাই কিছু মুহূর্ত তব্দা খেয়ে গিয়েছিল।পরে যখন সারার মুখ থেকে শুনল বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে আসার কারণ তখন সবাই দুঃখ প্রকাশ করল, কেউবা সারার কাধে চাপড় মেরে বাহবা দিল। রুমের বড় জানালাটার সামনে বসে সারাসহ, তানিরা সবাই সারার জন্য একটা কাজের ব্যবস্থা কিভাবে করা যায় সেটা নিয়ে আলোচনা করছে।

‘মাত্র এস এস সি পাসে ভালো কোনো কাজ পাবেনা। এখন একটাই উপায় আছে, ছোট বাচ্চাদের পড়াতে পারো! আমি তোমায় টিউশনি খুঁজে দিতে পারবো। এ নিয়ে কোনো সমস্যা হবেনা’ তানি বলল।

তানির কথায় সারা একটা আশার আলো খুঁজে পেল।সে ঠোঁটে সুক্ষ্ম হাঁসি ফুঁটিয়ে বলল,

‘ধন্যবাদ আপু। আমার জন্য এতোটা করার জন্য।’

বিনিময়ে তানি হাসিমুখে সারার কাধে আলতো চাপড় মারলো।

তানি ভাবলো ভার্সিটির পাশে যে কলেজটা আছে সেখানে ভর্তি করিয়ে দিবে মেয়েটাকে।তার আগে মেয়েটার সাথে এ নিয়ে কথা বলা প্রয়োজন।তানি কিছু একটা ভেবে বলল,

‘তো তুমি তো এবার ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারে তাইনা?’

তানির প্রশ্নে সারা ইতস্ততবোধ করল। এস এস সি এর পর সে আর পড়াশোনা করতে পারেনি।মূলত তার দাদু মেয়েদের এতো পড়াশোনা পছন্দ করেনা।দাদুর কথা হলো, মেয়েদের এত পড়াশোনা কি দরকার , বিয়ের পর তো চুলো-ই গুঁতাতে হবে। তাই দাদুর মন রক্ষার্থে তার-ও আর কলেজে পা রাখা হয়নি।সে ইতস্ততভাবে বলল,

‘এস এস সি-র পর আমি আর কলেজে ভর্তি হইনি আপু।এক বছরের মতো গ্যাপ আমার৷’

সারার কথা শুনে ছয়জন একে অপরের মুখের দিকে তাকালো।তবে সারাকে কেউ জিজ্ঞেস করল না কেন, কিসের জন্য ভর্তি হয়নি। হয়তো মেয়েটার পরিবারে কোনো প্রবলেম ছিল।মেয়েটাকে এমনিতেই বিব্রত দেখাচ্ছে।কথাটা জিজ্ঞেস করে মেয়েটাকে আরো বিব্রত করতে চাইলো না কেউ-ই।

তানি কিছু বলার আগেই অনি সারার উদ্দেশ্য বলে উঠল,

‘এখন কি পড়াশোনার করার ইচ্ছে আর নেই তোমার?’

সারা মিনমিনে গলায় বলল,
‘ইচ্ছে আছে কিন্তু কিভাবে পড়ব? ‘

কথাটা শুনে সবাই ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল।

একে তো বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে এসেছে।তারমধ্যে আবার হাতে একটা টাকা পর্যন্ত নেই।গাঁধার মতো একটা কাজ করে ফেলেছে সারা , তার উচিত ছিল বাড়ি থেকে কিছু টাকা হাতে করে আনা কিন্তু সে আনেনি।বলতে গেলে তখন তার হাতে টাকাও ছিলনা। তাই সাথে করে এক টাকাও আনতে পারেনি। এখন টাকা ছাড়া কিভাবে চলবে? এটা ভাবতেই সে ডিপ্রেশনে চলে যাচ্ছে।তার মধ্য আবার নতুন করে যোগ হলো বাড়ি ভাড়ার খরচ+খাওয়ার খরচ+কলেজের খরচ এত এত খরচ কিভাবে যোগান দিবে সে! আর টিউশনি পেলেও বেতন কত-ই বা পাবে! টিউশনির টাকা দিয়ে কিছুই হবেনা।এসব ভেবেই সে কথাটা বলেছিল। কিন্তু তানি আপুরা সবাই এমন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল কেন?এটা তার বোধগম্য হচ্ছেনা।

এই পর্যায় তানির মনে হলো সারা মেয়েটা দেখতে সুন্দরী হলেও অতিমাত্রায় গাঁধা একটা মেয়ে।কেউ আগ্রহ না করলে তাকে ধরে বেধে পড়াশোনা করানো যায়না।পড়াশোনা করার জন্য অবশ্যই আগ্রহ থাকা প্রয়োজন এটা তানির ধারণা ।তানি সারার উদ্দেশ্য বলল,

‘এই যে, আমাদের ছয়জনকে দেখছো আমরা দূর থেকে পড়াশোনা করতে এসেছি।আমরা সবাই ধনী পরিবারের মেয়ে এই ধারণা করলে ভুল হবে। আমরা প্রত্যেকেই মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে।আমাদের প্রত্যেকেরই একটা স্বপ্ন আছে, যাতে ভালো একটা রেসাল্ট করে ভালো চাকরি করতে পারি।আর আমরা সবাই আগ্রহ করেছি বলেই না দূর থেকে এসে পড়াশোনা করছি। যাইহোক, এখন ওসব প্যাচাল থাক। তোমার কাছ থেকে জানতে চাইছি, তুমি কি পড়াশোনা করতে চাও নাকি?

সারা বলল,’আমার হাতে তো এখন টাকা নেই। ‘

‘টাকার চিন্তা করতে হবেনা। আমরা সবাই সাহায্য করবো। সার্টিফিকেট এনেছো?’ তানি বলল।

পালিয়ে আসার সময় কি মনে করে যেন সারা ব্যাগে এডমিট কার্ড আর সার্টিফিকেট ভরে রাখে।এগুলো যে কাজে লাগবে ভাবতে পারেনি সে।নিজেকে মনে মনে খুব বাহবা দিল।
সারা বলল,হ্যাঁ এনেছি।

তানি বলল,গুড।তানি হামি দিতে দিতে বলল, অনেক রাত হয়েছে। সবাই ঘুমিয়ে পরো।আর সারা কালকেই কিন্তু তোমাকে ভর্তি করিয়ে দিব কলেজে।
__________

আজকে তানিদের ক্লাস নেই। তাই সারাকে কলেজে ভর্তি করানো শেষে আর টুকটাক ঝামেলা শেষে সবাই বাড়ি ফিরার জন্য রওনা হলো।কলেজ থেকে বের হতেই দেখতে পেল, ব্ল্যাক টি শার্ট সাথে ব্ল্যাক ব্লেজার, ব্ল্যাক জিন্স পরিহিত উজ্জল শ্যাম বর্নের এক ছেলে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে।সবাই একে অপরের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকালো। তানি পিউকে গুঁতা মেরে বলল,’তুই কি ছেলেটাকে চিনিস? ‘

পিউ ছেলেটাকে পরখ করতে করতে বলল, ‘আশ্চর্য আমি কিভাবে চিনব? কিন্তু মানতে হবে, হি ইজ হ্যান্ডসাম মেন।’

তানি বলল, ‘ওহ আচ্ছা! আমি ভাবলাম তোর বয়ফ্রেন্ড। তুই তো আবার দুইদিন পর পরই নতুন নতুন বয়ফ্রেন্ড বানাস।’

পিউ একটা গরম চাহনি দিল তানিকে।

ছেলেটা ওদের সামনে এসেই সারার হাত ধরে বলল,’এসো।’

সারাসহ সবাই হতভম্ব হয়ে গেল। সে ভরকে গিয়ে বলল,
‘কে আপনি?আমি তো আপনাকে চিনিনা! ‘

ছেলেটা শান্ত গলায় বলল,
‘আমার বাড়ি গেলে আমাকে চিনতে আপনার অসুবিধা হবেনা।আর এখন আমরা বাড়িতেই যাবো।’

সারা ছেলেটার দিকে সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকিয়ে নিজের হাতটা ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বলল, ‘ আমার হাত ছাড়ুন।আমি কেন আপনার বাড়ি যাবো।’

ছেলেটা সারার হাত ছাড়লোনা।শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সারার চেহারাটার দিকে।

এতক্ষণে তানিরা সবাই স্তম্ভিত ফিরে পেল।তারা এতক্ষণ লক্ষ্য করছিল ছেলেটার কাণ্ড। তানি বলল,
‘আশ্চর্য আপনি! একটা মেয়ে আপনাকে চিনতে পারছেনা আর আপনি তার হাত ধরে টানাটানি করছেন।এটা কি ভদ্রতা?’

ছেলেটা এবার নিজের ঠোঁটজোড়া চেঁপে নিয়ে দশ সেকেন্ড পর বলল,
‘আমি রোহান।রিফার ভাই।’

তানিরা সবাই তব্ধা খেয়ে গেল কিছুক্ষণের জন্য।তানি তড়িঘড়ি করে বলল,
‘সরি ভাইয়া।আপনাকে আমরা চিনতে পারিনি।আসলে কোনোদিন দেখিনি তো আপনাকে তাই…। তবে রিফার কাছ থেকে আমরা আপনার অনেক কথা-ই শুনেছি।’ তানি শেষের কথাটা মেকি হাঁসি দিয়ে বলল।’

রোহান গম্ভীর কন্ঠে বলল, ‘সবার জানা শেষ হলে এখন ওকে নিয়ে যেতে পারি?’

অনি বোকার মতো একটা হাঁসি দিয়ে বলল, ‘অবশ্য-ই ভাইয়া।’

রোহান সারার অনুমতির জন্য অপেক্ষা করলনা। সারাকে এক প্রকার টেনেই নিয়ে যেতে লাগলো নিজের প্রাইভেট কারের দিকে।এদিকে সারা একেবারে অবাকের শেষ পর্যায়। এই ছেলে রিফা আপুর ভাই! আর মিসেস রেহনুমার ছেলে! কই এই ছেলেকে তো ঐ
বাড়িতে দেখেনি! অবশ্য দেখবেই বা কিভাবে রুম থেকেই তো বের হয়নি সে।মিসেস রেহনুমার কথা মনে হতেই সারা নিজের হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে বলল,
‘হাত ছাড়ুন আমার।আমি কোথাও যাচ্ছিনা।’

রোহান হাঁটা বন্ধ করে দিয়ে বিরক্তিকর চেহারা নিয়ে সারার দিকে তাকালো।সে শান্তগলায় বলল,
‘জেদ দেখিওনা মেয়ে।আশপাশ লক্ষ্য করে দেখো, একদম কোলে উঠিয়ে নিয়ে যাবো।তখন মানুষ বিনা টিকেটে মুভি দেখবে।আর তুমি নিশ্চয়ই আমার কোলে উঠে যেতে পছন্দ করবেনা !’

সারা ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখলো আশপাশটা।তারপর আবার রোহানের দিকে তাকালো।রোহান গাড়ির চাবিটা অনিমিকা আঙ্গুলে গোড়াতে গোড়াতে বলল, ‘চলো।’ বলেই হাঁটা ধরল রোহান।

চলবে,
@Nusrat Hossain

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here