উপসংহার পর্ব -০৪

0
45

#উপসংহার
#পার্টঃ৪
#জান্নাতুল কুহু (ছদ্মনাম)
বিয়ের দিন, বিয়ের আসরে বিধবা হলাম। লাল বেনারসিটার স্থায়িত্ব ছিলো কিছু ঘন্টা মাত্র। যাকে সারাজীবনের সঙ্গী বানাবো বলে ভেবেছিলাম, তাকে হারালাম মাত্র কয়েক ঘন্টা পরে। এরপর সমাজের চাপে লাল শাড়িকে বিসর্জন দিলাম বাকি জীবনের জন্য। কিন্তু আকড়ে ধরলাম শাড়ি নামক কয়েক গজের কাপড়কে। কারণ? কারণ তার পছন্দের ছিলো শাড়ি। চার বছর সম্পর্কে সে আমাকে কোনদিন শাড়ি পরিহিতা অবস্থায় দেখিনি। কিন্তু হয়তো তার নিজের স্বপ্নগুলোতে আমাকে শাড়ি পরিহিতা অবস্থাতেই নিয়ে গেছে। বিয়ের দিনে আমাকে প্রথম শাড়ি পরিহিতা অবস্থা দেখে। তার প্রথম কথা ছিলো, ” সর্বনাশ! মাশ আল্লাহ মাশ আল্লাহ। তুমি এরপর বাকি জীবনটা আমার সাথে শাড়ি পরেই কাটাবে। প্রতি মুহুর্তে যাতে আমার মনে হয় এই মেয়েটা আমার বউ। একান্তই আমার”
তার কথা আমি আজও রাখছি। আমি শাড়ি পরি সবসময়। কিন্তু তার কাছে একটা প্রশ্ন। আমাকে আজও তোমার বউয়ের মতো লাগে তো? নাকি তোমার বিধবার মতো লাগে?
শ্রাবণীর হাত থেমে গেলো। কলম চলছে না আর। চোখের কোনে পানি এসে জমছে। হাউমাউ করে কাঁদতে ইচ্ছা হচ্ছে। একজন মানুষ যে কতটা কাঁদাতে পারে সেটা শ্রাবণী আজও ভেবে চলে। সেই একজন মানুষ! একজন মানুষ তাকে আটটা বছর ধরে ক্রমাগত কাঁদিয়ে চলেছে। না না ভুল হলো। মানুষটা না। মানুষটার স্মৃতি, মানুষটার সাথে দেখা স্বপ্নগুলো। তার মৃত্যুর পরে মনে হয়েছিলো বাকিটা জীবন স্মৃতিগুলো আকড়ে কাটিয়ে দিবে। কিন্তু এখন মনে হয় যদি তার সাথে সাথে যদি তার স্মৃতিগুলোকেও কবর দেয়া যেতো হয়তো তাহলে বাঁচতো।
সে প্রায়ই শ্রাবণীকে জিজ্ঞেস করতো,

—শ্রাবণী আমাকে কতটা ভালোবাসো?

শ্রাবণী জবাবে হাসি উপহার দিতো। কারণ ভালোবাসার পরিমাপ করা যায় বলে তার মনে হয়না। তার হাসি দেখে ভ্রু কুচকে বলতো,

—আরে বলো না! কতটা ভালোবাসো?

সে উত্তর দিতো না। খুব ভালো লাগতো তাকে রাগাতে। তখন সে রহস্য করে বলতো,

—আমি চোখের আড়াল হলেও কি ভালোবাসবে? কি জানো প্রবল ভালোবাসাও কখনো কখনো প্রবল ঘৃণায় রূপান্তরিত হয়। আবার একসময় পাগলের মতো যাকে ভালোবাসি তাকে পৃথিবীর সব থেকে বিরক্তির মানুষ মনে হয়। আমার সাথে কখনো এমন হবে না তো?

মানুষটার এমন পাগলামি কথাবার্তা শুনে শ্রাবণী হেসে ফেলতো। অনেক জোরে জোরে হাসতো। হাসতে হাসতে চোখের কোনে পানি জমে যেতো। কেবল তার সাথে থাকলেই শ্রাবণীর চোখে হাসতে হাসতে পানি আসতো। আজ বহু বছর তা আর হয় না।
তখন হেসে উড়িয়ে দেয়া কথাগুলোই আজ কেমন বাস্তব মনে হচ্ছে। প্রবল দোটানা! তার জীবনটাই দোটানার।
শ্রাবণী কাগজটাকে ছিড়ে কুটিকুটি করে ফেলল। মনের কথাগুলো জানার অধিকার কারোর নেই। কাগজ কলমেরও না। স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের খাতা দেখতে বসলো আবার। খাতা দেখা শেষে অভ্যাসমতো সবার ঘরে উঁকি দিলো। হেমার ঘরে উঁকি দিয়ে দেখলো প্রতিদিনের মতোই কাঁথা গায়ে না দিয়েই শুয়ে পড়েছে। আবার টনসিল বাধাবে। শ্রাবণী কাঁথা টেনে দিয়ে হেমার মাথার কাছে বসলো। প্রতিদিনই কিছুক্ষণ বসে। হেমার গায়ে, মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। হেমার গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে শ্রাবণীর বুকের ভিতরে হু হু করে উঠলো। কি একটা বিশ্রি পরিস্থিতিতে পড়েছে হেমা! গত কয়েকদিন বাসায় এই সিয়ামের ঘটনা নিয়ে থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে। সিয়াম যে কেনো হেমার মতো মিষ্টি একটা মেয়েকে ছেড়ে তাকে বিয়ে করার জন্য জেদ ধরেছে সেটা বুঝছে না। হেমাও কেমন যেনো চুপচাপ হয়ে গেছে। কি করে যে সব ঠিক করবে বুঝে উঠতে পারছে না। শ্রাবণী উঠে যাওয়ার সময় হেমার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,

—তুই যে জেগে আছিস আর জেগে থাকিস তা আমি জানি। এতো রাত পর্যন্ত না জেগে ঘুমা।

শ্রাবণী আর পিছনে না ঘুরে চলে গেলো। শ্রাবণী চলে যাওয়ার পরে হেমা চোখ খুলে চোখ বড় বড় করে দরজার দিকে তাকিয়ে থাকলো। আপা যে বুঝে এটা সে কখনো টের পায়নি। আজ আপা না বললে টের পেতো বলেও মনে হয়না। আপার জন্যই সে মূলত প্রতিদিন জেগে থাকে। কখন আপার গায়ের গন্ধ নিবে। কখনো আপা মাথায় হাত বুলিয়ে দিবে সেই অপেক্ষা করে। এরপর সে ঘুমাবে। কিন্তু আপাকে কখনো বুঝতে দিতে চায়নি যে সে জেগে থাকে। তার সব পরিকল্পনা মাটিতে। হেমার ছোটবেলার কথা মনে পড়লো৷ যখন সে মা বাবার মাঝ থেকে উঠে আপার ঘরে এসে আপার গলা জড়িয়ে ঘুমাতো। বাবা-মায়ের মাঝে থাকলেও তার ভয় লাগতো৷ কেবল আপার কাছে থাকলে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারতো। তার জন্মের পরে মা অনেকদিন পর্যন্ত অসুস্থ ছিলো। শেষ বয়সের বাচ্চা হলে যা হয়। তখন আপাই তাকে কোলে পিঠে নিয়ে ঘুরতো। হেমা চোখ বন্ধ করলে মায়ের বদলে কেবল আপার চেহারাটা ফুটে উঠে। মানুষ নিজের সবচেয়ে দূর্বল মুহুর্তে মায়ের নাম নেয়।কিন্তু সে আপার নাম নেয়।

আপার কথা মনে হতেই সিয়ামের কথা মনে হলো। চোখের কোনে জ্বালা করতে শুরু করলো। মায়া বড্ড খারাপ জিনিস। মায়াকে ধ্বংস করার কোন উপায় থাকলে সে যেকোন মূল্যে সব মায়া শেষ করে দিতো। ভুল মানুষকে উদ্দেশ্য করে লেখা ৪০০টার বেশি চিঠি যদি দিনে একটা করেও পুড়িয়ে দেয় তাহলেও এক বছরের বেশি সময় লাগে। চার বছর ধরে প্রতিদিন একটু একটু করে স্বপ্ন আর মায়াগুলো গড়ে উঠেছে। মায়াকে মুছে ফেলতে এক বছর সময় লাগবে। কিন্তু সব মিথ্যা হতে এক ঘন্টাও লাগেনি। হেমা চোখ বন্ধ করে ভালো কিছু ভাবার চেষ্টা করলো। আপার জীবনটা হয়তো এবার সুন্দর হতে চলেছে। কিন্তু চোখ বন্ধ করে কষ্ট কমার বদলে আরো বেড়ে গেলো। রফিক নামের মানুষটার কথা মনে হতেই রাগ, কষ্ট একসাথে ঘিরে ধরলো। এতোটা খারাপ ভাবে কিভাবে কেউ কথা বলতে পারে? সেদিনের কাগজের দাম আজ দিতে রফিক ভাইয়ের আব্বার দোকানে দিতে গিয়েছিলো। অন্য দিন ঐ রাস্তা দিয়ে গেলেও রফিক ভাই একবার তার দিকে তাকিয়ে দেখে। আর যদি দোকানে যায় তাহলে কথা তো বলেই। সে যদি দোকানে নাও থাকে দোকানের কর্মচারী ছেলেটা রফিক ভাইকে ডেকে আনে। আজ যাওয়ার পরে ঘুরেও তাকায়নি। সে যখন বলল,

— মোট ৭৫ টাকা দাম হয়েছে। আমার কাছে খুচরা নেই। ১০০ টাকায় রাখেন।

অপরিচিতের মতো রফিক জিজ্ঞেস করলো,

—কি কি কিনবা? তারপর দামের কথা

হেমা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলো,

—কি কিনবো মানে? সেদিন যে টাকা না নিয়ে চলে গেছিলেন সেটা ভুলে গেছেন?

— ওটার দাম দেয়া লাগবে না

খানিক ঝাঁঝালো কন্ঠে উত্তর দিয়েছিলো,

— লাগবে না মানে কি? এগুলোর দাম না নিয়ে কি আমাকে দয়া দেখাচ্ছেন? আমার কোন দয়ার দরকার নেই। বুঝলেন?

রফিক তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে,

—দয়া তো তুমি আমাকে দেখাচ্ছো হেমা। কোন কিছু কিনলে দাম বেশি দেয়া, না কিনে দোকানে টাকা রেখে যাওয়া এগুলোর কোন খবর জানিনা ভেবেছো? শিক্ষিত বেকার বলে আমার উপর করুনা হয়? তুমি শুনে রাখো করুনা বা দয়া কোনটাই আমার দরকার নেই। দেশের নানা প্রান্তে দোকান না থাকলেও এই ভাঙাচোরা দোকান থেকে যা ইনকাম হয় তাতেই আলহামদুলিল্লাহ। তুমি এখন যেতো পারো।

অপমানে তখনই হেমার চোখে পানি আসছিলো কিন্তু কোনমতে আটকে বাসায় চলে এসেছে। কি এমন বলেছিলো সে? এতো খারাপ ভাবে কেন কথা বললো সে? একটু ভালো ভাবে কথা বলা যায় না তার সাথে? রফিক ভাই এতো নিষ্ঠুর কবে থেকে হলো? আগে তো এমন ছিলো না। বরং মুখ দেখে বুঝে যেতো তার মন খারাপ কিনা। রফিক ভাই কি জানে গত কয়েকদিন ধরে তার উপর দিয়ে কি কি বয়ে যাচ্ছে? জানলে কি এমন ভাবে কথা বলতো? হয়তো বলতো। রাগে, দুঃখে, অভিমানে হেমা কান্না করে দিলো।
পাশাপাশি দুই ঘরে থাকা দুই বোনের বালিশ রাতে অন্ধকারে ক্রমাগত ভিজতে থাকলো।
,
,
,
🌿
সকালে তাড়াহুড়োর মধ্যে স্কুলে যাওয়ার সময় শরিফা শ্রাবণীর রাস্তা আটকে বলল,

—আমার কিছু টাকা লাগবে

শ্রাবণী অবাক হলো। মাসের শুরুতে সংসারের আলাদা করে যা টাকা বাঁচে প্রায়ই সবটাই মাকে দিয়ে দেয়। এখন আবার টাকা? জিজ্ঞেস করলো,

— কত টাকা লাগবে? টাকা কেন লাগবে? মাসের শুরুতেই তো সব দিয়ে দিলাম।

শরিফা মুখ বাঁকিয়ে বলল,

— ৪০০০ টাকা। এখন দেখছি সব কাজের জন্য কৈফিয়ত দেয়া লাগবে! ছেলে থাকলে আর এটা হতো না। শাড়ি আর পাঞ্জাবি কিনবো।

—এখন শাড়ি পাঞ্জাবি কার জন্য? কিসের জন্য?

—হেমার বিয়ে ঠিক হচ্ছে। বেয়াই-বেয়াইন প্রায়ই আসে। তোর বাপের কোন ভালো পাঞ্জাবি নেই। আর আমারও একটা শাড়ি পছন্দ হয়েছে। ওটা কিনবো।

শ্রাবণী মায়ের দিকে আহত দৃষ্টিতে তাকালো। একটা সংসারকে টেনে নেয়া যে কত কষ্টের! তার সাথে বাড়ির লোন তো আছেই। শ্রাবণী বলল,

—গত ঈদে বাবার পাঞ্জাবিটা তো নতুনই আছে। বাবা তো পরেই না। আর তোমারও তো তিন চারটা নতুন শাড়ি আছে। ওগুলো দিয়ে নাহয় কাজ চালিয়ে নাও।

—বাপরে বাপ! একটা শাড়ি পাঞ্জাবি চেয়েছি বলে কত কথা! বাপ-মায়ের শখ আহ্লাদ থাকতে পারে সেটা তো ভুলেই গেছেন। আর শুধু তো শখ না। প্রয়োজনও। কামাই করে মাথা কিনে নিয়েছে একদম। শুধু আমাকে টাকা দেয়ার সময়ই যত অজুহাত। নিজে তো ঠিকই সব টাকা জমিয়ে রাখছে। থাক বাপু থাক৷ আর লাগবে না টাকা।

ক্লান্ত স্বরে শ্রাবণী জিজ্ঞেস করলো,

—আমি তোমাদের ছাড়া আর কোথায় টাকা খরচ করি মা?

—আমরা মরে গেলে তখন নিজের টাকা দিয়ে আয়েশ করিস।

শরিফা দ্রুত পায়ে বাড়ির ভিতরে চলে গেলো। শ্রাবণী দেখলো হেমা বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে। শ্রাবণী আলমারির চাবি হেমার হাতে দিয়ে বলল,

— ড্রয়ারে ২৫০০ টাকা মতো আছে। মাকে বাজারে নিয়ে যাস। আমি গেলাম। দেরী হয়ে যাচ্ছে।
নিজের হাতখরচের টাকাটা মায়ের হাতে তুলে দেয়ার ব্যবস্থা করে শ্রাবণী বাসা থেকে বের হয়ে গেলো।
——————————-
মিটিং এর মাঝে বাবা ফোন দেয়ায় সিয়াম বিরক্তি নিয়ে ফোনটা কেটে দিলো। আজকাল তার আর বাবার মাঝে কথা বলার একমাত্র বিষয়ই হচ্ছে বিয়ে। বিয়ে ছাড়া আর কোন কথা বাবার মুখে শোনা যায় না। এরপর আরো দুবার ফোন কেটে দেয়ার পরে তৃতীয় বার ধরলো। এতোবার ফোন করেছে নিশ্চয়ই কোন দরকার হবে। ফোন ধরার পরেই আকবার বললেন

— বারবার ফোন কেটে কেনো দিচ্ছো?

—মিটিংয়ে ছিলাম

—তোমার আম্মা কথা বলবে নাও

সিয়াম বিরক্ত হলো। এই কাজের সময়ে আম্মার আবার কি দরকার? সে ভেবেছিলো জরুরি কিছু। রোজিনা ফোন ধরে বলল,

— হ্যালো! শোন আমি হেমার জন্য একটা শাড়ি কিনেছি। তোর আব্বার কাজ আছে সেজন্য ওবাসায় যেতে পারবে না। তুই কাউকে দিয়ে পাঠানোর ব্যবস্থা কর।

ফোস করে নিঃশ্বাস ফেলে সিয়াম বলল,

— প্রথম কথা ওবাসায় তিনজন মেয়ে আছে। শাড়ি পাঠাতে হলে তিনটাই পাঠাবা নাহলে একটাও না। আর আজ সারাদিন আমার কাজ আছে। আমি যেতে পারবো না।

—তাহলে কে দিয়ে আসবে?

—আজই দেয়া লাগবে মা?

রোজিনা জেদ ধরে বললেন

—হ্যা আজই।

সিয়াম ক্লান্ত স্বরে বলল,

—আমি রাজিবকে পাঠাচ্ছি। ওর হাতে দিয়ে দিবা।

সিয়াম ফোন রেখে অফিসের পিওন রাজিবকে শাড়ির প্যাকেটটা অফিসে আনতে বলল। তার মায়ের উপর ভরসা নেই। দেখা যাবে একটা শাড়ি দিয়েছে।
টাকার হিসাবের একটা বড় গড়মিল সমাধান করার পরে শান্ত ভাবে শাড়িগুলো প্যাকেট থেকে বের করে দেখলো। একটা আলাদা প্যাকেটে দেয়া। হালকা কমলা রঙ। শ্রাবণীকে মানাবে। তাই শাড়ির উপর “শ্রাবণীর জন্য” লেখা কাগজ আটকে দিয়ে শ্রাবণীর বাসাতে পাঠিয়ে দিলো।
,
,
,
🌿
স্কুল আর তারপর প্রাইভেট পড়িয়ে বাসায় এসে গোসল করে বের হওয়ার পর বিছানার উপর একটা শাড়ির প্যাকেট দেখতে পেলো শ্রাবণী। কমলা রঙের সুন্দর একটা শাড়ি। উপরে তার নাম লেখা। শ্রাবণী বুঝলো এটা নিশ্চয়ই হেমার কাজ। হেমা বাজারে গেলে তার জন্য কিছু না কিছু আনে। কিন্তু ২৫০০ টাকার ভিতরে তার জন্যও শাড়ি কিনেছে? শাড়িটা শ্রাবণীর এতো ভালো লাগলো যে তখনই পরে নিলো। পিঠ জুড়ে ভেজা চুল ছড়িয়ে বসার ঘরে এসে দেখলো সিয়ামের মা বসে আছে। শ্রাবণী হাসি মুখে বলল,

—আসসালামু আলাইকুম চাচি।

রোজিনা তার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকালো। বলল,

—এই শাড়িটা? এই শাড়িটা তো আমি হেমার জন্য কিনেছিলাম।

শ্রাবণীর হাসিটা মিলিয়ে গেলো। শরিফা জিজ্ঞেস করলো,

—এটা আপনি হেমার জন্য কিনেছেন ভাবী?

—হ্যা। আমি তো ওই রাজিব ছেলেটাকে বলে দিলাম এই প্যাকেটটা হেমার জন্য। যেনো এটা আপনাদের বলে অবশ্যই। বলেনি?

শরিফা আমতাআমতা করে বলল,

—হেমা নিয়েছে এটা। নিশ্চয়ই শ্রাবণীর ভালো লেগেছে তাই পরে নিয়েছে।

— ছি ছি ছোট বোনের জিনিসের উপর নজর।

শ্রাবণী বুঝে উঠার চেষ্টা করছে আসলে হয়েছেটা কি? তার নাম লেখা ছিলো তো শাড়ির উপর। হঠাৎই শরিফা হুংকার দিয়ে বলে উঠলো,

— লোভি মেয়েছেলে! বোনের জিনিসের উপর নজর দিস! রঙ লেগেছে মনে তো? মা টাকা চাইলে তো মুখে খই ফোটে। জেরা শেষ হয়না। মা শাড়ি কিনতে চাইলে টাকা থাকে না হাতে। আর বিধবা হয়ে এই নতুন রঙিন শাড়ি পড়িস? খোল তুই শাড়ি।

শ্রাবণী স্তব্ধ হয়ে মায়ের কথা শুনছে। কিছু বুঝে উঠার আগেই শরিফা তার শাড়ির আঁচল ধরে টান দিলো । শ্রাবণী তৎক্ষনাৎ আঁচল ধরে নিলো। হেমা চা বানাচ্ছিলো। চিৎকার শুনে দৌড়ে আসে। শরিফার হাত থেকে আঁচল টান মেরে সরিয়ে শরিফাকে মৃদু ধাক্কা দেয় সে। চিৎকার করে বলে,

— আপার আঁচল ছাড়ো। আমার আপার গায়ে যদি আর হাত লাগিয়েছো তাহলে এখানে রক্তারক্তি কান্ড ঘটে যাবে একদম। আমি কোন কিছুর পরোয়া করবো না। একদম আগাবে না।

হেমার রুদ্রমূর্তি দেখে শরিফা ভয় পেয়ে গেলেন। ছোট মেয়ের এমন রূপ আগে কখনোই দেখেননি। তিনি পিছিয়ে আসলেন। রোজিনা বললেন,

—ছাড়েন ভাবী। শান্ত হন।

পাশের ঘর থেকে মাজিদ ক্রমাগত চিৎকার করে যাচ্ছেন,

—শরিফা ও শরিফা। কি হলো গো? এতো চিৎকার কেন?

উত্তর না পেয়ে আবার বলেন,

—শ্রাবণী? হেমা? কি হয়েছে? আমাকে কেউ নিয়ে চল ওই ঘরে।

হেমা কোন কিছুর পরোয়া না করে শ্রাবণীকে নিয়ে তার ঘরে চলে আসলো। শ্রাবণী এখনো স্তব্ধ হয়ে বসে আছে। হেমা শ্রাবণীকে জড়িয়ে ধরে বসে কান্না করছে। আজ তার ক্লাস করে আসতে দেরী হয়ে গেছে বলে মাকে নিয়ে বাজারে যেতে পারেনি। আর বলাও হয়নি যে আপা টাকা দিয়েছে। তাতেই মা এতো রেগে গেছে যে….
————-

হেমা অনেকক্ষণ চিন্তাভাবনা করার পরে সিয়ামের নাম্বারে ডায়াল করল। ওপাশ থেকে হ্যালো শুনতেই বলল,

—আমি হেমা বলছি। আপনার সাথে কিছু জরুরি কথা আছে। বাইরে কোন রেস্টুরেন্টে কাল ১১টায় দেখা করা সম্ভব?

—হ্যা সম্ভব।

—আমি ঠিকানা মেসেজ করে দিচ্ছি।

হেমা কথা না বাড়িয়ে ফোন কেটে দিলো। আপন মনেই বলল, আল্লাহ আপাকে কি দিয়ে তৈরি করেছো? এই মানুষটা কিভাবে পারে? বিকালে মায়ের এমন কাজের পরেও, আপা শরীরে ক্লান্তি নিয়ে মায়ের জন্য ডাল রান্না করছে কারণ মা ডাল ছাড়া খেতে পারে না তাই! আপা কি মানুষ?
,
,
,
🌿
অনেকক্ষণ চুপ থাকার পরে হেমা মুখ খুললো। সিয়ামের দিকে তাকিয়ে বলল

—আপনি জানেন যে আপা বিধবা। কিন্তু আপার বিয়েই হয়নি। (চলবে)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here