একটুখানি সুখ পর্ব ৩১

0
51

#একটুখানি_সুখ
#আনিশা_সাবিহা
পর্ব ৩১

“সামনে মা আর ডক্টর আছে স্বচ্ছ! কি করছেন? ছাড়ুন।”
ফিসফিস করে কথাগুলো স্বচ্ছের কানের কাছে বলে দিল মোহ। সাথে সাথে নিজের মায়ের দিকে তাকিয়ে স্বচ্ছ হাতের বাঁধন আলগা করে দিয়ে ছেড়ে গিয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে বলে,
“ডক্টর, মোহের হাতের কি খুব বেশি ক্ষতি হয়েছে?”

“নো মি. আহিয়ান। সি ইজ অলরাইট। হাতে সামান্য হাড়ের লেগেছে। হাড়ের জায়গা থেকে একটু নড়ে গেছে তাই হাতে ১৫ দিন ব্যান্ডেজ করা থাকলে ভালো হয়। আর আপনার মতো হাজবেন্ড পেলে অবশ্যই তার আগেও সুস্থ হয়ে উঠতে পারে।”
কথাগুলো বলে মুচকি হাসলেন ডক্টর। মোহ লজ্জায় মিইয়ে গেল সাথে সাথেই। স্বচ্ছ আড়দৃষ্টি নিক্ষেপ করল মোহের দিকে সাথে শুঁকনো কাশি দিলো সে। ডক্টর প্রেসক্রিপশন এগিয়ে দিয়ে বলে,
“এটা প্রেসক্রিপশন। কিছু মেডিসিন লিখে দিয়েছি ব্যথা দ্রুত সেড়ে যাওয়ার জন্য। সময় মতো খাইয়ে দেবেন আর সবসময় রেস্টে থাকলে ভালো হয়। বিশেষ করে হাতের ওপর যেন চাপ না পড়ে। এখন আমি আসি।”

ডক্টর উঠে দাঁড়ালে মিসেস. রেবাও উঠে দাঁড়ান। ডক্টরকে এগিয়ে দেওয়ার বাহানায় ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যান উনি। উনি বেরিয়ে যেতেই আর এক মূহুর্ত দেরি না করে স্বচ্ছের হাত দুহাতে চেপে ধরে মোহ আতঙ্কিত কন্ঠে বলে,
“এই বাড়িতে আমরা ছাড়া অন্যকেউ আছে জানেন? আর সে-ই আমার ওপর আক্রমণ করেছে। কে থাকে এ বাড়ি আমরা বাদে? যাকে আমি চিনি না?”

থতমত খেয়ে তাকায় স্বচ্ছ। মোহের চোখে ভয় ও উদ্বিগ্নতা। স্বচ্ছ জানতো এমন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে তাকে। কিন্তু এসবের কি উত্তর দেবে তা ভেবে রাখেনি সে। তবুও মাথা ঠান্ডা করে বলল,
“মানে? মোহ কি বলছো? আমরা ছাড়া এ বাড়িতে কে থাকবে? আমি, মা-বাবা, বাড়িতে যেই সার্ভেন্ট থাকে তারা। এই কয়জনই তো। আর কে থাকবে?”

“উঁহু না। সার্ভেন্টদের মধ্যেও কেউ ছিল না। আমার মনে আছে ওই ঝাঁকড়া এলোমেলো চুল, আর জ্বলজ্বল করতে থাকা হিংস্র চোখজোড়া। কিভাবে আমাকে মারতে ধেয়ে আসছিল। নিজেকে বাঁচাতে গিয়েই তো সিঁড়ি থেকে পড়ে গেলাম। ওই লোকটাই বোধহয় রাতেও এসেছিল জানেন তো? রাতেও ওই করিডোরের শেষপ্রান্তের বারান্দায় ওসব চিঠি লিখে রেখেছিল। আমার খুব ভয় করছে স্বচ্ছ।”

বেশ আকুতির সাথে কথাগুলো বলে স্বচ্ছের দিকে এগিয়ে আসে মোহ। ঘটনাগুলোর পর মুষড়ে পড়ছে সে। স্বচ্ছের চোখেও বাধ্যবাধকতা স্পষ্ট। কিন্তু মোহ আজ তা দেখতে পাচ্ছে না। তার মন সেদিকে নেই। মোহ আস্তে আস্তে গুটিয়ে নিচ্ছে নিজেকে। আস্তে করে স্বচ্ছের বুকে নিজের মাথা গুঁজে দেয় সে। সেখানেই চোখ বন্ধ করে বলে,
“জানেন? আমি যেন আজকে মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। ভেবেছি আর হয়ত এভাবে আপনার বুকে মাথা রাখতে পারব না। আমি বাঁচতে চাই স্বচ্ছ। এভাবে মরতে চাই না। অন্য পরিস্থিতি হলে হয়ত বলতাম না কথাটা। কিন্তু আপনি এমন একজন মানুষ যার সঙ্গে বাঁচতে ইচ্ছে করে। আমাকে বাঁচিয়ে নিবেন?”

স্বচ্ছের মন দোটানায় ভুগছে। কাঁপা কাঁপা হাতে নিজের হাতটা মোহের মাথায় রাখে স্বচ্ছ। যদি আর একটু দেরি হতো তাহলে কি হতো? যাকে স্বচ্ছ সুখের রানী করতে চেয়েছিল তাকে হারিয়ে ফেলতো! এর চেয়ে খারাপ আর কি হতো? স্বচ্ছ মোহের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
“কেন ভয় পাচ্ছো? আমি আছি তো। কেউ তোমার ক্ষতি করতে পারবে না। তার আগে নিঃশেষ হয়ে যাবে সেই ক্ষতির উৎস যে আমার সুখপাখির রানীর ক্ষতি করতে চায়।”

“এতোক্ষণ কোথায় ছিলেন আপনি? এই বাড়িতে সত্যিই কেউ থাকে আমার মনে হয়।”

“এটা তোমার কল্পনা মোহ। শুধুই কল্পনা। সব তোমার সাথে ঘটা কিছু বাজে ঘটনার প্রভাব। হুট করে তোমার মা-বাবার মারা যাওয়া, তারপর সব খারাপ পরিস্থিতির সম্মুখীন আবার হুট করেই বিয়ে। এসব কিছুর প্রভাব পড়ছে। তুমি সিঁড়ি থেকে পা পিছলে পড়ে গিয়েছে।”

মোহের মন তবুও মানে না। সে অস্থির হয়ে বলে,
“না। আমার কল্পনা নয়। আমি এতোটাও কল্পনার জগতে বাস করি না। আর রাতেও ওই লোকটাই হয়ত ছিল।”

“কোন লোকটা?”

“যে আমাকে আগেরবারও চিঠি দিয়েছিল ওটা সেই লোকটাই ছিল হয়ত। রাতে ওই লোকটাই তো আমাকে অজ্ঞান করে দিয়েছিল। জ্ঞান হারিয়েছিলাম আমি। আপনি আমাকে রাতে কোথায় পেয়েছিলেন?”

স্বচ্ছ থমথমে গলায় জবাব দেয়,
“কেন? তুমি তো ঘরেই ছিলে। ঘুমিয়ে ছিলে তুমি।”
আকাশ থেকে পড়ে মোহ। স্বচ্ছের বুক থেকে মাথা উঠিয়ে বিস্ফোরিত কন্ঠে বলে,
“কি বলছেন আপনি? আমার স্পষ্ট মনে আছে আমি ওই বারান্দায় গিয়েছিলাম আর ওই লোকটাা এসেছিলো। আর আপনি বলছেন আমি ঘুমোচ্ছিলাম?”

“হ্যাঁ তুমি ঘুমিয়ে ছিলে। আমি কি মিথ্যে বলছি? তুমি বলো? যদি তুমি সত্যিই ঘরের বাহিরে জ্ঞান হারিয়ে থাকতে তাহলে এখানে কি করে আসতে? আমি তো সারা রাত ঘুমিয়েই কাটিয়েছি।”

মুখটা আপনাআপনি হা হয়ে যায় মোহের। সে বিশ্বাসই করতে পারছে না যে সে ভুল। সে কি সত্যিই তাহলে ভুল ভাবছে? এবার মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে তার। কিছু না বুঝে নিজের মাথা ধরে দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে বলল,
“আমি…আমি কিছু বুঝতে পারছি না। কি হচ্ছে আমার সাথে?”

“এটা তোমার সাথে যা যা ঘটেছে তারই প্রভাব। তোমার মনে অনেক বাজে ইফেক্ট পড়েছে। সেটা দূর হওয়া প্রয়োজন। এখন নিচে যাই? তোমাকে খেয়ে কিছু ঔষধ খেতে হবে। রিমেম্বার? এই হলো এক জ্বালা। ২১ বছরের একটা বড় মেয়ে অথচ ঔষধ খেতে তোমার তালবাহানা! তোমাকে ঔষধ খাওয়ানো যে কি ঝামেলা উফফ…!”

চোখটা আরো দ্বিগুন বড় হয়ে যায় মোহের। স্বচ্ছও কথাগুলো বলে কেমন যেন ভ্যাবাচেকা খেয়ে যায়। ফ্যাকাশে মুখে মোহের দিকে দৃষ্টিপাত করে সে। মোহ সন্দেহী সুরে বলে,
“আপনি কি করে জানলেন? আমার ঔষধ খেতে একদমই ভালো লাগে না? আমি তালবাহানা করি?”

শুঁকনো ঢক গিলে স্বচ্ছ কিছুটা জোর দিয়ে উত্তর দেয়,
“ছোট ফুপি…ইয়েস ছোট ফুপি বলেছিলো। তার জন্য এভাবে গোয়েন্দাগিরি করার কি আছে? এভাবে তাকাও কেন? এভাবে তাকালে কিন্তু আমার মন অনেক কিছু ভেবে ফেলে।”

মোহ চিকন সুরে জিজ্ঞেস করে,
“কি ভাবে আবার আপনার মন?”

“মন বলে মেয়েটা নিশ্চয় ভালোবাসা চাইছে। আদর চাইছে। ওইযে ফিল্ম দেখো না? ইংলিশ রোমান্টিক ফিল্ম? মেয়েরা কিভাবে চেয়ে থাকে? যাকে হট লুক বলে? ঠিক তেমন লাগে তোমাকে।”

বাকরুদ্ধ হয়ে বসে থাকে মোহ। স্বচ্ছ স্বাভাবিক হয়ে মোহের দিকে তাকিয়ে থেকে মুচকি হাসে। মুখ লুকানোর জায়গা পায় না মোহ। পাথরের মূর্তির মতো বসে থাকে সে। পরক্ষণেই স্বচ্ছকে এক ধাক্কা দিয়ে বলে,
“দূর হন আপনি। অসভ্য লোকের সাথে বিয়ে হয়েছে আমার। যখন তখন আজেবাজে কথাবার্তা।”

স্বচ্ছ উচ্চস্বরে হেঁসে উঠে বলে,
“আমার সাদা মনে কোনো কাঁদা নেই। তুমি যা প্রশ্ন করলে আমি তোমায় উত্তরে বলে দিলাম। দ্যাটস ইট। এখন যদি আমার উত্তরে তোমার লজ্জা লাগে আমার কি করার থাকতে পারে বলো? অবশ্য যদি বলো তো তাহলে একটু ভালোবেসে লজ্জা ভাঙিয়ে দিই?”

“আপনি সত্যিই একটা মস্ত বড় বেয়াদপ আর লুইচ্চা লোক। আমি ফেঁসে গেছি।”

“যখন ফেঁসেই গেছো তখন ফেঁসেই থাকো আমার জ্বালে। তোমার মোহের জ্বালে তো আমাকে কবেই ফাঁসিয়ে নিয়েছো। এবার না হয় আমার জ্বালেও ফেঁসে থাকো।”

মোহ মৃদু হাসে। চোখের পলক বারংবার ফেলতে ফেলতে হাত দিয়ে মুখ ঢেকে নেয় সে। কি লজ্জা করছে তার! স্বচ্ছের ঠোঁটের আবেশ পায় মোহ কানের কাছে। লোকটা কানে কানে বলে,
“এই সুন্দরী? বলেছিলাম না? তোমাকে তোমার থেকেই চুরি করে নেব টেরও পাবে না? চুরি হয়ে যাচ্ছো তুমি।”
মোহ হালকা করে নিজের হাত সরায় মুখ থেকে। সে সত্যিই চুরি হয়ে যাচ্ছে! ভালোবাসার চুরি!

খাবার টেবিলে বসে আছে মোহ। সামনের খাবারের প্লেটে ভর্তি খাবার। একবার এপাশ ওপাশ তাকাচ্ছে সে। মিসেস. রেবা অদ্ভুত মুখভঙ্গি করে খেয়ে যাচ্ছেন। যেন কোনো কিছুতে বড়ই বিরক্ত উনি। আর নেহাল সাহেব তাড়াহুড়ো করে খেয়ে যাচ্ছেন। কারণ উনার অফিস আছে। আর তার পাশে স্বচ্ছ খাবার নিয়ে নাড়াচাড়া করছে কিন্তু খাচ্ছে না মোটেও। এবার নিজের খাবারের প্লেটের দিকে তাকায় মোহ। ডান হাতে খেতে পারবে না সে। বাম হাতেও খাওয়াটা ঠিক নয়। কেমন জানি লাগছে তার। তাই চুপ করে বসে আছে সে। আচমকা স্বচ্ছ নিজের প্লেট থেকে স্যান্ডউইচ নিয়ে মোহের সামনে ধরে বলে,
“নাও খাও।”

সকলের দৃষ্টি এবার মোহের দিকে স্থির হয়। মিসেস. রেবা ভ্রু কুঞ্চিত করে তাকান। মোহের অস্বস্তি লাগছে। এভাবে সবার সামনে স্বচ্ছের হাতে কি করে খাবে সে? এবার স্বচ্ছে কিছুটা কড়া কন্ঠে বলে,
“কি হলো? খাও?”

“ওকে খাইয়ে দিতে হবে কেন স্বচ্ছ? তোর তো অফিস আছে! ও নিজে খেতে পারবে। তোর তো দেরি হয়ে যাবে।”

“মা, আমি দেরি করলে আহামরি কিছু হবে না। কিন্তু আমি ওকে না খাইয়ে শান্তি পাচ্ছি না। মনের শান্তির জন্য খাওয়াচ্ছি। আর ওর বাম হাতে খেতে কেমন যেন লাগবে না? আমরা তো ডান হাতে খেতে অভ্যস্ত। আর মোহ? চুপচাপ বসে থাকতে বলছি তোমায়? খেয়ে বলিনি? খাও।”

স্বচ্ছের ধমকে মোহ আলতো করে কামড় নিয়ে স্যান্ডউইচ মুখে নিয়ে খেতে থাকে। স্বচ্ছ নিজেও সেই স্যান্ডউইচে কামড় বসিয়ে বলে,
“আর হ্যাঁ একটা কথা বলতে ভুলে গেছি। আমি ভাবছিলাম যে মোহের সাথে কোথাও গিয়ে ঘুরে আসব। ইভেন বিয়ের পর পরই তো হাজবেন্ড ওয়াইফের আলাদা সময় কাটানো উচিত না? তোমাদেরই তো সেই ব্যবস্থা করা উচিত। বাট তোমরা হয়ত ভুলে গিয়েছো। নো প্রবলেম! আমি নিজেদের ব্যবস্থা নিজেই করে নিয়েছি। ইন্টারেস্টিং না?”

বলেই হেঁসে আবারও মোহকে খাইয়ে দিতে থাকল স্বচ্ছ। মোহ বিস্ময়ের খাবার গিলতেও ভুলে গিয়েছে। বিস্ফোরিত নয়নে সবার দিকে পর্যবেক্ষণ করছে সে। স্বচ্ছের কথার সঙ্গে সঙ্গে নেহাল সাহেব কটাক্ষ করে বলেন,
“কি বলছো তুমি এসব? সবে তো অফিসে জয়েন করলে। তাও আবার ঘুরে আসতে চাইছো? আরো কয়েকদিন যাক। এখন না।”

“আমি কারো মতামত চাইনি বাবা। নিজের মতামত জানিয়ে দিলাম। ফারদার নিজের মতামত ততক্ষণ বলবে না যতক্ষণ আমি না জানতে চাইব। কোম্পানি তো এখনো তুমি সামলাও। আমার অনুপস্থিতিতে তোমার খুব বড় একটা সমস্যা হবে না বলে আশা করি।”

মিসেস. রেবা কিছু বলতে গিয়েও পারলেন না। শুধু স্বচ্ছের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন। কিন্তু তাতেও কোনো ভ্রুক্ষেপ হলো না স্বচ্ছের।
“সো! আজ রাতেই বের হচ্ছি আমরা। মোহ, তুমি রেডি থেকো আর জামাকাপড় গুছিয়ে রাখবে। ওহ সরি! তোমাকে কিছু করতে হবে না। আমি রোহিনীকে(সার্ভেন্ট) বলে দিচ্ছি। সে করে দেবে।”
মোহ শুধু চোখ গোল গোল করে স্বচ্ছের কান্ড দেখতে থাকল। আসলে লোকটার মাথায় এখন কীসের ভূত চেপেছে? তাকে বোঝা দায়।

চলবে….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here