একটুখানি সুখ পর্ব ৭+৮

0
74

#একটুখানি_সুখ
#আনিশা_সাবিহা
পর্ব ৬

চোখমুখের রঙ পাল্টে যায় মোহের। ইচ্ছে করে সামনে থাকা লোকটাকে কয়েকটা কিল-ঘুষি মেরে দিতে। কি পরিমাণে অসভ্য হলে এমন কথাবার্তা বলা যেতে পারে? লোকটার হাত থেকে ছাড়া পেতে ছটফটিয়ে যাচ্ছে মোহ। দুর্দান্ত সাহস নিয়ে লোকটা একহাতে মোহের পিঠ খামচে অন্যহাতে মোহের মুখ চেপে ধরে আছে। একসময় না পেরে আচমকা লোকটার হাতে কামড় বসিয়ে দেয় মোহ। লোকটি চমকে উঠে দেয় মৃদু চিৎকার। চিৎকারের আওয়াজ শুনে স্থির হয় মোহ। এই কন্ঠস্বর তার চেনা। সে অস্ফুটস্বরে বলে ওঠে,

“স্বচ্ছ ভাই?”

“হু ইজ হি?”

আবারও বিস্মিত হয় মোহ। মাথাটা চক্কর দিয়ে ওঠে তার। কন্ঠস্বর তো মোটা। কিন্তু যেভাবে লোকটা চিৎকার দিয়েছে যেন স্বচ্ছের মতো চিকন সুরেই চিৎকার দিয়েছিল। মোহ এবার শাসিয়ে বলল,
“আপনি জানেন না কার সঙ্গে এমন অসভ্যতা করছেন। আমার বাড়ির আশেপাশে থেকে আপনি আমার সাথে অসভ্যতা করছেন? আমার গায়ে হাত দিচ্ছেন? আই উইল কিল ইউ!”

মোহ জোরে জোরে আগন্তুক ব্যক্তিটির বুকে কিল দিতে শুরু করলেও লোকটার বিন্দুমাত্র নড়চড় হয় না। বরং লোকটি তার আরো কাছে এসে ফিসফিস করে বলে,
“মোহময়ী নারীকে একটা বারের জন্য কে-ই বা স্পর্শ করতে চাইবে না? কিন্তু হ্যাঁ, আমি তোমাকে একান্তভাবে স্পর্শ করতে চাই। আমি চাই না তোমায় স্পর্শ করার জন্য অন্য কেউ হাত বাড়িয়ে দিক।”

বুকে কিল মারা থেমে গেল মোহের। কে এই লোকটা? কে চায় তার কাছে? আর কীসের এতো অধিকারবোধ ফলিয়ে যাচ্ছে। মোহ চিল্লিয়ে বলে ওঠে,
“হু দ্যা হেল আর ইউ?”

লোকটা তার এই কথার বিন্দুমাত্র কর্ণপাত করে না। কথা পাল্টে বলে,
“সেকেন্ড বার কেউ চিঠি লিখলেও যেন জাস্ট গায়ে গেঞ্জি, হাঁটু পর্যন্ত প্যান্ট আর গলায় জাস্ট স্কার্ফ ঝুলিয়েই বেরিয়ে পড়বে না। সবার ইনটেনশন ভালো হয় না। তোমার হটনেসে অনেকে পুড়ে যেতে পারে।”

রাগে কটমট করতে করতে নিজের দুটো হাত এই লম্বা ভূতের ন্যায় মানুষটার গলার কাছে নিয়ে যায় মোহ। তার উদ্দেশ্য গলা চেপে ধরবে লোকটার। এতো নির্লজ্জ মার্কা কথাবার্তা তার সহ্য হচ্ছে না। কিন্তু বরাবরের মতোই লোকটা একহাত দিয়েই তার হাত চেপে ধরে পেছনে ঘুরিয়ে দেয়।
“কি বিশ্বাস হয় না আমার কথা? তোমার হটনেসে আমিও পুড়ে যাচ্ছি। ডু ইউ নো দ্যাট? বাট সাহস অনেক তোমার মাঝে। কিন্তু অহেতুক কাজে লাগাও। আমার কাছে এসব সাহস চলবে না। এখন সোজা ঘরে চলে যাও। ভুলে বাইরে এসো না।”

“রফিক মামা!”
চেঁচিয়ে ডাকাডাকি করে মোহ। তারপর দেখা যায় একটু করে আলো। রফিক এগিয়ে আসছে মোহের দিকে। সেইসময় খেয়াল করে আগন্তুক লোকটা তাকে ছেড়ে দিয়েছে। পেছন ফিরে তাকায় মোহ। সেই অবয়বটা অনেকটা দূরে চলে গেছে। পিছু পিছু ডাকতে ডাকতে ছুটতে শুরু করে মোহ। তবে দুর্ভাগ্যবশত লোকটার অবয়বটা একেবারে মিলিয়ে যায়। আশপাশটা ভালো করে করেও খুঁজে পায় না মোহ। রাগে হিসহিসিয়ে বলে,

“চোর কোথাকার! চোরই তো। যদি চোর না হতো অন্তত নিজের মুখটা দেখাতো। সাহস নেই। আমি উনাকে ছাড়ব না। পুলিশে কমপ্লেন করব। আমায় স্পর্শ অবধি করেছেন! একবার পেলে না মেরেই দেব।”

রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে খেয়াল করে লোকটা তার টর্চ লাইটও নিয়ে চলে গেছে। খিটখিটে মেজাজের সঙ্গে আশপাশটা হাতড়াতে থাকে মোহ। তার ওপর হঠাৎ করে লাইট দিতেই চোখমুখ খিঁচে বন্ধ করে সে।

“ছোট সাহেবা? কি হইছে? এমনে ডাকতেছিলেন ক্যান? কোনো বিপদ হইছিল নাকি?”

অস্থির হয়ে বলে রফিক। মোহ বিরক্ত হয়ে বলে,
“যখন বিপদ হয়েছিল তখন তো আপনার টিকিটিও পাওয়া যাচ্ছিল না রফিক মামা। এখন জেনে কি হবে? চলুন বাড়ি চলুন। আমার একদমই ভালো লাগছে না।”

“আপনেই তো বলছিলেন আমারে ওইদিকে দেখতে আর আপনি এইদিক দেখবেন।”

“হ্যাঁ ভুলটা তো আমারই। এখন আমার টায়ার্ড লাগছে। আই হ্যাভ টু টেক রেস্ট। আর একটা কথা মিমি যেন এসব ব্যাপারে টের না পায়। মনে থাকবে?”
রফিক মাথা নাড়তেই নিশ্চিন্তে শ্বাস ফেলে তার সাথে বাড়িতে চলে যায় মোহ।

পূর্বাকাশে জ্বলজ্বল করছে সূর্য। রাতে আকাশে বিদ্যুৎ চমকালেও বর্তমানে বাহিরে খাঁ খাঁ করছে। সকাল সকাল লেগে পড়েছে সব মানুষ তার নিত্য দিনের কাজে। সকলের দৈনন্দিন জীবন একটা সূত্রে বাঁধা থাকে। সকাল থেকে রাত অবধি একটা রুটিন থাকে। সেই অনুযায়ী চলে মানুষ। সকলে পৌঁছায় তার কর্মস্থানে।

শাওয়ার নিয়ে সবে হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে নিজের চুল শুঁকিয়ে নিচ্ছে মোহ। মুখে বিরাজ করছে গাম্ভীর্যের ছাপ। রাতের ঘটনাগুলো নিয়ে এখনো বড্ড ভাবুক সে। ঘটনা যে ঘটিয়েছে তার নাম আন্দাজ করে মাথায় আনতেই একজনের নামই কেন জানি ভেসে উঠছে তা হলো স্বচ্ছ। কিন্তু স্বচ্ছ তাকে এভাবে বলবে আর এতো সুন্দর নামে সম্মোধন করবে এটা যেন পৃথিবী উল্টে গেলেও বিশ্বাস করতে পারে না মোহ। তাই তাকে সন্দেহের তালিকা থেকে বাদ দিল সে। এসব আকাশ-কুসুম চিন্তাভাবনা করতে করতে কল আসে মোহের ফোনে।

হেয়ার ড্রায়ারটা রেখে দিয়ে সোফায় পড়ে থাকা ফোনটা হাতে তুলে নেয় সে। ‘নানিমা’ নামটি দেখে দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে অভিমানের সঙ্গে ফোনটা কেটে দেয় মোহ। তার মন মানছেই না। মানুষটা যদি তার সঙ্গে আসত কি এমন ক্ষতি হয়ে যেত? নানিমা যে খুব সুখে আছেন সেখানে তা তো নয়! নিজের মায়ের শেষ ইচ্ছে পূরণ করতে না পেরে নিজের কাছে নিজে ছোট হয়ে যাচ্ছে মোহ। এখনো তার মনে পড়ে মায়ের শেষ কথাগুলো। হসপিটালে নেওয়া হয়েছিল তার মাকে। সেদিনে বান্ধবীর জন্মদিনে ব্যস্ত ছিল সে। আচমকা এমনটা খবর আসায় ছন্নাছারা হয়ে ছুটে গিয়েছিল হসপিটালে। তার বাবার স্পট ডেড হয়েছিল। তবে তার মায়ের বাঁচার ক্ষীণ আশা ছিল।

সেদিন মোহের হাত ধরে তা মা অস্পষ্ট কন্ঠে বলেছিল,
“যাই হয়ে যাক না কেন মোহ মা! তোর নানিমাকে একা ছাড়বি না। আমরা তোর নানিমাকে নিয়ে আসতে যাচ্ছিলাম। সেটা তো আর হলো না। আমি আর মায়ের দেখা পাবও না বোধহয়। কিন্তু তুই আমার অসম্পূর্ণ কাজ করে দিস রে মা। আমার মা যে ওখানে ভালো নেই। তোর মামা আর মামিকে তো চিনিস। ওরা নামে বড়লোক কিন্তু নিজের মায়ের জন্য সামান্য সেবা করতেও ওদের বাঁধে। মানুষটা সারাজীবন দুঃখ-যন্ত্রণা সয়ে গেছে। মায়ের শেষ জীবনটা যেন তোর সেবাতে কাটে। তুইও ভালো থাকবি। নিজের খেয়াল রাখবি। আ…”

কথাটা সম্পূর্ণ হয়নি মোহের মায়ের। জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন উনি। ডক্টর অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে গিয়েছিলেন দ্রুত। কিন্তু অপারেশন চলাকালীন মারা গিয়েছিলেন মোহের মা।

আজও মনে পড়ে সেদিন। আবারও ভেঙে পড়ে মোহ। তৎক্ষনাৎ ফোনের রিংটোন বেজে ওঠে। ঝাপ্সা হয়ে আসে মোহের দৃষ্টি। সে জানে আবারও তার নানিমা কল করেছে। নাক টেনে এবার ফোনটা ধরে মোহ। সালাম দিয়ে মোহ সোজাসুজি প্রশ্ন করে,
“কি হয়েছে নানিমা বলো? কিছু বলবে?”

“রাগ করেছিস আমার ওপর?”

দুর্বল কন্ঠে বলে ওঠেন নাফিসা বেগম। তবে মোহ আগের ন্যায় শক্ত থেকে বলে,
“রাগ করার মতো কি আছে? তোমার আসতে মন চায়নি তাই আসোনি আমার সাথে। তোমার কাছে তোমার ছেলে বড় তোমার ছেলের কাছেই থাকো। আমি তো তোমার কেউ হই না। শুধু নাতনি হই। তোমার ছেলের বাড়িতে তোমার নাতি আছে।”

“আমি কি কখনো নাতি-নাতনিদের মাঝে ফারাক করেছি রে মোহ? তুই-ই বল দেখি? আমি তো স্বচ্ছের থেকেও তোকে বেশি ভালোবেসেছি।”

“তাহলে এলে না কেন আমার সাথে? কি সমস্যা ছিল আমার সাথে আসতে? কি এমন হতো বলো তো?”

জোর গলায় বলে মোহ। নাফিসা বেগম ওপাশ থেকে ফিসফিসিয়ে বলে,
“জানি না এই কথা বললে তুই বিশ্বাস করবি কিনা। তবে শুনে রাখ। এটা অবশ্যই আমার ছেলের বাড়ি। আমার মেয়ে আর ছেলে দুজনেরই ভালো চাই আমি। আমার ছেলে যেমনই হক। সে তো আমার ছেলে তাকে কি করে আমি অপমানিত হতে দেব? আমি যদি তোর সাথে যাই তাহলে আশেপাশের লোকেরা আমার ছেলেকে কথা শোনাবে। আর…”

“একটা কথা বাধ্য হচ্ছি। তোমার এই স্নেহ, তোমার এই কোমলতার জন্যই মামা কিন্তু এমন হয়েছেন। উনার দোষ ঢাকতে ঢাকতে তুমি শেষ হয়ে গেলে।”

“তাও হয়ে যাই আমার আফসোস নেই। আরো একটা কারণ আছে। ওরা আমায় এখান থেকে যেতে দেবে না। এরজন্য ওরা যদি তোর কোনো ক্ষতি করে দেয় আমি মানতে পারব না। শুধুমাত্র তুই-ই তো বেঁচে আছিস। আমার মেয়ের স্মৃতি!”

মোহ হতভম্ব হয়। অবাক কন্ঠে জিজ্ঞেস করে ওঠে,
“আমার ক্ষতি? সেটা কে করবে? আমি বুঝতে পারছি না তোমার কথা।”

“তোকে বুঝতে হবে না। আমি যা বলছি তাই কর। তোর যদি দরকার পড়ে আমার সঙ্গে এসে দেখা করে যাবি। আমার কাছে এসে থেকে যাবি। আমি এখান থেকে যেতে পারব না।”

মোহ কিছু বলার আগেই ফোন কেটে দেন নাফিসা বেগম। মোহ কিছুই বোধগম্য হচ্ছে না। এতসবকিছু ভাবতে ভাবতে মস্তিষ্ক শূন্য হয়ে আসছে তার। চারিদিকে শূন্যতা। এইসব উত্তর দেওয়ার মতো কেউ নেই। কেউ না!

দুপুরের সূর্যের উত্তাপে চারিদিকে পড়েছে ভ্যাপসা গরম। ঘর্মাক্ত চোখমুখ নিয়ে ক্লাস থেকে বের হয় মোহ। আজ ইউনিভার্সিটিতে এসেছে সে। নিজেকে যতটা সম্ভব ব্যস্ত রাখার প্রচেষ্টায় মোহ। এতো গরমে বিরক্ত লাগছে তার। রুমাল দিয়ে ঘাম মুছতে মুছতে ক্লান্ত সে।

“মোহ? এখন তোর কি প্ল্যানিং?”
মোহ ভ্রু কুঁচকে তাকায় জুহির কথায়। জুহি হচ্ছে মোহের ফ্রেন্ড। একসাথে একই বিভাগে পড়ছে তারা। একরাশ বিরক্তি নিয়ে বলে,

“মানে কি প্ল্যানিং হবে?”

“আই মিন আঙ্কেল আন্টি তো নেই। সো…! তুই বলছিস তোর মিমি আছে। কিন্তু উনিই বা কতদিন তোর কাছে থাকবেন। উনারও তো সংসার আছে।”

“আমি জানি না। কেউ না থাকলে আমি একা থাকতে পারব। কাউকে লাগবে না আমার।”

বলে সামনে তাকিয়ে গটগট করে হেঁটে মেইন গেট দিয়ে বেরিয়ে আসে মোহ। তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে আসতেই সামনের মানুষটাকে খেয়াল না করার কারণে একটা প্রসারিত বুকের সঙ্গে লাগে মোহের মাথায়। সর্বপ্রথম মৃদু আওয়াজ করে ওঠে এই ওফ হোয়াইট শার্ট পরিহিত ও প্রসারিত বুকের অধিকারী লোকটার। এই মৃদু চিৎকার শোনার সঙ্গে সঙ্গে চমকে তাকায় মোহ। কেননা এই মৃদু চিৎকারের ভঙ্গি এর আগেও শুনেছে সে।

মাথা উঁচিয়ে তাকাতেই ধূসর বর্ণের চোখের মণিতে আঁটকে যায় মোহ। ছোট ছোট আলতো চোখের পাপড়িতে আবদ্ধ চোখজোড়া চিনতে ভুল হয় না মোহের। ঠোঁট কামড়ে মোহের দিকে বিরক্তির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে স্বচ্ছ।

“ইউ স্টুপিড গার্ল! দেখে হাঁটাচলা করতে পারো না?”

ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল মোহ। তার মাঝে কোনো হেলদোল নেই। সে শুধু চেয়েই আছে। ঠিক এমনই লম্বা ছিল গতকালকের সেই আগন্তুক লোকটা। স্বচ্ছ গলা খাঁকারি দিতেই ধ্যান ভাঙে মোহের। চোখ নামিয়ে নেয় সে। স্বচ্ছ বলে,
“আই নো আই এম হ্যান্ডসাম। বাট এভাবে তাকিয়ে থাকলে আমারও লজ্জা লাগে তাও সে যদি আমার কাজিন হয়।”

তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে মোহ স্বচ্ছের দিকে। মূহুর্তেই স্বচ্ছের হাত ধরে টেনে নিয়ে বাহিরে আসে মোহ। যদিও মোহ টানলেই স্বচ্ছের মতো একজন মানুষ চলে আসবে সেটা নয়। স্বচ্ছ ইচ্ছেতেই সে তাকে আনতে পেরেছে। স্বপ্ন ভ্রু উঁচিয়ে দেখে যাচ্ছে তার কান্ড। সাইডে এসেই স্বচ্ছের দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকায় মোহ যেন স্বচ্ছ কোনো গুরুতর অন্যায় করে ফেলেছে।

“তার মানে ওই লোকটা আপনি ছিলেন? গতকাল রাতে অসভ্যতা আপনি করেছেন?”

স্বচ্ছ কিছু না বুঝে বিরক্ত হয়ে বলে,
“এক্সকিউজ মি? হু আর ইউ? তুমি কে যে তোমার সাথে আমি অসভ্যতা করতে যাব?”

“দেখুন আপনি না বোঝার ভান করবেন না। আপনি ছিলেন ওই লোকটা। আপনি আমাকে কিসব বলেছিলেন! হট আরো কতকিছু। ছিঃ!”

বলেই মুখ চেপে ধরল মোহ। বেফাঁস কথাবার্তা বলে ফেলেছে সে। স্বচ্ছ তার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। মোহকে মাথা থেকে পা থেকে দেখে নিল স্বচ্ছ। অতঃপর অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল স্বচ্ছ। তা দেখে বোকা বনে দাঁড়িয়ে রইল মোহ।
#একটুখানি_সুখ
#আনিশা_সাবিহা
পর্ব ৭

–“লাইক সিরিয়াসলি? টেল মি ওয়ান থিং! তোমায় কে এই কথাটা বলেছে? আই মিন তাকে একটু যাচাই করে দেখতাম আদোও তার চোখ ঠিক আছে কিনা। তুমি আর হট?”

বলেই আবারও উচ্চস্বরে হাসতে শুরু করল স্বচ্ছ। তার হাসি যেন থামছেই না। চকচকে দাঁত কেলিয়ে হাসছে। স্বচ্ছের হাসির ঝংকারটাও সুন্দর বেশ। তবে এই হাসিতে যে মোহকে ইনসাল্ট করা হচ্ছে তা বেশ বুঝতে পারছে মোহ। রাগে আগের চেয়ে বেশি দরদর করে ঘামছে সে। ঘামে আর মৃদু বাতাসে গালের সাথে লেপ্টে যাচ্ছে মোহের চুল। রোদ সরাসরি এসে পড়ছে তার চোখেমুখে। রোদের তাপ ও রাগ দুটো মিলিয়ে মুখে উঠে উঠেছে গাঢ় লাল আভা। গাল দুটো বেশি লাল হয়েছে তার। তা দেখে হাসি থামায় স্বচ্ছ। এক মূহুর্তের জন্য তার মনে হয় এ যেন কোনো ভয়াবহ সুন্দরী ঝাঁসির রানি দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে। তৎক্ষনাৎ ঠোঁট কামড়ে চোখ সরিয়ে ফেলল সে। আবার মুখে সেই হাসি ফুটিয়ে বলল,

“তোমার মাঝে হটনেসের কোন গুন আছে? একটা পাগলই বলতে পারে তোমায় এসব কথা। তুমি সত্যিই হট হতে চাইলে তোমায় আমি কিছু ছবি পাঠিয়ে দেব। সেসব ছবি দেখে নিজেকে তেমন বানাতে চাইলে বানাতে পারো।”

“আপনি চুপ করবেন স্বচ্ছ ভাই? আপনার মুখে কিছু আঁটকায় না জানি। বার বার ওই শব্দটা ইউজ করার মানে কি? অন্তত আমি আপনার কাজিন সেই হিসেবে এসব বলা বন্ধ করতেই পারেন।”

বিরক্ত আর কিছুটা লজ্জা নিয়ে বলে মোহ। তবুও ভাবান্তর নেই স্বচ্ছের। সে আগের মতোই স্বাভাবিকভাবে বলল,
“এটা কোথায় লিখা আছে কাজিনকে এসব বলা যাবে না? আর কাজিন কি? তুমি কি ভাবো তোমার মতো একটা মেয়েকে স্বচ্ছ কাজিন মানবে? হাহ, ইন ইউর ড্রিম। তুমিই তো নিজেকে হট বলে পরিচয় দিলে আমি কি দিয়েছি? আমি তো জাস্ট তোমায় সাজেস্ট করলাম কি করে…”

“আমি কেন আপনার সঙ্গে কথা বলছি বলুন তো? আমি ভুলেই গিয়েছিলাম আপনার সঙ্গে কথা বলা আর না বলা একই। আপনি তো নিজে কনসিডার করবেন না। সো প্লিজ স্টপ। আমিও আপনাকে কাজিন মানতে মরে-টরে যাচ্ছি না।”

অতিষ্ঠ হয়ে বলে মোহ। তার চোখমুখের অঙ্গিভঙ্গি বলে দিচ্ছে স্বচ্ছের এমন কথাবার্তার ওপর কতটা বিরক্ত সে। তবুও স্বচ্ছ একেবারে নির্বিকার। যেন মোহের কোনো কথায় তার কান অবধি পৌঁছায়নি। মোহের এমন চেহারা দেখে বেশ মজা লুটছে মনে মনে স্বচ্ছ। হাসতে গিয়েও গম্ভীরতা বজায় রাখছে সে। মোহ আবারও তেতে বলে ওঠে,
“আর তাছাড়া আমি তো বুঝতেই পারছি না আপনি এই ভার্সিটির সামনে করছেন টা কি? নিশ্চয় নতুন করে ভর্তি হতে আসেননি? কেন এসেছেন?”

স্বচ্ছ তুড়ি বাজিয়ে বলেন,
“দিস ইজ নট অনলি ইউর ভার্সিটি। আমার আট নম্বর গার্লফ্রেন্ড ফারিহা আছে এখানে। তার সঙ্গে মিট করতে এসেছি। এনি কুয়েশ্চন?”

মোহ আর কিছু বলে না। গটগট করে হেঁটে চলে আসে জুহির কাছে। ভার্সিটির দরজার সামনে দাঁড়িয়েই স্বচ্ছ আর মোহকে খেয়াল করছিল জুহি। মোহ আসতে না আসতেই জুহি লাফিয়ে বলে ওঠে,
“এই মোহ, ওই ছেলেটা কে রে? তোর বয়ফ্রেন্ড? কিন্তু তোর বয়ফ্রেন্ড তো অন্যজন ছিল চাশমিশ ওয়ালা। কবে বয়ফ্রেন্ড পাল্টালি?”

প্রথমেই স্বচ্ছের কথাবার্তায় মেজাজ বিগড়ে ছিল মোহের। জুহির কথা শুনে দাঁত চেপে তাকালো সে।
“আমার মাথা এতোটাও খারাপ না যে উনার মতো একটা ডিজগাস্টিং লোককে আমি বয়ফ্রেন্ড বানাব। আমার সো কলড কাজিন উনি।”

“সিরিয়াসলি? সিঙ্গেল? বল না সিঙ্গেল? একটু লাইন করিয়ে দে না রে।”

“হ্যাঁ একেবারে সিঙ্গেল। আট নম্বর গার্লফ্রেন্ডের সাথে মিট করতে এসেছে। নয় নম্বর গার্লফ্রেন্ড হবি? তাহলে যা। তোর জন্য একদম পারফেক্ট।”
মুখ ভেঙিয়ে বলল মোহ। সঙ্গে সঙ্গে মুখ ভোঁতা হয়ে যায় জুহির। সেখান থেকেও সরে আসে মোহ। নিজের মাথা আর খারাপ করতে চায় না সে।

হেঁটে কিছুটা দূর এগিয়ে আসতে আসতেই আচমকা তার সিক্সথ সেন্স বলে ওঠে তার পিছু পিছু কেউ হেঁটে যাচ্ছে। কেউ তাকে লক্ষ্য করছে। এমনটা ভার্সিটিতে আসতেও হয়েছিল তার। যদিও সে গাড়িতে এসেছিল। তবুও মনে হয়েছিল একটা সাদা রঙের গাড়ি তার গাড়িতে ফলো করছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই কোথাও উধাও হয়ে যায় গাড়িটা। লুকিং গ্লাসে গাড়ির দেখা আর মেলে না।

এখন আবারও একই অনুভূতি পেয়ে কিছুটা আতঙ্কিত হলো সে। ধীরে ধীরে পিছু ফিরেও তেমন সন্দেহজনক কাউকে নজরে পড়ল না তার। স্বচ্ছকেও আশেপাশে দেখা গেল না। সামনে ফিরে হাঁটার গতি বাড়িয়ে ড্রাইভারকে কল লাগায় মোহ। ড্রাইভার জানায় তার আসতে একটু লেট হবে। তা শুনে সেখানেই দাঁড়ায় মোহ। আশেপাশে এতো মানুষজন থাকতেও তার মনে হচ্ছে কেউ হিংস্র ভঙ্গিতে তাকে দেখছে। কথায় বলে মেয়েদের সিক্সথ সেন্স বেশি কাজ করে। একটু জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়াল মোহ। নিজেকে শান্ত রাখতে বড় বড় শ্বাস ফেলেও বিশেষ লাভ হলো না। হাতের রুমাল চেপে ধরে দাঁড়িয়ে রইল সে।

মিনিট পাঁচেক পরই আকস্মিকভাবে তার সামনে একটা বাইক এসে থামে। হঠাৎ এমন ঘটনা ঘটে যাওয়া হুড়মুড়িয়ে পেছনে সরে যায় মোহ। বিতৃষ্ণা নিয়ে বাইকের মালিকের দিকে তাকাতেই স্তব্ধ হয় সে। স্বচ্ছ হেলমেট খুলে মোহের দিকে ভ্রু উঁচিয়ে তাকিয়ে আছে।

“কি সমস্যা আপনার জানতে পারি স্বচ্ছ ভাই? কেন অকারণে আমার পেছনে লাগছেন?”

মোহ কথাগুলো অতিরিক্ত রাগের সঙ্গে বলতে গিয়েও পারল না। কারণ স্বচ্ছকে দেখে কেন যেন একটু হলেও স্বস্তি পেয়েছে সে। জড়োসড়ো ভাবটা কেটে গেছে তার মনে। স্বচ্ছ কথা পাল্টে বেশ দ্রুততার সঙ্গে বলল,
“বাইকে উঠে পড়ো রাইট নাউ।”

স্বচ্ছের এই কথায় ভ্রুযুগল কুঞ্চিত হয় মোহের। সে হতভম্ব হয়ে বলে,
“মানে?”

“মানে বোঝো না? নাকি কানে শুনতে পাও না? আমি এখনই বাইকে উঠে বসতে বলেছি। সময় নেই তাড়াতাড়ি ওঠো। তর্কাতর্কি করতে চাই না মোহ।”

“আমি কেন আপনার বাইকে উঠতে যাব? এটা আপনি ভাবলেন কি করে? বলা নেই কওয়া নেই বাইকে উঠতে বলবেন আর উঠে যাব?”

“লাস্টবার বলছি বাইকে উঠে পড়ো। নয়ত অন্য ব্যবস্থা নিতে হবে আমায়।”

এবার মোহ রাগে রীতিমতো তার শরীর কাঁপছে মৃদু। স্বচ্ছের এমন উদ্ভট ব্যবহার তাকে বিভ্রান্ত করে ফেলছে। মোহও রীতিমতো জেদ নিয়েই বলল,
“আমি যাব না আপনার সাথে। কি প্রবলেম আপনার? আগে তো আমার সামনেও আসতেন না। তাহলে কি হলোটা এই কয়দিনে? আমি যাব না। কিছুক্ষণ পর আমার গাড়ি আসবে আমি তাতে করেই যাব।”

স্বচ্ছ স্থির চোখে তাকিয়ে থাকে মোহের দিকে। চোয়াল শক্ত করে বাইক থেকে নেমে মোহের হাত ধরে টান দিতেই সে স্বচ্ছের দিকে চলে আসে। মোহ সরতে চাইলে তাকে কোলে করে তুলে বাইকে বসিয়ে দেয় স্বচ্ছ। ঘটনা এতো দ্রুত ঘটে যাওয়ায় কিছু করার সুযোগটুকুও পায় না মোহ। মেয়েটার হাত শক্ত করে ধরে শাসিয়ে বলে,

“নিজের ভালো পাগলেও বোঝে। আই থিংক তুমি পাগলের চেয়েও অধম নও। আর একবার যদি বাইক থেকে নামার চেষ্টা করেছো তাহলে আমার থেকে খারাপ কেউ হবে না। আমি ভেতর থেকে এতোটাও মিষ্টি মানুষ নয়। আমার তিক্ত রূপ দেখাতে বাধ্য করবে না। কালকের কথা মনে আছে? ওইযে নিজের রুমে ঢুকে পাগলের প্রলাপ বকছিলে? ভিডিওটা এখনো আমার কাছে আছে। ভিডিওটা সবার ফোনে যাক এমন কিছু নিশ্চয় চাও না? কিপ ইউর মাউথ শাট।”

এক মূহুর্ত দাঁড়ায় না স্বচ্ছ। সামনে বাইকে উঠে যত দ্রুত সম্ভব ততটা দ্রুত বাইক স্টার্ট দেয় সে। ফুল স্পিডে বাইক চালানোতে স্বচ্ছের কাঁধে হাত রাখতে গিয়েও পারছে না মোহ। সে স্বচ্ছের কোনোরূপ আচরণ বুঝতে পারছে না। লোকটা নিজ মনে বাইক দ্রুত গতিতে চালিয়ে যাচ্ছে। মোহ এবার না পেরে আমতা আমতা করে বলে,
“বাইক একটু স্লো স্পিডেও তো চালানো যায়। আমার এতো তাড়াহুড়ো নেই।”

স্বচ্ছ গাম্ভীর্যের সাথে জবাব দেয়,
“সো হোয়াট? তোমার কমপ্লিমেন্ট শুনতে চেয়েছি? না তো! আমার অনেক তাড়া আছে। অফিস থেকে এসেছি। আমায় আবার যেতে হবে।”

“তাহলে চলে গেলেই পারতেন। কেন আমায় বাইকে এভাবে তুলে দরদ দেখাতে গেলেন?”

“ওইযে আমি একটু দরদী মানুষ তাই।”

রাগে ক্ষোভে ফেটে পড়ল মোহ। কিছু বললও না। এবার স্বচ্ছ নিজ থেকে বলল,
“কি কাঁধে হাত রাখতে সাহস পাচ্ছো না? কাঁধে হাত রাখতে পারো। তোমার হাত এতোটাও আকর্ষণীয় না যে খেয়ে ফেলার ইচ্ছে হবে।”

স্বচ্ছের এমন খাপছাড়া কথায় আবারও ক্রুদ্ধ হয়ে গেল মোহ। এমন মানুষ হয় কেন? অন্যকে লজ্জা দেওয়ার জন্য? এবার শোধ তুলতে স্বচ্ছের কাঁধে খামচে ধরে নখ বসিয়ে দিতেই বেসামাল হয়ে পড়ে স্বচ্ছ। গলা খাকিয়ে জোরে জোরে বলে ওঠে,
“হোয়াট দ্যা…! এমন করছো কেন?”

“আপনিই তো বললেন কাঁধে হাত রাখতে।”

“তাই বলে এভাবে? মনে তো হচ্ছে রক্ত বের টের হয়ে গেছে। এখন তুমি আমার কত বড় ক্ষতি করে দিলে ধারণা আছে? যেভাবে নখ বসিয়েছো নিশ্চয় দাগ হয়ে গিয়েছে। এটা আমার ভবিষ্যৎ বউ দেখলে কি হবে বুঝতে পারছো?”

বেশ আতঙ্কের ভাব ধরে প্রশ্ন করে স্বচ্ছ। মোহ মানে না বুঝে জিজ্ঞেস করে,
“কি হবে?”

“আমার বউ আমায় ডিভোর্স দিয়ে দেবে নিশ্চিত। কাঁধে এমন দাগ কেন হয় জানো তো? ইটস কলড লাভ বাইট।”

এবার হতবিহ্বল হলো মোহ। রাগে হাত-পা ছড়িয়ে কাঁদার মতো অবস্থা হলো তার। দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে স্বচ্ছকে বলে,
“আপনি কি চুপ করবেন?”

স্বচ্ছ চুপ করে মৃদু হাসে। জোরালো বাতাসে চোখমুখ বন্ধ হয়ে আসছে মোহের। ছোট ছোট চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে আছে সে। সামনের মানুষটাকে মাঝে মাঝে ভেংচি কাটা থেকে শুরু করে মনে মনে তাকে গালি দিয়ে উদ্ধার করে ফেলল মোহ।

রাস্তার দিকে চোখ পাকিয়ে সে বলল,
“শুনুন আমি বাড়ির দিকে যাব না এখন।”

“তো কোথাও যেতে চাও?”

“পুলিশ স্টেশনে যাব।”

তা শুনে হঠাৎ গাড়ির ব্রেক কষে স্বচ্ছ। পিছু ফিরে বলে,
“কেন? পুলিশ স্টেশন কেন?”

“গতকাল রাতে কেউ আমাকে ওইযে ওসব বলেছিল। আর আমার সঙ্গে অসভ্যতাও করেছিল। তাই ওই লোকটাকে খুঁজে বের করতে চাই আমি।”

চোখ বড় বড় করে তাকায় স্বচ্ছ। যেন এখুনি চোখজোড়া কোটর থেকে বেরিয়ে আসবে। মূহুর্তেই কাশি উঠে যায় তার। বিষম খেয়ে একনাগাড়ে কাশতে শুরু করে সে।

চলবে….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here