আলো আঁধারের খেলা পর্ব ৫

0
150

#আলো_আঁধারের_খেলা
#Part_5
#লেখনীতে_Nusrat_Hossain

‘দেখুন আমি যাবোনা ঐ বাড়ি।আমায় নামিয়ে দিন প্লিজ।’ অনুরোধের স্বরে বলল সারা।

রোহান ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, ‘কেন যাবেনা আমাদের বাড়ি।প্রবলেম কি?’

প্রবলেম আপনার মা মিসেস রেহনুমা। এই কথাটা সারা বলতে গিয়েও বললনা।চুপ হয়ে রইল।

সারার কাছ থেকে কোনো জবাব না পেয়ে রোহান বলল,
‘দেখো ,বাবা তোমায় নিতে পাঠিয়েছে আমায়।বাবা অনেক হার্ট হয়েছে যখন শুনেছে তুমি আমাদের বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছো। একজন মানুষ তোমার জন্য ওয়েট করে আছে, তাকে না করে দেওয়াটা কি ঠিক হবে তোমার ?এটা কি অভদ্রতার পরিচয় দেওয়া হলোনা?কথাটা বলে রোহান সারার দিকে তাকালো সারার জবাবের আশায়। কিন্তু সারা জানালার বাহিরের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।তার কথাগুলো সারা শুনেছে কিনা এটাতে সন্দিহান রোহান।রোহান সারার ধ্যান পাওয়ার জন্য দুইবার করে গলা খাঁকারি দিল।এতে কোনো লাভ হলোনা। সারা আগের মতোই জানালার বাহিরে তাকিয়ে আছে।মেয়েটা হয়তো কিছু ভাবছে! রোহানের মনে হলো। রোহান গম্ভীরস্বরে বলল,

‘এক্সকিউজ মি!’

সারা বাহির থেকে দৃষ্টিজোড়া সড়িয়ে নিয়ে রোহানের দিকে তাকালো। রোহান চোখজোড়া ছোট ছোট করে জিজ্ঞেস করল,
‘তুমি কি আমার কথাগুলো শুনেছো?’

সারা ছোট করে জবাব দিল,
‘ হ্যাঁ। ‘
অপরিচিত মানুষ সারাকে ‘ তুমি’ করে বললে সারার কেমন যেন একটা লাগে। তা-ও যদি আবার সেটা ছেলে হয়।মনে মনে সারা রোহানের প্রতি বিরক্ত হলেও রোহানকে মুখে কিছু বললনা।রোহান আড়ে আড়ে সারার দিকেই তাকাচ্ছিল। সারার বিরক্তিমাখা চেহারাটা দেখে ঠোঁট কামড়ে হেঁসে গাড়ি চালানোতে মন দিল সে।এরমধ্যে দুইজনের একজন-ও আর কথা বলেনি।গাড়ি এসে সোজা থামল রায়হান ভিলায়।
সারা রোহানের পিছু পিছু যাচ্ছে। খুব অস্বস্তিবোধ হচ্ছে সারার।আবার-ও ঐ ভদ্রমহিলার সামনে পরতে হবে তাকে। উফফফ কি হবে এখন!ভদ্রমহিলা নিশ্চয়ই তাকে দেখলে এবার রেগে যাবে!

‘আপনার সাথে দেখা করবে বলে আজকে বাবা অফিসে-ও যায়নি।’ রোহান বাড়িতে ঢুকতে ঢুকতে কথাটা বলল।

মিসেস রেহনুমা অহংকারি টাইপ হলেও রাহির ফুপা রায়হান সাহেব আন্তরিক একজন মানুষ সারা যা বুঝলো।এই মানুষটাকে কষ্ট দিলে আসলেই অভদ্রতার পরিচয় দিয়ে ফেলত সারা।তবে সে মনে মনে সিদ্বান্ত নিল রায়হান সাহেব যদি তাকে এই বাড়িতে থাকতে বলে তাহলে সে কোনোভাবেই থাকবেনা।রায়হান সাহেবকে যেকোনো একটা অযুহাত দিয়ে বাড়ি থেকে চলে আসবে। যতযাইহোক, এই বাড়িতে থাকার আর ইচ্ছে নেই তার।

সারা মাথার ঘোমটাটা ঠিকঠাক করে রোহানের পিছু পিছু রায়হান সাহেবের রুমে ঢুকল।রায়হান সাহেব সিঙ্গেল সোফায় বসে ছিলেন আর তার পাশেই মিসেস রেহনুমা দাঁড়িয়ে ছিলেন। সারাকে দেখা মাত্র-ই মিসেস রেহনুমার চেহারা চোরের মতো হয়ে গেল।চোর চুরি করলে যেমন ধরা পড়ে যায় ঠিক তেমন।সারাকে দেখতে পেয়েই রায়হান সাহেব সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে হাঁসিমুখে সারার উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করলেন,
‘কেমন আছো মা? ‘

সারা-ও বিনিময়ে মুচকি হেঁসে বলল,
‘আলহামদুলিল্লাহ।আপনি কেমন আছেন আঙ্কেল? ‘

রায়হান সাহেব ঠোঁটে হাঁসি বজিয়ে রেখে বললেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ।’ রায়হান সাহেব সারাকে সোফায় ইশারা করে বললেন, ‘বসো মা।’

সারা রায়হান সাহেবের কথামতো বসল। রোহান-ও সারার থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে বসল।রায়হান সাহেব বসামাত্র-ই মিসেস রেহনুমাকে আদেশের সুরে বললেন সারার জন্য নাস্তা আনতে।সারা তড়িৎগতিতে সৌজন্যমূলক হাঁসি দিয়ে বলল,

‘না, না তার প্রয়োজন নেই। আমি নাস্তা করেই এসেছি।’

তবে রোহান তার কথায় বাধ সেধে বলল ‘বাবা আমি কিন্তু মাত্র-ই ওকে কলেজ থেকে এনেছি। আম্মুকে নাস্তার ব্যবস্থা করতে বলো।’

রায়হান সাহেব মিসেস রেহনুমাকে ইশারা করতেই মিসেস রেহনুমা মলিন মুখে বেরিয়ে গেলেন নাস্তা বানাতে।

মিসেস রেহনুমা বেরিয়ে যেতেই রায়হান সাহেব বললেন,

‘তবে আমি কিন্তু তোমার প্রতি খুব রাগ হয়েছি মা! আমার বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার
জন্য।’

সারা বলল, ‘মাফ করবেন। আপনাকে বলে যাওয়া হয়নি।’

‘উহ! আমি সেটা বোঝাতে চাইনি, বোঝাতে চেয়েছি তুমি কেন আমার বাড়ি ছেড়ে চলে গেলে?’

সারা কি বলবে ভেবে পাচ্ছেনা! বলবে কি! মিসেস রেহনুমা চাননা ও এই বাড়িতে থাকুক।রায়হান সাহেবের এই প্রশ্নের কোনো জবাব না দেওয়ার সিদ্বান্ত নিল সারা।চুপচাপ মাথা নিঁচু করে বসে রইল সে।এর মধ্যেই সারার কানে একটা গম্ভীর গলার আওয়াজ এলো।

‘একজনের বাড়ি এসে তারপর আবার কাউকে কিছু না বলে বাড়ি ছেড়ে হুটহাট চলে যাওয়াতো অভদ্রতামি তাই না?’ রোহান বলল।

এমন তিক্ত অপমানে সারার গাঁ রি রি করে উঠলো ।তার ইচ্ছে হলো হনহন করে এই বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে।এই মুহূর্তে উঠতেও পারছেনা সোফা ছেড়ে।উফফফ!

রায়হান সাহেব রোহানকে চোখ রাঙ্গিয়ে ধমকে বললেন, ‘চুপ করো। যেটা জানোনা সেটা নিয়ে কথা বলোনা।’

রোহান অপরাধীভঙ্গিতে দুই হাত উঁচু করে বলল, ‘ওকে ওকে সর‍্যি।’

রায়হান সাহেব এবার সারাকে উদ্দেশ্যে বললেন, ‘ যা হয়েছে , হয়েছে। থেকে যাও আমার বাড়িতে। আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি মা, কেউ তোমাকে ডিস্টার্ব করবে না।’

রোহানের কাছে বিষয়টা গুরুতর মনে হলো।বাবার কথাগুলো ভাবাচ্ছে রোহানকে।এই বাড়িতে থাকাকালীন কে ডিস্টার্ব করেছে সারাকে আর কি হয়েছে ওর সাথে?

সারা কিছু বলতে নিলেই রোহান সিরিয়াস কন্ঠে বাবাকে জিজ্ঞেস করল,
‘কি হয়েছে ওর সাথে বাবা।আমাকে ক্লিয়ার করে
বলোতো। ‘

রায়হান সাহেব গম্ভীর কন্ঠে বললেন,
‘আমি চাইনা তুমি তোমার মায়ের সম্পর্কে তিক্ত ভাবনা নিয়ে থাকো।’

রোহান মুহূর্তেই হতবিহ্বল হয়ে গেল।সে সারাকে জিজ্ঞেস করে উঠলো,
‘তার মানে মা তোমাকে বের করে দিয়েছে।’

সারা কোনো জবাব দিলনা। সে লজ্জায় মাথাটা আরো নুইয়ে নেয়। পরিস্থিতিটা কেন এমন হলো? সে কোনোদিন চায়নি এই বিষয়টা কেউ জানুক।কারণ এই বিষয়টা জানাজানি হলে লজ্জাটা তাকেই পেতে হবে। যেমন এই মুহূর্তে লজ্জায় তার মাথা কাঁটা যাচ্ছে।’

রোহান একটা দীর্ঘদম ছেড়ে নির্বাক হয়ে সারার চেহারার দিকে তাকিয়ে রইল।
রায়হান সাহেব আবারো বললেন, ‘থেকে যাও মা।’

সারা বলল, ‘আঙ্কেল অনুরোধ করবেননা প্লিজ।কারণ আমি থাকবোনা।’

‘ওর জায়গায় হলে আমিও এটাই করতাম।আগে জানলে কোনোদিনও ওকে এই বাড়িতে আনতামনা।’ কাঠ কাঠ গলায় শেষের কথাটা বলল রোহান।

রায়হান সাহেব দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বললেন,
‘ঠিক আছে আমি তোমায় জোড় করবনা।তবে আমার একটা শর্ত আছে।’

সারা রায়হান সাহেবের দিকে প্রশ্নবিদ্ধ দৃষ্টিতে তাকালো।
রায়হান সাহেব বললেন,
‘ লাঞ্চ আমার বাসায় করতে হবে। না করলে আমি খুব দুঃখ পাবো।’ কথাটা বলেই রায়হান সাহেব বাচ্চাদের মতো গম্ভীর চেহারা বানিয়ে রাখলেন।

সারা মুচকি হেঁসে বলল,
‘ঠিক আছে লাঞ্চ এখানেই করব।’

কথাটা শুনতেই রায়হান সাহেবের মুখে হাঁসি ফুঁটে উঠল।
হাঁসির দেখা মেলল রোহানের ঠোঁটেও!

ইতিমধ্যেই মেইড নাস্তা নিয়ে হাজির হলো।সারা সৌজন্যমূলক কিছুটা খাবার মুখে দিল।নাস্তা শেষে রায়হান সাহেব মেইডের হাতে খাবারের লিস্ট দিলেন। দুপুরের লাঞ্চে কি কি রান্না হবে তার জন্য।

সারাটা সময় সারা রায়হান সাহেবের সাথেই আড্ডা দিয়ে কাঁটিয়েছে। মূলত আড্ডার আসরটা জমিয়েছে রায়হান সাহেব নিজেই।আর সাথে ছিল রোহান, রোহানের ছোট ভাই তুষার আর রিফা।ওরাই একটার পর একটা কথা তুলছিল আর হাঁসাহাসি করছিল।সারা চুপচাপ-ই থেকেছে।এরমধ্যে সারা আর মিসেস রেহনুমাকে দেখতে পায়নি।লাঞ্চের সময়-ও মিসেস রেহনুমাকে দেখতে পায়নি।এমনকি বাড়ি থেকে বের হবার সময়-ও মিসেস রেহনুমাকে দেখতে পায়নি। সারার অদ্ভুত লাগলেও পরে আর পাত্তা দেয়নি বিষয়টাকে।সারার কথা হলো যারা তাকে ভালোবাসে তাদের কথা ভাবা উচিত। যারা তাকে বিরক্তির চোখে দেখে তাদের কথা ভাবাটা বোকামী ছাড়া কিছুই নয়।

বিকেল চারটার দিকে সারা রায়হান সাহেবের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বের হলো রোহানের সাথে। রায়হান সাহেবের কথামতো রোহান তাকে পৌঁছে দিয়ে আসবে।এটাতে সারা প্রথমে আপত্তি করলেও রায়হান সাহেবের জোড়াজুড়িতে রাজি হতে হলো। বের হওয়ার সময় রায়হান সাহেব বারবার বলে দিয়েছেন সারাকে, কোনো প্রবলেম হলে যেন তাকে জানায়।সারা-ও হাঁসিমুখে রায়হান সাহেবকে মাথা ঝুলিয়ে হ্যাঁ বোজায়।

চলবে,
@Nusrat Hossain

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here