আলো আঁধারের খেলা পর্ব ৮

0
164

#আলো_আঁধারের_খেলা
#Part_8
#লেখনীতে_Nusrat_Hossain

‘মা… এক কাপ চা দিবে আমায়? মাথাটা ভীষণ ব্যথা করছে।’ সারা উচ্চস্বরে বলল।সকালে ঘুম থেকে উঠতেই মাথাটা কেমন চিনচিন করে ব্যথা করছে সারার।এই মুহূর্তে এক কাপ কড়া লিকারের চা পান করলে মাথা ব্যথার যন্ত্রনা থেকে হয়তো মুক্তি পাওয়া যাবে।

রেহেনা বেগমের কথায় সত্যি সত্যি হাসান আহমেদ সারাকে ঘরবন্দি করে রেখেছে কালকে রাত থেকে।সারাও চুপচাপ পরিবারের দেওয়া যন্ত্রনাগুলো সব সহ্য করছে।শিমুর কাছ থেকে শুনেছে কালকে রাতে সবাই তার আর জায়িফের বিয়ে নিয়ে নাকি আলোচনা করেছে।ফুপা ফুপির সাথে আলোচনা করে সবাই সিদ্বান্ত নিয়ে বিয়ের ডেট ছয়দিন পর ঠিক করেছে।আরমাত্র ছয়দিন আছে তার আর জায়িফের বিয়ের!

মাথা ব্যথার যন্ত্রনায় সারা দুইহাত দিয়ে মাথাটা চেঁপে ধরে বসেছিল।এমন সময় সারার রুমের দরজা খুলে কেউ ভেতরে ঢুকে।সারা ভাবল মা এসেছে তার চা নিয়ে।তাই পেছনে ফিরে মায়ের জায়গায় জায়িফকে দেখতেই মাথায় যেন আগুন ধরে গেল সারার।নিজের ভেতরের ক্ষোভটাকে যথাসম্ভব নিয়ন্ত্রণে এনে নিল সারা।

বিয়ের পর আমার সাথে রোম্যান্স করবি কিভাবে সেই প্ল্যান করছিলি বুঝি….টান দিয়ে কথাটা বলেই বিচ্ছিরি একটা হাসি দিল জায়িফ।

সারা দাঁতে দাঁত চেঁপে মেজাজ সংবরণ করার চেষ্টা করছে।এমনিতেই মাথাটা দপদপ করছে তারমধ্যে আবার জায়িফের লাগামহীন কথাবার্তা সহ্য হচ্ছেনা সারার।

জায়িফ এসে গাঁ ঘেসে বসল সারার। সারা জায়িফের পাশ থেকে উঠে যেতে নিল।তবে জায়িফ তা হতে দিলনা।সারার হাতজোড়া একহাত দিতে শক্ত করে চেঁপে ধরল আর আরেক হাত দিয়ে সারার কমোর চেঁপে ধরে নিয়ে সারার আরো
গাঁ ঘেষে বসল জায়িফ।সারার গাঁ-টা কেমন ঘিনঘিন করে উঠল।এবার আর নিজের রাগটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলোনা সারা। সে রক্তাক্ত দৃষ্টিতে জায়িফের দিকে তাকাল।রাগে ক্ষোভে ফোঁসফোঁস করে বলল, ‘আমায় ছেড়ে দে।’ জায়িফ ছাড়লোনা। উল্টো নিজের বিচ্ছিরি হাসিটা সারার দিকে তাকিয়ে দিতে লাগে।জায়িফের বিচ্ছিরি হাসিটা যেন সারার কাঁটা গাঁয়ের নুনের ছিটার মতো লাগল।সারা ঢোক গিলে আবার ক্ষুব্ধ গলায় বলল,
‘আমায় ছেড়ে দে বলছি।’
এবারও জায়িফ সারার কথা শুনেও না শুনার ভান ধরে নিজের বিচ্ছিরি হাসিটা দিতে লাগে।

আয়ায়ায়ায়া কেউ আমায় বাঁচাও এই রাক্ষসটার হাত থেকে। মা……. আমায় বাঁচাও……
সারা কান্নামিশ্রিত গলায় গগনবিধারি চিৎকার দিয়ে বলতে লাগল।সারার এমন চিৎকার চেচামেচিতে জায়িফ খানিকটা ভরকে গেল।ইতিমধ্যে বাড়ির সবাই সারার চিৎকার শুনে হন্তদন্ত হয়ে সারার রুমে চলে এল।জায়িফ সবাইকে দেখে সারাকে ছেড়ে দিল।সারা দৌড়ে গিয়ে মাকে জড়িয়ে কাঁদছে। সুরাইয়া খাতুন মেয়ের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল, ‘ভয় পাসনা মা আমি আছিতো। কিছু হবেনা।’

সারা কান্নামিশ্রিত গলায় বলল,
‘আজকেও জানোয়ারটা নোংরাভাবে আমায় স্পর্শ করেছে মা।আমার শরীর খুব ঘিনঘিন করছে মা।আমার শরীরটা তুমি কেঁটে ফেল মা।এমন নোংরা স্পর্শ নিয়ে আমি বাঁচতে চাইনা আর।’
সুরাইয়া খাতুন শক্ত করে মেয়েকে বুকের সাথে চেঁপে ধরলেন।উনার সাধ্য থাকলে এক্ষুণি মেয়েকে নিয়ে এক কাপড়ে বের হয়ে যেতেন।কিন্তু তিনি অপারগ।

‘তুমি কেন মরবা? মরবো তো এই জানোয়ারটা।’
সবাই শিমুর হাতে বটি দেখে ভরকে গেল।শিমু রক্তাক্ত দৃষ্টি নিয়ে বটি নিয়ে জায়িফের দিকে তেড়ে যেতেই রেহানা বেগম চিৎকার করে বলল,
‘কেউ এই বজ্জাত মাইয়াটারে ধর। আমার নাতি মাইরা ফালাইল।’
শিমুর মা সায়মা, জেঠি মালিহা,আর শিমুর বাবা আজিজ শিমুকে শক্ত করে চেঁপে ধরলেন।শিমুর সাহস দেখে সবাই হতভম্ব।

শিমু মেয়েটাকে পাত্তা না দিয়ে জায়িফ রক্তাক্ত দৃষ্টিতে সারার দিকে একপলক তাকিয়ে রুম থেকে হনহন করে বের হয়ে গেল।

রেহানা বেগম ছোট ছেলে আজিজুলের দিকে তাকিয়ে হুশিয়ারি দৃষ্টিতে ক্ষুব্ধ গলায় বললেন,
‘আজিজ্জা তোর এই বজ্জাত মাইয়ারে সামলা নইলে এই ছেমরিরে আমি গেট্টি ধইরা বাইর করুম বাড়ি থিকা।’

‘শয়তান বুড়ি তোর বাড়ি আমি থাকতেও চাইনা।আম্ শিমু আরো বলতে যাচ্ছিল আজিজ মেয়েকে ধমকে সেখান থেকে নিয়ে গেলেন।

রেহানা বেগম বিরবির করে বললেন বজ্জাত মাইয়া কোনহানকার…
তারপর তিনি মুখ ভেংচি দিয়ে সারার উদ্দেশ্যে বললেন,
‘নাটক!বিয়া না করার নতুন ফন্দি। বুজলি হাসান তোর মাইয়া বিয়া না করার জন্য ফন্দি আঁটছে। বিয়া না করার জন্য নতুন নাটক খাড়া করসে।মাঝখান দিয়া আমার নাতিটারে খারাপ বানাইলো তোর মাইয়া।’

সারা তখনো মাকে জড়িয়ে ধরে চোখের পানি ফেলছিল।
হাসান আহমেদ সারার দিকে তেড়ে গিয়ে গলা শক্ত করে বললেন,
‘দুইদিন পর যার সাথে বিয়ে সে যদি একটু কথা বলতে আসে তাহলে এত কান্নাকাটির করার কি আছে? দুনিয়ায় কি তুই একটাই মেয়ে? আর কি মেয়ে নাই। আর মেয়েদের কি বিয়ে হয়না?তোর ভাগ্যে ভালো যে সব জেনে শুনেও তোর ফুপি তোরে নিজের বাড়ি বৌ করতে চাইছে। আমি আর কোনো অশান্তি চাইনা।নিজের ভালো চাইলে বিয়েতে রাজি হয়ে যা।না হইলে তোরে আমি ত্যাজ্য করব বলে রাখলাম।’ বলেই রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন হাসান আহমেদ ।

রেহানা বেগম-ও কিছুক্ষণ ক্রুব্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে সুরাইয়া খাতুনের উদ্দেশ্যে বললেন,
‘নাটক শেষ হইলে এহন বাইর হও রুম থিকা।’
সুরাইয়া খাতুন মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বের হয়ে গেলেন রুম থেকে।দরজাটা বাহির থেকে তালা লাগিয়ে দিয়ে রেহানা বেগমও চলে গেলেন।

সারা চোখ মুছে বিরবির করে বলল, ‘বিয়ে করবোনা। মরে গেলেও না।’
____________

‘আসতে কোনো কষ্ট হয়নি তো তোমার আব্বু?’

‘না মামা কষ্ট হয়নি।আপনি ভালো আছেন? বাড়ির সবাই ভালো আছে?’

আমরা সবাই ভালো আছি।তোমার বাবা মা রিফা আসলোনা যে?

‘মামা আমি এখানে একটা কাজে এসেছি।’

‘ওহ আচ্ছা।ভোর রাতে তোমার কল পেয়েই ছুটে এসেছি স্টেশনে।’

‘আমার খুব খারাপ লাগছে মামা। আমার জন্য আপনার ঘুমটা নষ্ট হয়ে গেল।’

দূর…..তুমি জানো আমি কত খুশি হয়েছি তুমি আমার বাড়ি আসছো শুনে। ভাবছি সূর্য টা কোনদিক দিয়ে উঠেছে।যাকে নাকি হাতেধরেও কোনোদিন আমাদের বাড়িতে আনতে পারিনি।সে আজ আমাদের বাড়ি নিজ ইচ্ছায় এসেছে ভাবা যায়…তুমি আসবে শুনেই তোমার মামি রান্নাবান্না চড়িয়ে দিয়েছে।চলো বাড়ি যাই।বাড়ি গিয়ে নাস্তা করে একটা ঘুম দিবে।সারারাত ট্রেনে ঘুম হয়নি নিশ্চয়ই…

মামার কথা শুনে রোহান ক্লান্ত চেহারায় ঠোঁট কামড়ে হাসলো।

নাসিম হোসেন ভাগ্নের লাগেজটা হাতে নিয়ে গাড়িতে উঠলেন। রোহান-ও গাড়িতে উঠে স্টেশন থেকে মামার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলো।

নাসিম হোসেন আর রোহান বাড়িতে ঢুকতেই নাসিম হোসেনের স্ত্রী পুষ্পা হন্তদন্ত হয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন।

রোহান মামিকে সালাম জানালো।পুষ্পা রোহানের সালামের জবাব নিয়ে বলল,

‘আব্বু আমি খুব খুশি হয়েছি তুমি আসছো।অনেকদিন থাকতে হবে কিন্তু…এখন যাও ফ্রেশ হয়ে এসো। আমি নাস্তা রেডি করে রেখেছি তোমার জন্য।’

‘মাফ করবেন মামীমা এখন নাস্তা করবনা।সারারাত ট্রেনে ঘুম হয়নি। খুব ক্লান্ত আমি.. একটু ঘুমোতে চাই।’

পুষ্পা রোহানের চেহারার দিকে তাকালেন। ছেলেটার চোখজোড়া-ই বলে দিচ্ছে সারারাত ঘুমোতে পারেনি।ক্লান্ত দেখাচ্ছে রোহানকে।তিনি আর দেরি না করে রোহানকে থাকার রুম দেখিয়ে দিলেন।রোহান-ও ফ্রেশ হয়ে নিজের ক্লান্ত গাঁ-টা বিছানায় এলিয়ে দিল।ঘুম থেকে উঠেই রাহির সাথে খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা বলতে হবে।পরিকল্পনা করতে করতে রোহান ঘুমিয়ে গেল।

চলবে,
@Nusrat Hossain

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here