আলো আঁধারের খেলা পর্ব ৯

0
135

#আলো_আঁধারের_খেলা
#Part_9
#লেখনীতে_Nusrat_Hossain

সারার কাছে মনে হচ্ছে দিনগুলো কেমন দ্রুত চলে যাচ্ছে। তিন-তিনটা দিন চোখের পলকেই চলে গেল সারার।বিয়ের মাত্র আর তিনদিন বাকি আছে।কালকে রাতে রাহি কল করেছিল। সবথেকে অবাক হয়েছিল তখন, যখন কল রিসিভ করতেই রোহানের গলা শুনতে পেল।যেদিন সে এসেছিল তার রাতের ট্রেনেই নাকি রোহান এসেছে।এই ছেলে এতদূর তার জন্য চলে আসবে সেটা সারা নিজের ভাবনাতেও আনেনি।ফোন রিসিভ করতেই রোহান তাকে বেশ ধমকের উপরে রেখেছে।গালাগাল করে জায়িফের চৌদ্দগুষ্টিও উদ্ধার করেছে।ওর তিনদিন পর বিয়ে সেই কথাও রোহানের কানে চলে গেছে।রাহির কাছ থেকে জেনেছে হয়তো।রোহান জায়িফের ত্রিশ বছরের রেকর্ড একে একে পড়ে শুনিয়েছে তাকে। এই তিনদিনের ভেতরেই রোহান জায়িফের সব খবর জেনে নিয়েছে ।রোহান নিজের প্ল্যানটা সারাকে শোনাল। সারা প্রথমে গাইগুই করলেও পরে জায়িফের শাস্তির কথা ভেবে রাজি হয়ে যায়। বাবার সাথেও একবার কথা বলা উচিত।যদিও জানে বাবা মানবেনা তারপর-ও শেষচেষ্টা একবার করা যাক। দেখা যাক বাবাকে মানাতে পারে কিনা! তাই সকাল হতেই শিমুকে দিয়ে বাবাকে ডেকে পাঠায় সারা।

‘আমি ইচ্ছে করলে পারতামনা এই বাড়ি আর না ফিরে আসতে।তবুও তো আমি এসেছি। সারাজীবন তো আর তোমাদের ছেড়ে থাকা আমার পক্ষে সম্ভবনা।তাই আমি বাড়ি ফিরে এসেছি আর আমি চাই এর একটা শেষ হোক।আমাদের মধ্যে সবকিছু ঠিক হয়ে যাক আব্বু। আব্বু আমিও তো তোমার মেয়ে তাইনা?কেন আমার জীবনটা অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছ?’
সারা একনাগাড়ে কথাগুলো বলল।

হাসান আহমেদ মেয়ের কথাশুনে বললেন,
‘আম্মার ইচ্ছা তোর বিয়ে জায়িফের সাথে হবে।আর আম্মা বাঁচবেই বা কয়দিন! তাই
আমি চাই তোর বিয়ে জায়িফের সাথেই হোক।’

সারা ধরা গলায় বলল,
‘তোমার আম্মার কয়দিনের বাঁচার জন্য, আমি সারাজীবন যন্ত্রনায় ভুগবো ? এটাই কি চাও তোমরা? কিন্তু আমি তো চাইনা সারাজীবন যন্ত্রনায় ভুগতে!আমার লাইফটা যে শেষ হয়ে যাবে আব্বু সেটা কেন দেখছোনা?’

হাসান আহমেদ মেয়ের কথা শুনে আশ্বস্ত স্বরে বললেন,
‘জায়িফ এখন হয়তো এমন! দেখবি, বিয়ের পর একদম ঠিক হয়ে যাবে।আর ছেলে মানুষ একটু আধটু এমন করেই, বিয়ের পর এরা সংসারী হয়ে যায়।’

সারা কান্নামিশ্রিত গলায় চিৎকার করে বলল, একটু আধটু এমন করে, বলে বলেই তোমরা আমার লাইফটা শেষ করে দিচ্ছ।সারা চোখমুছে বলল, আচ্ছা তোমার কথা মানলাম বিয়ের পর ঠিক হয়ে যাবে।আর যদি ঠিক না হয় তো? তার দায়ভার কে নিবে? আমার জীবন নষ্ট করার দায়ভার কে নিবে? তুমি নিবে দায়ভার? তোমার আম্মা নিবে? আমার জীবন নষ্ট করার দায়ভার!’

হাসান আহমেদ মেয়ের কথা না শোনার ভান করে রুম থেকে বেরিয়ে যেতে নিলেন। সারা ধরা গলায় হাসান আহমেদকে পেছন থেকে ডেকে বলল,
‘আব্বু!’

হাসান আহমেদ সারার ডাকে পেছনে ফিরে তাকালেন।

‘দরজাটা খোলা রেখে যাও। নিশ্চিন্ত থাকো আমি আর পালাবোনা।’

হাসান আহমেদ মেয়ের দিকে একপলক তাকিয়ে দরজাটা খোলা রেখেই রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন।

হাসান আহমেদ চলে যাওয়ার পর সারা ডানহাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখের পানি মুছে বিরবির করে বলল,
‘এরপর যা হবে তারজন্য সর‍্যি আব্বু।আমি এটা করতে চাইছিলামনা তবে তোমরা আমায় বাধ্য করলে করতে।’

সারা ফোনটা হাতে নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল রাহিকে কল করার জন্য। রুমে কথা বলা যাবেনা। কেউ যদি রুমে ঢুকে শুনে ফেলে তাহলে শেষ।রাহি ফোন রিসিভ করেই বলল,
‘হ্যালো সারা রোহান ভাইয়ার সাথে কথা বল।’

সারা রাহিকে কিছু একটা বলতে নিচ্ছিল তার আগেই রাহি
নিজের কান থেকে ফোনটা সরিয়ে নিয়েছে।সারা চাইছিলনা রোহানের সাথে কথা বলতে। সে কথাটা রাহিকে বলবে ভেবেছিল।কানে ফোন নিয়ে সারা দাঁড়িয়ে থাকলো।কিছুক্ষণ পর তার কানে একটা গম্ভীর গলার আওয়াজ এল।

‘কেমন আছো?’ রোহান জিজ্ঞেস করল।

সারা ছোট্ট করে বলল, ভালো।সারা ইতস্ততবোধ করছে রোহানকে জিজ্ঞেস করবে না-কি রোহান ভালো আছে কিনা। এদিকে রোহান-ও চুপ মেরে আছে।সারা ইতস্তত করে বলল,

‘আপনি? ‘

‘আপনি কি?’ রোহান সারার কথাটা না বুঝতে পেরে জিজ্ঞেস করল।

সারা অস্ফুটস্বরে বলল,
‘আপনি কেমন আছেন? ‘

আমি ভালো নেই…

সারার রোহানকে৷ জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করল কেন ভালো নেই।তবে তাকে আর কষ্ট করে জিজ্ঞেস করতে হলোনা। রোহান-ই তাকে বলে দিল।

‘চিন্তা হচ্ছে প্ল্যান যদি সাকসেসফুল না হয়! তোমার বিয়েটা যদি হয়ে যায়! আমি শেষ।’

সারা ভ্রু কুঁচকে বলল,
‘বিয়ে আমার টেনশনও আমার।বিয়ে হয়ে গেলে শেষ হয়ে যাবো আমি। আপনার এত চিন্তার কারণ তো দেখছিনা!’

রোহান ধমকে বলল, আমি চিন্তিত হবোনা? হবেটা কে শুনি? তোমার তেমন কেউ আছে নাকি? যে তোমার জন্য চিন্তায় মরে যাবে।অবশ্য মরে গেলে ভালোই হয় আমার রাস্তা ক্লিয়ার।আর আমি কেন চিন্তিত তোমার মোটা মাথায় যেহেতু গততিনমাসে ঢুকেনি তাহলে আজকেও ঢুকবেনা।’শেষের কথাটা বিদ্রুপ করে বলল।

রোহানের কথাটা ভুল।সারা রোহানের কর্মকান্ডগুলোতে বেশ বুজতে পেরেছিল রোহান ওর প্রতি ফল করে গেছে।তবে সারা ইচ্ছে করেই জেনেও না জানার ভাব ধরে থাকত।সারার ধারণা মানুষকে এত সহজে বিশ্বাস করতে নেই। মানুষের মুখের আড়ালে যে মুখোশটা লুকিয়ে থাকে সেই মুখোশটা চিনতে যদি ভুল হয় তাহলে সারাজীবন পস্তাতে হবে তাকে।আর রোহান হলো বড়লোকের ছেলে।রোহান তার মোহে পরে আছে তাই এসব করছে।দুইদিন পর মোহ কেটে গেলে তার প্রতি প্রেম ভালোবাসাও জানালা দিয়ে পালাবে।আর রোহান যদি তাকে সত্যিকারের ভালোবাসেও আজকে ভালো থাকলে, কালকে যে ভালো থাকবে তার গ্যারান্টি কি?আর মানুষের মন তো ক্ষনে ক্ষনে বদলায়। সারার এসব ধারণাই তার কাছে রোহানের ভালোবাসা,কেয়ার সব মাটির নিচে চাপা পড়ে গেছে।

সারা বলল, ‘ আশ্চর্য! কোন কথা থেকে কোন কথায় চলে গেলেন আপনি।যেটা বলতে ফোন করেছিলাম সেটাই তো বলা হলোনা, বাবার সাথে কথা বলেছিলাম বাবা মানেনি নিজের সিদ্বান্তে অটল।জানতাম মানবেওনা।তবে বাবা মানুক আর না মানুক জায়িফকে শাস্তি পেতে হবে। আচ্ছা ঐ মেয়ে কি রাজি হয়েছে?

‘মেয়েটা রাজি হলেও মেয়েটার পরিবার রাজি হচ্ছেনা সারা।’ রোহান বলল।’

‘জায়িফ স্কুল, কলেজের অনেক মেয়েকেই হ্যারাস করেছে।আচ্ছা ওদের পরিবারের সাথে কথা বললে কেমন হয়?’

‘আমি খোঁজ নিয়ে এদের মধ্যে কয়েকটা পরিবারের সাথে যোগাযোগ করেছি।কিন্তু মেয়েগুলো রাজি হলেও পরিবারের কেউ রাজি হচ্ছেনা। সবাই নিজেদের মান সম্মান হারানোর ভয় পাচ্ছে।তবে একটা মেয়ের পরিবার সিদ্বান্ত নিয়ে আমায় জানাবে বলেছে।ঐ মেয়েকে নাকি জায়িফ প্রেগন্যান্ট করে ছেড়ে দিয়েছে।’

‘আপনি কি জাইমা আপুর কথা বলছেন? আমাদের এলাকার জাইমা আপু?’

‘হ্যাঁ। তুমি জানো?’

‘হ্যাঁ কিছু কিছু শুনছিলাম।’

‘তোমার পরিবারের কানেও কথাটা গিয়েছিল নিশ্চয়ই? ‘

‘শুনেছে তো অবশ্যই যেহেতু সবাই আমরা এক এলাকার-ই।তবে আমার পরিবারের কেউ পাত্তা দেয়নি।জাইমা আপুর বাবা নিজেই খবরটা ধামাচাপা দিয়ে দিয়েছে।খুব মান্যগণ্য ব্যক্তি কিনা!আমার মনে হয়না এরা রাজি হবে।মান সম্মানের ভয়ে আপনাকে না বলে দিবে নিশ্চিত।’

তবুও আমি চেষ্টা করে দেখবো। যতযাইহোক তোমার বিয়ে হবেনা নিশ্চিন্ত থাকো।আর নিজের খেয়াল রেখো হুম।

সারা ছোট্ট করে বলল, হুম বলে ফোনটা রেখে দিয়ে রুমে চলে এল।

দেখতে দেখতে গাঁ-য়ে হলুদের দিন চলে এল। পাড়া প্রতিবেশী আত্মীয় স্বজন দিয়ে বাড়ি ভরে গেছে।পুরো বাড়িতে লাল, নীল আলো জ্বলছে। সারা আর জায়িফের গাঁ-য়ে হলুদের অনুষ্ঠান একসাথেই হবে।জায়িফ আর সারাদের বাড়ি যেহেতু পাশাপাশি । তাই রেহানা বেগমের কথায় গাঁ-য়ে হলুদের অনুষ্ঠান তার নিজের বাড়িতে একসাথেই হবে।

সারার রুমও কাজিনরা দখল করে নিয়েছে ।কাজিনরা তাকে ধরাধরি করে সাজানোর চেষ্টা করছে যার ফলে রাহিকে কল করার একটা সুযোগ পর্যন্ত পাচ্ছেনা সে।রাহি,রোহানের সাথে কথা বলাটা খুব প্রয়োজন।
শেষ পর্যন্ত যদি কিছু ঠিক নাহয় তাহলে সব শেষ হয়ে সারার…

চলবে,
@Nusrat Hossain

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here