আলো আঁধারের খেলা পর্ব ৭

0
129

#আলো_আঁধারের_খেলা
#Part_7
#লেখনীতে_Nusrat_Hossain

মায়ের কোলে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে সারা।চোখের কোণ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পরছে।সুরাইয়া খাতুন মেয়ের গালে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।সারা বাড়িতে পা রাখতে না রাখতেই হাসান আহমেদ তেড়ে এসে সারার গালে চটাস চটাস করে ইচ্ছমতো চড় মেরে নিজের ভেতরে জমিয়ে রাখা ক্ষোভটাকে ঝেড়েছেন।মেয়েটা টুঁশব্দ পর্যন্ত করেনি। ঠায় দাঁড়িয়ে বাবার দেওয়া চড়গুলো গালে মেখে নিয়েছে।শেষে সারার জেঠা আর কাকা এসে ভাইকে তোড়জোড় করে থামায়।

‘তো ঐখানে গিয়ে বয়ফ্রেন্ড জুটিয়েছিস কয়টা?’

গলা শুনে সারা মায়ের কোল থেকে মাথাটা উঠিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির দিকে তাকালো।টি-শার্ট, ঢোলাঢালা প্লাজোতে মেয়েটাকে আরো বাচ্চা বাচ্চা লাগছে।মেয়েটি সারার চাচাতো বোন শিমু। শিমু এবার ক্লাস নাইনে পড়ে। তবে বাড়ির মেয়েদের মধ্যে শিমু মেয়েটাই সবথেকে বেশি চঞ্চল আর ঠোঁটকাটা স্বভাবের।চোখেমুখে দুষ্টুমির আভা শিমুর।সারা শিমুর দিকে পিটপিট করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মুচকি হেঁসে শিমুর কান টেনে ধরে বলল,
‘পাজি কোথাকার! তুই জানিস আমি কোথায় ছিলাম?’

শিমু আহত ভঙ্গিতে আ্ আ্ করে বলল, এটা পেট থেকে কথা বের করার টেকনিক ছিল।আর আমি কিভাবে জানবো তুই কোথায় ছিলি।আহ…ছাড়না প্লিজ কানে লাগছে তো…

সারা কান ছাড়লোনা। কানটা আরো চেঁপে ধরে দুষ্টুমি স্বরে বলল, ‘এই আমি তোর বড় না ছোট? কতবার বলেছি আমায় আপু বলে ডাকবি।আগে আপু বল নাহলে কান ছাড়বোনা।’

শিমু কাঁদো কাঁদো চেহারা বানিয়ে বলল, আপু…

সারা কানটা আরো জোড়ে টেনে বলে উঠে, ‘এমনে হবেনা।ভালোভাবে বল।’

শিমু ঠোঁটজোড়া ফুলিয়ে বলল,
আপু ছেড়ে দাও প্লিজ….

‘দিলাম ছেড়ে।’ সারা শিমুর কান ছেড়ে বলল।

শিমু কানে হাত বুলাতে বুলাতে বলল, ‘এ্যা…বজ্জাত মহিলা! পালিয়ে গিয়ে ডাইনি রূপে ফিরে এসেছে আমার গাঢ়টা মটকানোর জন্য।’

সারা চোখজোড়া ছোট ছোট করে হুশিয়ারি দৃষ্টিতে তাকালো শিমুর দিকে।শিমু সারার চাহনি দেখে ইনোসেন্ট ফেস বানিয়ে কানে দুইহাত দিয়ে বোঝালো আর বলবেনা,একদম চুপটি মেয়ে হয়ে থাকবে।

সারা ফিঁক করে হেঁসে দিল বোনের বাচ্চামোপানা দেখে।

সুরাইয়া খাতুন বসে বসে দুই বোনের খুনশুটি দেখছে। আর মিটমিট করে হাঁসছে।আগেও দুইবোন এভাবে সারাক্ষণ খুঁনসুটিতে মেতে থাকতো।আজ কতদিন পর মেয়েটাকে হাসতে দেখলেন সুরাইয়া খাতুন।ভেতরটা প্রশান্তিতে ভরে গেল। পরোক্ষণেই মনটা আবার কালো আঁধারে ছেয়ে যায় সুরাইয়া খাতুনের।বাবার হাতে এত মার খাওয়ার পর-ও মেয়েটা কি মিষ্টি করে হাঁসছে।সুরাইয়া খাতুন তাকিয়ে রইলেন মেয়ের হাঁসিমাখা চেহারাটার দিকে।

শিমু কান থেকে দুই হাত সরিয়ে বলল,
‘মেঝোমা তুমি এখন যাও।আমরা এখন দুইবোন মিলে আড্ডা দিব।আর প্রমিস করছি তোমাকে,তোমার মেয়ের পেট থেকে যা যা বের করব সব তোমার কাছে ট্রান্সফার করব।’

সারা চোখ পাকিয়ে তাকালো শিমুর দিকে।শিমু দাঁতপাটি বের করে হাঁসলো সারা আপুর সাথে খুঁনসুটি করতে খুব ভালো লাগে তার।সুরাইয়া খাতুন ফিঁক করে হেঁসে দিয়ে শিমুর উদ্দেশ্য বললেন, ‘ফাজিল একটা।’
তিনি বললেন, ‘আমিও তোদের আড্ডায় থাকতে চাই।’

‘থাকো মা সমস্যা নেই।’ সারা বলল।

শিমু সারাকে উত্তেজিত কন্ঠে বলল, ‘তাহলে শুরু করা যাক।এতোদিন কোথায় ছিলে?কি কি করেছিলে এই তিনমাস?’
শিমুর সাথে সাথে সুরাইয়া খাতুনের চেহারাতেও উত্তেজনা প্রকাশ পাচ্ছে।মেয়েটা কিভাবে,কোথায় ছিল সব জানতে ইচ্ছে করছে।সবকিছু জানার জন্য মেয়ের চেহারার দিকে আগ্রহ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন তিনি।

‘হ্যাঁ.. হ্যাঁ… সব বলব।আগে প্রমিস কর আমার কথা বলার মাঝখানে একটুও দুষ্টুমি করবিনা আর কথার বলার মাঝখানে বা-হাত ঢুকাবিনা?’ কথাটা বলে সারা প্রশ্নবিদ্ধ দৃষ্টিতে তাকালো শিমুর দিকে।

শিমু নাকটা ফুলিয়ে চেহারা পানসে করে বলল, ‘আচ্ছা যাও দুষ্টুমি করবোনা আর বা-হাতও ঢুকাবোনা।এখন জলদি বলো।’ শেষের কথাটা গাঁ-টা মৃদু ঝুলিয়ে উত্তেজিত হয়ে বলল শিমু।

সারা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলতে শুরু করল, আমি বাড়ি ছেড়ে পালাই রাহির সাহায্যে। তারপর সিলেটে চলে যাই্
‘ও মাই গড সিলেটে! তুমি এতদূর চলে গিয়েছলে আপু?’ শিমু রাজ্যের বিষ্ময় নিয়ে বলল কথাটা।শিমুর সাথে সাথে সুরাইয়া খাতুন-ও অবাক হয়ে গেলেন। মেয়ে এত দূর পালিয়ে গিয়েছিল! যে মেয়ে বাড়ি ছাড়া তেমন কোথাও বের হয়না সেই মেয়ে কিভাবে এতদূর পালালো?চোখেমুখে চিন্তা ভর করল সুরাইয়া খাতুনের।মেয়ের কথা শুনে, না জানি সামনে আরো কত অবাক হওয়ার বাকি আছে একমাত্র উপরওয়ালাই জানে…

সারা ধমকে শিমুর উদ্দেশ্যে বলল, ‘তোকে না বলেছি কথা বলার মাঝখানে বাহাত ঢুকাবিনা!এমন করলে বলবই না কিছু।’ শেষের কথাটা সারা গম্ভীর স্বরে বলল।

শিমু বিরক্তিকর গলায় বলল,
‘প্যারা…. তুমি এমন কথা বললে যে বাহাত না ঢুকিয়ে আর থাকতে পারলামনা।আচ্ছা যাও, আর বাহাত ঢুকাবোনা। এখন জলদি বলা শুরু করো প্লিজ।’ ইনোসেন্ট ফেস করে বলল শিমু।

সুরাইয়া খাতুন আগ্রহ ধরে রাখতে না পেরে বলল, ‘তুই বল তো সারা।আমি সবটা জানতে চাই।’

সারা আবারো বলতে শুরু করল,
সিলেটে রাহির ফুপির বাড়ি আমি সেখানেই উঠেছিলাম। তবে সেখানে দুইদিনের বেশি থাকা হয়নি।কথাটা বলে সারার চেহারাটা মলিন হয়ে গেল।মাকে কিছুতেই জানানো যাবেনা সেই বাড়িতে তাকে অসুস্থ অবস্থায় বের করে দেওয়া হয়েছিল।এটা জানলে মা খুব কষ্ট পাবে।

সুরাইয়া খাতুন জিজ্ঞেস করলেন, ‘দুই দিনের বেশি থাকা হয়নি কেন?কি হয়েছিল?’

সারা ঠিক এই ভয়টাই পাচ্ছিল।বলল, উনারা আমার থাকার জন্য অন্য একটা জায়গা ব্যবস্থা করেছিলেন।আমি সেখানেই উঠেছিলাম।

সুরাইয়া খাতুন থমথমে গলায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘কেন! ওরা কি তোকে থাকতে দেয়নি? বিরক্ত হচ্ছিল তোর উপর? বোঝা মনে হচ্ছিল ওদের তোকে? সুরাইয়া খাতুনের দৃষ্টিজোড়া টলমল করছে।

শিমু চোয়াল শক্ত করে বলল,
‘ সত্যি-ই কি ওরা তোকে বোঝা মনে করছিল আপু?’

মা আর শিমু এই দুইজন মানুষের কাছে সব সময় সব কিছুতেই ধরা পড়ে যায় সারা। চাইলেও এদের থেকে কিছু লুকিয়ে রাখতে পারেনা সে।আপন মানুষগুলো বুঝি এমনই হয় ….

‘উহ তেমন কিছুইনা।আঙ্কেল আন্টি খুব ভালো মানুষ। আমায় খুব স্নেহ করে তারা।উল্টো আমিই ওদের বাড়ি থাকতে চায়নি। আমার ভালো লাগেনি।তাই উনারা আমার জন্য একটা থাকার জায়গা ব্যবস্থা করে। উনাদের মেয়ের বন্ধুদের সাথে আমার থাকার ব্যবস্থা করে দেন।তিনমাস আমি ওদের সাথেই ছিলাম।মেয়েগুলো খুব ভালো জানো মা!ওদের কারণে আমি কলেজে ভর্তি হতে পেরেছি,পড়াশোনা করতে পারছি।’ সারা এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলল।

শিমু গাঢ় ঝুলিয়ে বলল, ‘ওহ আচ্ছা।’

সুরাইয়া খাতুন সারার গালে হাত বুলিয়ে বলল, ‘ওদের ভালো হোক, যারা আমার মেয়েকে প্রতিটা মুহূর্তে সাহায্য করেছে।’

মায়ের কথার প্রত্যুত্তরে সারা ছোট্ট করে বলল, ‘হুম।’

সারা মা বোনের সাথে গল্পে মেতে ছিল ঠিক তখনি রুমে এসে শিমুর ছোট ভাই সায়িম এসে বলল, ‘সারা আপু দাদি তোমায় যেতে বলেছে এক্ষুনি।শুধু একা যেতে বলেছে।’

সারা ঢোক গিলে মায়ের দিকে তাকালো।সুরাইয়া খাতুন বললেন, ‘ যা দেখা করে আয়।’

সারা গুটিগুটি পায়ে রেহেনা বেগমের রুমে ঢুকল।রেহেনা বেগম বিছানায় দুই পা ছড়িয়ে পান সাজাচ্ছিলেন। সারাকে দেখতে পেয়ে হাত দিয়ে ইশারা করে নিজের কাছে ডাকলেন।
সারা ইতস্ততভাবে রেহেনা বেগমের কাছে যেতেই রেহেনা বেগম কষে একটা চড় মেরে বসলেন সারার গালে।সারা গালে হাত দিয়ে টলমল দৃষ্টিতে দাদির দিকে তাকিয়ে রইল।
রেহেনা বেগম ক্ষিপ্ত স্বরে বললেন,
‘লাফাঙ্গা কোথাকার। অনেক লাফাইছিস। ভাবছস পার পায়া যাবি! কালই তোর বিয়া হইব জায়িফের সাথে।এখন দেখুম কেমনে লাফাস তুই।’
রেহেনা বেগম উচ্চস্বরে সবাইকে ডেকে বললেন, ‘এই…. ওরে ঘরবন্ধি করে রাখ।আর জানি পালাইতে না পারে।’

চলবে,
@Nusrat Hossain

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here