এক_আকাশ_ভালোবাসি পার্ট_৪৯

0
982

এক_আকাশ_ভালোবাসি
পার্ট_৪৯
#নিশাত_জাহান_নিশি

কথা গুলো বলেই আদনান হু হা করে হেসে দিলো। সাথে রূপ ও অট্ট হাসি দিয়ে সানায়ার দিকে তাকালো। সানায়া বেকুব হয়ে রূপ আর আদনানের দিকে তাকিয়ে আছে।

সানায়া কপাল কুঁচকে রূপ আর আদনানকে উদ্দেশ্য করে বলল,,,,,,

—–“আজব তোমরা এভাবে হাসছ কেনো? এখানে হাসির কি হলো?”

রূপ হাসি চেঁপে সানায়াকে উদ্দেশ্য করে বলল,,,,,,

—–“শুনলাম তোমার নাকি আদনানকে খুব পছন্দ হয়েছে?”

সানায়া আমতা আমতা করে বলল,,,,,,

—–“পছন্দ হতেই পারে। এতে এতো হাসির কি আছে? তাছাড়া আমি উনাকে জাস্ট পছন্দ করি। ভালো তো আর বাসি না।”

মুহূর্তেই আদনানের হাসি মুখটা চুপসে গেলো। রূপ মুখট কালো করে সানায়ার দিকে তাকিয়ে বলল,,,,,

—–“শুধু কি পছন্দ হয়েছে? আর কিছুই না?”

সানায়া ভাবলেসহীন ভাবে আদনানের দিকে তাকিয়ে বলল,,,,,,

—–“হুম জাস্ট ভালো লেগেছে। এর চেয়ে বেশি কিছু না।”

আচমকা আদনান বসা থেকে উঠে গলাটা ঝাঁকিয়ে ড্রইং রুমে উপস্থিত সবাইকে উদ্দেশ্য করে জোরে চেঁচিয়ে বলে উঠল,,,,,,

—–“হ্যালো হ্যালো এভরি ওয়ান। আমি আপনাদের সবার সাথে কিছু ইম্পরটেন্ট কথা বলতে চাই। প্লিজ সবাই আমার কথাটা মনযোগ দিয়ে শুনুন।”

মুহিত সিঁড়ি বেয়ে নামছে আর জোরে চেঁচিয়ে বলছে,,,,,,,

—–“হুম আদনান বলো। আমি ও জয়েন করছি। আমরা সবাই তোমার ইম্পরটেন্ট কথা শুনতে চাই।”

উপস্থিত সবাই আদনানের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। আদনান মাথাটা নিচু করে হালকা হেসে বলল,,,,,,

—–“আসলে আমি তোমাদের সবার কাছে এক্টা প্রস্তাব রাখতে চাই।”

উপস্থিত সবাই মাথা নাঁড়িয়ে সম্মতি জানালো। রূপ মিটিমিটি হেসে মুহিতের কানে ফিসফিসিয়ে বলল,,,,,,

—–“আমি জানি আদনান কি বলতে চাইছে।”

মুহিত মুখ খুলে কিছু বলতে নিলেই আদনান সানায়ার দিকে তাকিয়ে সবাইকে উদ্দেশ্য করে জোরে চেঁচিয়ে বলে উঠল,,,,,,,

—–“আমি সানায়াকে বিয়ে করতে চাই।”

সানায়া চোখ দুটো রসগোল্লার মতো বড় বড় করে আদনানের দিকে তাকিয়ে আছে। সোহেলী আহমেদ আর মিসেস আয়রা দুজন দুজনের দিকে থতমত খেয়ে তাকিয়ে আছে। মায়া আহমেদ তব্দা লেগে বসে আছে। মাঝখান থেকে মারু এসে সবার মাঝখানে দাঁড়িয়ে বলল,,,,,,,

—–“প্লিজ সবাই রাজি হয়ে যাও না। দুটো বিয়ে একসাথে হবে। কতো মজা হবে বলো।”

রূপ ও মারুর সাথে তাল মিলিয়ে বলে উঠল,,,,,,,

—–“হ্যাঁ হ্যাঁ প্লিজ রাজি হয়ে যাও না। আদনান কিন্তু ছেলে হিসেবে খুব ভালো। আমার আর মারুর খুব পছন্দ। আশা করি তোমাদের ও কম বেশি পছন্দ হয়ে গেছে।”

মিসেস আয়রা আদনানের দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে সোহেলী আহমেদের হাত ধরে মলিন হেসে বলল,,,,,,,

—–“ভাবী। আমি আর কি বলব বলুন? ছেলে তো সবার সামনেই খোলসা করে সব বলে দিলো। এখন আপনারা কি বলেন? আশা করি আপনাদের উওরটা হ্যাঁ ই হবে।”

সোহেলী আহমেদ মৃদ্যু হেসে মায়া আহমেদের দিকে তাকালো। মায়া আহমেদ মাথা নাঁড়িয়ে হ্যাঁ বুঝালো। রেজাউল আহমেদ, সানোয়ার আহমেদ ও সম্মতি জানালো। সবার থেকে মুখ ফিরিয়ে সোহেলী আহমেদ মুচকি হেসে মিসেস আয়রার হাত ধরে বলল,,,,,,

—–“আমরা রাজি ভাবী।”

সাথে সাথেই পুরো বাড়িতে হাসির রোল পড়ে গেলো। সানায়া তেড়ে এসে আদনানকে টানতে টানতে কিচেন রুমের দিকে নিয়ে এলো। আদনান বেকুব হয়ে সানায়ার দিকে তাকিয়ে আছে। সানায়া কোঁমড়ে হাত দিয়ে দাঁত কিড়মিড় করে আদনানের দিকে তাকিয়ে বলল,,,,,,

—–“এটা কি হলো? বলা নেই, কওয়া নেই হুট করে বিয়ের প্রস্তাব রেখে দিলেন?”

—–“হুম। কারন আমি তোমাকে ভালোবাসি। বিয়ে করতে চাই। সংসার করতে চাই। চার চারটে সন্তানের বাপ হতে চাই। বয়স তো আর কম হলো না তাই।”

—–“আপনি কি পাগল? বিয়ে হলো না এখনো পর্যন্ত অথচ সংসার আর বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে পড়েছেন!”

আদনান সানায়ার গাল দুটো টেনে বেশ আহ্লাদি স্বরে বলে উঠল,,,,,,

—–“এভাবে বলতে নেই সোনা। সামনের সপ্তাহেই আমাদের বিয়ে। দুটো বিয়ে একসাথে হবে। আ’ম সো এক্সাইটেড। বিয়ের এক বছর পরেই বাপ হয়ে যাবো। আহ্ কি শান্তি!”

সানায়া চোখ লাল করে আদনানের দিকে তাকিয়ে আছে। হুট করে আদনান সানায়ার দিকে এগিয়ে এসে সানায়ার ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিলো। সানায়া চোখ বড় বড় করে আদনানের দিকে তাকিয়ে আছে। আদনান এক চোখ মেরে সানায়ার কোমড় আঁকড়ে ধরল। সানায়া ও কিছুটা শান্ত হয়ে চোখ জোড়া বন্ধ করে আদনানের শার্ট আঁকড়ে ধরল।

,,
,,

ড্রইং রুম জুড়ে আড্ডা আর খুনসুটি চলছে। মুহিত রূপকে অনেকক্ষন ধরেই বলছে কিছু খেয়ে নিতে। তবে রূপ কোনো কথাই শুনছে না। সবার সাথে আড্ডায় ব্যস্ত। এর মাঝেই আচমকা রূপের মাথা ঘুড়িয়ে এলো। মারু তাড়াহুড়ো করে রূপকে দু হাতে চেঁপে ধরল। মুহিত তেঁড়ে এসে বেশ চিন্তিত হয়ে চেঁচিয়ে বলে উঠল,,,,,,,

—–“বলেছিলাম না কিছু খেয়ে নিতে। কাল থেকে উপোস আছো। এই সময়ে এক্টু নিজের প্রতি যত্নশীল হতে হয় তো নাকি?”

মুহিতের কথা শুনে সবাই রূপ আর মুহিতকে চেঁপে ধরল। মায়া আহমেদ রূপের পাশে বসে রূপের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,,,,,,,

—–“গুড নিউজটা আগে বললি না কেনো? অনেকক্ষন ধরেই তো এখানে ছিলি!”

রূপ কিছু বলার আগেই মুহিত বলে উঠল,,,,,,,,

—–“এতো সবের মধ্যে আসল কথাটা বলতেই ভুলে গেছি আম্মু।”

মুহিত কিছুটা লজ্জা পেয়ে মাথাটা নিঁচু করে বলল,,,,,,

—–“আমি বাবা হতে চলেছি আম্মু।”

সানোয়ার আহমেদ এক গাল হেসে মুহিতকে ঝাপটে ধরে বলল,,,,,,,

—–“কংগ্রাচুলেশনস বেটা। আমার দু দুটো ছেলের দু দুটো নাতি, নাতনী। তাও আবার একই বছরে। সত্যি খুশি আর ধরছে না।”

মুহিতকে ছেড়ে সানোয়ার আহমেদ দৌঁড়ে সদর দরজার দিকে পা বাড়াচ্ছে আর পিছু ফিরে জোরে চেঁচিয়ে বলছে,,,,,,,,

—–“সবাই ওয়েট করো। আমি মিষ্টি নিয়ে আসছি।”

বাড়ির সবাই হাসি মুখে সানোয়ার আহমেদের যাওয়ার পথে তাকিয়ে আছে। মায়া আহমেদ আর মারু রূপকে ঝাপটে ধরে হাসছে আর রূপের মাথায় হাত বুলাচ্ছে। মারু ক্লোজ আপ স্মাইল দিয়ে রূপের কানে ফিসফিসিয়ে বলছে,,,,,,,,

—–“আজ থেকে আমার দল ভারী হলো বল? এবার থেকে তুই আর আমি মিলে আচার খাবো। ছাদ থেকে আচার চুরি করে খাওয়ার মজাই আলাদা।”

রূপ চোখ রাঙ্গিয়ে মারুর দিকে তাকিয়ে বলল,,,,,,

—–“তার মানে তুই এতোদিন ধরে ছাদ থেকে আচার চুরি করে খেয়েছিস?”

মারু জিভ কেটে রূপের দিকে তাকিয়ে আছে। রূপ কিছুক্ষন কঠোর দৃষ্টিতে মারুর দিকে তাকিয়ে থেকে আচমকাই হু হা করে হেসে দিলো। মারু ও রূপের সাথে তাল মিলিয়ে হাসি জুড়ে দিলো। মুহিত কিচেন রুম থেকে এক প্লেইট খাবার এনে রূপকে টেনে ডাইনিং টেবিলে বসিয়ে দিলো। লোকমা ধরে মুহিত রূপকে খাইয়ে দিচ্ছে।

প্রায় ঘন্টা খানিক পর সানোয়ার আহমেদ হাতে করে দুই কাটুন মিষ্টি নিয়ে এলো। মায়া, আহমেদ আর সোহেলী আহমেদ মিলে সবাইকে মিষ্টি মুখ করালো। আদনান আর সানায়া ও এসে সবার সাথে যোগ দিলো। দুজনের মধ্যে বেশ ভাব হয়ে গেছে। মিষ্টি মুখ করার পর পরই সবাই এবার বিয়ের ডেইট নিয়ে কিছুক্ষন আলোচনা করে সাকিবের বিয়ের দিনই সানায়ার বিয়ের ডেইট ফিক্সড করে নিলো। মায়া আহমেদ ফোন করে মারুর পুরো পরিবারকে বিয়ের দাওয়াত করে দিলো। আর শর্ত রাখল যে, বিয়ের দুই দিন আগেই যেনো ওরা সবাই ঢাকা চলে আসে। মারুর পরিবার ও হাসি হাসি মুখে সব মেনে নিলো। মারু খুব খুশি মায়া আহমেদের এমন সিদ্ধান্তে।

মৃন্ময় মাএ অফিসের কিছু ইম্পরটেন্ট কাজ সেরে বাড়ি ফিরেছে। দু দুটো খুশির সংবাদ পেয়ে সে ভীষণ খুশি। মারুর খুশি দেখে মৃন্ময় হেসে হেসে মারুকে ঝাপটে ধরছে। এভাবেই সকাল থেকে দুপুর ঘনিয়ে এলো। বাড়ির কাজের লোকরা রান্না বান্না করে ডাইনিং টেবিলে খাবার সাজিয়ে দিলো। খাওয়া দাওয়া করে বিকেলের দিকে আদনার আর মিসেস আয়রা বাড়ি ফিরে গেলো। বাড়ির বাকিরা যে যার রুমে চলে গেলো।

রূপ রুমে ঢুকে বেডের উপর বসে বেশ সিরিয়াস হয়ে মুহিতকে উদ্দেশ্য করে বলল,,,,,,,

—–“মুহিত….. আমি এক্টা জিনিস নিয়ে খুব ভাবছি। আমি স্থির ও করে নিয়েছি আমায় কি করতে হবে।”

মুহিত রূপের পাশে বসে রূপের হাত ধরে বলল,,,,,,

—–“তা কি স্থির করলে?”

রূপ এক্টা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,,,,,

—–“আমি ভাবছি মামুর বিরুদ্ধে কেইসটা তুলে নিবো।”

—–“হোয়াট? কি যা তা বলছ এসব?”

—–“আমি সত্যিই বলছি মুহিত। মামু অনেক অনুতপ্ত উনার কাজে। আমার মনে হচ্ছে উনাকে এক্টা সুযোগ দেওয়া উচিত। উনার পাপের ফল উপর ওয়ালাই উনাকে দিবে। হয়তো এই দুনিয়ায় উনি বেঁচে কুল পেয়ে যাবে, তবে উপর ওয়ালার থেকে বেঁচে কুল পাবে না। উনি পাপের শাস্তি ঠিক পাবে।”

রূপ কিছুটা থেমে আবার বলল,,,,,,

—–“উনি বাঁচবেই বা আর কতো দিন বলো? যে কয়েকটা বছর বেঁচে আছে ঐ বছর গুলো যেনো পরিবারের সাথে হাসি খুশিতে কাটিয়ে দিতে পারে আমি কেবল ঐটাই চাই। তাছাড়া উনাকে ছাড়া মামানী, আদনান কেউ ভালো নেই। সব দিক বিবেচনা করে আমার মনে হচ্ছে উনাকে ছাড়িয়ে আনা উচিত। তবে আমি উনাকে এই জীবনে ক্ষমা করতে পারব না। উপর ওয়ালা ই উনার বিচার করবে। উনার জন্য আমি আমার মা-বাবাকে হারিয়েছি। আমার পরিবারকে হারিয়েছি।”

কথা গুলো বলার সময় রূপের গলাটা ধরে আসছিলো। চোখ দিয়ে ও টলটলিয়ে পানি পড়ছে। মুহিত রূপের চোখের জল গুলো মুছে রূপকে বুকের মাঝে ঝাপটে ধরে বলল,,,,,,,

—–“আমি তোমার সিদ্ধান্তকে সম্মান জানাই রূপ। তুমি খুবই ভালো এক্টা ডিসিশান নিয়েছ। উনার পাপের শাস্তি উপর ওয়ালাই উনাকে দিবে। যতো দিন বেঁচে আছে এক্টু আনন্দ উল্লাস করে যাক। ফ্যামিলির সাথে সময় কাটিয়ে যাক।”

মুহিত কিছুটা থেমে আবার বলল,,,,,,

—–“হলুদের দিন রাতেই আমরা উনাকে ছাড়িয়ে আনব। আদনান আর মামানীকে বড় সড় এক্টা সারপ্রাইজ দিবো। খুব খুশি হবে সবাই।”

রূপ হালকা হেসে মুহিতের বুকে চুমো খেয়ে বলল,,,,,

—–“ভালোবাসি মুহিত।”

মুহিত রূপের মথায় চুমো খেয়ে বলল,,,,

—–“আমি ও ভালোবাসি রূপ। খুব খুব খুব ভালোবাসি।”

,,
,,,
,,,,

এভাবে কেটে গেলো এক সপ্তাহ। আজ সানায়া আর সাকিবের গাঁয়ে হলুদ। একসাথেই ওদের গাঁয়ে হলুদ পড়ানো হবে। তবে বিয়ের দিন সানায়ার বিয়েটা আগে হবে। এরপর সাকিবের। সানায়াকে বিদায় দিয়ে সাকিবের বৌ আনা হবে। মানে আদ্রিতাকে উঠিয়ে আনা হবে। দুটো বিয়ে একসাথে বলে বাড়িতে কাজের অভাব নেই। দুইদিন আগে থেকেই কাজ কর্ম শুরু হয়ে গেছে। পাড়ার মানুষরা খুব অবাক। কারণ, এই প্রথম ওদের পাড়ায় ভাই-বোনের বিয়ে একসাথে এবং একই দিনে। বাড়ির ভিতরে বিশাল এক প্যান্ডেল করা হয়েছে। আর গেইট টা তো রাজকীয় ভাবে সাজানো হয়েছে। একেবারে তাক লেগে যাওয়ার মতো।

মারুর পুরো পরিবার গতকাল ঢাকা এসেছে। মায়া আহমেদ উনাদের পেয়ে খুব খুশি। সানোয়ার আহমেদ তো অলরেডি আব্বাস আহমেদের সাথে সখ্যতা জুড়ে দিয়েছে। মাইমুনা আহমেদ এসে খুব সহজেই মায়া আহমেদ আর সোহেলী আহমেদের সাথে মিশে গেছে। মিনা আর মেঘা আরো ইজিলি দোলা আর সানায়ার সাথে মিশে গেছে। আর টায়রা বুড়ি তো আসার পর থেকেই পুরো বাড়ি মাথায় করে রেখেছে। বাড়ির প্রতিটা মানুষ টায়রাকে মাথায় তুলে রেখেছে। মিনার স্বামী এখন পুরোপুরি ভালো হয়ে গেছে। নতুন কোম্পানী খুলে বসেছে। মেঘার হাজবেন্ড আগে থেকেই খুব ভালো। উনার নিজস্ব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে। কাজের চাঁপে মিনা আর মেঘার হাজবেন্ড ঢাকায় আসতে পারে নি। পরিবারকে কাছে পেয়ে মারু খুশিতে পুরো বাড়ি মাতিয়ে রেখেছে। ওর যেনো খুশি আর ধরছে না।

রূপ আর মুহিত সকাল থেকেই থানায় দৌঁড়াদৌঁড়ি করছে। কেইস উঠানোর জন্য। গত একদিন আগে থেকেই মুহিত থানার গন্ডিতে ঘোরা ফেরা করছে। বড় বড় আইনজীবিদের থেকে বিভিন্ন রকমের মতামত নিচ্ছে। অনেক খাটা খাটনি শেষে কেইস উঠানো হলো। এর জন্য রূপকে অনেক কটু কথা ও শুনতে হয়েছে। যাক অবশেষে কেইস উঠিয়ে সন্ধ্যার মধ্যেই মিঃ হাসিবকে নিয়ে রূপ আর মুহিত বাড়ি ফিরল। মিঃ হাসিব এখনো অনুশোচনায় ভুগছে। রূপ বা মুহিত কারো দিকে চোখ তুলে তাকাচ্ছে না। উনাকে নিয়ে রূপ আর মুহিত সোজা আদনানের বাড়ি চলে এলো। আদনানদের পুরো বাড়িটা বেশ সুন্দর ভাবে সাজানো হয়েছে। বাড়ি ভর্তি মেহমান গিজগিজ করছে।

আদনান আর মিসেস আয়রা খুশিতে ছলছল দৃষ্টিতে মিঃ হাসিবের দিকে তাকিয়ে আছে। মিঃ হাসিব চোখের জল ছেড়ে মিসেস আয়রা আর আদনানকে ঝাপটে ধরল। বাড়ির সব মেহমানরা ওদের দিকে তাকিয়ে আছে। আদনান ইশারা দিয়ে রূপকে ধন্যবাদ জানালো। মিসেস আয়রা ও হেসে হেসে রূপের দিকে তাকালো।

রূপ আর এক মুহূর্ত ও ঐ খানে দাঁড়ালো না। দৌঁড়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে সোজা গাড়িতে বসে পড়ল। মুহিত ও রূপের পিছু পিছু দৌঁড়ে এসে গাড়িতে বসে গাড়ি স্টার্ট করে দিলো। রূপ গাড়িতে বসে অঝড়ে কেঁদে যাচ্ছে। কিছুতেই যেনো ওর কান্না থামছে না। শুধু ওর মা-বাবার কথা মনে পড়ছে। মুহিত ও রূপকে বাঁধা দিচ্ছে না। কারণ, কাঁদলেই মনের কষ্ট টা হালকা হবে।

বাড়িতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা সাতটা বেজে গেলো। মুহিত প্যান্ডেলের ভিতর ঢুকেই কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। বাড়ির ড্রইং রুমে পা রাখার সাথে সাথেই মারু এসে রূপকে ঝাঁকিয়ে বলল,,,,,,,

—–“সানায়াকে সাজানো হচ্ছে। চল আমরা ও সেজে নেই।”

রূপ জোর পূর্বক হাসি টেনে বলল,,,,,,,

—–“আগে ফ্রেশ হয়ে নেই। এরপর সাজব।”

মায়া আহমেদ রূপের কাছে এগিয়ে এসে এক গাল হেসে বলল,,,,,,,,

—–“রূপ….. তুই যা করেছিস, নিঃসন্দেহে ভালো করেছিস। খুব পুন্য করেছিস। তোর মামুর পাপের ফল উপর ওয়ালাই উনাকে দিবে। তুই যা করেছিস তার জন্য তুই অনেক গুলো মানুষের মনের দো’আ পেয়েছিস। বাকিটা জীবন তুই খুব সুখে শান্তিতে কাটিয়ে দিবি। মা তোকে অনেক অনেক দো’আ করে গেলাম। জানি না তোর এই পাপি মা টার দো’আ আদৌ কবুল হবে কিনা!”

মায়া আহমেদ এক্টা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে রূপের গালে হাত রেখে ঠোঁটে মলিন হাসি ফুটিয়ে আবার বলল,,,,

—–“যা ফ্রেশ হয়ে আয়। আজ আমি আমার তিন মেয়েকে নিজের হাতে সাজিয়ে দিবো। খুব শখ হচ্ছে তোদের সাজিয়ে দিতে।”

রূপ মায়া আহমেদকে ঝাপটে ধরে চোখের জল ছেড়ে বলল,,,,,,,

—–“ভালোবাসি মা। খুব খুব খুব ভালোবাসি। আমি আমার এই মা টা কে কোথাও হারাতে দেবো না। সারাজীবন তোমাকে আঁচলে বেঁধে রাখব। কোথাও যেতে দেবো না।”

রূপের সাথে সাথে মারু আর দোলা ও এসে মায়া আহমেদকে ঝাপটে ধরল। মায়া আহমেদ চোখের জল ছেড়ে অস্পষ্ট স্বরে বলল,,,,,,,,,

—–“যেদিন উপর ওয়ালা ডাক দিবে, ঐ দিন পৃথিবীর সব মায়া কাটিয়ে আমাকে যেতেই হবে। ঐ দিন পৃথিবীর কোনো শক্তিই আমাকে বেঁধে রাখতে পারবে না। উপর ওয়ালার ডাকে সাড়া দিতেই হবে। তোদের কাছে আমার এক্টাই রিকুয়েস্ট মা…… আমার মৃত্যুর পর প্রতিদিন নামাজ পড়ে আমার জন্য দো’আ করিস। কোরআন পাঠ করিস। আমার নাতি, নাতনীদের কাছে সবসময় আমার কথা বলবি। ওরা যেনো আমাকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মনে রাখে।”

কথা গুলো বলেই মায়া আহমেদ সবাইকে ছেড়ে নিজের রুমে চলে গেলো। রূপ, মারু আর দোলা চোখে অসংখ্য জল নিয়ে মায়া আহমেদের যাওয়ার পথে তাকিয়ে আছে। সানায়ার আহমেদ দৌঁড়ে রুমে ঢুকে মায়া আহমেদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মায়া আহমেদকে ঝাঁকিয়ে বলল,,,,,,,

——“কি হয়েছে তোমার? কয়েক দিন যাবত কিসব হেয়ালী কথা বার্তা বলছ?”

মায়া আহমেদ নিচের দিকে তাকিয়ে কেবল চোখের জল ছাড়ছে। মুখে টু শব্দ ও করছে না। সানোয়ার আহমেদ অশ্রুসিক্ত চোখে কিছুক্ষন মায়া আহমেদের দিকে তাকিয়ে থেকে মায়া আহমেদকে ঝাপটে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরল। মায়া আহমেদ ও সানোয়ার আহমেদকে ঝাপটে ধরে নীরব কান্না জুড়ে দিলো।

,,
,,
,,

রূপ ফ্রেশ হয়ে বেডের উপর বসে আছে। কিছুতেই যেনো ওর মন ভালো হচ্ছে না। মুহিত কাজ ফেলে রূপের কাছে চলে এলো। রুমের দরজা লাগিয়ে মুহিত রূপের পাশে বসল। মুহিতকে দেখে রূপ মুহিতের বুকে মাথা রেখে চোখ জোড়া বন্ধ করে ফেলল। মুহিত রূপের মাথায় হাত বুলাচ্ছে আর বলছে,,,,,,,

—–“কি হয়েছে তোমার হুম? এভাবে আপসেট থাকার কোনো মানে হয়?”

আচমকাই রূপ মুহিতের বুক থেকে মাথা তুলে চোখ জোড়া বন্ধ করে মুহিতকে ইশারা করে বলল ঠোঁটে চুমো খেতে। মুহিত বাঁকা হেসে রূপের ঠোঁট জোড়া আ্ঁকড়ে ধরল। এর মাঝেই রুমের দরজা খুলে মারু, দোলা আর মায়া আহমেদ রুমে ঢুকে পড়ল। ওরা তিনজনই জিভ কেটে মুখটা ঘুরিয়ে উল্টো পাশে ফিরে গেলো। মুহিত চরম লজ্জা পেয়ে রূপকে ছেড়ে মাথাটা নিচু করে রুম থেকে বের হয়ে গেলো। রূপ লজ্জায় মাটির সাথে মিশে যাচ্ছে। পারছে না মাটি ফাঁক করে মাটির ভিতর ঢুকে যেতে।

মারু আর দোলা রূপের পাশে বসে রূপকে খোচাচ্ছে আর হাসছে। মায়া আহমেদ ওদের দুজনকে থামিয়ে কথা ঘুড়ানোর জন্য মিটিমিটি হেসে বলল,,,,,,,,

—–“তোমরা এই মাএ যা যা দেখেছ, সব ভুলে যাও। সবাই এক এক করে দাঁড়িয়ে পড়ো। আমি আমার সাজানো শুরু করি।”

মারু আর দোলা জোরে চেঁচিয়ে বলল,,,,,,,

—-“আমরা দুজন আগে সাজব। এরপর রূপ সাজবে।”

রূপ মাথা নাঁড়িয়ে মায়া আহমেদকে উদ্দেশ্য করে বলল,,,,,,

—–“আচ্ছা আগে ওদের ই সাজিয়ে দাও। আমি নিচ থেকে আসছি। মিনা আপু আর মেঘা আপুর সাথে কথা বলে।”

রূপ রুম থেকে বের হয়ে সোজা নিচে চলে গেলো। মায়া আহমেদ এক এক করে মারু আর দোলাকে সাজানো শুরু করল। রূপ নিচে নেমে প্যান্ডেলের ভিতর ঢুকেই হঠাৎ থেমে গেলো। মুহিত ভিডিও কলে কারো সাথে হেসে হেসে কথা বলছে। রূপ পা টিপেটিপে নিশব্দে মুহিতের পাশে দাঁড়ালো। ফোনের স্ক্রীনের দিকে তাকিয়েই রূপ অবাক হয়ে গেলো। কারন মুহিত অনিকের সাথে ভিডিও কলে কথা বলছে। অনিকের পাশে এক্টা সুন্দুরী মেয়েকে ও দেখা যাচ্ছে। অনিক আর মেয়েটা হেসে হেসে মুহিতের সাথে কথা বলছে।

রূপ মুখে হাত দিয়ে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে স্ক্রীনের দিকে তাকিয়ে আছে। মুহিত পাশে রূপের উপস্থিতি টের পেয়ে রূপকে এক হাতের বন্ধনীতে আবদ্ধ করে অনিক আর মেয়েটাকে উদ্দেশ্য করে হেসে হেসে বলল,,,,,,,,

—–“লুক ভাবী। সি ইজ রূপ। আমার প্রিয়তমা, আমার সহধর্মিণী, আমার অর্ধাঙ্গিনী। যাকে আমি এক আকাশ ভালোবাসি।”

#চলবে,,,,,,,,,,,

(শেষের দিকে এসে গল্পটার রেসপন্স এতো বাজে ভাবে কমবে ভাবতেই পারি নি। কালকে দুটো পর্ব দিয়ে গল্পটার ইতি টানব।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here