আলো আঁধারের খেলা পর্ব ৬

0
198

#আলো_আঁধারের_খেলা
#Part_6
#লেখনীতে_Nusrat_Hossain

রাতেই সারা রাহিকে ফোন করে জানালো সে বাড়ি ছেড়ে দিয়েছে।বাড়ি ছেড়ে আসার কারণ হিসেবে অযুহাত দিল তার ঐ বাড়ি ভালো লাগেনা।এটা সেটা নানান বাহানা দেওয়ার পর-ও চতুর রাহি ধরে ফেলল সারার মিথ্যে কথা।রাগে ক্ষোভে ফোন কেঁটে দিল রাহি।মনে মনে অজস্র গালি দিল ফুপির বাড়ির মানুষদেরকে।

সারা সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে কলেজের উদ্দেশ্য রওনা দিল। আজকে তার কলেজে ফার্স্ট ক্লাস।তানিরা সবাই নাকডেকে ঘুমোচ্ছে কারণ ওদের ক্লাস শুরু হতে আরো অনেক দেরি। ক্লাস শেষে সারা তানিদের সাথে দেখা করে বাড়ি চলে এল।রুমে এসেই ক্লান্ত গাঁ-টা বিছানায় এলিয়ে দিল সারা।একে তো কড়া রোদ তারমধ্যে আবার পনেরো মিনিটের পথ হেঁটে এসেছে।ইচ্ছে করছে ঠান্ডা বরফ পানিতে গোসল করে গাঁ-টাকে শান্তি দিতে। যোহরের আজান আরো চল্লিশ মিনিট আগে পরে গেছে।না চাইতেও সারা তার ক্লান্ত শরীরটাকে নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকল। গোসল সেরে এসে যোহরের নামাজ আদায় করল।তানিরা সকালে রান্না করে রেখে গেছে।সারা রান্নাঘর থেকে তার জন্য খাবার বেড়ে নিয়ে রুমে এসে খেয়ে নিল।কলেজে তো ভর্তি হয়ে গেল ঠিকই কিন্তু বই নেই।বই ছাড়া পড়বে কি? আর আজকে স্যার ক্লাসে সারাকে বলে দিয়েছেন বই কিনে আনতে। এখন হাতে টাকা-ও নেই।কাকে বলবে বই-এর কথা? তানিদের বলবে!হুম ওরা ছাড়া আর কেইবা আছে! ওকে সাহায্যে করার জন্য। তানিরা ভার্সিটি থেকে ফিরলে ওদের সাথে কথা বলতে হবে বই-এর ব্যাপারে।সারা কথাগুলো ভাবতে ভাবতে ঘুমের জগতে চলে গেল।

বিকেলে সারা এমন একটা সারপ্রাইজ পাবে ভাবতে পারেনি।সারা পুরোপুরি চমকে গেছে।বই কেনার জন্য সারা আর তানি বের হচ্ছিল। ঠিক তখনি রোহান হাতে একগাদা বই নিয়ে হাজির।সারা সত্যি তখন খুব চমকে গিয়েছিল।রোহান বলল ওর বাবা পাঠিয়েছে বইগুলো কিনে।সারা-ও আর না করেনি।বইগুলো সত্যি সারার প্রয়োজন ছিল খুব। তানিরা নিজেদের এক মাসের ভাড়ার টাকা দিয়ে তাকে বই কিনে দিতে যাচ্ছিল, এই ব্যাপারে সারা খুব কষ্ট আর লজ্জা-ও পেয়েছিল।ওর জন্য মেয়েগুলো নিজেদের কতগুলো টাকা খরচ করে ফেলল। এরমধ্যে রোহানের বই নিয়ে অপ্রত্যাশিতভাবে হাজির হওয়াটা সত্যিই আশ্চর্যের বিষয় ছিল সারার জন্য।

তিনমাস কেঁটে গেল জীবন থেকে।সারাকে তানিরা একটা টিউশনি খুঁজে দিয়েছিল। টিউশনি আর তানিদের সহায়তায় সারার ভালোই চলছিল।সারার পড়াশোনাটাও ভালোই হচ্ছে সবার সহায়তায়।তবে তার চলার পথে কষ্ট যে হয়নি এটা বললে ভুল হবে।

‘ আপু আমি বাড়ি যাবো।’ সারা আমতা আমতা করে বলল।

তানি ভ্রু কুঁচকে বলে, ‘ বাড়ি যাবি মানে! কার বাড়ি? ‘

সারা মিনমিনে গলায় বলল, ‘আমার বাড়ি।’

তানিরা সবাই রেগে গেল সারার এহেন কথায়।মেয়েটা বলে কি? এখন নাকি নিজের বাড়ি যাবে।বাড়ি গেলেই পরিবারের মানুষগুলো ধরে বেধে বিয়ে দিয়ে দিবে। পালানোর শখ জন্মের মত ঘুচোবে এই মেয়ের। সব বুঝেও কেন মেয়েটা যেতে চাইছে বাড়ি?তানি গলাটা কঠিন করে বলে,

‘মাথা তাথা কি খারাপ হয়ে গেছে তোর? বাড়ি ফিরলেই তো তোকে ঐ ফাজিল ছেলেটার কাছে বিয়ে দিয়ে দিবে। সব বুঝেও কেন যেতে চাইছিস?’

সারা হঠাৎ ডুকরে কেঁদে উঠল।তানিরা সবাই বিচলিত হয়ে সারার পিঠে,মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বাড়ি যাওয়া ঠিক হবেনা, এটা সেটা বলে বোঝাতে লাগলো।

সারা কান্নামিশ্রিত গলায় বলল,
‘আপু আমার মা আমার চিন্তায় চিন্তায় হয়তো মরেই যাবে।তিন মাস হয়ে গেল মা কেমন আছে জানি না।পালিয়ে আসার কারণে মাকেই বেশি কটু কথা শুনতে হচ্ছে ,সবাই মাকেই বকাঝকা করেছে এই ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। মায়ের জন্য খুব কষ্ট হচ্ছে আমার।এভাবে আমি থাকতে পারছিনা।তাই আমি বাড়ি ফিরতে চাইছি।মায়ের সাথে দেখা করেই আবার ফিরে আসবো এখানে।’

তানি বিষ্ময়কর কন্ঠে বলল,
‘তোর ভয় হচ্ছে না? তোকে যদি বিয়ে দিয়ে দেয়?’

সারা কিছু একটা ভেবে বলল,
‘তিনমাস হয়ে গেছে।সব জেনেশুনে ফুপি, ফুপা আমায় আর তার ছেলের বৌ করতে চাইবেনা।’ কথাটা বলে সারা তানিদের দিকে তাকালো অনুমতি পাবার জন্য।

তানির মন কিছুতেই চাইছেনা সারাকে বাড়ি পাঠাতে।বাড়ি ফিরলে যদি ওকে ধরে বেধে ঐ ফাজিল ছেলেটার কাছে বিয়ে দিয়ে দেয়? তাহলে তো ওর সারাজীবনের লাইফ নষ্ট হয়ে যাবে!
হাফসা তানির কানেকানে ফিসফিস করে বলল, মেয়েটা যখন যেতে চাচ্ছে, যেতে দে।দু’দিন থেকে আবার ফিরে আসবে।আর তিন-তিনটা মাস পেরিয়ে গেছে ওর পরিবারের মাথায় এখনো বিয়ের ভূত আছে বলে তো মনে হচ্ছেনা।যার সাথে বিয়ে হওয়ার কথা ছিল তার বাবা, মা-ই আর চাইবেনা পালিয়ে যাওয়া মেয়ের সাথে ছেলের বিয়ে দিতে হুম… যতই আত্মীয়তার সম্পর্ক থাকুক।

তানি ইতস্তত করে বলল, তারপরও….

হাফসা আশ্বস্ত করে বলল, উহ!আর না করিসনা। অনুমতিটা দিয়ে দে।
তানিরা কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
আচ্ছা ঠিক আছে যাস।কবে রওনা দিবি?

তানিদের কাছ থেকে অনুমতি পেয়ে সারা খুব খুশি-ই হলো।তবে খুশিটা তার চেহারায় প্রকাশ করলনা।স্বাভাবিক গলায় বলল,
‘কালকে সকালের ট্রেনে যাবো।’

‘আচ্ছা এখন তাহলে ঘুমিয়ে পর।কালকে আবার সকাল সকাল উঠে গোছগাছ করতে হবে।’ তানি বলল।

সারা বিছানায় শুয়ে ভাবছে, কেমন হবে তার বাড়ির পরিবেশ?তাকে দেখে বাবা নিশ্চয়ই রেগে যাবে?রাগুক! তবুও সে সবার মুখোমুখি হবে।একদিন না একদিন তো মুখোমুখি হতেই হতো, তবে সেটা কাল-ই হোক।

সকালে ঘুম থেকে উঠেই গোছগাছ করে নিল সারা। তানিরা-ও গোছগাছ করতে সাহায্য করল। সকাল সকাল উঠে সারার জন্য রান্না-ও করল।কিছু মুখে দিয়ে সারা স্টেশনে যাওয়ার জন্য রওনা হলো সাথে তানিরা সবাই সারাকে পৌঁছিয়ে দিতে এল স্টেশনে।

‘সারা কোনো প্রবলেম হলে আমাকে ফোন করে জানাস। ‘ তানি বলল।

সারা মাথা ঝুলিয়ে হ্যাঁ বলল।

অনি বলল, ‘দেখেশুনে যাস সারা।আর জলদি ফিরে আসিস।’

সারা মুচকি হ্যাঁ বলে সবাইকে জড়িয়ে ধরল।সবাই সারার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ি ফেরার জন্য রওনা হলো।ওদের-ও ভার্সিটি যেতে হবে।

ট্রেন ছাড়তে আরো বিশমিনিটের মতো বাকি আছে।সারা হাতল ধরে ট্রেনের ভেতর ঢোকার জন্য উদ্ধত হতেই, সে শুনতে পেল কেউ চিৎকার করে তার নাম ধরে ডাকছে।চিৎকারের উৎস খুঁজতে ট্রেন থেকে নামতেই অবাক হয়ে গেল।রোহান ট্রেনের জানালার সামনে তার নাম ধরে ডেকে ডেকে তার খোঁজ চালাচ্ছে।

সারা বিরবির করে বলল,
‘অদ্ভুত! ‘

সারা রোহানের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।রোহান তখনো ওর নাম ধরে ডেকে ডেকে ওর খোঁজ চালাতে ব্যস্ত ছিল।বিধায় ওকে দেখতে পায়নি।উদ্ভ্রান্তের মতো দেখাচ্ছে রোহানকে।প্রিয় জিনিস হারিয়ে গেলে যেমন কষ্ট হয় ঠিক তেমন। সারা চোখমুখ কুঁচকালো।এই তিন মাসেও রোহান ছেলেটা ওর জন্য এটা সেটা নিয়ে হাজির হয়ে যেত ফ্ল্যাটে ।কখনো খাবার, কখনো বা ওর দরকারি জিনিস।ওর প্রয়োজনগুলো রোহান ছেলেটা আগে থেকেই কিভাবে যেন জেনে ফেলত আর যথাসময়ে হাজির হয়ে যেত ওর প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে।আর বলত বাবা পাঠিয়েছে তোমার জন্য।তবে সারার বিশ্বাস হয়নি।রায়হান সাহেব পাঠালে তো রিফাকেই পাঠাতে পারে,দুইদিন পর পর রোহানকে কেন পাঠাবে?তা-ও আবার মেয়েদের ফ্ল্যাটে।এতেই সারার সন্দেহ হয় রোহানের উপর।ছেলেটা কেন ওকে নিয়ে এত মাতামাতি করে তা বুঝে আসেনা সারার।
সারা শান্তগলায় বলল,

‘আপনি এখানে কি করছেন? আর আমার নাম ধরে ডাকছেন কেন?’

রোহান সারার গলা শুনতে পেয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল সারার দিকে। তারপর দাঁতে দাঁত চেঁপে বলল,

‘আগে বলো,তুমি কোথায় উড়াল দিচ্ছেলে?’

‘বাড়ি যাচ্ছি।’

‘তুমি তো খুব অসভ্য মেয়ে।চলে যে যাচ্ছো একবার-ও কি বলেছিলে আমাকে?’ রোহান বিষ্ময়ভাব নিয়ে বলল।

‘ আপনাকে কেন বলতে হবে?’

সারার প্রশ্নের প্রত্যুত্তর করলনা রোহান। হাতটা মাছি তাড়ানোর মতো ভাব করে বলল,
‘ঠিক আছে আমিও যাবো তোমার বাড়ি।’

সারা চোখদুটো বড়বড় করে বলল,
‘ ফাজলামো হচ্ছে আমার সাথে?’

রোহান স্বাভাবিক গলায় বলল, ‘একদম-ই না।’

সারা রোহানকে পুরোপুরিভাবে ইগ্নোর করে ট্রেনের সিটে গিয়ে বসে পরল।

চলবে,
@Nusrat Hossain

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here